kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

হিংসা পুণ্যকে বিনষ্ট করে দেয়

মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম   

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ১৭:৩৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হিংসা পুণ্যকে বিনষ্ট করে দেয়

হিংসা বলা হয় অপরের সুখ-শান্তি দেখে ব্যথিত হয়ে তা দূর হওয়ার প্রত্যাশা করা। আল্লামা জুরজানি (রহ.) বলেন, হিংসা বলা হয় হিংসাকৃত ব্যক্তির অর্জন দূরীভূত হয়ে হিংসুকের মধ্যে চলে আসার আকাঙ্ক্ষা করাকে। আল্লাহ তাআলা তাঁর কোনো বান্দাকে ধন-দৌলত দান করেছেন, কাউকে স্বাস্থ্য দান করেছেন, কাউকে সুখ্যাতি দান করেছেন, কাউকে সম্মান দান করেছেন, কাউকে নেতৃত্ব দান করেছেন, আবার কাউকে দান করেছেন জ্ঞান। হিংসুকের মনে এই খেয়াল জন্মে যে এই সম্পদ তার কেন অর্জিত হলো? যদি তার থেকে এই নিয়ামত চলে যেত, তাহলে ভালো হতো! যদি অন্যের  কোনো বিপদ হয়, তাহলে সে খুশি হয়, আর যদি অন্যের ভালো কিছু অর্জিত হয়, তাহলে সে অন্তরে ব্যথা পায় এবং আফসোস করতে থাকে, কেন সে আমার চেয়ে বড় হয়ে গেল, উন্নতি লাভ করল! এর নামই হিংসা।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা পুণ্যকে এমনভাবে বিনষ্ট করে দেয়, যেমনিভাবে আগুন কাঠকে ভস্মীভূত করে দেয়।’ (আবু দাউদ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে পূর্ববর্তীদের নৈতিক ব্যাধি বিস্তার লাভ করবে, আর তা হলো হিংসা ও বিদ্বেষ।’ (জামে তিরমিজি)। কোরআনের ভাষায়, ‘আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে (আশ্রয় চাই) যখন সে হিংসা করে।’ (সুরা ফালাক)

হিংসাই পৃথিবীর অশান্তির কারণ : শত্রুতার কারণে হিংসার জন্ম হয় এবং পরিণতিতে অনেক সময় ভয়াবহ দ্বন্দ্ব-কলহ ও খুনাখুনির মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রতিপক্ষের নিয়ামত বিলোপ সাধনের ফন্দিফিকিরে ও চিন্তাভাবনায় সব জীবন কাটিয়ে দেয়। কখনো প্রতিপক্ষের গিবত ও মানহানির চেষ্টা পর্যন্ত চালানো হয়। হিংসার আগুন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ভাই-ভাইয়ের মধ্যে প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। হিংসার উপাদানগুলোর উপস্থিতি যেখানে যত বেশি ঘটবে, হিংসাও সেখানে সেই পরিমাণ প্রবল আকারে পাওয়া যাবে। এক ব্যক্তি একসঙ্গে অহংকার, শত্রুতা ও হীনম্মন্যতার কারণে হিংসা করে।

ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে হিংসার কারণ : আপনজনদের সঙ্গে অধিক পরিমাণ হিংসার কারণ হলো, জীবন চলার পথে আপনজনদের সঙ্গেই যেহেতু অধিক ওঠাবসা, কথাবার্তা, লেনদেন এবং ভাব ও স্বার্থের বিনিময় হয়, সেহেতু কোনো একজনের কথাবার্তা ও কাজকর্ম যদি নিজের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রতি বিরক্ত, অসন্তুষ্ট ও কষ্ট পেয়ে অন্তরে বিদ্বেষ ভাব পোষণকরত এর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করে।

হিংসার মূল কারণ হলো দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা। একদিকে মানুষের পার্থিব চাহিদা অন্তহীন। অথচ ঐহলৌকিক বস্তুসমূহ তার অংশীদারদের মধ্যে যথেষ্ট হয় না। একজন কিছু প্রাপ্ত হলে অন্যজন তা থেকে সেই পরিমাণ বঞ্চিত হয়। পক্ষান্তরে আখিরাতের অবস্থা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে কোনো বস্তুরই অভাব নেই। তাই পারলৌকিক বিষয়ে হিংসা করা হয় না।

হিংসার প্রতিকার : মানুষের আত্মার ব্যাধিসমূহের মধ্যে প্রধান ব্যাধি হলো হিংসা। আত্মার এই রোগের প্রতিকার একমাত্র প্রকৃত জ্ঞান ও নির্লোভ জীবনাচারের মাধ্যমেই সম্ভব। এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা উচিত যে হিংসার ফলে হিংসুকের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ যার প্রতি হিংসা করা হয়, তার ঐহলৌলিক ও পারলৌকিক কোনো ক্ষতি হয় না; বরং এই হিংসার ফলে সে লাভবান হয়। এ কথা জানার পর সে হিংসা করা বর্জন করবে।

হিংসার ভিত্তি হলো অতিমাত্রায় জাগতিক অর্জন ও সম্পদের মোহ। ফলে ব্যক্তি যদি স্বীয় অন্তর থেকে এসবের লালসা বের করে দিতে পারে, তাহলেই হিংসার রোগ থেকে আরোগ্য লাভ সম্ভব।

লেখক : প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী

মন্তব্য