kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

শিশু-নারী প্রতিবন্ধীর পাশে পিস ফাইন্ডার

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শিশু-নারী প্রতিবন্ধীর পাশে পিস ফাইন্ডার

আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে এল কক্সবাজারের চকরিয়ার স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন পিস ফাইন্ডার। ‘শান্তিতে আমরা সবার পাশে’ স্লোগানে এবার সংগঠনটির পক্ষ থেকে দুই কন্যাশিশু, এক নারীসহ ৬ জন প্রতিবন্ধীকে একটি করে হুইল চেয়ার এবং অপর এক নারীর (প্রতিবন্ধীর স্ত্রী) হাতে তুলে দেওয়া হয় সেলাই মেশিন। এতে এসব প্রতিবন্ধীর চলাচলের দুঃখ ঘুচল।

হুইল চেয়ারে চেপে তাঁরা এখন ইচ্ছেমতো চলাচল করতে পারবেন। আর ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দেওয়ার জন্য ৪০ বছরের প্রতিবন্ধী লিয়াকতের স্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে একটি সেলাই মেশিন। সেই মেশিনে দর্জির কাজ করে সংসার চালাতে পারবেন তিনি।

গত শনিবার দুপুর ১২টার দিকে চকরিয়া পৌরশহরের চিরিঙ্গাস্থ সরকারি হাসপাতালের উন্মুক্ত মাঠে এসব হুইল চেয়ার ও সেলাই মেশিন উপকারভোগী প্রতিবন্ধীদের কাছে হস্তান্তর করেন চকরিয়া থানার ওসি মো. বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গাজী মাঈন উদ্দিন, চকরিয়া অনলাইন প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সমকাল প্রতিনিধি এম আর মাহমুদ, প্রেস ক্লাবের কার্যকরী সভাপতি ও কালের কণ্ঠ প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ এবং সিনিয়র সহসভাপতি ও প্রথম আলো প্রতিনিধি এস এম হানিফ, ইত্তেফাক প্রতিনিধি আরমান চৌধুরী, পূর্বদেশ প্রতিনিধি ইকবাল ফারুক, পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা সমাজকর্মী আদনান রামিম, সদস্য জিয়াউদ্দিন জিয়া, মাহফুজুল আলম কুতুবী, আনিসুর রহমান, মিফতাহ উদ্দিন আহমদ, আজহারুল ইসলাম সোহাগ, আনোয়ার হোসেন, কফিল উদ্দিন সিকদার, অহিদুজ্জামান, সুমন দাশ, নাদিম এলাহী জনসহ সংগঠনের বিভিন্ন শাখার সদস্যরা।

পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা আদনান রামিম কালের কণ্ঠকে জানান, প্রতিবছর সংগঠনটির পক্ষ থেকে উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী শিশু, নারী ও পুরুষদের শনাক্তপূর্বক যাচাই-বাছাই করা হয়। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে হুইল চেয়ার প্রদান করা হয়। এনিয়ে ২০১০ সাল থেকে এই পর্যন্ত ২৯ জন প্রতিবন্ধীকে হুইল চেয়ার প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়াও দুইজন প্রতিবন্ধীর স্ত্রীকে সেলাই মেশিন প্রদান, চারজন পথশিশুর পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়া ছাড়াও প্রতিবছর শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণসহ নানা সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবীমূলক কাজ করছে পিস ফাইন্ডার।

পিস ফাইন্ডার ও টিআইবির সদস্য জিয়াউদ্দিন জিয়া বলেন, ‘চকরিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার একজন প্রতিবন্ধীও যাতে অবহেলিত না থাকে সেজন্য আমাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য পর্যায়ক্রমে সকল প্রতিবন্ধীকে হুইল চেয়ার প্রদান করা হবে, যাতে চলার পথে তাদের কোনো অসুবিধা না হয়।’

প্রতিবন্ধীদের মাঝে হুইল চেয়ার বিতরণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি চকরিয়া থানার ওসি মো. বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমাজকর্মী রামিমের প্রতিবন্ধীপ্রেম দেখে আমি মুগ্ধ। তার সংগঠন পিস ফাইন্ডারের পক্ষ থেকে দুই শিশুকন্যা ও এক নারীসহ ৬ জন প্রতিবন্ধীর পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার কাজ করেছে। একইসঙ্গে একজন প্রতিবন্ধীর স্ত্রীকেও সেলাই মেশিন প্রদান করার বিষয়টি অনন্য দৃষ্টান্ত।’

ওসি আরো বলেন, ‘পিস ফাইন্ডারের প্রতিষ্ঠাতা রামিমের মতো তরুণ-যুবকেরা যদি এভাবে এগিয়ে আসে তাহলে আমাদের সমাজ তথা পুরো বাংলাদেশ একটি রোল মডেল হয়ে উঠবে।’

ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালাতেন চকরিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাহারিয়াঘোনার মোহাম্মদ হোছাইনের পুত্র মো. লিয়াকত আলী (৪০)। তাকে একটি হুইল চেয়ার এবং স্ত্রী রওশন আরাকে দেওয়া হয়েছে একটি সেলাই মেশিন।

হুইল চেয়ার এবং সেলাই মেশিন পাওয়ার পর প্রতিবন্ধী লিয়াকত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জন্মগতভাবেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। ছোটকাল থেকে শুরু হয়ে বিয়ের পরও আমি ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালিয়েছি।

এখন পিস ফাইন্ডার থেকে একটি হুইল চেয়ার এবং স্ত্রীকে একটি সেলাই মেশিন দেওয়ায় আমি আর ভিক্ষা করব না। আমার স্ত্রী এই সেলাই মেশিন দিয়ে দর্জির কাজ করে সংসার চালাতে পারবেন।’

প্রতিবন্ধী লিয়াকত বলেন, ‘আমাদের পরিবারে একসঙ্গে চারজন সদস্য প্রতিবন্ধী। অন্য তিনজনকেও আগামীতে হুইল চেয়ার দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।’

প্রতিবন্ধী লিয়াকতের স্ত্রী রওশন আরা বলেন, ‘আমার স্বামী বিয়ের আগে থেকেও ভিক্ষা করে সংসার চালিয়ে আসছেন। বিয়ের পর মনে করেছিলাম তাকে একটা ক্ষুদ্র ব্যবসা ধরিয়ে দিলে সংসার চালাতে পারবেন। কিন্তু আর্থিক দৈন্যদশার কারণে তা আর হয়ে উঠেনি।’

রওশন আরা বলেন, ‘এই অবস্থায় স্বামীর দুঃখ দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। তাই নিজে দর্জির কাজের প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য একজনের বাড়িতে গিয়ে সেলাই কাজ কিছু টাকা আয় করছি। কিন্তু নিজের কোনো সেলাই মেশিন না থাকায় প্রতিবন্ধী স্বামীকে ঠিকই ভিক্ষা করতে হয়েছে। তবে পিস ফাইন্ডারের পক্ষ থেকে দেওয়া একটি সেলাই মেশিনই আমাদের জীবন পাল্টে দিয়েছে। এখন ঘরে বসেই সেলাইয়ের কাজ করে সংসারের হাল ধরতে পারবো আমি। এতে আর আমার স্বামীকে অন্যের কাছে গিয়ে হাত পাততে হবে না। এজন্য আমি পিস ফাইন্ডার ও রামিমের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছি।’

গতকাল আরো যারা হুইল চেয়ার পেয়েছেন তারা হলেন উপজেলার সাহারবিল ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের মোক্তার মাস্টার পাড়ার জয়নাল আবেদীনের স্ত্রী হাবিবুন নাহার (৪২) ও আট নম্বর ওয়ার্ডের গুরুন্যাকাটার মৃত কফিল উদ্দিনের কন্যা হুরে জন্নাত সুমাইয়া (১৪), বরইতলী ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব খয়রাতি পাড়ার ফরিদুল মোস্তফার পুত্র সাজ্জাদুল মোস্তফা টিটু (৩২), পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাছেম আলী মিয়াজী পাড়ার আনোয়ার হোসেনের কন্যাশিশু ছানিয়া মণি (১০) এবং কাকারা ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের কাকারা গ্রামের মোহাম্মদ হোসেনের শিশুপুত্র মোহাম্মদ ইয়াছিন (৭)।

মন্তব্য