kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

শিশু কী পড়বে?

মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ   

৩০ নভেম্বর, ২০১৮ ০৮:৫৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশু কী পড়বে?

শিশু কী পড়বে? আমরা তাকে কী পড়ে শোনাব? কোন ধরনের গল্প বা কাহিনির বই আমরা তাকে পড়তে দেব?

বই নির্বাচনে কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা চাই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো উপকারিতা ও আনন্দ দান। প্রাথমিকভাবে এ দুটি বৈশিষ্ট্য থাকা চাই।

উপকারিতা থাকা এ জন্য আবশ্যক, শিশুদের এ সময়টি আত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, শারীরিক ও সামাজিক গুণাবলি অর্জনের সময়। তাই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও মনোবল সুদৃঢ় করার জন্য শিশুদের পঠিতব্য বইগুলো সম্পর্কে আমাদের ভালো জানাশোনা থাকতে হবে।

তেমনিভাবে পড়ায় আনন্দ থাকা চাই। শিশুরা যা পড়বে বা শুনবে, তাতে আনন্দ না পেলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিশেষত শিশুকাল ও কিশোর বয়সে তাদের সর্বদা আনন্দ-উত্ফুল্লতায় থাকতে হয়; নতুবা বই পড়তে তারা অভ্যস্ত হয় না। শিশুর মনে যেন আনন্দ-খুশির ছোঁয়া লাগে এবং জীবনের সৌন্দর্য সে-ও অনুভব করে। অতএব শিশুদের বই নির্বাচন করার সময় আমাদের খুব সূক্ষ্মভাবে ভাবতে হবে।

বই নির্বাচনে নিম্নোক্ত দিকগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে :

►   সহজ ও সাবলীল ভাষায় লিখিত গল্পের বই শিশুর জন্য বেশ ফলদায়ক। এমন বই পড়ে শিশুরা কোনো ক্লান্তি অনুভব করে না। এ ধরনের বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা বইয়ের মলাটের ওপর নির্ভর করতে পারি। লেখক বা প্রকাশকরা বইয়ের মলাটে শিশুর বয়স উল্লেখ করে থাকেন।

►   যে গল্পের বইগুলো শিশুর মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা তৈরি করে, এমন বই নির্বাচন করা দরকার। ছোটদের জন্য লিখতে পারা সাধারণ কোনো ব্যাপার নয়। আর এমন লেখকের সংখ্যা অতি নগণ্য, যাঁরা বইয়ের মাধ্যমে শিশুদের বাজে খানাপিনা ও খেলাধুলা থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারেন। কোন গল্পের বই শিশুর মনকে নাড়া দেয় তা বোঝা যাবে, বইয়ের মুদ্রিত কপির বিক্রির হার এবং ভিন্ন ভাষায় এর অনুবাদের হার দেখে। কারণ শিশু চীনে থাকলেও শিশু। আর চীনের শিশু যাতে আকৃষ্ট হবে, দক্ষিণ আফ্রিকা বা প্যারিসে থাকা শিশুও তাতে আকৃষ্ট হবে।

►   শিশুর মধ্যে ভয়ভীতি ছড়িয়ে দেয় এমন বই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা। যেমন জিন-ভূত, শয়তান-দৈত্য ও বিভিন্ন লোমহর্ষক নির্যাতনের ঘটনাবলি। কেননা শিশুরা বেশির ভাগ সময় কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।

►   অনেক গল্পের বইয়ের লেখক অমুসলিম থাকেন কিংবা মূল লেখক অমুসলিম। অথবা লেখক মুসলিম, তবে তিনি ইসলামী ভাবধারার প্রতি যত্নবান নন। তাই তাঁর লেখায় তাওহিদ ও আকিদাবিরোধী বিভিন্ন কথা থাকে। এ ব্যাপারে সব মা-বাবার সচেতন থাকা কর্তব্য। অন্যদের এ ব্যাপারে জানানোও সবার দায়িত্ব। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্যদের এ ব্যাপারে জানিয়ে সহযোগিতা করা যায়।

►   শিশুরা ছোটবেলায় যা পড়ে, বড় হওয়ার পর নিজের ব্যক্তিত্ব গঠন ও চিন্তা-চেতনা লালনে এর অনেক প্রভাব পড়ে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো, তাদের জন্য এমন বই নির্বাচন করা, যা তাদের মনে ঈমানি ভাবধারা, মহান আল্লাহ ও রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা তৈরি করবে। একজন মুসলিমের জীবন গঠনের মৌলিক উপাদান হলো, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। আমি এখনো ভুলতে পারি না ওই ছোট ছোট বইয়ের কথা, যাতে ইসলামের রুকন, ইসলামী শিষ্টাচার ও সুন্নত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, অঙ্গীকার রক্ষা, অপরের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ, বদান্যতা, উদারতা, অবিচলতা, সাহসিকতা, অধ্যবসায়সহ ইসলামী ভাবধারা ও উন্নত চরিত্র গঠনের নানা দিক নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে ছোট ছোট বইয়ে। এ ছাড়া মহানবী (সা.) ও মহান সাহাবা (রা.)-এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনাসংবলিত ছোট ছোট গল্পের বই শিশুদের পড়তে দেওয়া চাই; তেমনি ইসলামী ইতিহাসের মুসলিম বীরদের শৌর্য-বীর্য, মান-সম্মান, বিজয়গাথা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষণীয় ঘটনার ছোট ছোট বইও শিশুদের পড়তে দিতে হবে। পৃথিবীর সুদীর্ঘ ইতিহাসে সজাগ-সচেতন জাতি হিসেবে তারাই টিকে আছে, যারা নিজেদের মহান ব্যক্তিদের জীবনালেখ্য ও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছে।

আমরা জানি, শিশু বয়স হলো অস্থিরতা ও জিজ্ঞাসার বয়স। তাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব হবে মানুষ, জীবন, প্রকৃতি ও সৃষ্টি জীবসংবলিত ছোট ছোট বই তাদের হাতের নাগালে রাখা। বইগুলো পড়ে তারা নিজেদের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবে। তেমনি শিশুর মনে ঘুরপাক খাওয়া স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবে বইগুলো। শিশুর কাছে জীবন হলো একটি অন্ধকার কামরার মতো। সে আস্তে আস্তে তা উপলব্ধি করতে থাকে। অন্ধকার কামরার পুরোটা সে ধীরে ধীরে আবিষ্কার করতে চেষ্টা করে। আমাদের কর্তব্য হলো, তাকে সামান্য সহযোগিতা করা।

এখানে আরেকটি কথা উল্লেখ করতে চাই। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় অনেক গবেষক দীর্ঘ পরিশ্রম করে বিজ্ঞানকে সহজ করে ছোটদের সামনে নিয়ে এসেছেন। ছোটদের জন্য তৈরি করা বিজ্ঞানের বইগুলো আমরা শিশুদের হাতে তুলে দিতে পারি। এতে তাদের বিজ্ঞানের নানা বিষয়—রসায়ন, পদার্থ, চিকিৎসা, ব্যবসা ও কৃষি সম্পর্কে ধারণা তৈরি হবে। ছোটবেলায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে জানার ফলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনে কোনো এক বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জনে সহায়তা দেবে ওই বইগুলো।

লেখক : গ্রন্থকার ও অনুবাদক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা