kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

প্রথম দফার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়নি

‘আঁরা ন-যাইয়্যুম’

তোফায়েল আহমদ, রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে এসে   

১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:৪৯



‘আঁরা ন-যাইয়্যুম’

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বৃহস্পতিবার বহুল প্রত্যাশিত প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি। প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তারা দফায় দফায় চেষ্টা করলেও রোহিঙ্গারা এক যোগে শ্লোগান ধরে বলে-‘আঁরা ন-যাইয়্যুম’ (আমরা যাব না)।

এর ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এক অনিশ্চিত অবস্থায় গিয়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রথম দফার প্রত্যাবাসন কাজে সফলতা না আসলেও পরবর্তীতে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরতে উদ্ভুধ্বকরণ (মোটিভেশন) করা হবে।

বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ৩০ পরিবারের দেড় শতাধিক রোহিঙ্গার দেশে ফিরে যাবার কথা ছিল। এজন্য প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের কর্মকর্তারা যাবতীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিল। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩০ টি শিবিরের মধ্যে ২টি শিবির থেকে এসব রোহিঙ্গার দেশে ফিরার কথা ছিল।

এসব শিবির দুটি যথাক্রমে টেকনাফের উনচিপ্রাং রোহিঙ্গা শিবির এবং উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা শিবির। গতকাল অপরাহ্ন ১২ টায় ঘুংধুমের প্রত্যাবাসন কেন্দ্র দিয়ে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করার কথা। দুপুর ১২ টার সময় উনচিপ্রাং শিবিরে দেশে ফিরে যাবার জন্য তালিকাভুক্ত ১৭ টি পরিবারের রোহিঙ্গা সদস্যদের ডেকে নিয়ে আসা হয় শিবিরের কার্যালয়ে।

এ সময় সেখানে আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম ও ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাবার ব্যাপারে মতামত জানতে চাওয়া হয়। রোহিঙ্গারা তখন সবাই এক যোগে শ্লোগান তুলে-‘আঁরা ন-যাইয়্যুম- ন-যাইয়্যুম।’ আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম রোহিঙ্গাদের জানান-যারা দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক তাদের প্রত্যেককে তিন দিনের খাবার দেওয়া হবে। সেই সাথে চিকিৎসা সহায়তা সহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধাও দেয়া হবে। কিন্তু রোহিঙ্গারা সবারই একই কথা- ‘আঁরা ন-যাইয়্যুম।’

এরপর আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম জামতলী রোহিঙ্গা শিবিরের তালিকাভুক্ত ১৩টি পরিবারের সদস্যদের দেশে ফিরতে ইচ্ছুক কিনা জানতে চান। এ সময় ১৩ পরিবারের মাত্র একজন সদস্য ছাড়া কেউই উপস্তিত হননি। উপস্থিত হওয়া রোহিঙ্গা  নুরুল আমিন এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে জানান, তিনদিন আগেই এসব পরিবারের সকল সদস্য দেশে ফিরা এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছে।

এরপর আরআরআরসি ঘুংধুমের প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে বিকাল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও দেশে ফিরতে কোনো রোহিঙ্গা পাননি। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা যায়নি। তবে আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেছেন-‘রোহিঙ্গাদের মোটিভেশনের মাধ্যমে দেশে ফিরার কাজ আবারো শুরু করা হবে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে গেল বছরের নভেম্বরে চুক্তি হলেও গত এক বছরেও কোনো রোহিঙ্গাকে স্বদেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। অথচ গত বছরের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বরাবরই দেশে ফিরতে ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে আসছে।

কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে ততই দেশি-বিদেশি ‘রোহিঙ্গা ব্যবসায়ী’র দল উল্টো রোহিঙ্গাদের দেশে না ফিরতে উদ্ভুদ্ধ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত এক বছরেরও বেশী সময় ধরে শিবিরগুলোতে এনজিও ছদ্মবরণে থাকা শত শত লোক এভাবে স্বদেশ না ফিরার জন্য রোহিঙ্গাদের উদ্ভুদ্ধকরণের মাধ্যমে তৈরি করে ফেলে।

গত দুদিন ধরে টানা রোহিঙ্গা শিবির ঘুরে আরো জানা গেছে, গত বছরের আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাবার জন্য সরকারি-বেসরকারি কোনো পক্ষেই উদ্ভুদ্ধকরণ কর্মসুচি হাতে নেয়া হয়নি। এমনকি রোহিঙ্গা শিবির তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও এরকম কর্মসুচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হয়নি।

অথচ এসময়ে এক তরফা কেবল রোহিঙ্গাদের স্বদেশ ফিরে যাবার ব্যাপারে অনিচ্ছুক করে তোলা হয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে এরকম কার্যক্রমের নেপথ্যে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক কয়েকটি সংস্থার  বিরুদ্ধে।

আবার প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম শুরু হবার সাথে সাথেই এসব সংস্থাগুলোর তরফেই রাখাইনে পরিবেশ সৃষ্টি হয়নিসহ নানা অজুহাত তুলে প্রত্যাবাসন বিরোধী চাপ দেওয়া হয়। ফলে প্রত্যাবাসনের কাজ এগুনো সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে দু’দেশের মধ্যে চুক্তি সম্পাদনের পরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে না পারায় মিয়ানমারসহ অন্যান্য দেশগুলোরও সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে। রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছামূলকভাবে দেশে ফিরার বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে মধ্য নভেম্বরে প্রত্যাবাসনের সময় নির্ধারণ করার ব্যাপারটিকে মোটেই ভাল চোখে দেখছেন না স্থানীয় সচেতন মহল।



মন্তব্য