kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

রামগড় পর্যটন পার্ক অরক্ষিত

শ্যামল রুদ্র, রামগড় (খাগড়াছড়ি)   

৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রামগড় পর্যটন পার্ক অরক্ষিত

সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ, বিজয় ভাস্কর্য, শহীদ মিনার, বসার বেঞ্চ, ছোটখাটো একটা হ্রদও আছে পার্কটিতে। তবে সুষ্ঠু দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটির এখন হতশ্রী চেহারা। ইতোমধ্যে বেহাত হয়েছে বেশকিছু মূল্যবান জিনিস, প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন স্থাপনা।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রামগড় সদরে অবস্থিত পার্কটি অরক্ষিত হয়ে পড়ায় ইভটিজার ও মাদকাসক্তদের আনাগোনা বেড়েছে। অন্যদিকে, এটিকে গো-চারণ ভূমি বানিয়েছেন আশপাশের লোকজন। এলাকাবাসী বলছেন, এ দুরবস্থার লাঘবে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ জরুরি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া উদ্যোগী হয়ে ঐতিহ্যবাহী সাবেক মহকুমা রামগড়ের হারিয়ে যাওয়া জৌলুস উজ্জীবিত করতে উপজেলা সদরে বিনোদন পার্কটি গড়ে তোলেন।

প্রায় ৭ একর জমির উপর লেকসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে ওই সময় খরচ হয় প্রায় তিন কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের স্মারকমূলে নানা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ পার্কের জমি পৌরসভাকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে এই জমিতে একটি চিত্তাকর্ষক বিনোদন পার্ক গড়ে নিয়মিত রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা করা হয়। তখন দূরদূরান্তের পর্যটকদের আগমনে সবসময় মুখরিত হয়ে থাকত পুরো পার্ক এলাকাটি। বাগান পরিচর্যাসহ যাবতীয় কাজ পৌর কর্তৃপক্ষ সুচারুভাবে সম্পন্ন করায় অল্পসময়ের মধ্যেই ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় চিত্তাকর্ষক স্থান হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু গত ২০০৭-এ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় উপজেলা প্রশাসন পার্কের মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেয়। সেই থেকে উপজেলা ও পৌর প্রশাসনের মধ্যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

এ প্রসঙ্গে সাবেক ইউএনও অলি উল্ল্যাহ ও রায়হান কাউসার বলেন, জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল। সরকারি খাস জমির মালিক ভূমি মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। এখানে এর ব্যত্যয় ঘটায় জমির প্রশ্নে জটিলতা দেখা দেয়।

পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, উপজেলার পক্ষে মালিকানা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি সাঁটানোয় তারা এ জমিতে যায়নি।

আর দুই প্রশাসনের দড়ি টানাটানির সুযোগ নেয় সুযোগসন্ধানী দুষ্টচক্র। পার্ক রক্ষণাবেক্ষণে শিথিলতায়  মূল্যবান জিনিস বেহাত হয়। শোভাবর্ধক ২০০ বাতির সব চুরি হয়ে যায়।

হৃদে নামার কাঠ-লোহার তৈরি ঘাট ও ঝুলন্ত সেতুর পাটাতন ভেঙে নষ্ট হয়। বেঞ্চের এসএস পাইপ (স্টেনলেস স্টিল) ও পাইপের রেলিং খুলে নিয়ে যায় এবং মারা যায় নানা প্রজাতির গাছগাছালি।

চার লাখ টাকার প্যাডেল বোট হৃদে ডুবে নষ্ট হয়। পর্যটকেরা হ্রদের স্বচ্ছ পানিতে ঘুরে বেড়াতে পারেন না।

সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোজাম্মেল হোসেন বাবলু বলেন, ‘খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পার্ক রক্ষায় ওই সময় লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়েও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।’

অবশ্য সাবেক জেলা প্রশাসক মাসুদ কামাল ওই সময় জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করে এ ধরনের এনজিওর সহযোগিতায় পার্কটি পুনর্গঠনে উদ্যোগ নেবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি আর হয়ে ওঠেনি।

রামগড় উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আলমগীর পার্কের মূল্যবান জিনিস চুরি এবং নষ্ট হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, ‘রামগড়বাসীর বিনোদনের চমৎকার একটি পার্ক চোখের সামনে কীভাবে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস হচ্ছে তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি রক্ষায় অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আন্তরিক হলে রামগড়ের একমাত্র বিনোদন পার্কটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেত।’

রামগড় উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল কাদের বলেন, ‘কয়েক লাখ টাকার মাছের পোনা লেকে অবমুক্ত করেছি। কিন্তু ইজারা সংক্রান্ত জটিলতার সুরাহা না হওয়ায় মাছ ধরা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত লেকের মাছ চুরি হচ্ছে।’ পার্কর্িট দেখভাল করতে প্রথমে অন্তত দুজন কেয়ারটেকার নিয়োগ দিলে ভালো হত বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রামগড় পৌর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফারুক আহমেদ বলেন, ‘সরকারি মালিকানাধীন হওয়া সত্ত্বেও পার্কটির হতশ্রী চেহারায় মনে হয় এটি এখন অভিভাবকহীন। খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক নজরদারি। পার্কের ভেতর স্থাপিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিভাস্কর্য বিজয় ও শহীদ মিনার চত্বরে অবাধে গরু-ছাগল বিচরণ করছে।’

সমপ্রতি সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন ধরনের পাতাবাহার ও ফুলের বাগানে মড়ক লেগে সব মারা গেছে। সুযোগ বুঝে যে যার মতো পার্কের জিনিস চুরি করেছে। আশপাশের লোকজন পার্কটিকে গো-চারণ ভূমি বানিয়েছে।

এলাকাবাসীর মতে, এর রক্ষণাবেক্ষণে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সাহায্য নিলে ভালো হবে। তাদের ভালো আর্থিক তহবিল রয়েছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, লোহার গেটসহ অন্যান্য জিনিস চুরি হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকাটি এখন অরক্ষিত। নজরদারির অভাবে ইভটিজার এবং মাদকাসক্তদের আড্ডা বসে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে ইসরাত বলেন, ‘রামগড়ের একমাত্র বিনোদন পার্কটির হতশ্রী চেহারায় মন খারাপ হয়। দেখি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে কোনো সুখবর দিতে পারি কিনা।’

উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্কটি সংস্কার করে কিভাবে পূর্বাবস্থায় ফেরানো যায় এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ির বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলামর সঙ্গে সম্প্রতি আমার আলাপ হয়েছে। জেলা প্রশাসক মহোদয় কথা দিয়েছেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবেন।’

মন্তব্য