kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ নভেম্বর ২০১৯। ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দেশের মাটি

ইমদাদুল হক মিলন

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ২১ মিনিটে



দেশের মাটি

অঙ্কন : মাসুম

ভদ্রলোক ধীর পায়ে হেঁটে এলেন। খয়েরি রঙের দামি হ্যান্ডব্যাগ একটু যেন বেশি যত্নে কেরিয়ারে রাখলেন। সৌম্য স্নিগ্ধ চেহারা। পরনে অ্যাশ কালারের স্যুট আর সাদা শার্ট। টাইয়ের রং গাঢ় সবুজ। পায়ে চকচকে কালো জুতা। চোখে সুন্দর ফ্রেমের চশমা। বয়স চৌষট্টি-পঁয়ষট্টি হবে।

আমার উইন্ডোসিট। পাশের সিটে এ রকম যাত্রী পেয়ে ভালোই লাগল। টুকটাক গল্প করা যাবে।

হ্যান্ডব্যাগ রেখে কেরিয়ারের ডালা বন্ধ করলেন ভদ্রলোক। সিটে না বসে আমার দিকে তাকালেন। নম্র-বিনয়ী গলায় বললেন, আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব।

জি, প্লিজ।

আমি কি কিছুক্ষণের জন্য আপনার সিটে বসতে পারি?

নিশ্চয়। আসুন।

তাঁকে আমার সিটে বসালাম। নিজে বসলাম তাঁর সিটে। খুবই কৃতজ্ঞ ভঙ্গিতে তিনি বললেন, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। অনেক ধন্যবাদ। বেশিক্ষণ বসব না। এই তো প্লেন টেকঅফ করার পর...

তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই বললাম, কোনও অসুবিধা নেই। আপনি ওখানেই বসুন। আমার উইন্ডোসিটে ইন্টারেস্ট নেই।

ধন্যবাদ ধন্যবাদ।

ভদ্রলোক জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। সেই অবস্থায় সিটবেল্ট বাঁধলেন। বোঝা গেল, তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্লেনে চড়ে অভ্যস্ত।

সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের বিমানটি ছুটতে শুরু করেছে। দু-তিন মিনিটের মধ্যে আকাশে উড়বে। টেকঅফের এই সময়টায় আমার সব সময়ই নার্ভাস লাগে। ভয় ভয় করে, বুক কাঁপে, গলা শুকিয়ে আসে। চোখ বুজে আয়াতুল কুরসি পড়ি। এই দোয়া পড়ে যাত্রা শুরু করলে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করেন আল্লাহ।

বিমান আকাশে উঠে যাওয়ার পর হাঁফ ছেড়েছি। ভয় কেটে গেছে। বুকের কাঁপন বন্ধ। শুকনা গলা স্বাভাবিক। সব ঠিকঠাক। হাসিমুখে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়েছি। তাকিয়ে অবাকই হলাম। তিনি নিঃশব্দে কাঁদছেন। এখনো জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন। চশমার তলা দিয়ে চোখের পানি গড়িয়ে নামছে।

এয়ারপোর্টে মানুষের কান্নাকাটির দৃশ্য দেখেছি অনেক। প্রিয়জন বিদেশে চলে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের জন্য, এই কষ্টে কান্নাকাটি করেন কাছের মানুষজন। যে যাচ্ছে সেও কাঁদে। যেকোনো বিদায়ের মুহূর্তই কষ্টের। কান্না পেতেই পারে। কিন্তু প্লেনে চড়ার পর, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে এই বয়সী একজন মানুষের এভাবে কান্না, ব্যাপারটা একটু যেন অস্বাভাবিক। বহুবার বিদেশে গিয়েছি, প্লেনে এই বয়সী মানুষকে এভাবে কাঁদতে দেখিনি। কোন বেদনায় কাঁদছেন তিনি?

এয়ারহোস্টেস ফেসটাওয়েল দিয়ে গেল। গরম ভাপ ওঠা সাদা টাওয়েল। ভদ্রলোক টাওয়েল নিয়ে চশমা খুলে চোখ-মুখ মুছলেন। চশমা পরে হাত মুছতে মুছতে বুক কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আপনি কি সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন?

তিনি আমার দিকে তাকালেন। না। আমি এলএতে। ওখানেই থাকি। লাহাবরা নামের একটা সিটিতে।

আমিও এলএতেই যাচ্ছি। ছোট বোনের ওখানে। ওরা থাকে আনাহাইমে।

ও। আমাদের কাছাকাছিই।

ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকালেন। আপনি নিশ্চয় খুব অবাক হয়েছেন। আপনার সিটে বসলাম, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। কাঁদলাম...

বড় কোনও কারণ হয়তো আছে। মানুষের কত রকমের কষ্ট থাকে। প্রিয়জন ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট। সে রকম কিছু।

আসলে আমি আপনার সিটে বসলাম দেশটাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য। প্লেনের জানালা দিয়ে অনেকখানি দেখা যায় দেশ। শহর, শহরের চারপাশের এলাকা, গ্রাম, নদী, জলাভূমি, মাঠ, শস্যক্ষেত। এসবই দেখছিলাম। কান্নাও পেল এ জন্যই।

আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। শেষবারের মতো দেশটা দেখে নিচ্ছেন বললেন, আপনি কি আর কখনও বাংলাদেশে ফিরবেন না?

মনে হয় ফেরার সময় পাব না।

কথাটার অর্থ বুঝতে পারি না। ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। তিনি ম্লান হেসে বললেন, দেখুন কত রকমের ভুল মানুষের হয়। আপনার সিট নিয়ে নিলাম, এতক্ষণ ধরে কথা বলছি; কিন্তু নিজের নামও বললাম না, আপনার নামও জানা হল না।

তিনি ডান হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। আমার নাম হাফিজুর রহমান। আমি আসাদ। আসাদুল হক।

খুব ভাল লাগল ভাই আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে। আমি আমেরিকায় থাকি তিয়াত্তর সাল থেকে। দু-চার বছর পর দেশে আসি। ঘুরে ঘুরে দেশটা দেখি। পনেরো-বিশ দিন থাকি, তারপর ফিরে যাই। এবার এলাম তিন বছর পর। শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। স্ত্রী কিছুতেই আসতে দিতে চায়নি। ছেলেও মানা করল। কারও কথা শুনিনি। চলে এলাম। দুই সপ্তাহ থাকলাম। স্ত্রী প্রতিদিন ফোন করে খবর নিচ্ছে। ছেলে ফোন করছে। ভেবেছিলাম টিকিট চেঞ্জ করব। আরো কয়েকটা দিন থাকব। ওদের যন্ত্রণায় থাকা হল না।

ওদেরও নিয়ে আসতেন।

তা-ই চেয়েছিলাম। ছেলে তার বউ-বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত। আমার স্ত্রী স্প্যানিশ। দিনে দিনে বাঙালি বউদের মতো হয়ে উঠেছে। নাতি-নাতনি নিয়ে ব্যস্ত। আগে যতবার এসেছি, হয় ছেলে এসেছে সঙ্গে, নয় স্ত্রী। আবার কখনও ছেলে, ছেলের মা আর আমি এসেছি। আমার বউমাও স্প্যানিশ। ওকেও একবার নিয়ে এসেছিলাম। এবার নিজেরা তো এলোই না, আমাকেও আসতে দিতে চায়নি। আমি জোর করে এসেছি। ওদের ভয় আমার শরীর নিয়ে...

স্ন্যাকস দিয়ে গেল। হাফিজ সাহেব সামান্যই মুখে দিলেন। হোস্টেসকে বললেন লিকার চা দিতে। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার জন্যও বলি? চা দেবে, না কফি?

চা। আপনার মতোই লিকার।

চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, আপনার হোম ডিস্ট্রিক্ট?

ঢাকার কাছেই। মুন্সীগঞ্জ। মুন্সীগঞ্জ তো আগে মহকুমা ছিল।

জানি। আমি ওই জেলারই লোক। তবে মুন্সীগঞ্জ বলি না, বলি আমরা বিক্রমপুরের লোক।

হাফিজ সাহেবের মুখটা উজ্জ্বল হল। বাহ্, দুজন একই এলাকার মানুষ। আপনাদের কোন থানা?

লৌহজং। গ্রামের নাম মেদিনীমণ্ডল।

গোয়ালিমান্দ্রার কোন দিকে, বলুন তো?

পশ্চিমে। তিন-চার কিলোমিটার পশ্চিমে। গোয়ালিমান্দ্রা চেনেন?

না, যাইনি কখনো। একাত্তরে গোয়ালিমান্দ্রায় একটা বড় যুদ্ধ হয়েছিল। জুলাই-আগস্ট মাসের দিকে।

জানি। ষাটজন পাকিস্তানি মিলিটারি ধরা পড়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। সেগুলোকে কচুকাটা করে পদ্মায় ভাসানো হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। পাকিস্তানিদের নাস্তানাবুদ করে দিয়েছিল বীর মুক্তিযোদ্ধারা। আপনাদের গ্রাম কোনটা?

গজারিয়া।

হাফিজ সাহেব উদাস হলেন। মেঘের অনেক ওপর দিয়ে যাচ্ছে বিমান। মাথার ওপর নিঃসীম আকাশ। মাঝখানটা ফাঁকা। তলায় সাদা মেঘের পাহাড় ভেসে ভেসে যায়। বিমান যাচ্ছে আকাশ এবং মেঘের মাঝখান দিয়ে। হাফিজ সাহেব জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

গজারিয়ায় বড় একটা গণহত্যা হয়েছিল। মে মাসের ৯ তারিখে ৩৬০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘গজারিয়া গণহত্যা’ নামে পরিচিত। আপনার গ্রাম কি গজারিয়াই? আমি ওদিককার প্রায় সব গ্রামই চিনি। গোশাইর চর, নয়ানগর, বালুচর, বাঁশগাঁও...

হাফিজ সাহেব উদাস গলায় বললেন, আমার গ্রাম গজারিয়াই। যে গণহত্যার কথা আপনি বললেন...

তিনি আমার দিকে মুখ ফেরালেন। গজারিয়ার ওই এলাকা ঘুরে বেরিয়েছেন বললেন, কেন ঘুরেছেন? এমনি?

না। আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে টুকটাক কাজ করি। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি করি। আমি একটা পত্রিকার সম্পাদক।

শুনে খুবই খুশি হলাম ভাই।

হাফিজ সাহেব আবার উদাস হলেন, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মে মাসের ৯ তারিখ ১৯৭১ ওই একটা দিন আমার জীবন তছনছ করে দিল। সব স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেল। আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম। সব গেল আমার। মা-বাবা...

মুক্তিযুদ্ধ আমার বিশেষ আগ্রহের বিষয়। হাফিজ সাহেবের কথায় বুঝে গেছি, সেই সময়কার বড় রকমের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি। জানতে ইচ্ছে করে।

ভাই, আপনি কি আমাকে বলবেন? যদি কোনও অসুবিধা না থাকে!

তিনি যেন নিজেকে একটু সামলালেন। না, কোনও অসুবিধা নেই। বলতে পারলে ভালই লাগবে। আপনি কোথাও লিখবেন এ জন্য না। এমনিতেই বলব।

প্লেন একটু দুলে উঠল। সামান্য সময়ের জন্য। খেয়ালই করলাম না। আমার এক ধরনের অস্থিরতা হচ্ছে। কতক্ষণে শুনব হাফিজ সাহেবের কথা। তিনি আমার সিটে বসে যেভাবে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, বাংলাদেশ নিয়ে যেটুকু বললেন, ওই সামান্য কথা আর তাঁর কান্নায় বুঝেছি, দেশের জন্য গভীর মমত্ববোধ আছে। এখন বললেন একাত্তরের কথা। গজারিয়ার গণহত্যা, জীবন তছনছ হয়ে যাওয়ার কথা।

ভাই, আপনার মা-বাবার কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে বলুন। আপনি কি তখন গ্রামেই ছিলেন?

না। একাত্তরে আমি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। নদীর ওপারে মুন্সীগঞ্জ। মুন্সীগঞ্জের বিখ্যাত কলেজ হরগঙ্গা। আমি হরগঙ্গা কলেজে পড়তাম। গজারিয়া গণহত্যার ঠিক এক মাস আগে, এপ্রিল মাসের ৯ তারিখে মুন্সীগঞ্জ শহরে ঢোকে মিলিটারিরা। মুসলিম লীগের লোকজন তাদের ব্যাপক খাতির-তোয়াজ করে। গরু জবাই করে খাওয়ায়। পঁচিশে মার্চের পরই আমি গজারিয়ায় চলে আসি। হোস্টেলে থাকতাম। মা-বাবার একমাত্র ছেলে। দুজনই আমার জন্য অস্থির। ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম। গজারিয়ায় বসেই টের পাই আমার বয়সী, আমার চেয়ে বড়, এমনকি স্কুলে পড়া ছেলেরাও যে যার মতো করে ওপারে চলে যাচ্ছে। কুমিল্লার ওদিক দিয়ে বর্ডার ক্রস করে আগরতলায় যাচ্ছে। মেলাঘরে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শুরু হয়ে গেছে। মা-বাবা দুজনই বুঝে গেছেন, আমি যাবই। সুযোগ পেলেই বাড়ি থেকে পালাব। আমাকে চোখে চোখে রাখা হচ্ছিল। এসব নিয়ে মা-বাবার সঙ্গে তর্কাতর্কিও করি। মা-বাবার একমাত্র ছেলে অনেক আছে। দেশের এই অবস্থায় তারা কি ঘরে বসে আছে? তার পরও মাকে ম্যানেজ করতে পারি না। কান্নাকাটি করে। বাবাকে ম্যানেজ করে ফেললাম। বাবা বললেন, যা। যুদ্ধ কর। দেশের এই অবস্থায় কারোই ঘরে বসে থাকা উচিত না। বাবা আদর্শবান, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ধরনের মানুষ। আমাদের স্কুলের ধর্মের শিক্ষক। জীবনে এক ওয়াক্ত নামাজ কাজা করেননি। অবস্থাও সচ্ছল।  পৈতৃক সম্পত্তি পেয়েছেন অনেক। তিরিশ-বত্রিশ বিঘা জমি, বাড়ি, পুকুর। আমার একটা মাত্র ফুফু। দাদা বেঁচে থাকতেই ফুফুকে তাঁর সম্পত্তি ভাগ করে দিয়েছেন। বাবা আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার পথ করে দিলেন। একরাতে দিনমজুরের বেশে আমি রওনা দিলাম। লুঙ্গি আর ছেঁড়া শার্ট পরা। মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি-গোঁফ। লুঙ্গির তলায় পকেটঅলা পাতলা একটা হাফপ্যান্ট পরা। প্যান্টের পকেটে তিন শ টাকা। বাবাই দিয়েছেন। গজারিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জে আসে কিছু মহাজনি নৌকা। একটা পরিচিত নৌকা পেলাম। তাদের ম্যানেজ করে সেই নৌকার মাঝি হয়ে এলাম নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায়। সেখান থেকে আমার বন্ধু সেলিমের কাছে। খবর পেয়েছিলাম, সেলিম ওপারে যাওয়ার চেষ্টায় আছে। চান্স পেলেই রওনা দেবে। দুজন একসঙ্গে রওনা দিতে পারলে ভাল। দিন দুয়েক পর রওনা দেওয়ার পরিকল্পনা। যে রাতে রওনা দেব, সেদিনই বিকালের দিকে খবর পেলাম, গজারিয়ায় ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে মিলিটারিরা। শত শত লোক মেরে ফেলেছে। তখনও পর্যন্ত সংখ্যাটা জানি না। এই খবরে মাথা খারাপ হয়ে গেল। পাগল হয়ে গেলাম। দিশাহারা হয়ে গেলাম। আমার বাবা বেঁচে আছেন তো? মা বেঁচে আছেন তো? পাড়াপড়শিরা? কিসের বর্ডার ক্রস? কিসের ওপারে যাওয়া? রাতটা ছটফট করে কাটালাম সেলিমদের বাসায়। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিলাম। যেমন করেই হোক, গজারিয়ায় যেতে হবে। মা-বাবার অবস্থা জানতে হবে। নারায়ণগঞ্জ শহরে মিলিটারি গিজগিজ করে। শান্তিবাহিনীর লোক এদিক-ওদিক। কোনও দিকে খেয়াল নেই। দিনমজুরের বেশে হাঁটছি। পাশ দিয়ে সা সা করে যায় মিলিটারি জিপ। কেউ আমার দিকে তাকিয়েও দেখে না। কুমুদিনীর ওদিকটায় এসে গজারিয়ার নৌকা পেলাম একটা। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তারা জানে। তবে বলতে পারছে না কত লোক মারা গেছে। শুধু বলল, চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। আজ গজারিয়ার দিকে তারা যাবেই না। পুরো তিন শ টাকায় তাদের রাজি করালাম। গজারিয়ায় এসে দেখি, গজারিয়া আর তার আশপাশের এলাকা মৃত্যুপুরি হয়ে গেছে। পুরো এলাকাই কবরখানা। এদিক-ওদিক পড়ে আছে মানুষের লাশ। রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে। ছুটে গেলাম বাড়িতে। বাড়ি আর বাড়ি নেই। গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। পোড়া ছাই থেকে ধোঁয়া উঠছে তখনও।

আমার মা কোথায় গেল?

আমার বাবা?

পরে শুনেছি, আমি আগরতলায় চলে গেছি শুনে মা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিলেন। শুয়ে শুয়ে শুধু কাঁদতেন। জ্বর এসে গিয়েছিল। ওই অবস্থায় ঘরে আগুন দেয় মিলিটারিরা। আমার মা পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন। কোনও চিহ্ন নেই তাঁর।

আর বাবা?

বাবার লাশটা আমি পেয়েছিলাম। মসজিদের কাছাকাছি একটা জায়গায় পড়ে ছিল। সাদা পাঞ্জাবি রক্তে লাল হয়ে আছে। সবুজ লুঙ্গি রক্ত জমে কালচে হয়ে গেছে। মাথায় তখনও টুপি। টুপি খুলে পড়েনি। বাবা গিয়েছিলেন ফজরের নামাজ পড়তে। নামাজ শেষ করে অন্য মুসল্লিদের সঙ্গে মসজিদ থেকে বেরিয়েছেন, তখনই জন্তুদের আক্রমণ। লাশের পর লাশ পড়ল গজারিয়া আর আশপাশের গ্রামগুলোতে।

দমবন্ধ করে ঘটনা শুনে যাচ্ছি আমি। হাফিজ সাহেব থামতেই বললাম, আমি জানি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পড়েছি, গজারিয়া এলাকার মুসলিম লীগ আর শান্তি কমিটির দালালগুলো পাকিস্তানিদের মিথ্যা খবর দিয়েছিল যে গজারিয়ায় মুক্তিবাহিনীর আস্তানা আছে। শুনে নরপশুগুলো এসেছিল গানবোট নিয়ে। তাদের আচমকা হামলায় দিশাহারা মানুষ প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। ছুটন্ত মানুষদের ওপর গুলি চালায় শত শত মিলিটারি। পনেরোজন যুবককে খালের ধারে নিয়ে সার ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। তেরোজনই সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। পাশের ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিল দুইজন। ফুলদি নদী দিয়ে ওদিকটায় এসেছিল তারা। সারা দিন ধরে গণহত্যা চালায়। ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট। শুধু গোসাইরচর গ্রামেরই ১৫৯ জনকে হত্যা করেছিল ওরা।

হাফিজ সাহেব বললেন, আপনার তথ্য একদমই ঠিক। আমিও এ রকমই জানি। গণহত্যার পর গ্রামগুলো জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। লাশ দাফন করার মতো কেউ ছিল না। পরদিন আমার মতো অনেকেই প্রিয়জনদের খোঁজে এসেছিল। এত লাশ কোথায় কবর দেবে? কাফনের কাপড় পাবে কোথায়? কেউ কেউ বা কলাপাতা জোগাড় করে এনেছে। কলাপাতার কাফনে গণকবর দেওয়া হয়েছে। এক কবরে অনেক লাশ। আমি আমার বাবার লাশ পাঁজাকোলে করে নিয়ে গেছি কবরস্থানে। তখনই শুনি মিলিটারি আসছে। আমার মতো আরও কত লোক কবরস্থানে। মিলিটারির কথা শুনেই লাশ ফেলে ছুটতে শুরু করল। আমি নড়লাম না। আসুক মিলিটারি। আমাকেও গুলি করে মারুক। বাপ-ছেলের লাশ পড়ে থাকুক এক জায়গায়। পরে শোনা গেল, না, মিলিটারি আসেনি। গুজব রটেছে।

এ রকম গুজব তখন অনেক রটত।

হ্যাঁ। যুদ্ধের সময় গুজব রটেই। আমি তারপর পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। কখনও কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকি, কখনও ছাই হয়ে যাওয়া বাড়িতে। ফুফুর বিয়ে হয়েছে বালুয়াকান্দি গ্রামে। একটা পাঁচ বছরের ছেলে আর কোলে বছর দেড়েকের মেয়ে। ছেলে-মেয়ে ফেলেই ফুফাকে নিয়ে ফুফু এলেন কাঁদতে কাঁদতে। আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে। সেই বাড়িতে দিন সাতেক ছিলাম। তারপর ওই গ্রামের ওয়াজেদের সঙ্গে চাঁদপুর হয়ে, পাঁচ দিন না সাত দিনের চেষ্টায় বর্ডার ক্রস করলাম...

 

দুই.

সিঙ্গাপুর এয়ারপোর্টের ট্রানজিট এরিয়ায় হাফিজ সাহেবের সঙ্গে ঘুরে বেড়ালাম। কফিশপে বসলাম। তিন ঘণ্টা পর আবার প্লেনে চড়ব। এই সময়টায় তাঁর পেছনের জীবন নিয়ে আর কোনো কথা হল না। তবে আমার ভেতর তীব্র কৌতূহল। ভদ্রলোকের জীবনের বাকি ঘটনা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি। কিন্তু তিনি সেসব কথা আর তুলছেন না। মাঝে মাঝে কেমন উদাস হয়ে যাচ্ছেন। আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকছেন কোনও দিকে। মনে হচ্ছে, সারাক্ষণ কী যেন ভাবছেন।

হাফিজ সাহেব কথা শুরু করলেন প্লেনে উঠে। সিঙ্গাপুর থেকে লসএঞ্জেলেস তেরো-চৌদ্দ ঘণ্টার জার্নি। বিমানটাও অনেক বড়, অনেক সুন্দর। ঢাকা থেকে যে বিমানে এলাম, তার চেয়ে অনেক ভাল। ধনী দেশগুলো আমাদের মতো নিম্নমধ্যম আয়ের কিংবা দরিদ্র দেশগুলোয় ভাল বিমান পাঠায় না। ব্যাপারটা আমি আগেও খেয়াল করেছি।

এবার আর উইন্ডোসিটে বসেননি হাফিজ সাহেব। আমি বসেছি। এই কয়েক ঘণ্টা একসঙ্গে থাকার ফলে বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়েছে তাঁর সঙ্গে। দুজনেরই কথায় এবং আচরণে বোঝাই যাচ্ছে না, মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পরিচয় হয়েছে। যে কেউ দেখে ভাববে, আমরা দীর্ঘদিনের বন্ধু।

বিমান আকাশে ওঠার কিছুক্ষণ পর হাফিজ সাহেব নিজ থেকেই কথা বলতে শুরু করলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে খুবই দুর্ধর্ষ ছিলাম। জীবনের মায়া না থাকলে সাহসের অভাব হয় না। জীবনের মায়া আমার ছিল না। বুকের রক্ত সারাক্ষণ টগবগ করে ফুটছে। শুধু মনে হয়, আমার মা-বাবাকে যারা মেরেছে, তাদের একটাকেও আমি ছাড়ব না। যেখানে যেভাবে পারি মারব। যেসব অপারেশনে যেতে কোনও কোনও মুক্তিযোদ্ধা একটু ভাবতেন বা ভয় পেতেন, সেই সব অপারেশনে আমি আছি সবার আগে। একটা পাগলামিও ছিল আমার মধ্যে। মাথাটা বোধ হয় খারাপও হয়ে গিয়েছিল। সহযোদ্ধারা আমাকে ডাকত ‘পাগলা হাফিজ’। চারদিক দিয়ে মিলিটারিদের ঘেরাও করেছি। কোনও পাট কিংবা আখক্ষেতে ওতপেতে আছি। ক্রোলিং করে করে এগোচ্ছি। গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে দুই পক্ষে। উত্তেজনায় কখনও কখনও আমি দাঁড়িয়ে যেতাম। এই করেই বাঁ কাঁধে গুলিটা লেগেছিল। তেমন বড় জখম না। কাঁধের কিছুটা মাংস উড়ে গিয়েছিল।

তাই নাকি? আপনার বাঁ কাঁধে গুলি লেগেছিল?

হ্যাঁ। বড় একটা গর্ত আছে ওখানে। সাভারের কাছাকাছি এলাকায় যুদ্ধ করছিলাম। নভেম্বরের শেষদিকে। ভেবেছিলাম মারা যাব। এত রক্ত পড়ল! আমার অবশ্য বাঁচার ইচ্ছাও ছিল না। মনে হচ্ছিল, দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। আমার মা নেই, বাবা নেই। একা বেঁচে থেকে লাভ কী? দেশের জন্য শহীদ হয়ে যাওয়াই ভালো। মরলাম না, জানেন! একজন গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার বাঁচিয়ে তুলল। তখন ওদিকটা প্রায় স্বাধীন। চারদিক দিয়ে ঢাকা অবরোধ করছে মুক্তিযোদ্ধারা আর মিত্রবাহিনী। পাকিস্তানিরা কোণঠাসা হচ্ছে। সেই ডাক্তার ভদ্রলোক সাত দিন না দশ দিন যেন তাঁর বাড়িতে রাখলেন। ঘা শুকাতে সময় লাগছিল। কিন্তু বেঁচে গেলাম, ভাল হয়ে গেলাম। দেশ স্বাধীন হল, আমি পুরো সুস্থ। চারদিকে স্বাধীনতার আনন্দ-উৎসব চলছে। আমার ভাল লাগে না কিছুই। গজারিয়া গেলাম ফুফুর বাড়িতে। ডিসেম্বরেও এদিকটায় নানা রকম ঝামেলা করেছে পাকিস্তানিরা। ফুফুরা এদিক-ওদিক পালিয়ে বেঁচেছে। আমাকে পেয়ে কী কান্নাটা যে কাঁদল ফুফু! আমি কোথায় যাব, কী করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াই। ফুফুর বাড়িতে থাকি, খাই। ভালই লাগে না। আমাদের বাড়ি শূন্য পড়ে আছে। ঘরদুয়ার ছাই করে দিয়েছে পাকিস্তানিরা। এই অবস্থায় কী করে দিন কাটবে আমার? ফুফু আমাকে বলল, তুই আবার লেখাপড়া শুরু কর। বিএ, এমএ পাস করে চাকরিবাকরি করবি। জায়গা-সম্পত্তি যা আছে, সবই তো তোর। আমার কিছুই ইচ্ছা করে না। বাবার লাশ যেখানটায় পড়ে ছিল, সেই জায়গাটায় গিয়ে বসে থাকি। কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকি। শূন্য বাড়িতে গিয়ে বসে থাকি। এই করে কাটল একটা বছর। আমার সহযোদ্ধা ছিল বাদল। পুরানা পল্টনে থাকত। ওর এক আত্মীয় এলএতে থাকে ষাটের দশকের দিক থেকে। বাদল চলে যাবে আমেরিকায়। বললাম, আমাকেও নিয়ে যা। যেভাবেই হোক, আমি যাব। পাঁচ বিঘা জমি বিক্রি করে বাদলের সঙ্গে আমেরিকায় এলাম...

একটু থামলেন তিনি। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর এই এতগুলো বছর। জীবন কেটে গেল আমেরিকায়; কিন্তু মন পড়ে রইল বাংলাদেশে। মন পড়ে রইল একাত্তরে। মা-বাবার মৃত্যু, পাকিস্তানিদের বর্বরতা, মুক্তিযুদ্ধ...আমেরিকার ব্যস্ততম জীবনের মধ্যে থেকেও মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারি না কিছুই। অদ্ভুত এক ডিপ্রেশন হয় মাঝে মাঝে।

হাসপাতালে থাকতে হয়। আমার যিনি স্ত্রী, তার সঙ্গে পরিচয় হল হাসপাতালে। সে নার্সের কাজ করত। ধীরে ধীরে সম্পর্ক, বিয়ে। সে আমার অবলম্বন হয়ে দাঁড়াল। ছেলেটাও হল বাপ ন্যাওটা। প্রথম দশ-বারোটা বছর দেশে আসিনি। স্ট্রাগল করেছি। বিদেশে যা করতে হয় আর কি! ধীরে ধীরে জীবন বদলালো। একটা গ্রোসারিশপ করেছিলাম, সেখান থেকে হল সাতটা। বাড়ি হল তিনটা।

একটায় থাকি, বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া। দুটি গ্যাস স্টেশান। ছেলে আরও বাড়াচ্ছে ব্যবসা। আমি মাঝারি মাপের বড়লোক। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে দেশে। ফুফু মারা গেছেন। মামা-খালারাও কেউ বেঁচে নেই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগও তেমন ছিল না। মা কিছু জায়গা-সম্পত্তি পেয়েছিলেন নানার দিক থেকে। আমার দুই মামা আর তিন খালা সেগুলো আমাকে দিলই না...। তবু আমার কোনও রাগ নেই কারও ওপর। তবে আমার সেই ফুফাতো ভাইটা, মুক্তিযুদ্ধের সময় যার বয়স ছিল পাঁচ বছর, ওর নাম সবুজ, অসাধারণ একটা ছেলে। এত সৎ, এত কর্মঠ। এখন ওরও বয়স পঞ্চাশ। ফুফা-ফুফু মারা যাওয়ার পর আমার জায়গা-সম্পত্তি দেখে। আমার কাজগুলো করে। আমার বাড়িতেই থাকে। একটা বিল্ডিং করে দিয়েছি...। ভাই, মনটা সব সময় দেশের জন্য কাঁদে। কেমন আছে আমার দেশ, তা দেখার জন্যই দু-তিন বছর পর পর দেশে আসি।

হাফিজ সাহেবের দীর্ঘজীবনের কথা শুনতে শুনতে আমার মনে অনেক প্রশ্ন জমেছে। ভাই, আপনাকে দু-একটা প্রশ্ন করি?

নিশ্চয় নিশ্চয়।

দেশটাকে আপনি এত ভালবাসেন, সেই দেশ ফেলে জীবনটা আমেরিকায় কাটিয়ে দিলেন কেন?

তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন। নিয়তি ভাইজান, নিয়তি। ওই যে বললাম ডিপ্রেশন! অদ্ভুত এক ডিপ্রেশন হত। দিনে দিনে তার সঙ্গে যুক্ত হল নার্ভের সমস্যা। পঁয়ত্রিশ বছর আগে ধরা পড়ল হাড়ের অদ্ভুত এত রোগ। প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছিল হাড়ে। পায়ের পাতার বুড়ো আঙুলের পাশের হাড় বেড়ে গেল ব্যথায়। নানা রকম টেস্ট ইত্যাদির পর ডাক্তাররা বললেন, এ এক ধরনের ক্যান্সার। রেগুলার ট্রিটম্যান্টের মধ্যে থাকতে হয়। প্রচুর ওষুধ খেতে হয়। ইনজেকশন নিতে হয়।

আমি ভেতরে ভেতরে দমে গেলাম। দেখে বোঝা যায় না যে আপনি ক্যান্সার সারভাইভার।

আমেরিকায় আছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

আমি মাথা নাড়লাম। তা ঠিক।

তবে আর বেশি দিন বোধ হয় আয়ু নেই। মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। বোধ হয় এটাই শেষ বাংলাদেশে আসা। শেষ কাজটা করার জন্য এসেছিলাম...

হাফিজ সাহেব উদাস হলেন...। আমি আমার জায়গা-সম্পত্তি, মানে বাংলাদেশের জায়গা-সম্পত্তি সবই সবুজকে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছি। বাইশ-তেইশ বিঘা জমি হবে। সেই সব জমির দামও অনেক। সব মিলিয়ে সাত-আট কোটি হবে। মাসে মাসে টাকা পাঠাই ওকে বহু বছর ধরে। ও আমার একটা কাজ খুবই সততার সঙ্গে করে। ওর কোনও কাজ নেই। জমির একটা বড় আয় আছে। আমিও টাকা দিই। সবুজ সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়ায়। কোথায় কোন মুক্তিযোদ্ধা কষ্টে আছেন, টাকার অভাবে সংসার চালাতে পারেন না, চিকিৎসা করাতে পারেন না, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেন না, খুঁজে খুঁজে তাঁদের বের করে। তাঁদের কাছে যায়। নানা রকমভাবে তাঁদের সাহায্য করে। বেশ কয়েকটা অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবার চালিয়ে রাখছি আমি। তিরিশ-চল্লিশজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছি। অনেক বছর ধরে কাজটা করি। বেশ কয়েকটা পরিবার এভাবে দাঁড় করিয়েছি। আমার মৃত্যুর পরও যেন কাজটা বন্ধ না হয়, সেই ব্যবস্থা করেছি। জমির আয় থেকে কাজটা চালিয়ে যাবে সবুজ। আমার স্ত্রীরও বয়স হয়েছে। প্রায় আমার মতই বয়স। আমি না থাকলে সে আর আমার ছেলে থাকবে সবুজের পাশে। মোট কথা, কাজটা কিছুতেই বন্ধ হবে না। যাঁরা দেশটা পাকিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন, স্বাধীন একটা দেশ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, তাঁদের পাশে থাকতে চাই। দেশের ঋণ শোধ করবার সামান্য চেষ্টা...

হাফিজ সাহেবের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে আছি। নিয়তি তাঁকে একটা চক্রের মধ্যে ফেলে আমেরিকায় থাকতে বাধ্য করেছে; কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে বাংলাদেশে। দেশের জন্য যেটুকু কাজ করার, তা করছেন একটু অন্য রকমভাবে। অসহায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁদের ছেলেমেয়েদের দাঁড় করাচ্ছেন। এ তো বিশাল কাজ! দেশে এত টাকাঅলা মানুষ আছেন, বড় অবস্থার মুক্তিযোদ্ধাও আছেন, কজন করেন এই ধরনের কাজ?

হাফিজ সাহেব বললেন, এবার যে কারণে দেশে এলাম, সেটা আপনাকে বলি ভাই। দেশে এসেছিলাম মাটি নিতে।

কথাটা বুঝতে পারি না। মাটি নিতে মানে?

দেশের কিছুটা মাটি আমেরিকায় নিয়ে যেতে এসেছিলাম। যেখানটায় আমার বাবার লাশ পড়ে ছিল, যেখানে কবর দিয়েছিলাম বাবাকে, আর যেখানটায় পাকিস্তানিরা পুড়িয়ে ছাই করে ফেলেছিল আমার মাকে—এই তিন জায়গার সামান্য সামান্য মাটি হ্যান্ডব্যাগে নিয়েছি। বুঝে গেছি আর বেশিদিন আয়ু আমার নেই। মারা যাওয়ার পর আমার কবরও হবে আমেরিকায়ই। স্ত্রী আর ছেলে চাইবে, তাদের কাছাকাছিই থাকি আমি। যেন বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে আমার কবরে তারা যেতে পারে। দেশে এনে কবর দিলে সেই সুযোগটা থাকবে না। এ জন্য দেশের মাটিটুকু আমি নিয়ে যাচ্ছি। স্ত্রী আর ছেলেকে বলব আমার কবরে যেন আমার দেশের মাটিটুকু ছড়িয়ে দেয়। কবরেও আমি যেন আমার দেশের মাটির স্পর্শেই থাকি...

হাফিজ সাহেবের কথা শুনে আমার চোখে পানি এল।

মন্তব্য