kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

কৃষি উন্নয়নে মুসলিমদের ইতিহাস স্বর্ণোজ্জ্বল

মুশাহিদ দেওয়ান    

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ১৭:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কৃষি উন্নয়নে মুসলিমদের ইতিহাস স্বর্ণোজ্জ্বল

খলিফা হারুন অর রশিদের স্ত্রী কর্তৃক খনন করা ‘নহরে জুবাইদা’র স্মৃতিচিহ্ন

কৃষি উন্নয়নে মুসলিমদের ইতিহাস স্বর্ণোজ্জ্বল। যুগে যুগে মুসলিম খলিফারা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কৃষির প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম চাষাবাদ করেছেন। নবীজি (সা.) কৃষিকর্মের প্রশংসা করেছেন। পবিত্র কোরআনের অনেক আয়াতে কৃষির প্রসঙ্গ এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো, সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তাকে উৎপন্ন করো, না আমি উৎপন্নকারী?’ (সুরা ওয়াকিয়া : ৬৩-৬৪)

হাদিস শরিফেও জমি চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ভূমি যেন পতিত অবস্থায় না থাকে সে জন্য নবীজি (সা.) বলেন, ‘যার কোনো জমি আছে, সে যেন তা চাষাবাদ করে। অথবা অন্য ভাইকে দান করে দেয় (তবু যেন অনাবাদি না থাকে)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৪৯৩) 

ইসলামের খলিফাদের কৃষির প্রতি গুরুত্ব
সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িন কৃষি উন্নয়নের প্রতি খুব মনোযোগী ছিলেন। হজরত ওসমান (রা.)-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়, আপনি বৃদ্ধ বয়সে বৃক্ষ রোপণ করছেন কেন? তিনি জবাব দেন, ‘সৎ কর্মরত অবস্থায় আমার মৃত্যু হওয়া ফাসাদরত অবস্থা থেকে উত্তম।’ একবার আবু দারদা (রা.) আখরোটগাছ রোপণ করছিলেন। তখন তাঁকে বলা হয়, আপনি বৃদ্ধ বয়সে এটা কেন লাগাচ্ছেন? অথচ এর ফল পেতে ২০ বছর (অর্থাৎ অনেক) সময় লাগবে। তিনি জবাব দেন, ‘আজর তথা প্রতিদান ছাড়া আমার অন্য কোনো চাহিদা নেই।’ (নুজহাতুল আনাম, পৃ. ১৮৫)

আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) ধনী হওয়া সত্ত্বেও মাঠে কোদাল নিয়ে নিজ হাতে পানি সেচের ব্যবস্থা করে দিতেন। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.) সর্বপ্রথম মদিনার জমিতে গম চাষ করেন। এত বিশাল এলাকাজুড়ে চাষাবাদ করেন যে উৎপন্ন শস্য মদিনাবাসীর এক বছরের খোরাক হয়ে যেত। ফলে সিরিয়া থেকে খাদ্যশস্য আমদানি নিষ্প্রয়োজন হয়ে পড়ে। (তারিখে দিমাশক : ২৫/১০২)

কৃষি উন্নয়নে খলিফা-আমিরদের অবদান
হিজরি প্রথম শতকে ইসলামী সাম্রাজ্য অর্ধজাহানে বিস্তৃত হয়। এর পর থেকে সুদীর্ঘকাল ধরে উমাইয়া, আব্বাসিয়া, উসমানিয়া খলিফারা পৃথিবী শাসন করেছেন। এসব খিলাফতের আমির-উমরা সর্বদা কৃষি উন্নয়নের প্রতি সুনজর দিয়েছেন। তাঁরা খাল-বিল খনন, সাঁকো ও বাঁধ নির্মাণ, মাজরা তথা পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কারকরণ, ভূগর্ভ থেকে সহজে পানি উত্তোলনের মেশিন স্থাপনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। শুধু বসরা নগরীতেই এক লাখ ছোট-বড় নালা ছিল, যেগুলো দিয়ে সহজে পানি প্রবাহিত হতো। অনেক নালা খননকারীর নামে নামকরণ হতো। খলিফা হারুন অর রশিদের স্ত্রী কর্তৃক খনন করা ‘নহরে জুবাইদা’ ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে।

এসব কাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হয়। কৃষক-বণিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হজরত সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.) ‘নহরে সাদ’ খননের প্রস্তুতি নেন। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। খননকাজ কিছুদূর এগোনোর পর বিশাল এক পাহাড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন খননকাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময় হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আস সাকাফি (তাঁর যুগে) আবার খননকাজ শুরু করেন। তিনি এবার তত্ত্বাবধায়কদের নির্দেশ দেন যে তোমরা দেখো, খননকর্মীদের দৈনিক খাবারের মূল্য কত? যদি খাদ্যের ওজন একজন শ্রমিকের খনন করা পাথরের ওজনের সমপরিমাণও হয়, তবু তোমরা খননকাজ বন্ধ করবে না। (সেই পরিমাণ মূল্য আমি দেব) পরবর্তী সময় বিশাল অর্থ ব্যয় করে নহরটি খনন করা হয়। (মুজামুল বুলদান : ৫/৩২১)

কৃষকদের সম্মান প্রদান
ইসলামের খলিফারা কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য অনুদান দিতেন। ওমর (রা.) বলতেন, তোমরা কৃষকদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। (অর্থাৎ তাদের প্রতি জুলুম কোরো না।) হজরত আলী (রা.) কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশনা প্রেরণ করেন যে তোমরা এক দিরহাম করের জন্য কৃষককে প্রহার কোরো না। খলিফা জিয়াদ বিন আবিহ কর্মচারীদের বলেন, তোমরা কৃষকদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। কেননা তারা যত দিন মোটা-তাজা থাকবে তোমরাও তত দিন মোটা-তাজা থাকতে পারবে (অর্থাৎ সুখে থাকবে)। (তাসহিলুন নজর, পৃ. ১৫৯)

এ ছাড়া তৎকালীন মুসলিম পণ্ডিতরা চাষাবাদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন। মানুষের আগ্রহের কারণে এটি একটি স্বতন্ত্র বিদ্যায় পরিণত হয়, যা ‘ইলমুয যিরাআহ’ (কৃষিবিদ্যা) নামে পরিচিতি লাভ করে।

সুতরাং চাষাবাদকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষত মুসলিম বিশ্বের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে এটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।

লেখক : উচ্চশিক্ষার্থী, আরবি সাহিত্য, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা