kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

চট্টগ্রামের ‘যক্ষ্মা ম্যাডাম’

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রামের ‘যক্ষ্মা ম্যাডাম’

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ডা. বিশাখা ঘোষ দীর্ঘসময় ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যক্ষা নিরোধে কাজ করছেন। ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশ থেকে যক্ষ্মা নির্মূল করার লক্ষ্যে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সফল করতে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

 

যক্ষ্মা দেশের একটা জনস্বাস্থ্য সমস্যা ও ঘাতক ব্যাধি। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে জাতীয় যক্ষা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ১৯৯৩ সাল থেকে ডটস্ প্রোগ্রামের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে। ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে যক্ষ্মা নির্মূল করার লক্ষ্যে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। গত বছরের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় বাংলাদেশের যক্ষ্মা রোগ ও চিকিৎসার সফলতার বিষয়ে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি উচ্চ  পর্যায়ের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।

বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রিভালেন্স সার্ভের তথ্যমতে, বর্তমানে  প্রতি লাখ জনসংখ্যার মধ্যে যক্ষ্মা রোগী ২৬০ জন, যা পূর্বে ছিল ৪০৪। চিকিৎসার সাফল্যের হার শতকরা ৯৫ ভাগ যা অত্যন্ত প্রশংসার দাবিদার। ২৪ মাসের পরিবর্তে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা ৯ মাসে এনে রোগীকে সুস্থ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বকে পথ দেখিয়েছে। দেশের প্রতিটা উপজেলায় জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় ডটস্ কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়েছে।

যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির এই মহাযজ্ঞে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার ১০১ উপজেলায় গত একদশক ধরে চুক্তিভিত্তিক প্রকল্পে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় টিবি এক্সপার্ট ডা. বিশাখা ঘোষ। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে যক্ষ্মা রোগীদের সেবায় যক্ষ্মা বিষয়ক চিকিৎসা, পর্যবেক্ষণ, তদারকি, মূল্যায়ন, পরিকল্পনা কর্মসূচিতে সমন্বয় করার জন্য চট্টগ্রাম বিভাগের ১০১ উপজেলায় সরেজমিনে পরিদর্শন করে কাজ করে থাকেন। পরিশ্রমী ও মেধাবী এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় তিনি সকল পর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথে যক্ষ্মারোগ নিয়ন্ত্রণের কাজে সমন্বিতভাবে দক্ষতার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন।

তিনি চট্টগ্রাম বিভাগের যক্ষ্মা জীবাণু শনাক্তকরণ পরীক্ষাগার (জঞজখ), ২৭টি জিন-এক্সপার্ট সাইট, ৩৫০টি মাইক্রোস্কোপি ও ডটস্ সেন্টার, তিনটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল এবং ৮টি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক তত্ত্বাবধানেরও কাজ করেন। তিনি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় রোহিঙ্গাদের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছেন। চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় দক্ষতা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করে তিনি ইতোমধ্যে সকলের কাছে ‘চট্টগ্রামের যক্ষ্মা ম্যাডাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।

জানা গেছে, এই চিকিৎসক ১৯৯৫ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ২০০০ সালে নিপসম থেকে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষক হিসেবে সুপরিচিত ডা. বিশাখা ঘোষ দেশের বিভিন্ন প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। তিনি জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রতিনিধি হিসাবে আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ড ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রকাশনায় তাঁর আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে।  তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শাখার একজন কর্মী ছিলেন। বিএমএ, স্বাচিপ, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল ও ওজিএসবির আজীবন সদস্য। তিনি ও তাঁর স্বামী ডা. বিপুল সরকার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র জীবনে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রয়েছেন। 

ডা. বিশাখা ঘোষ চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাসিমপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা চট্টগ্রাম জেলার বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রথিতযশা আইনজীবী হিমাংশু বিমল ঘোষ বাংলাদেশ হিন্দু ফাউন্ডেশন, চট্টগ্রাম-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দক্ষিণ চট্টগ্রাম শাখার সহসভাপতিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর একমাত্র ভাই ডা. ত্রিদিব ঘোষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন। তিনিও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শাখার সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালে বিএনপি আমলে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হন।

ডা. বিশাখা ঘোষ বলেন, ‘চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি সমাজের দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের কল্যাণে নিজেকে আরো নিবেদিত করতে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে চাই। সেই লক্ষ্যে তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনে চট্টগ্রাম থেকে মনোনয়নের জন্য আবেদনপত্র জমা দিয়েছি।’

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী জানান, ডা. বিশাখা ঘোষ দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যক্ষ্মা নিরোধে কাজ করছেন। ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যক্ষ্মা নির্মূল করার লক্ষ্যে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সফল করতে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন তিনি।

ডা. আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমি ২০১৩ সালে কুমিল্লায় ডেপুটি সিভিল সার্জন থাকার সময় বিশাখার সঙ্গে পরিচয় হয়। তখন থেকেই লক্ষ করছি একজন নারী হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় প্রতিটি উপজেলা ও নগরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কাজ করছেন তিনি । কাজের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা সত্যিই অসাধারণ।’

‘‘যক্ষ্মা দূরীকরণে ডা. বিশাখার দক্ষতা আন্তরিকতার কারণে সবার কাছে ইতোমধ্যে তিনি ‘চট্টগ্রামের যক্ষ্মা ম্যাডাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।’’ যোগ করেন সিভিল সার্জন আজিজ।

 

 

মন্তব্য