kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

১৬ ডিসেম্বরের বিকেল

মোস্তফা কামাল

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



১৬ ডিসেম্বরের বিকেল

অঙ্কন : বিপ্লব

ইন্দিরা গান্ধী সংক্ষিপ্ত সফরে কলকাতায় এসেছেন। বিকেলে কলকাতার গড়ের মাঠে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। জনসভার বক্তৃতামঞ্চে এসে তিনি জানতে পারেন, পাকিস্তানি বিমানবাহিনী পশ্চিম ভারতের বেশ কয়েকটি বিমান ঘাঁটিতে আকস্মিকভাবে আক্রমণ চালিয়েছে। পশ্চিম ফ্রন্টে শ্রীনগর, অবন্তীপুর, অমৃতসর, ফিরোজপুর, চণ্ডীগড়, ফরিদকোট, পাঠানকোট, সাদেক, ওকহা, যোধপুর ও উত্তরলাই, আম্বালা ছাড়াও দিল্লির নিকটবর্তী আগ্রার বিমানক্ষেত্র ও পূর্ব ফ্রন্টের আগরতলা বিমান ঘাঁটিতে পাকিস্তান বিমানবাহিনী হামলা চালায়। একই সঙ্গে পাকিস্তান স্থলবাহিনী ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে।

রাতেই ইন্দিরা গান্ধী কলকাতা থেকে দিল্লি পৌঁছেন। দিল্লিতে এসেই তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিংহ, অর্থমন্ত্রী ওয়াইবি চবন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরিকে দিয়ে সারা ভারতে জরুরি অবস্থা জারি করান। সরকারের তাৎক্ষণিক এই সিদ্ধান্তকে বিরোধী দলগুলো সমর্থন জানায়।

পরে ইন্দিরা গান্ধী সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শ্যাম মানেকশকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ দেন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। রাত সাড়ে বারোটার দিকে তাঁর ভাষণ অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে প্রচার করা হয়। ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, শত্রুরা আমাদের বিমানক্ষেত্রসহ সীমান্তের প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর হামলা চালিয়েছে। এ রকম আসন্ন বিপদের মধ্যেও ভারত যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। গত মার্চ থেকেই ব্যাপক বিপদগ্রস্ত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে অত্যন্ত কাছ থেকে দেখে আসছি। তাদের দোষ ছিল যে তারা গণতন্ত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তাদের সমস্যা আমাদের ছুঁয়েছে। ভাবিয়েছেও বটে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে চেষ্টা করেছি। কিন্তু বিশ্বসভা মূল সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাইরের দিকটা সামান্য আলোচনায় এনেছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই অবস্থার অবনতি ঘটেছে। শৌর্যবান মুক্তিযোদ্ধারা এক অসীম উন্মাদনায় জীবনকে যুদ্ধে বাজি রেখে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আমরা তাদের সম্মান করি। আজ এই যুদ্ধ ভারতের যুদ্ধ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করল। এর দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে আমার ওপর, আমার সরকারের ওপর এবং সর্বোপরি ভারতের সব জনগণের ওপর। যুদ্ধের তাণ্ডব থেকে আর পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের যোদ্ধা জওয়ানরা দেশের প্রতিরক্ষার জন্য এগিয়ে চলেছে। সারা ভারতে ঘোষণা করা হয়েছে জরুরি অবস্থা এবং এর সঙ্গে সঙ্গে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ রাতে বেশ কয়েকবার প্রচার করা হয়। ফলে সারা ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগোষ্ঠীর কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছে যেতে থাকে। সকালেও ওই ভাষণ বেশ কয়েকবার প্রচার করা হয়। তাতে মানুষ পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেকটাই জানতে পারে। ভারতীয় বাহিনীও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। ভারতীয় জনগণ আরো ব্যাপকভাবে বাংলাদেশি শরণার্থীদের সহায়তার জন্য এগিয়ে আসে।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই ইন্দিরা গান্ধী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের যৌথ স্বাক্ষরযুক্ত একটি চিঠি হাতে পান। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি স্বীকৃতি প্রদানের দাবি।

ইন্দিরা গান্ধী আর বিলম্ব করলেন না। চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে চিঠি পাঠান। এরপর ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সর্বাধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার অধীনে ভারতীয় পূর্ব ফ্রন্টের সামরিক বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সমন্বয়ে ভারত-বাংলাদেশ মিত্রবাহিনী গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এর পরই ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।

৭ ডিসেম্বর সকাল থেকে সারা দিন মিত্রবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর আকাশযুদ্ধ চলে। ঢাকায় অনেকেই বাড়ির ছাদে উঠে আকাশযুদ্ধ দেখার সুযোগ পায়। ওই দিন পাকিস্তানের সব যুদ্ধবিমানই বিধ্বস্ত হয়। মিত্রবাহিনীরও কয়েকটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে বলে পরের দিন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়।

ইন্দিরা গান্ধী সার্বক্ষণিকভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। খোঁজখবর রাখেন। কখনো কখনো দিকনির্দেশনাও দেন। তিনি তাঁর বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রকেও এ বিষয়ে ব্রিফ করেন। তাদের সহযোগিতার হাত বাড়াতে অনুরোধ জানান। এর মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভ বাংলাদেশের পক্ষে বিবৃতি প্রদান করেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

ইন্দিরা গান্ধীর কাছে খবর আসে, বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে জয়লাভ করছে। পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থা বেগতিক। তাদের অস্ত্র-গোলাবারুদ শেষ হয়ে এসেছে। সেনারা মার খেতে খেতে চিঁড়াচ্যাপ্টা অবস্থা। ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধে নামার পর মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বহু গুণ বেড়ে গেছে। তারা মনে করছে, এখন তাদের বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।

ইন্দিরা গান্ধী আনন্দের সাগরে ভাসেন। তিনি মহা-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, এটাই তো চাই!

ভারত স্বীকৃতি প্রদান করার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন, আমার প্রিয় দেশবাসী ভাই-বোনেরা, ঝঞ্ঝাসংকুল, সংগ্রামময়, অমারাত্রির শেষতম প্রহর আমরা অতিক্রম করে এসেছি। স্বাধীনতার সূর্যাকাশে বাংলাদেশের দিগ্বিদিক আজ উদ্ভাসিত। স্বাধীনতার এই সূর্যসকালে আপনারা আমার অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আজ আমাদের ইতিহাসের পাতায় লিখিত হলো আরো একটি স্মরণোজ্জ্বল দিন।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক ন্যায্য স্বীকৃতি দিয়েছে আমাদের প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত। বাংলাদেশের মাটিতে যে নির্মম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেক জাগ্রত করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই দীর্ঘ আট মাসব্যাপী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তার জন্য আমি তাঁকে এবং ভারতবাসীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে টেলিফোন করে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, আপনি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত করে দিয়েছেন। এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। সারা জীবন আপনার এবং ভারতের অবদানের কথা মনে রাখব।

ইন্দিরা গান্ধীও তাজউদ্দীনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি পরক্ষণেই যখন তাঁকে জানালেন, পাকিস্তান শিগগিরই আত্মসমর্পণ করবে।

এ খবর শুনে তাজউদ্দীন আহমদ আনন্দের সাগরে ভাসেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর আনন্দ মাটি হয়ে যায়। একজন লোক তাঁর দপ্তরে এসে জানায়, পাকিস্তানিরা আলবদর, রাজাকার, আলশামস বাহিনীর সহায়তায় রাতের আঁধারে বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করছে। গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লাসহ শান্তি কমিটির নেতাকর্মীরা সারা দেশে যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, তাঁদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে; ঠিক একইভাবে তারা বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে নিধনযজ্ঞ চালাচ্ছে। ইতিমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষককে তারা হত্যা করেছে। এঁদের মধ্যে মুনীর চৌধুরী, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আলিম চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, সেলিনা পারভীন, জহির রায়হান, আলতাফ মাহমুদসহ অনেকে।

তাজউদ্দীন আহমদের চোখের কোটরে পানি জমে। সেই পানি এক ফোঁটা দুই ফোঁটা করে টেবিলের ওপর পড়তে লাগল। তিনি নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা করেন। মনে মনে তিনি বলেন, আমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। 

এরই মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসে গান।

মাগো ভাবনা কেন/আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে/তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি/তোমার ভয় নেই মা/আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।/আমরা হারব না হারব না/তোমার মাটির একটি কণাও ছাড়ব না।/আমরা পাথর দিয়ে দুর্গ ঘাঁটি গড়তে জানি/তোমার ভয় নেই মা/আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।/আমরা পরাজয় মানব না/দুর্বলতায় বাঁচতে শুধু জানব না/আমরা চিরদিনই হাসিমুখে মরতে জানি/তোমার ভয় নেই মা/আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।

গানটি শোনার পর একেবারে চাঙ্গা হয়ে গেলেন তাজউদ্দীন। মনে যেন অনেক জোর পেলেন তিনি।

 

দুই. 

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এ এম মালিক গভর্নর হাউসে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে বেসামরিক প্রশাসনের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাও ফরমান আলী, পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ নিয়াজি, মেজর জেনারেল জানজুয়া, চিফ সেক্রেটারি মুজাফফর হোসেনকে ডাকা হয়েছে। যথাসময়ে তাঁরা উপস্থিত হয়েছেন।

গভর্নর মালিক বৈঠকের শুরুতেই জেনারেল নিয়াজির কাছে পরিস্থিতি জানতে চাইলেন। তিনি কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই বললেন, স্যার, পরিস্থিতি খুবই খারাপ। আকাশ, নৌ, ভূমি কোথাও আমরা সুবিধা করতে পারছি না। আমাদের অস্ত্রশস্ত্রও প্রায় শেষের পথে।

রাও ফরমান আলী বললেন, আমার মনে হয় পুরো পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট স্যার ও সেনাপ্রধান স্যারকে জানানো উচিত। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত দেন সে অনুযায়ী আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

যদি প্রেসিডেন্ট স্যার জানতে চান, এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী? 

রাও ফরমান আলী বললেন, আত্মসমর্পণ ছাড়া বিকল্প কোনো পথ দেখছি না। আর বেশি দিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

গভর্নর সাহেব কিছুটা দম নিলেন। তারপর নিয়াজিকে উদ্দেশ করে বললেন, আপনি তো ওয়ারফিল্ডে আছেন! আপনার কী মত?

নিয়াজি আমতা আমতা করে বললেন, হুম। উনি ঠিকই বলেছেন। আসলেই আমাদের অবস্থা শোচনীয়। অস্ত্র ও গোলাবারুদ একেবারেই শেষ পর্যায়ে। সৈনিকরাও যুদ্ধ করতে করতে টায়ার্ড হয়ে গেছে।

তাহলে কি আমরা আত্মসমর্পণের দিকেই যাব?

আমার মতে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা ভালো। নিয়াজি বললেন।

আমি প্রেসিডেন্ট সাহেবকে জানাই। আপনি সেনাপ্রধানকে জানান। তাঁরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কী বলেন?

সবাই একসঙ্গে বললেন, জি জি। সেটাই ভালো।

গভর্নর সাহেব বৈঠক শেষ করে নিজের রুমে গেলেন। কতক্ষণ স্থির হয়ে নিজের চেয়ারে বসে রইলেন। মনে মনে বলেন, একেই বলে দুর্ভাগ্য! কেন যে গভর্নর হতে রাজি হলাম! গভর্নর হয়ে কোনো কাজও করতে পারলাম না। এখন আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিতে হবে! এটা কোনো কথা হলো? আমি আসলেই একটা বোকার হদ্দ। কিছুই বুঝি না। পরিস্থিতি না বুঝে এমন একটা সিদ্ধান্ত কেন নিতে গেলাম! কলঙ্কের বোঝা নিয়ে বিদায় নিতে হবে। ছি!    

বিষণ্ন মন নিয়েই গভর্নর মালিক প্রেসিডেন্ট সাহেবকে বার্তা পাঠালেন। বার্তায় পূর্ব পাকিস্তানের খারাপ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরলেন। তারপর বললেন, এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতি ও আত্মসমর্পণই শ্রেয়।

এত আশা করে আপনাকে গভর্নর বানালাম। আপনিও তো ফেল মারছেন দেখি!

কী করব স্যার, আমার কপাল মন্দ।

চেষ্টা করেন না, আগেভাগে হাল ছেড়ে দিলে হবে!

স্যার, সবাইকে নিয়ে বসেছিলাম। রাও ফরমান আলী, নিয়াজি কেউ আর যুদ্ধ করতে রাজি না। এখনো যদি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা না করেন, তাহলে আমাদের সবাইকে পালিয়ে যেতে হবে।

আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আপনাকে কিছুক্ষণ পর জানাচ্ছি।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবার সত্যি সত্যিই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি কী করবেন তা নিয়ে ভাবেন। নিজের অজান্তেই তিনি হুইস্কির বোতলে মুখ দিয়ে ঢক ঢক করে গিলতে থাকেন। তারপর সিগারেট ধরান। বেশ কয়েকটা সিগারেট টানার পর তিনি সেনাপ্রধান হামিদ খানকে ফোন করেন।

হামিদ খান ফোনের রিসিভার তোলার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়া খান বললেন, কী খবর, বলেন তো হামিদ।

স্যার, খবর তো ভালো না। নিয়াজি ফোন করেছিল। সে জানাল, আমাদের সৈন্যরা বাঙালিদের সঙ্গে যুদ্ধে পেরে উঠছে না। ইতিমধ্যেই অনেক জেলা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। যৌথ বাহিনী যুদ্ধে নামার পর বাঙালিরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অতর্কিত হামলা করে আমাদের সেনাদের ঘায়েল করে দিচ্ছে। তারা মনোবল হারিয়ে ফেলেছে।

বলেন কী!

জি স্যার। আমার মনে হয়, যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে দিন।

ভুট্টো সাহেবকে তো দেখলাম, জাতিসংঘে গরম গরম বক্তৃতা করল। তারপর চীনে গেল। এতে কি কোনো কাজ হবে না?

স্যার, যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হয়ে বাইরে দৌড়াদৌড়ি করে গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে কী হবে, স্যার?

তাহলে কি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বলব?

জি স্যার। ওরা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে আত্মসমর্পণ করুক। তাতে আমাদের সৈন্যরা বেঁচে যাবে।

হতাশার সুরে ইয়াহিয়া খান বললেন, তাহলে আর কী করা! আপনিই ওদের বলে দিন।

ইয়াহিয়া খান ফোনের রিসিভার রেখে আবার হুইস্কির বোতল হাতে নিলেন। তারপর ঢক ঢক করে মদ গিলতে শুরু করলেন।

 

তিন. 

হঠাৎ আকাশ থেকে ঢাকার মাটিতে হাজার হাজার লিফলেট পড়তে শুরু করল। লোকজন ছুটে গিয়ে লিটলেট কুড়িয়ে হাতে নিল। লিফলেটটি উর্দু ও ইংরেজিতে লেখা। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর প্রধান শ্যাম মানেকশর নামে প্রচারিত লিফলেটে পূর্ব পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের উদ্দেশে বলা হয়, অবিলম্বে আমার অগ্রগামী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে আপনাদের সৈন্যবাহিনী এবং অন্য ব্যক্তিবর্গের নিরাপত্তা বিধান করা হবে। এর পরও যদি আমার আবেদন মোতাবেক আপনারা পুরো সামরিক বাহিনীসহ আত্মসমর্পণ না করেন, তাহলে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টার পর আমি মিত্রবাহিনীকে পুরোদমে আঘাত হানার নির্দেশ দিতে বাধ্য হব।  

লিফলেট নিয়ে সারা ঢাকায় হৈচৈ পড়ে গেল। সর্বত্র আলোচনা শুরু হলো, এরপর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে; নিশ্চয়ই করবে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে হাতেও সেই লিফলেট দেখা গেল।  

  

চার.

১৬ ডিসেম্বরের বিকেল। সূর্যের হলদে রোদ তখনো ঢাকা রেসকোর্স ময়দানজুড়ে চিকচিক করছে। চারদিক থেকে লোকজন আসতে শুরু করেছে। এই ময়দানেই ৯ মাস ৯ দিন আগে লাখ লাখ জনতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে সমবেত হয়েছিলেন। তিনি তখন সমবেত লাখ লাখ জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই ময়দানেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের ৯৩ হাজার সৈনিকের নেতা আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণ করবেন বলে লোকমুখে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও কেউ কেউ বলছেন, নিয়াজি আত্মসমর্পণ করতে রাজি নন। তিনি চান যুদ্ধবিরতি। কিন্তু যৌথ বাহিনীর আরেক জেনারেল জ্যাকব হুমকি দিয়ে নিয়াজিকে বলেছেন, তাহলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অনেক সৈনিক মারা যাবে। তার দায়দায়িত্ব নিয়াজিকেই নিতে হবে। অতঃপর নিয়াজি বিলম্ব করলেন না। তিনি আত্মসমর্পণ দলিলে সই করতে রাজি হলেন।

বিকেলেই ভারতীয় সামরিক হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় পৌঁছেন জেনারেল জ্যাকবসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এর পরপরই হেলিকপ্টারে করে যৌথ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জগজিৎ সিং অরোরা তাঁর উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকায় আসেন। তাঁরা রেসকোর্স ময়দানে এসে দেখেন, মানুষ আর মানুষ। তাঁরা আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান দেখতে জমায়েত হয়েছে। তাদের কণ্ঠে গগনবিদারী স্লোগান, জয় বাংলা।

ইতিমধ্যেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল নিয়াজি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হয়েছেন। সেখানে হাজার হাজার জনতা ও দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে যৌথ বাহিনীর পক্ষে সর্বাধিনায়ক জেনারেল অরোরা ও পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজি চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা নগরীর প্রতিটি বাড়িতে গাঢ় সবুজের ওপর লাল বলয়ের মধ্যে সোনালি রঙের মানচিত্রসংবলিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয়। চারদিক থেকে বেজে ওঠে সেই গান, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।

মন্তব্য