kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্রে ইসলামী ভাবধারা

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা    

১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্রে ইসলামী ভাবধারা

মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা যেসব চিঠিপত্র লিখেছিলেন, ‘একাত্তরের চিঠি’ নামে তার একটা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এই চিঠিগুলোতে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎকালীন আবেগ ও চিন্তা ফুটে উঠেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের বেশির ভাগই ছিলেন বাঙালি মুসলমান। তাই স্বাভাবিকভাবে তাঁদের চিঠিপত্রে ইসলামী ভাবধারা বিদ্যমান ছিল। সেখান থেকে কয়েকটি চিঠির ভাষ্য এখানে উল্লেখ করা হলো—

মা,

আপনি এবং বাসার সবাইকে সালাম জানিয়ে বলছি, দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। তাই ঢাকার আরো ২০টা যুবকের সাথে আমিও পথ ধরেছি ওপার বাংলায়। মা, তুমি কেঁদো না, দেশের জন্য এটা খুব ন্যূনতম চেষ্টা। মা, তুমি এ দেশ স্বাধীনের জন্য দোয়া কোরো। চিন্তা কোরো না, আমি ইনশাআল্লাহ বেঁচে আসব। আমি ৭ দিনের মধ্যেই ফিরে আসতে পারি কি বেশিও লাগতে পারে। তোমার চরণ মা, করিব স্মরণ। আগামীতে সবার কুশল কামনা করে খোদা হাফেজ জানাচ্ছি।

তোমারই বাকী (সাজু)

চিঠি লেখক : শহীদ আবদুল্লাহ বিহ বাকী (সাজু), বীরপ্রতীক।

পিতা : এম এম বারী (একাত্তরের চিঠি, প্রথমা প্রকাশন, প্রথম সংস্করণ, ২০০৯, পৃষ্ঠা ১৮)

মা,

দোয়া করো। তোমার ছেলে আজ তোমার সন্তানদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে চলছে। বর্বর পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠী আজ তোমার সন্তানদের ওপর নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। যেখানে তোমার সন্তানদের ইজ্জতের ওপর আঘাত করছে, সেখানে তো আর তোমার সন্তানরা চুপ করে বসে থাকতে পারে না। তাই আজ তোমার হাজার হাজার বীরসন্তান বাঁচার দাবি নিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করবার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ‘তোমার নগণ্য ছেলে তাদের একজন।’ পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে দুহাত তুলে দোয়া করি—তোমার সন্তানরা যেন বর্বর পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীকে কতল করে এ দেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করতে পারে। ‘এ দেশের নাম হবে বাংলাদেশ, সোনার বাংলাদেশ।’ এ দেশের জন্য তোমার কত বীরসন্তান শহীদ হয়ে গিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

। দেশকে স্বাধীন করে ছাড়বই। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

, যেন জয়ের গৌরব নিয়ে ফিরে আসতে পারি, নচেৎ বিদায়।

ইতি

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

মো. খোরশেদ আলম। মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর ২।

বর্তমান ঠিকানা : ১-ই-৭/৪ মিরপুর, ঢাকা ১২১৬। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৯)

মা,

আমার শত সহস্র সালাম ও কদমবুসি গ্রহণ করিবেন। আব্বার কাছেও তদ্রূপ রহিল। এত দিনে নিশ্চয়ই আপনারা আমার জন্য খুবই চিন্তিত। আমি আল্লাহর রহমতে ও আপনাদের দোয়ায় বাংলাদেশের যেকোনো এক স্থানে আছি। আমি এই মাসের ২০ হইতে ২৫ তারিখের মধ্যেই বাংলাদেশে আসিয়াছি। যাক, বাংলাদেশে আসিয়া আপনাদের সঙ্গে দেখা করিতে পারিলাম না। আমাদের নানাবাড়ির ও বাড়ির খবরাখবর নিম্নের ঠিকানায় লিখিবেন। আমি বাংলার স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য আসিয়াছি। আশা করি, বাংলায় স্বাধীনতা আসিলেই আমি আপনাদের কোলে ফিরিয়া আসিব। আশা করি, মেয়াভাই ও নাছির ভাই এবং আমাদের স্বজন বাংলার স্বাধীনতাসংগ্রামে লিপ্ত। যাক, বর্তমানে আমি ময়মনসিংহে আছি। এখান হইতে আজই অন্য জায়গায় চলিয়া যাইব। দোয়া করিবেন।

পরিশেষে

আপনার স্নেহমুগ্ধ ফারুক

জয় বাংলা

চিঠি লেখক : শহীদ ওমর ফারুক। ভোলা জেলার সদর উপজেলার চরকালী গ্রামের আনোয়ারা বেগম ও আব্দুল অদুদ পণ্ডিতের পুত্র। ১৯৭১ সালের অক্টোবরে গাইবান্ধার নান্দিনায় সংঘটিত যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৯)

ঝালকাঠি, মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট

২৪-৭-৭১, বাংলা ৬ শ্রাবণ ১৩৭৮

স্নেহের ফিরোজা,

তোমাকে ১৭ বছর পূর্বে সহধর্মিণী হিসেবে গ্রহণ করিয়াছিলাম। অদ্যাবধি তুমি আমার উপযুক্ত স্ত্রী হিসেবে সংসারধর্ম পালন করিয়া আসিয়াছ। কোনো দিন তোমার ওপর অসন্তুষ্ট হইতে পারি নাই। আজ আমি (...) তোমাদের অকূল সাগরে ভাসাইয়া পরপারে চলিয়াছি। বীরের মতো সালাম। ইনশাআল্লাহ জয় আমাদের হইবে, দুনিয়া হইতে লাখ লাখ লোক চলিয়া গেছে খোদার কাছে। কামনা করি যেন সব শহীদের কাতারে শামিল হইতে পারি। মনে আমার কোনো দুঃখ নাই। তবে যে অপরাধে আমার মৃত্যু হইতেছে, খোদাকে সাক্ষী রাখিয়া আমি বলিতে পারি যে এই সব অপরাধ হইতে আমি নিষ্পাপ। জানি না খোদায় কেন যে আমাকে এরূপ করিল। জীবনের অর্ধেক বয়স চলিয়া গিয়াছে, বাকি জীবনটা বাদল ও হাকিমকে নিয়া কাটাইবে। (...) পারিলাম না। (...) বজলু ভাইয়ের বেটা ওহাবের কাছে ১৫ হাজার টাকা আছে। যদি প্রয়োজন মনে করো, তবে সেখান হইতে নিয়া নিয়ো।

ইতি তোমারই বাদশা

(বাদশা হাকিম, তোমার মাকে ছাড়িয়ে কোথাও যাইয়ো না)

চিঠি লেখক : শহীদ বাদশা মিয়া তালুকদার, গ্রাম : বাঁশবাড়িয়া, উপজেলা : টুঙ্গিপাড়া, জেলা : গোপালগঞ্জ। (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৪৭)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা