kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

জোরালো হচ্ছে নারীর পৃথক কর্মসংস্থানের দাবি

আতাউর রহমান খসরু    

১ মে, ২০১৯ ১৫:২১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জোরালো হচ্ছে নারীর পৃথক কর্মসংস্থানের দাবি

মুসলিম বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী। দেশভেদে জনশক্তির ৩০ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত নারী। তাই দেশের সার্বিক উন্নয়নে কর্মস্থলে নারীর অংশগ্রহণকে আবশ্যক মনে করছেন অনেকেই। তাঁদের মতে, কর্মশক্তির অর্ধেকাংশকে নিশ্চল রেখে দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কর্মসংস্থানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে নানা ধরনের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে মুসলিম ও অমুসলিম দেশে। এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও মুসলিমবান্ধব কর্মসংস্থান বাড়ছে—এমন তথ্য উঠে আসছে পশ্চিমা মিডিয়ায়।

অর্থনীতিবিষয়ক ওয়েবসাইট ব্লুমবার্গ এক গবেষণা প্রতিবেদনে আমেরিকার মুসলিমবান্ধব কর্মসংস্থান বাড়ার চিত্র তুলে ধরেছে। ক্যারল হাইমেজ ও জেফ গ্রিনের তৈরি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, আমেরিকায় মুসলিমবান্ধব কর্মসংস্থান বাড়ছে। মুসলিম কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভালো-মন্দ বিবেচনাবোধ বাড়ছে চাকরিদাতাদের মধ্যে। নামাজের কক্ষ থাকা, অফিসের খাবারের মেন্যুতে শূকরের গোশত ও অ্যালকোহল না থাকা, রমজানের রোজা পালনের সুযোগ দেওয়া, দুই ঈদ উদ্‌যাপনের অবকাশ, মুসলিম নারীর হিজাব পরিধানের অনুমতি ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে মুসলিমবান্ধব পরিবেশ আছে কি না তা নির্ণয় করা হয়। ২০০০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আমেরিকার করপোরেট কম্পানির তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমেরিকার মোট কম্পানির মাত্র এক শতাংশে মুসলিমবান্ধব কাজের পরিবেশ রয়েছে। অন্যদিকে ধর্মপালনের পরিবেশ রয়েছে এমন কম্পানির প্রায় অর্ধেকে মুসলিমবান্ধব পরিবেশ রয়েছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ধর্মীয় পরিবেশ রয়েছে এমন কম্পানিতে মুসলিমবান্ধব কর্মপরিবেশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিবেদনে কম্পানিগুলো মুসলিম চাকরিধারীদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, জনসংখ্যায় মুসলমানের হার বৃদ্ধি, তরুণ প্রজন্মের মুসলিমদের কর্মদক্ষতা ও কাজ করার আগ্রহ বৃদ্ধি এবং ধর্মপালনের সুযোগ কর্মরতদের কর্মতৎপরতা ও মনোযোগ বাড়ায়।

পশ্চিমা বিশ্বের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বেও কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের ৩৪২ মিলিয়ন পুরুষের বিপরীতে ১৫৫ মিলিয়ন কর্মজীবী নারী রয়েছে। গত ১৫ বছরে মুসলিম বিশ্বে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়েছে ৫০ শতাংশ। তবে এখনো মুসলিম বিশ্বের মোট কর্মক্ষম নারীর মাত্র এক-চতুর্থাংশ কাজে যোগদান করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নির্বাহী কমিটির সদস্য পাকিস্তানি নারী অর্থনীতিবিদ সাদিয়া জাহিদি মুসলিম কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আধুনিক শিক্ষার প্রভাব, পরিবর্তিত মূল্যবোধ ইত্যাদিকে কারণ উল্লেখ করেন। পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি, কর্মস্থলের পরিবেশ নারীকে দ্বিধাগ্রস্ত করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। (দ্য গ্লোবালিস্ট)

অর্থনৈতিক বাস্তবতা, কাজে যোগদানে নারীর আগ্রহ বিবেচনা করে কয়েকটি আরব দেশ নারীবান্ধব কর্মসংস্থানে মনোযোগী হয়েছে। কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত এর মধ্যে অন্যতম। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এও নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রস্তাবে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা, নারীর জন্য পৃথক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শালীনতা রক্ষা করেই করা যায় এমন কাজে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রদানের কথা বলা হয়েছে।

ইউরোপিয়ান ট্রেনিং ফাউন্ডেশন (ইটিএফ) জর্দানের নারী কর্মজীবীদের ওপর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কর্মজীবী মুসলিম নারী ও মুসলিম স্কলারদের বক্তব্য তুলে ধরে। ২০১৬ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে মুসলিম কর্মজীবী নারীরা কাজে যোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এবং কাজের পরিবেশ নিয়ে তাদের মতামত দেয়। তাদের প্রায় ৪০ শতাংশই বলে, নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজন মেটাতেই তারা কাজে যোগদান করতে বাধ্য হয়েছে। ৩৪ শতাংশ নারী বলে, উন্নত জীবনযাপনের প্রয়োজনে তারা চাকরি করছে। অবশিষ্ট নারী চাকরি করছে শখের বশে। কর্মস্থলের ব্যাপারে এসব নারীর অভিজ্ঞতা মিশ্র। পুরুষ সহকর্মীদের অনেকে যেমন সহমর্মী ও সহযোগী, আবার অনেকের লোলুপ দৃষ্টি ও লালসার শিকার হতে হয় তাদের। নারী হিসেবেও তাচ্ছিল্য ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে অনেকেই।

ওপরের পরিসংখ্যান ও অভিযোগের ভিত্তিতে জর্দানের অর্থনীতিবিদ ড. আবদুল্লাহ রাফেয়ি কয়েকটি সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, কর্মস্থলে নারীর অংশগ্রহণ শুধু বিলাসিতা নয়, অনেক ক্ষেত্রে তা অনস্বীকার্য প্রয়োজনও। আধুনিক শিক্ষা ও সমাজের এই প্রভাব প্রায় অপ্রতিরোধ্য। তাই মুসলিম নারীর জন্য শরিয়াহবান্ধব (শরিয়তসম্মত) নিরাপদ কর্মসংস্থানের চিন্তা করতে হবে। নারীর জন্য পৃথক ও নিরাপদ কর্মসংস্থান গড়ে তোলাই হবে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক সমাজের মধ্যে সৃষ্ট সংকটের যথাযথ সমাধান। তিনি আরো বলেন, নারীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেভাবে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে, তাতে নারীর দ্বারা পরিচালিত সম্পূর্ণ পৃথক ও বিকল্প কর্মস্থল প্রতিষ্ঠা অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।

লেখক : সাংবাদিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা