kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

লামাবাসীর স্বপ্ন এবার সত্যি হচ্ছে

মাতামুহুরী নদীর রাজবাড়ি-মেরাখোলা পয়েন্টে নির্মিত হচ্ছে ১৪০ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ

তানফিজুর রহমান, লামা (বান্দরবান)   

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লামাবাসীর স্বপ্ন এবার সত্যি হচ্ছে

স্বপ্ন এবার সত্যি হতে চলেছে বান্দরবান পার্বত্য জেলাধীন লামা উপজেলার লামা সদর ইউনিয়নের ৮ গ্রামের বাসিন্দাদের। একটি ব্রিজ পাল্টে দেবে এখানকার প্রায় ৭ হাজার মানুষের জীবনধারা।

লামা পৌর শহরের সীমান্ত ঘেঁষে লামা সদর ইউনিয়নের অবস্থান হলেও এ ইউনিয়নের  গ্রামগুলোতে সড়কপথে কোনো যানবাহন চলাচল করে না। মাতামুহুরী নদী ও পোপা খাল ইউনিয়নটিকে সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।

সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে, এলাকার সড়কগুলোতে যানবাহন চলবে-এ ছিল এখানকার মানুষের স্বপ্ন। অবশেষে তাদের স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে। সোয়া ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে লামা মাতামুহুরী নদীর

রাজবাড়ি-মেরাখোলা পয়েন্টে নির্মিত হচ্ছে ১৪০ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ। আগামী জানুয়ারি মাসের মধ্যেই শেষ হবে ব্রিজের নির্মাণ কাজ। এর ফলে লামা ইউনিয়নের বিশাল একটি অংশের সাথে পৌরএলাকাসহ উপজেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। দীর্ঘদিনের স্বপ্নের ব্রিজ নির্মিত হওয়ায় উচ্ছ্বসিত এখানকার অধিবাসীরা।

সূত্র জানায়, লামা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ২নং লামা ইউনিয়নটি ছিল সদর ইউনিয়ন।

গত ২০০১ সালে উপজেলা সদর পৌরসভায় উন্নীত হলে অবশিষ্ট অংশটি নিয়ে লামা ইউনিয়ন পুনর্গঠিত হয়। পুনর্গঠিত লামা ইউনিয়নটিকে ঘিরে মাতামুহুরী নদী ও পোপা খাল থাকার কারণে পৌরএলাকাসহ উপজেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ছিল না। উপজেলা সদর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে এটির অবস্থান হলেও নদী পার হয়ে যাতায়াতের ফলে ইউনিয়নটিকে মনে হয়, উপজেলা শহর থেকে বিচ্ছিন্ন অনেক দূরের একটি দ্বীপ।

উপজেলা শহর থেকে মিশন ঘাট কিংবা রাজবাড়ি পয়েন্টে বর্ষায় নৌকা বা বাঁশের ভেলা, শুষ্ক মৌসুমে হাঁটু বা কোমর পানি ডিঙিয়ে অথবা নিজেদের উদ্যাগে নির্মিত বাঁশ কিংবা কাঠের অস্থায়ী সেতু দিয়ে  চলাচল করে আসছিল এখানকার বাসিন্দারা। বর্ষা মৌসুমে এ এলাকার মানুষের দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। নদী পার হতে অনেকে স্রোতের টানে ভেসে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

স্বাধীনতার পূর্ব থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত লামা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের এ দুর্ভোগ চলে আসছে। অবশেষে এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশেসিং এমপির আন্তরিক প্রচেষ্টায় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে  লামা মাতামুহুরী নদীর রাজবাড়ি-মেরাখোলা পয়েন্টে ১৪০ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ কাজ শুরু হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি এই ব্রিজের নির্মাণ কাজের সূচনা করেন।

চট্টগ্রামের মেসার্স মেছবাহ্ কনস্ট্রাকশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজটি নির্মাণের কার্যাদেশ পায়।

বর্তমানে উভয় পাশে অ্যাপ্রোচ রোডসহ অতিরিক্ত কাজের জন্য আরো প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত বাড়তি বরাদ্দ প্রক্রিয়াধীন বলে জানা গেছে।

মেরাখোলা গ্রামের বাসিন্দা মো. সহিদুল ইসলাম জানান, ব্রিজটির নির্মাণ সম্পন্ন হলে লামা ইউনিয়নের মেরাখোলা, ছোট বমু, পোয়াংপাড়া, বেগুনঝিরি, তেসরঝিরি, আশ্রয়ন প্রকল্প, হিন্দু ও মার্মাপাড়া ও দোছড়িসহ আশপাশের ৮টি গ্রামের প্রায় ৭ হাজার পাহাড়ি-বাঙালি জনসাধারণ এর সুফল ভোগ করবে। 

উপজেলা সদরের সাথে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি গ্রাম সহজেই সড়কপথের যোগাযোগের আওতায় আসবে। এতে এ সকল গ্রামে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণের ভোগান্তি লাঘব হবে। এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের  স্বপ্ন, তাদের এলাকার সড়কগুলোতে যানবাহন চলাচল করবে। এলাকার শত শত কৃষি ও জুমিয়া পরিবার তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করাসহ যাতায়াতের ক্ষেত্রে আধুনিকতার ছোঁয়া পাবে। পাশাপাশি উপজেলা সদরে উচ্চ শিক্ষা নিতে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘব হবে।

মেরাখোলা মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা সব্বির আহমদ (৭০) জানান, এ ব্রিজ আমাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন। নদী পার হতে হয় বলে আমাদের দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। আমাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে পর্যন্ত সমস্যা হত। বর্ষা মৌসুমে অনেকে রাতে নদী পার হতে না পেরে বাজারে থেকে যেতে হয়েছে।

লামা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিন্টু কুমার সেন বলেন, উপজেলা সদরের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপন ছিল লামা ইউনিয়নবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপির আন্তরিকতায় ব্রিজটি নির্মিত হওয়ার ফলে ইউনিয়নবাসীর সে স্বপ্ন এখন সত্যি হতে চলেছে।

ব্রিজটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে। উভয় পাশে অ্যাপ্রোচ রোড তৈরির কাজ চলছে। পৌরসভার রাজবাড়ি অংশে মাটি ভরাট হলেও পশ্চিম পাশে মেরাখোলা অংশে জায়গা নিয়ে সামান্য সমস্যা রয়েছে। তা দ্রুত নিরসন হবে।

তিনি বলেন, এ ব্রিজ নির্মিত হওয়ার মধ্য দিয়ে লামা ইউনিয়নের জনসাধারণের জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবানের সহকারী প্রকৌশলী তুষিত চাকমা জানান, ব্রিজের নির্মাণকাজ একেবারে শেষ পর্যায়ে। আগামী এক মাসের মধ্যে ব্রিজটির নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

স্থানীয়রা মনে করছেন, লামা মাতামুহুরী নদীর রাজবাড়ি-মেরাখোলা পয়েন্টে নির্মিত ব্রিজটি পাল্টে দেবে দীর্ঘদিনের পিছিয়ে পড়া পার্বত্য জনপদ লামা ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জীবনধারা।

মন্তব্য