kalerkantho

দ্রুত বিচারের বিষয়ে ইসলাম যা বলে

ড. মুহাম্মদ রুহুল আমিন রব্বানী   

৪ আগস্ট, ২০১৯ ০৮:৪৫ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



দ্রুত বিচারের বিষয়ে ইসলাম যা বলে

দ্রুত বিচার শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বভাবতই মনে হয়, কোনো মালমার বিচারকার্য দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করাই দ্রুত বিচার। শরিয়াহ আইনের প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে দ্রুত বিচারের কোনো সংজ্ঞা নেই। একইভাবে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০২’ (২০০২ সালের ২৮ নম্বর আইন) ও দ্রুত বিচারের কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। তবে ওই আইনের উদ্দেশ্য ও বিভিন্ন ধারা-উপধারা বিশ্লেষণ করে দ্রুত বিচারের সংজ্ঞা প্রদান করা যেতে পারে এভাবে, ‘গুরুত্ব, প্রয়োজন ও জনস্বার্থ বিবেচনায় যেসব মামলার বিচার সম্পন্ন হতে বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, বাদী-বিবাদীর কল্যাণ সাধন, জনস্বার্থ সংরক্ষণ ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার শর্তে সেসব মামলার বিচার কার্যক্রম যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা।’

ক.  মামলাটি জনগুরুত্বপূর্ণ হওয়া। অর্থাৎ মামলার সঙ্গে জনসাধারণ, দেশ বা ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট জরুরি বিষয় সম্পৃক্ত হওয়া।

খ.  গুরুত্ব ও প্রয়োজনের বিপরীতে মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা থাকা।

গ.  মামলার বাদী-বিবাদীর কল্যাণ বাস্তবায়ন, জনস্বার্থ সংরক্ষণ বা আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্য থাকা।

ঘ.  ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ঙ.  সম্ভাব্য দ্রুততার সঙ্গে মামলা নিষ্পত্তি করা।

শরিয়াহ আইনের দৃষ্টিতে দ্রুত বিচার
বিচারের মূল উদ্দেশ্য মামলার রায় প্রদান করে বাদী-বিবাদীর মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করা। স্বাভাবিকভাবেই যত দ্রুত ও অল্প সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা যায় ততই উভয় পক্ষের জন্য তা কল্যাণকর। এতে অত্যাচারের শিকার ব্যক্তির ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রতীক্ষার অবসান ঘটে এবং অত্যাচারীর ত্বরিত শাস্তি হয় এবং অত্যাচারও বন্ধ হয়। কিন্তু ত্বরিতগতি অবলম্বন অর্থ শুনানি, সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্যগ্রহণ ইত্যাদি সীমিত করা বা এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার শর্তে বিচারক কোনো প্রকার গড়িমসি না করে যত দ্রুত বিচারকার্য শেষ করা যায়—এটিই দ্রুত বিচার। শরিয়াহ আইনের দৃষ্টিতে বিচার দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করাই স্বাভাবিক অবস্থা বা সাধারণ নীতি। বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া একটি বিকল্প ব্যবস্থামাত্র। শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া বিচারকার্য বিলম্বিত করা বিচারকের জন্য অনুমোদিত নয়। পূর্বসূরি আলেমরা বিশেষত, যারা ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থা বিষয়ক গ্রন্থাদি রচনা করেছেন বা বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট ছিলেন তাঁরা বিলম্বিত বিচারের ক্ষেত্র নির্ধারণ করেছেন। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইসলামী আইনে দ্রুত বিচারই কাম্য।

দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির ব্যাপারে মূলনীতি
মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পন্ন করার জন্য বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিশ্বব্যাপী প্রচলিত দ্রুত বিচার দাবি মূলত শরিয়াহ আইনে বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা থেকেই গৃহীত। শরিয়াহ আইনে দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রে যেসব মূলনীতি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে, তার কয়েকটি নিচে আলোচিত হলো—

মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ (হাদিস)
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ইসলামে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত করাও যাবে না।’ (মুস্তাদরাক হাকেম, হাদিস : ২৪০০)

এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে কারো যেকোনো ধরনের অনিষ্ট সাধন করা ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে এ হাদিসের বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব। বাদী যদি অন্যায়ভাবে বিবাদীকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে, তখন দ্রুত বিচারের মাধ্যমে বিবাদীর অনিষ্ট অতি দ্রুত রোধ করা সম্ভব হয়। পক্ষান্তরে বিবাদী যদি অপরাধী হয়, তবে বাদীর অধিকার দ্রুত আদায়ের মাধ্যমে তার থেকে অনিষ্ট প্রতিহত করা যায়।

সাহাবায়ে কেরামের অভিমত
সাহাবিদের অভিমত শরিয়াহ আইনের অন্যতম সম্পূরক উৎস। চার ইমামের প্রত্যেকেই সাহাবির বাণীকে শরিয়তের বিধান উদ্ভাবনের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এ পরিসরে দুটি উদাহরণ উল্লেখযোগ্য—

(এক) ওমর (রা.)-এর খিলাফতকালে তিনি এ বিষয়ক বিশেষ নীতি প্রণয়ন করেন। তিনি আস-সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.)-কে নির্দেশ প্রদান করে বলেন, ‘আমার পক্ষ থেকে কিছু কাজ সম্পন্ন করো। অতঃপর তিনি এক-দুই দিরহামের (মূল্যমানের মামলাগুলো) ফয়সালা করতেন।’ (মাজমাউজ জাওয়াইদ, হাদিস : ৭০০৮)

এ থেকে নির্দিষ্ট বিচারপতির অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও তাতে বিচার্য মামলার ধরন নির্দিষ্ট করার ইঙ্গিত রয়েছে। মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে লিখিত পত্রে ওমর (রা.) বলেন, ‘যার অপরাধ প্রমাণিত হয়নি (অভিযুক্ত), তার ব্যাপারটি দ্রুত দেখবে। কেননা তার বন্দিত্ব দীর্ঘায়িত হলে সে অধিকার বঞ্চিত হবে।’ (মাউসুআতু ফিকহি উমার ইবনিল খাত্তাব, পৃষ্ঠা ৭২৬)

(দুই) জামাল ও সিফফিন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুয়াবিয়া (রা.) যখন দেখলেন যে মানুষের মধ্যে নরহত্যা ও রক্তপাতের প্রবণতা মারত্মক রূপ ধারণ করেছে এবং আহত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তখন তিনি তৎকালীন মিসরের বিচারপতি সুলাইম ইবনে আত্তারকে ‘আহতদের বিচার’ নামে বিশেষ একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করে তাদের বিষয়ে ফয়সালার নির্দেশ দেন। (আল-ক্বাদা আল-মুসতাজাল, মুসা ফাকিহি, পৃষ্ঠা ৯৫)

অতএব সাহাবিদের এ পন্থা অবলম্বন করে বর্তমান সময়ে অসংখ্য নতুন অপরাধপ্রবণতা রোধকল্পে দ্রুত বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন শরিয়াহ আইনের দৃষ্টিতে দূষণীয় নয়।

দ্রুত বিচারে সম্পূরক ফিকাহশাস্ত্রের মূলনীতি
ইসলামী আইন বিজ্ঞানের (উসুলুল ফিকহ) গ্রন্থাবলিতে বিচার ও বিচার ব্যবস্থা বিষয়ক ফিকাহশাস্ত্রের নীতিমালার বর্ণনা এসেছে। এ পরিসরে প্রাসঙ্গিক তিনটি কায়েদা (নীতি) উল্লেখ করা যেতে পারে—

এক. ‘যথাসময়ের আগে কোনো মামলার বিচার সম্পন্ন হবে না।’ (আল-কাওয়াইদু ওয়াদ-দাওয়াবিতুল ফিকহিয়্যাহ, মুহাম্মদ আল-হারিরি, পৃষ্ঠা : ৮৮)। এ নীতিমালা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে দ্রুত বিচার করার জন্য বিচারের মৌল নীতিমালার ব্যাপারে কোনোরূপ শিথিলতার অবকাশ নেই। বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার যেসব শর্ত ও প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করেই শুধু মামলা নিষ্পত্তি করার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে।

অন্যভাবে বলা যায়, রায় ঘোষণার আগে বিচার্য বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা ফতোয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকা বিচারকের কর্তব্য। কেননা তাঁর এ ধরনের মন্তব্য বিচারকে বাধাগ্রস্ত বা প্রভাবিত করতে পারে এবং তাঁর নিরপেক্ষতার ব্যাপারে বিচারপ্রার্থী যেকোনো পক্ষের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে কাজি শুরাইহ (মৃ. ১০৭ হি.]-এর কাছে বিচার্য বিষয় সংশ্লিষ্ট কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, ‘আমি তোমাদের বিচারের কাজে নিয়োজিত, ফতোয়া প্রদানের কাজে নই।’

দুই. ‘কোনো মামলার উপযুক্ত সময় অতিবাহিত হওয়ার পর তার বিচার করা যাবে না।’ (রদ্দুল মুহতার, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা ৪১৯)

যথাসময়ের আগে যেমন মামলার বিচার নিষ্পন্ন করা যায় না, তেমনি উপযুক্ত সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও মামলার বিচার করাও সংগত নয়। এ নীতি স্পষ্টভাবে বিচার কার্যক্রম দ্রুত করার নির্দেশনা প্রদান করে। অন্যভাবে বলা যায়, মামলার বাদী যদি শরয়ি ওজর ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত থাকে এবং মামলার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ প্রকাশ না করে, তবে একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের পর ওই মামলার তামাদি ঘোষণা করা হবে।

তিন. ‘বিচারের ক্ষেত্রে শর্তারোপ ও পর্যালোচনা গ্রহণযোগ্য এবং বিচারকের জন্য বিচারের স্থান, সময় ও মামলা নির্দিষ্ট করা অনুমোদিত।’ (আল আশবাহ ওয়ান-নাজাইর, ইবনে নুজাইম, পৃষ্ঠা ১৯৪)। বিচারের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ শর্তারোপ করতে হলে শর্তগুলো অবশ্যই শরিয়তসম্মত হতে হবে। বিচারের ক্ষেত্রে এ নীতি নিম্নোক্তভাবে প্রয়োগ করা হয়—

রাষ্ট্র যদি বিচারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান নির্ধারণ করে দেয়, তবে সে স্থানেই বিচারকার্য পরিচালনা করতে হবে। এর বাইরে অন্য কোথাও বিচারকার্য সমাধা করলে তা অগ্রাহ্য হবে এবং তার রায় অকার্যকর হবে।

রাষ্ট্র যদি বিচারের এজলাস বসার দিন বা সময় নির্ধারিত করে দেয়, তবে বিচারক সেই অনুযায়ী বিচারকার্য পরিচালনা করতে বাধ্য।

একই বিচারালয়ে একাধিক বিচারক থাকলে তাঁদের মধ্যে কর্ম ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন—একজন দেওয়ানি আদালতে বিচার পরিচালনা করবেন, অন্যজন ফৌজদারি আদালতে বিচার পরিচালনা করবেন।

ইসলাম ন্যায়বিচারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে
আল-কোরআনের সামষ্টিক নীতিমালা। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে বিচারবিষয়ক যেসব আয়াত রয়েছে, তাতে বিচারকার্যের কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি, বরং বিচারের মৌলিক উপাদান ও ধরন নির্ধারণ করা হয়েছে। কোরআনের বক্তব্য অনুযায়ী বিচার হতে হবে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে ন্যায়-ইনসাফপূর্ণ এবং এ ন্যায়ের মানদণ্ড হলো আল্লাহর দেওয়া বিধান এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। মহান আল্লাহ মানব-ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই বিচারের এই একই মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলেন। মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আসমানি কিতাবগুলো নাজিলের অন্যতম উদ্দেশ্য এবং তা নবী-রাসুলদের মুখ্য দায়িত্ব্ব।

বিচারব্যবস্থা বিষয়ে বর্ণিত সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত হয়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে যেসব মোকদ্দমা উপস্থাপিত হতো, তিনি সাক্ষ্য-প্রমাণ বিদ্যমান সাপেক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তার মীমাংসা করে দিতেন। অবশ্য কোনো কোনো সময় সার্বিক পরিস্থিতি, মামলার ধরন, অপরাধীর অবস্থা ও জনকল্যাণ বিবেচনা করে বিচারের রায় বিলম্বে কার্যকর করা হতো। যেমন—তিনি ব্যভিচারের অপরাধে অপরাধী এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর শাস্তি কার্যকর করা বিলম্বিত করেছিলেন। তবে সার্বিক ক্ষেত্রে তিনি দ্রুত বিচারে আগ্রহী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিক বিচারের প্রমাণসংবলিত দুটি হাদিস আমরা উল্লেখ করতে পারি।

(ক) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জমানায় কাব ইবনে মালিক (রা.) ইবনে আবু হাদরাদ (রা)-কে মসজিদে নিজ পাওনার জন্য তাগাদা দেন। এতে উভয়ের মধ্যে বাগিবতণ্ডা হয়। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ঘর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর হুজরার পর্দা সরিয়ে তাঁদের কাছে এলেন এবং কাব ইবনে মালিক (রা.)-কে ডেকে বলেন, হে কাব, তিনি হাতে ইশারা করলেন যে অর্ধেক মওকুফ করে দাও। কাব (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আমি তা-ই করলাম। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবনে আবি হাদরাদ (রা.)-কে বলেন, ‘যাও, তার ঋণ পরিশোধ করে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫২৯)

(খ) আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.) বলেন, জনৈক আনসারি সাহাবি মহানবী (সা.)-এর সামনে জুবাইর (রা.)-এর সঙ্গে খেজুরবাগানে পানি সরবরাহের জন্য হাররার নালার পানিপ্রবাহ নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হলেন। আনসারি বললেন, নালার পানিপ্রবাহ ছেড়ে দিন। কিন্তু জুবাইর (রা.) তা অস্বীকার করেন। তাঁরা দুজন মহানবী (সা.)-এর সামনে এ নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুবাইর (রা.)-কে বলেন, ‘হে জুবাইর, তোমার ভূমিতে পানি সরবরাহের পর তা তোমার প্রতিবেশীর ক্ষেতের দিকে ছেড়ে দাও।’ এতে আনসারি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, সে তো আপনার ফুফাতো ভাই। এ কথায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেহারা রক্তিমবর্ণ ধারণ করল। এরপর তিনি বলেন, হে জুবাইর, তোমার জমিতে পানি দাও, অতঃপর পানি আটকিয়ে রাখো, যাতে তা দেয়াল পর্যন্ত পৌঁছে। জুবাইর (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম! আমার মনে হয়, এ আয়াত উপরোক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নাজিল হয়েছে, ‘কিন্তু না, তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ না করে, অতঃপর তোমার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা থাকে না এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়।’ (আল-কোরআন, ৪:৬৫; সহিহ বুখারি, হাাদিস : ২৩৫৯)

মাকাসিদুশ শরিয়াহ
মাকাসিদুশ শরিয়াহ পূর্বকালের ও পরবর্তীকালের আলেমদের কাছে অতি পরিচিত একটি পরিভাষা। তবে পূর্ববর্তী আলেমরা এর কোনো সংজ্ঞা প্রদান করেননি, এমনকি ইমাম আশ-শাতিবিও নন, যিনি এ বিষয়ে সর্বপ্রথম গ্রন্থ রচনা করেন। মাকাসিদুশ শরিয়াহ শব্দের অর্থ শরিয়ত বা আইনের উদ্দেশ্য।

‘বান্দার দুনিয়া ও আখিরাতের সার্বিক কল্যাণ সাধনের জন্য শরিয়াহ প্রণেতা আইন প্রণয়নের বেলায় সাধারণ ও বিশেষ যে উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখেছেন, তাকে মাকাসিদুশ শরিয়াহ বলা হয়।’

এ পরিভাষা বোধগম্য করার জন্য অন্য কিছু শব্দও ব্যবহৃত হয়। যেমন—মাসলাহা, হিকমাহ, ইল্লাত ইত্যাদি।

ইসলামে বিচারব্যবস্থা ও বিচারকার্যের সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, মজলুমকে জালিমের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করা এবং প্রকৃত হকদারকে তার অধিকার পৌঁছে দেওয়া। দ্রুত বিচার আদালতের উদ্দেশ্যও একই।

ইজজুদ্দিন ইবনে আব্দুস সালাম (৫৭৭-৬৬০) বলেন, ‘বিচারক নিয়োগের উদ্দেশ্য হলো, জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত হকদারকে তার অধিকার পৌঁছে দেওয়া। তাই যত দ্রুত সম্ভব বিচারকার্য সম্পন্ন করা এবং ত্বরিত পন্থা অবলম্বন করা অত্যাবশ্যক, যাতে প্রকৃত হকদারকে অধিকার প্রদান এবং জালিম ও অধিকার খর্বকারীর জুলুমের অবসান করা যায়।’ (কাওয়াইদুল আহকাম ফি মাসাইলিল আনাম, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ৩৫)

পূর্বসূরি মুজতাহিদ কাজিদের অভিমত
কারো সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকার্য দ্রুত বা বিলম্বে সম্পন্ন করার ভয়াবহতা উল্লেখ করে কাজি শুরাইহ (রহ.) বলেন, ‘কারো সুপারিশের কারণে তড়িঘড়ি রায় দেওয়া অথবা রায় বিলম্বিত করা বিচারকের জন্য মোটেও সংগত নয়। যে তা করবে, তার ব্যাপারে আমি আশঙ্কা করি যে সে নিজের জন্য কঠিন শাস্তি অবধারিত করে নিল।’ (হাশিয়াল জামাল আলা শারহিল মানহাজ, খণ্ড-৫, পৃষ্ঠা ৩৪৯)

ইবনুল কিস (মৃ. ৩৩৫ হি.) বলেন, ‘বিচারকের কাছে বাদী-বিবাদী কোনো মামলা পেশ করলে তার ফয়সালা করা তার জন্য অপরিহার্য। তাদের অন্য কারো কাছে প্রেরণ করা বৈধ নয়। কেননা তাদের অন্যের কাছে পাঠানোর অর্থ প্রকৃত হকদারের তার অধিকার ফিরে পাওয়া বিলম্বিত করা।’ (প্রাগুক্ত)

বিনা কারণে বিচারকার্যে সময়ক্ষেপণ করার বিধান সম্পর্কে হানাফি আইনবিশারদরা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ বলেন, বিচারক বিনা ওজরে ইচ্ছাকৃতভাবে যদি বিচার বিলম্বিত করেন, তবে তিনি কুফরি করলেন। অন্য এক দলের মতে, ওই বিচারক কাফির হবেন। তবে বড় ধরনের অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবেন।

অপরাধ ও মামলার ধরন অনুযায়ী পৃথক ট্রাইব্যুনাল নির্ধারণ ও বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রসঙ্গে। কাজি আবু ইয়ালা [৩৮০-৪৫৮ হি.] বলেন, ‘যদি রাষ্ট্রপ্রধান কোনো এলাকায় দুজন বিচারক নিয়োগ করেন, আমি মনে করি, যদি তাঁদের একজনকে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের বিচারের দায়িত্ব্ব প্রদান করা হয় এবং অন্যজনকে ভিন্ন বিষয়ের দায়িত্ব্ব দেওয়া হয়, যেমন—একজনকে ঋণ বা আর্থিক লেনদেন বিষয়ে এবং অন্যজনকে বিয়ে বা পারিবারিক বিষয়ে বিচার ফয়সালা করার দায়িত্ব্ব দেওয়া হয়, তবে তা বৈধ। তাঁরা শুধু সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিচার করার দায়িত্বে নিয়োজিত হবেন। কাজি আল-মাওয়ারদিও [৩৬৪-৪৫০ হি.] একই মত পেশ করেছেন।

আল-কারাবিসি (মৃ. ৫৭০] বলেন, ‘বিচারের জন্য কোনো বিশেষ আদালত নির্দিষ্ট করা হলে তা সে ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে’—এ দলিলের ভিত্তিতে যদি কোনো এলাকার জন্য একজন বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে তাঁর কার্যক্রম ওই এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকবে। একইভাবে যদি বিচারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয় বা বিশেষ আদালত গঠন করা হয়, তবে তা তাঁর মধ্যেই সীমিত থাকবে। নির্ধারিত কিছু অপরাধের জন্য আলাদা আদালত গঠন প্রসঙ্গে ইবনে নুজাইম [৯২৬-৯৭০ হি.] বলেন,  ‘কিছু সুনির্দিষ্ট মামলার বিচারের জন্য নির্দিষ্ট আদালত গঠন এবং স্থান ও সময় নির্ধারিত করা বৈধ।’

বিচার বিলম্বিত করার ক্ষেত্রগুলো
প্রসঙ্গত ফকিহরা যেসব কারণে বিচারকার্য বিলম্বিত করা অনুমোদন করেছেন সেগুলো উল্লেখ করা জরুরি। এ সম্পর্কে নিচে চার মাজহাবের মতামত তুলে ধরা হলো—

এক. হানাফি মাজহাব

এ মাজহাবের দৃষ্টিতে বিচারক চার কারণে বিচারকার্য বিলম্বিত করার অধিকার সংরক্ষণ করেন—

১.  বিচারক যদি আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন এবং এ বিষয়ে আরো তদন্তের প্রয়োজন মনে করেন।

২.  বিচারক যদি বাদী-বিবাদী উভয়ের মধ্যে সমঝোতার আশা করেন। বাদী-বিবাদী পরস্পর প্রতিবেশী বা নিকটাত্মীয় অথবা দূরবর্তী যে-ই হোক—একই বিধান প্রযোজ্য।

৩.  যদি বাদী তার দাবির পক্ষে আরো যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন বা সাক্ষী উপস্থিত করার জন্য সময় প্রার্থনা করে। একইভাবে যদি বিবাদী তার প্রতিরোধ ও নিজের নির্দেশিত প্রমাণের জন্য সময় প্রার্থনা করে।

৪.  যদি বিচারক বিচারসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে ওই এলাকার আলেমদের থেকে ফতোয়া তলব করেন এবং তাঁদের প্রদত্ত ফতোয়ার ওপর নির্ভর করতে না পেরে অথবা অধিক তথ্য জানার জন্য অন্য এলাকার আলেম থেকে ফতোয়া গ্রহণ জরুরি মনে করেন, তবে অন্য এলাকার আলেমদের মতামত আসা পর্যন্ত বিচার বিলম্বিত করতে পারেন।

দুই. মালিকি মাজহাব

মালিকি মাজহাবের দৃষ্টিতে বাদী-বিবাদীর মধ্যে সমঝোতার সম্ভাবনা থাকলেই শুধু বিচারকার্য বিলম্বিত করা যেতে পারে।

তিন. শাফেয়ি মাজহাব

এ মাজহাবের দৃষ্টিতে বিচারক যেসব কারণে বিচার বিলম্বিত করার অধিকার সংরক্ষণ করেন তা হলো—

১.  বাদী-বিবাদীর মধ্যে সমঝোতা বা সন্ধির আশা থাকলে।

২.  অনুপস্থিত ব্যক্তির বিচারকে বিলম্বিত করা যেতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক শপথ করার যোগ্য হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাও অনুমোদিত।

৩.  মামলার বিষয় যদি রহস্যাবৃত ও দুর্বোধ্য হয়, তবে এর জট খুলে মূল ঘটনা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত বিচারকার্য দীর্ঘায়িত করা যায়।

চার. হাম্বলি মাজহাব

এ মাজহাবের দৃষ্টিতে নিম্নোক্ত কারণে বিচার বিলম্বিত করা যায়—

১.  মামলার তথ্য-প্রমাণ পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপিত হওয়া পর্যন্ত।

২.  সমঝোতার আশা থাকলে।

৩.  মামলার বিষয় ও প্রকৃত ঘটনা অস্পষ্ট হলে তা রহস্যমুক্ত হওয়া পর্যন্ত।

৪.  বিবাদী শপথ করলে এবং বাদী তা প্রত্যাখ্যান করলে।

৫.  সাক্ষ্য-প্রমাণের ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে।

দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রে পালনীয় শর্তাবলি
‘দ্রুত বিচার’ পরিভাষাকে সাধারণ বিচার থেকে পৃথক হিসেবে বিবেচনা করে আলাদা ট্রাইব্যুনাল চালু করলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ইসলামী আইনের বিচারব্যবস্থার সাধারণ নীতিমালাই প্রযোজ্য হবে। কেননা ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করাই সাধারণ ব্যবস্থা। শুধু উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে বিচারকার্য বিলম্বিত হতে পারে। ইসলামী আইন অনুযায়ী দ্রুত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার যেসব বিশেষ শর্ত রয়েছে সেগুলো হলো—

১.  সাধারণ বিচারের ক্ষেত্রে যেসব মৌলিক উপাদান থাকা ইসলামী আইনে আবশ্যক হিসেবে বিবেচ্য, দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রেও একই উপাদান বিদ্যমান থাকা জরুরি।

২.  সাধারণ ও দ্রুত বিচার আদালতের কার্যপ্রণালী বিধি অভিন্ন হওয়া।

৩.  নির্দিষ্ট কিছু মামলা নয়, বরং সব ধরনের মামলাকে দ্রুত বিচারের আওতাভুক্ত করা। কেননা দ্রুত বিচার ইসলামী বিচার ব্যবস্থার মৌলিক বৈশিষ্ট্য। সব ধরনের মামলার বিচার ইসলামী আইন অনুযায়ী করা একান্ত কর্তব্য। কিছু বিচার এ আইনের আওতায় এনে বাকিগুলোর প্রতি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। কেননা মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিটি মামলাই ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্ববহ।

৪.  ইসলামী আইন অনুযায়ী বিচার করার বাধ্যবাধকতা ছাড়াও বিচারকের সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থাকা।

৫.  ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়া পর্যন্ত সময় নেওয়া। বিচারকের অন্তরে এ সম্পর্কে কোনো ধরনের সংশয় বা দ্বিধাদ্বন্দ্ব না থাকা।

৬.  দুই স্তরে বিচারের ব্যবস্থা থাকা। অর্থাৎ নিম্ন আদালতের রায়সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকা।

৭.  বাদী-বিবাদী উভয়কে যুক্তিতর্ক এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।

৮.  বিচার পক্ষপাতমুক্ত হওয়া অর্থাৎ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য একই বিধান হওয়া। কাউকে বাঁচানো আর কাউকে ফাঁসানোর জন্য বিশেষ আইন তৈরি বা আইন পরিবর্তন না করা।

উপসংহার
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার নানামুখী কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্যই ইসলামী আইনকাঠামো দান করেছেন। এ আইনে নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বক্ষেত্রে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করাই কাম্য। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবসমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করাই নবী-রাসুল প্রেরণের অন্যতম লক্ষ্য। অত্র গবেষণাকর্ম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে ইসলামী আইন সর্বাগ্রে মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিচারপ্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অবকাশ দেয়। অতএব দ্রুত বিচার আইনের ধারণা ইসলামী আইনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যেরই অংশ। যদি এর প্রক্রিয়া, প্রয়োগপদ্ধতি ও নীতিমালা যথাযথ, ন্যায়সংগত এবং যেকোনো ধরনের অন্যায় প্রভাব থেকে মুক্ত হয়, তবে এজাতীয় আইন মানবতার কল্যাণ তথা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিশাল অবদান রাখতে পারে।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা