kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

ওয়াজ নিয়ে সরকারি নির্দেশনা : কী ভাবছে আলেমসমাজ

কালের কণ্ঠ অনলাইন   

৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:২৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ওয়াজ নিয়ে সরকারি নির্দেশনা : কী ভাবছে আলেমসমাজ

কী আছে সরকারি নির্দেশনায়

ফেসবুক ও ইউটিউবের কল্যাণে ওয়াজ মাহফিল এখন আর ময়দানে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে শোনা যায় ওয়াজ মাহফিল। আর এর মাধ্যমে উঠে আসছে ওয়াজের মাঠের নানা চিত্র। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছয়টি নির্দেশনা দিয়েছে—১. ওয়ায়েজ হুজুররা যেন বাস্তবধর্মী ও ইসলামের মূল স্পিরিটের সঙ্গে সংহতিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন, সে জন্য তাঁদের প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণের ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন ও কমিউনিটি পুলিশের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ; ২. যাঁরা ওয়াজের নামে হাস্যকর ও বিতর্কিত বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে ধর্মের ভাবগাম্ভীর্য নষ্ট করার চেষ্টা চালান, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ প্রো-অ্যাকটিভ উদ্বুদ্ধকরণ; ৩. অনেক আলেমের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রির মতো উচ্চশিক্ষা ছাড়া যাঁরা ওয়াজ করেন, তাঁরাই জঙ্গিবাদ ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। তাই মাদরাসায় উচ্চশিক্ষিত ওয়াজকারীদের নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসা; ৪. অনেকেই আছেন, যাঁরা হেলিকপ্টারযোগে ওয়াজ মাহফিলে যোগ দেন এবং ঘণ্টাচুক্তিতে বক্তব্য দিয়ে বিশাল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করেন। তাঁরা নিয়মিত ও সঠিকভাবে আয়কর প্রদান করেন কি না তা নজরদারির জন্য আয়কর বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব বিভাগে কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি করা; ৫. ওয়ায়েজ হুজুরদের বক্তব্য স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক সংরক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং উসকানিমূলক ও বিদ্বেষ ছড়ানো বক্তব্য দিলে তাঁদের সতর্ক করা। প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে তাঁদের ওয়াজ করার অনুমতি না দেওয়া এবং ৬. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য প্রদানকারীদের আইনের আওতায় আনা।

ওয়াজের মূলনীতি মেনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা উচিত

আল্লামা মাহমুদুল হাসান

ওয়াজে লাগামহীন কথাবার্তা বলা উচিত নয় বলে মনে করেন যাত্রাবাড়ী মাদরাসার প্রিন্সিপাল ও গুলশান কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব আল্লামা মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ওয়াজের উদ্দেশ্য হলো মানুষের হেদায়েত। আর এর জন্য কোরআন ও সুন্নাহর মূলনীতি আছে। কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহ্বান করো হেকমত ও সৎ উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে তর্ক করবে উত্তম পন্থায়...।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

ওয়াজ হলো উপদেশস্বরূপ। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘অতএব তুমি তাদের উপদেশ দিতে থাকো। কেননা উপদেশ ঈমানদারদের উপকারে আসে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ৫৫)

আল্লামা মাহমুদুল হাসান আরো বলেন, এখানে তিনটি বিষয় আছে—যুদ্ধ, তালিম (শিক্ষাদীক্ষা) ও দাওয়াত (সত্য পথে আহ্বান)। শক্তি ও বল প্রয়োগ যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তালিমের জন্য প্রয়োজন দয়ার্দ্রতা ও অনুগ্রহ। আর দাওয়াতের কাজ করতে হবে হেকমত তথা কৌশল অবলম্বন করে। সর্বোপরি দ্বিন প্রচারের মূলনীতি অনুসরণে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে ওয়াজ করা উচিত।

নম্র ভাষায় দাওয়াত দিয়ে তাবলিগ জামাত সফলতা পেয়েছে

আল্লামা আবদুল হালিম বুখারি

নম্র ভাষায় দাওয়াত দিয়ে তাবলিগ জামাত সফলতা পেয়েছে। সুতরাং এভাবেই দ্বিন প্রচার করা উচিত বলে মনে করেন বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলেম আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া চট্টগ্রামের মহাপরিচালক আল্লামা আবদুল হালিম বুখারি। তিনি বলেন, ওয়াজের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে হেদায়েতের পথে নিয়ে আসা। এটাও দাওয়াতের অংশ। তবে এটা প্রচারের দুটি ধারা আছে—এক. মহব্বতের সঙ্গে নম্র ভাষায় মানুষকে সত্য পথে আহ্বান করা; দুই. রাজনৈতিক ভাষায় কঠোরতার সঙ্গে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া। দ্বিতীয় পন্থা আমি পছন্দ করি না। দেখুন, তাবলিগ জামাত নম্রভাবে কথা বলে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। আমি মনে করি, সেভাবেই ওয়াজ করা উচিত। বর্তমানে যেভাবে ওয়াজ করা হয়, আমি আমাদের মুরব্বিদের সেভাবে কখনো ওয়াজ করতে দেখিনি। আর ওয়াজের মূলনীতি কোরআনেই আছে। খোদাদ্রোহী ফেরাউনের কাছে যখন মুসা ও হারুন (আ.)-কে পাঠানো হয়, তখন এই বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল : ‘তোমরা তার সঙ্গে নম্র ভাষায় কথা বলবে। (এতে) হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভয় করবে।’ (সুরা : ত্ব-হা, আয়াত : ৪৪)

ঢালাওভাবে ওয়াজ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয়

আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ

যাঁরা ঈমান ও ইসলামের কথা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরছেন, তাঁদের ঢালাওভাবে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত নয় বলে মত ব্যক্ত করে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান ও ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার গ্র্যান্ড ইমাম শাইখুল হাদিস আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ বলেন, আলেমরা সমাজের আয়না। ঢালাওভাবে আলেম-উলামার ওয়াজ নিয়ন্ত্রণ ঠিক হবে না। তবে যদি সুনির্দিষ্টভাবে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, একজন সাধারণ মানুষ মসজিদে এলেই আলেম খুশি হন। আলেমের দাওয়াতি কাজই হলো আসল মেহনত। কোথাও কোথাও কেউ কেউ কোনো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। তা অবশ্যই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটা আলেমদের বাস্তব চিত্র নয়। ঢালাওভাবে ওয়াজ নিয়ন্ত্রণ করলে বাস্তব ক্ষেত্রে সমাজ পিছিয়ে পড়বে। দ্বিনের আলো সমাজে কমতে থাকলে অন্ধকার এখানে জায়গা করে নেবে। সমাজকে আলোকিত করতেই এই সমাজের বাতাসে দ্বিনের কথা ছড়িয়ে দিতে হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের উত্থান ঠেকাতেও আলেমদের ওয়াজ ও বয়ান খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি নিয়ন্ত্রণ চাই না, বক্তাদের সংযম চাই

আল্লামা আরশাদ রাহমানি

ওয়াজ মাহফিলে সরকারি নিয়ন্ত্রণ চাই না, তবে বক্তাদের সংযম চাই—এই মর্মে অভিমত দিয়েছেন ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, বসুন্ধরা, ঢাকার মুহতামিম আল্লামা আরশাদ রাহমানি। তিনি বলেন, কিভাবে ওয়াজ করতে হবে, এ বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। হেকমতপূর্ণ ভাষায় ওয়াজ হওয়া উচিত। আর ধীরস্থির সাবলীলভাবে ওয়াজ করা উচিত। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) অনবরত কথা বলতেন না। তিনি আলাদাভাবে কথা বলতেন। ফলে যারা তাঁর কাছে বসা থাকত, তারা তা সংরক্ষণ করতে পারত। (তিরমিজি : ৩৬৩৯)

বিভ্রান্তি নিরসনে ‘হাইয়াতুল উলয়া’ ভূমিকা রাখতে পারে

মাওলানা মামুনুল হক

জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়ার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও সময়ের জনপ্রিয় বক্তা মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ওয়াজ মাহফিলের যে বিষয়গুলো বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলে মনে করা হয়, সেসব বিষয়ে আলেমদের সর্বোচ্চ অথরিটি আল-হাইয়াতুল উলয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদের এই ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ সুফল বয়ে আনবে না এবং তা গ্রহণযোগ্যও হবে না।

উলামায়ে কেরাম বিষয়গুলোতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, অসংযত কোনো কথা হলে তা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য উলামায়ে কেরাম আছেন। উলামায়ে কেরাম নিজ নিজ জায়গা থেকে এসব বিষয়ে সংযত হওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছেন। ওয়াজ মাহফিলেও তো বক্তাদের অসংযত আচরণ ও বক্তব্যের প্রতিবাদ হচ্ছে নিয়মিত!

গ্রন্থনা : মুফতি মোহাম্মদ মর্তুজা

মন্তব্য