kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১            

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ কাল

চলছে ব্যাপক প্রচারণা; সবার নজর অনুষ্ঠানে

কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি   

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০৪:২৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



চলছে ব্যাপক প্রচারণা; সবার নজর অনুষ্ঠানে

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত মধ্য জানুয়ারিতে। আগামীকাল শনিবার টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে।

আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠু তদারকি করতে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার পৌঁছেছেন। তিনি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশ।

অনুষ্ঠানস্থলে মঞ্চ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ উপলক্ষে প্রতিটি ইউনিয়নে মাইকিং করে ব্যাপক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। তবে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি আমন্ত্রণ পাচ্ছেন না বলে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে সীমান্তের সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। এলাকার বাইরে থাকা টেকনাফের অনেক বাসিন্দা ইতোমধ্যে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে এলাকায় ফিরছে। বিদেশে থাকা অনেক প্রবাসীরা ফোনে তাদের স্বজনদের কাছ থেকে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে খবরা খবর নিচ্ছেন।

দেশে এবং দেশের বাইরে ইয়াবার ট্রানজিট ঘাট হিসেবে পরিচিতি পায় টেকনাফ। এ কারণে ইয়াবা কারবারের বাইরের থাকা সাধারণ মানুষেরও বিভিন্ন সময় নিজ এলাকার বহু দুর্নাম শুনতে হয়েছে। অনেকে হয়রানির শিকারও হয়েছেন। এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘ইয়াবার কারণে টেকনাফের যতো বদনাম শুনতে হয়েছে, এমনকি টেকনাফে পরিচয় দিতেও আমাদের লজ্জা লাগতো, অবশেষে ইয়াবার সেই গডফাদাররা আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে শুনে কিছুটা ভাল লাগছে। তাই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটির সাক্ষী হতে চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ এসেছি।’

জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা কারবারির তালিকায়  ৭৩ জনকে গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে ২৯ জন গডফাদারসহ তালিকায় নাম থাকা প্রায় দেড়’শ ইয়াবা কারাবারি আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজার পুলিশের সেফহোমে রয়েছেন। তবে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন পুলিশ।

আত্মসমর্পণের জন্য সেফহোমে থাকা ইয়াবা গডফাদারের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির তিনভাই আব্দুল আমিন, ফয়সাল, মো. শফিক, খালাতো ভাই মংমং সি, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, ভাগ্নে শাহেদুর রহমান নিপু, চাচাতো ভাই মো. আলমসহ টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার আলম, হ্নীলা ইউপির সদস্য নুরুল হুদা, জামাল হোসেন, টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, সাবরাং ইউপি সদস্য রেজাউল করিম রেজু, টেকনাফ সদর ইউপির সদস্য এনামুল হক, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর দুই ভাই জিয়াউর রহমান, আব্দুর রহমান, টেকনাফ পৌরসভার দক্ষিণ জালিয়া পাড়ার মো. জুবাইর ও মোজাম্মেল।

এদিকে ইয়াবা তালিকায় নাম থাকা সত্বেও আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া থেকে বাইরে রয়েছেন টেকনাফ সীমান্তের অনেক ইয়াবা কারবারি। সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ছোট ভাই টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মৌলভী মুজিবুর রহমানের নাম তালিকার শীর্ষে থাকলেও তিনি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন না বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সীমান্তের একাধিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদানকারী মৌলভী মুজিব এখন প্রকাশ্যে ঘুরাফেরা করছেন।

এ ছাড়া টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ও তার ছেলে সদর ইউপির চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দীন ও তার ভাই বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দীন, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়া পাড়ার ইয়াবা ও হুন্ডি সম্রাট খ্যাত জাফর আহমদ ওরফে টিটি জাফরসহ আরো অনেকের নাম ইয়াবার ৭৩ জন গডফাদারের তালিকায় থাকলেও তারা আত্মসমর্পণ করছেন না বলে জানা গেছে।

এদিকে আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের হেফাজতে থাকা ইয়াবা কারবারিদের ভাগ্যে কি ঘটবে তা কেউ জানেন না। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা বিশদ কোনো মন্তব্য করেননি। তবে এর আগে কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেছেন, ‘আত্মসমর্পণ করলে তাদের (ইয়াবা কারবারিদের ) সবকিছু মাফ হবে তা না।’

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দেওয়া হবে এবং মাদক কারবার থেকে অর্জিত অবৈধ অর্থ ও সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা করা হবে। তবে পুলিশ হেফাজতে থাকা ইয়াবা কারবারিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ২ থেকে ২০ টি পর্যন্ত মাদক মামলা থাকায় তাদের সাজা ভোগ করার বিষয়টি অনেকটা অনুমানযোগ্য হলে তাদের অঢেল অর্থ ও সম্পত্তির বিষয়ে কি হবে তা কেউ জানেন না।

সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ইয়াবা কারবারিদের সাজা এবং তাদের অর্থ-সম্পদের ভাগ্যে নিয়ে উদ্ধিঘ্ন খোদ তাদের পরিবারের সদস্যরা। এলাকায় থাকায় ইয়াবা কারবারিদের পরিবারের সদস্যরাও জানেন না আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। তবে আত্মসমর্পণকারীদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেরই ধারণা, আত্মসমর্পন করলে তাদের সাজা হতে পারে, গুরু পাপে লঘু দণ্ডের ন্যায়।’ আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া ইয়াবা কারবারিদের স্বজনদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ করে সহজে পার পেয়ে যাবেন তারা (ইয়াবা কারবারিরা)।

পুলিশ হেফাজতে থাকা ইয়াবা কারবারি টেকনাফ সাবরাং ইউপি সদস্য রেজাউল করিম রেজু’র ভাই ফরিদ আহমদ বলেন, ‘আমার ভাইয়ের নাম ইয়াবা গডফাদারের তালিকায় রয়েছে। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির আহ্বানে সাড়া দিয়ে আত্মসমর্পনের জন্য পুলিশের হেফাজতে চলে গেছেন। তবে আত্মসমর্পণে তাদের কি অবস্থা হবে তা আমরা জানি না। শুনেছি আত্মসমর্পণ করলে তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দেওয়া হবে। তবে তাদের সাজার মেয়াদ কত হতে পারে এ ব্যাপারে আমরা কিছু  জানি না।’

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের জালিয়া পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ জুবাইয়ের নিকটাত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা এখনো জানি না, যারা আত্মসমর্পণ করতে গেছে তাদের ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। তাদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া এবং আইনি বিষয়ে আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে ভীষণ চিন্তায় রয়েছি। অনেকে বলছে, তাদের নাকি দীর্ঘ মেয়াদে সাজা ভোগ করতে হবে, আবার কেউ কেউ বলছে, আত্মসমর্পণ করলেও তাদের অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। প্রকৃতপক্ষে আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়াটি কিভাবে সম্পন্ন হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না।’

সাবরাং নোয়াপাড়া থেকে আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া মোহাম্মদ তৈয়ব এর ভাবী ও বন্দুকযুদ্ধে নিহত ইয়াবা কারবারি শামসুল আলম ওরফে মার্কিনের স্ত্রী তৈয়বা বেগম বলেন, ‘শুনেছি আত্মসমর্পণ করলে নাকি তাদের সবকিছু মাফ করা হবে। তাহলে এ সুযোগটা সবাইকে দেওয়া উচিত ছিল। যদি আমার স্বামীকে না মেরে আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হতো তাহলে আমি আজ বিধাব হতাম না।’ 

প্রসঙ্গত, সব ধরনের জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানেই খোলাসা হতে পারে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের ভাগ্যে কি ঘটছে এ বিষয়ে।

উল্লেখ্য, গত দুই মাস ধরে টেকনাফ সীমান্তের ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে এ পর্যন্ত শতাধিক ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের সেফহোমে রয়েছে। প্রশাসনের কড়াকড়ি এবং আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া চলমান থাকার পরও সীমান্তে ইয়াবা পাচার এখনো বন্ধ হয়নি। তবে আগামীকাল শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের পর সীমান্তে ইয়াবা কারবার পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে কিনা দেখতে সীমান্তের সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে রয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা