kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলাম প্রচারে সামাজিক মাধ্যম

আবরার আবদুল্লাহ    

২৭ মে, ২০১৯ ১০:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দক্ষিণ কোরিয়ায় ইসলাম প্রচারে সামাজিক মাধ্যম

রমজানের দ্বিতীয় সপ্তাহ। সিউলের একটি আলোকোজ্জ্বল সকাল। কয়েক শ মুসলিম একত্র হয়েছে সিউলের কেন্দ্রীয় মসজিদে। তারা ইতাইওয়ান জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে জুমার নামাজ আদায় করতে। অবশ্য উপস্থিত মুসল্লিদের মধ্যে কোরীয়দের সংখ্যা খুব কম। তাদের বেশির ভাগ মধ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী মুসলিম।

নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিপূর্ণ হয়ে গেছে মসজিদের মূল প্রার্থনাকক্ষ। মসজিদের ভেতরে জায়গা না পেয়ে বাইরের প্রাঙ্গণে নামাজের অপেক্ষা করছেন একজন কোরীয় মুসলিম মোহাম্মদ সানহু। তিনি বলেন, ‘আমি দক্ষিণ-পূর্ব সিউলের আনসান থেকে এসেছি। এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে আমাকে বাস ও ট্রেন পরিবর্তন করতে হয়েছে। আমি প্রতি শুক্রবার আমার দুই সন্তানকে নিয়ে এখানে নামাজ আদায় করতে আসি। আর রমজান মাস আসার পর মসজিদে উপস্থিত হওয়াকে আমি আরো গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। কেননা এটা বছরের সবচেয়ে পবিত্র মাস।’

তাঁর পাশেই বসা ছিলেন আহান নামের আরেকজন কোরীয় মুসলিম। তিনি এক দশক আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ায় মুসলিম হিসেবে বসবাস করা কঠিন; বিশেষত সমাজে ইসলামভীতি ছড়ানোর পর। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ইসলামের নামে যে চরমপন্থী কাজ হচ্ছে অনেক কোরীয়ই মনে করেন, পৃথিবীর সব মুসলিম তাঁর সঙ্গে একমত। কোরীয় সমাজে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রবল।

একই অভিযোগ করেন পার্ক সিউইন। তিনি ২০১০ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, ‘মুসলিম হওয়ায় আমার পরিবারের সদস্যরাও আমাকে নিয়ে অস্বস্তি বোধ করে। কোরীয় সমাজে মুসলিমদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। স্থানীয় কোরীয় মুসলিমদের চ্যালেঞ্জ যেন আরো বেশি। তবে আমার মনে হয়, ইসলাম ও মুসলিম সম্পর্কে মানুষের ধারণায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। পরিবর্তনটা অনিবার্য।’

দক্ষিণ কোরিয়ায় মুসলমানের সংখ্যা খুব সামান্য। দ্য কোরিয়া মুসলিম ফেডারেশনের তথ্য মতে কোরিয়ায় বর্তমানে দেড় লক্ষাধিক মুসলিম রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৩ শতাংশ। তবে এদের বেশির ভাগই অভিবাসী। দক্ষিণ কোরিয়ায় কোরীয় মুসলিমের সংখ্যা ৩৫ হাজার। দেড় লাখ মুসলমানের জন্য কোরিয়ায় সিউলের কেন্দ্রীয় মসজিদসহ মাত্র আটটি মসজিদ রয়েছে।

সিউল সেন্ট্রাল মসজিদের ইমাম রহমান লি জুহুয়া বললেন অন্য কথা। তাঁর মতে, ভুল-বোঝাবুঝি ও অপপ্রচারের কারণে বহু মানুষ আবার ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহী হচ্ছে এবং তাদের ভুল ধারণা ভেঙে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, সিউল সেন্ট্রাল মসজিদে দর্শনার্থী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তারা আমাদের আলোচনা শোনে এবং মুসলিম সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করে। গত বছর আড়াই হাজার কোরীয় সিউল সেন্ট্রাল মসজিদ পরিদর্শন করে, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি।

নানামুখী অপপ্রচার ও সামাজিক সংকটের মধ্যে কোরীয় মুসলিমদের উজ্জীবিত করতে, অমুসলিমদের মধ্যে ইসলামের প্রচার এবং সমাজের ভুল ধারণা ভেঙে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে কোরীয় মুসলিম তরুণরা। আর এই কাজে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করছে। ইসলামের প্রচার-প্রসারে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ব্যবহার করছে।

সামাজিক মাধ্যমে সরব কোরীয় তরুণদের একজন পার্ক ডংশিন। তিনি ২০০৯ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। বর্তমানে পার্ক ডংশিন দুটি ইউটিউব চ্যানেল চালান। একটি আরবি ভাষা শিক্ষাসংক্রান্ত এবং অন্যটি ইসলামের অন্যান্য বিষয়সংক্রান্ত। দুটি চ্যানেলে যথাক্রমে ১০ হাজার ও ৫০ হাজার সক্রিয় ভিউয়ার রয়েছে। ফেসবুকে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা দুই লাখ।

সামাজিক মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১১ সালে আমি ইউটিউব চ্যানেল চালু করি ইসলাম সম্পর্কে মানুষকে সঠিক তথ্য জানাতে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মানুষ সাড়া দিতে শুরু করেছে। অনেক ভিউয়ার ইসলাম অবমাননা করে পোস্টে মন্তব্য করে। কিন্তু আমি বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করি। কারণ কোরীয় সমাজে ইসলাম একটি নতুন সংস্কৃতি, যা সমাজের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে। একটি নতুন সংস্কৃতি ও ধর্ম সম্পর্কে জানার প্রক্রিয়াটাই এমন।

তিনি আরো বলেন, ‘আমি খুব বিস্মিত হই যে বহুসংখ্যক খ্রিস্টান ইসলাম সম্পর্কে জানতে আমার চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।’

ইসলাম গ্রহণের পর পার্ক সৌদি আরবের মদিনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে আরবি ভাষা ও মুসলিম ধর্মতত্ত্ব নিয়ে লেখাপড়া করেন এবং শরিয়াহ আইন নিয়ে মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সাফিয়া কাং না-ইয়ন ২০১৫ সালে ইসলাম গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি সিউল কেন্দ্রীয় মসজিদের নারী ম্যানেজার। ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৫০ হাজার। এই অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করে তিনি ইসলামী খাবার, ফ্যাশন ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয়ের প্রচার করেন। একই সঙ্গে তিনি ইসলামের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কোরীয় সংস্কৃতিগুলোও তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, ‘এটি কোরীয় ও মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধের কাজ করবে।’

তিনি বলেন, ‘কোরিয়ায় ইসলাম পালন করা কঠিন। তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আমি আমার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে গর্বিত। কারণ আমি ইসলামেই শান্তি  খুঁজে পেয়েছি।’

এভাবেই কোরীয় তরুণরা সামাজিক মাধ্যমে নানা আঙ্গিকে ইসলামকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

তথ্যসূত্র : আরব নিউজ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা