kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৪ অক্টোবর ২০১৯। ৮ কাতির্ক ১৪২৬। ২৪ সফর ১৪৪১       

স্বপ্ন

ডিউক জন

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বপ্ন

অঙ্কন : বিপ্লব

ঘন, কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে আকাশ, দেখে দ্রুত প্যাডেল করে বাড়ির দিকে সাইকেল ছোটাল দুই বন্ধু রকি আর সুব্রত। ফিরছে ওরা ক্লাস শেষ করে। ভেবেছিল, স্কুল ছুটির পর বন্ধুবান্ধব মিলে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করবে। সেটা আর হলো কই? বেরসিকের মতো বাগড়া দিয়ে বসেছে প্রকৃতি। অবশ্য সাগরের কাছে বলে এ অঞ্চলের আবহাওয়ার চরিত্রই এ রকম। এই রোদ তো, এই বৃষ্টি।

হাওয়া দিচ্ছে জোরে জোরে। সন্ধ্যার মতো অন্ধকার নেমে এসেছে চারদিকে। প্রতিবার বিদ্যুত্ চমকানোর সঙ্গে সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে নীলচে আলো, পরক্ষণেই বুকের মধ্যে কাঁপুনি তুলছে বাজ পড়ার বিকট শব্দ। ভয়াবহ পরিস্থিতি। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় কল্পনাই করা যায়নি এ অবস্থা হবে।

‘কপালটাই খারাপ আমাদের’—চলার ওপরই মুখ খুলল সুব্রত। ‘মরার বৃষ্টি আসার আর টাইম পেল না!’ ঝড়ের শোঁ শোঁ ছাপিয়ে গলা তুলতে হচ্ছে ওকে।

‘এক্কেবারে ঠিক কথা’—চিত্কার করে সায় জানাল রকি।

‘বাসায় গিয়েই পড়া নিয়ে বসছি আমি। তুই?’

‘আমিও। কালকে তো আবার ভূগোল টেস্ট আছে।’ বলেই সাইকেল ঘোরাল রকি। রাস্তাটা দুই ভাগ হয়ে গেছে এখানে এসে। দুই বন্ধুর পথও আলাদা হয়ে যাচ্ছে এখান থেকে।

‘দেখা হবে দোস্ত।’ পেছন না ফিরেই বন্ধুর উদ্দেশে হাত তুলল রকি।

‘দেখা হবে।’ সুব্রতও হাত নেড়ে বিদায় জানাল।

রকির আব্বু অফিসে। বাড়ি ছিলেন না আম্মুও। বুয়া রহিমা খালাকে জিজ্ঞেস করে জানল, কী জানি কিনতে বেরিয়েছেন। ফিরতে খানিকটা দেরি হতে পারে।

হাত-মুখ ধুয়ে, মুখে কিছু গুঁজেই বই-খাতা নিয়ে ড্রইংরুমে চলে এলো রকি। আরাম করে বসল প্রিয় ইজি চেয়ারটায়। তারপর ভূগোল বইটার পাতা উল্টে বের করে নিল নির্দিষ্ট চ্যাপ্টার। পৃথিবীর প্রাচীন, মধ্য আর আধুনিক যুগের সপ্ত আশ্চর্যের ওপর হচ্ছে আগামীকালের পরীক্ষা। ১৫ নম্বর রিটেন, ১৫ নম্বর এমসিকিউ। প্রস্তুতি নেওয়াই আছে, একটু শুধু ঝালাই করে নিতে হবে।

বাইরে ততক্ষণে নেমে গেছে বৃষ্টি। শুরুতে বন্ধ জানালার কাচে মৃদু তাল ঠুকছিল বৃষ্টির ফোঁটা, তারপর একটানা ড্রাম বাজাতে লাগল দ্রুত লয়ে। পাগল হয়ে গেছে যেন। ছন্দোময় আওয়াজটা শুনতে শুনতে কখন যে চোখ লেগে এসেছে, বলতে পারবে না রকি।

চোখ যখন মেলল, ওর মনে হলো ঘুমিয়েছে মাত্র এক মিনিট। জানালা দিয়ে আসা বিকেলের নরম রোদ্দুরে ভরে আছে বৈঠকখানা। বৃষ্টিবাদলার চিহ্নও নেই।

জানালার বাইরে চাইতেই সুব্রতকে দেখতে পেল রকি। কাচের গায়ে নাক ঠেকানো। নিঃশ্বাসের গরম বাতাস ঘোলা করে দিচ্ছে কাচ।

ঠকঠক করে টোকা পড়ল জানালায়। ‘রকি! অ্যাই, রকি!’ চাপা কণ্ঠে ডাকল ওর বন্ধু।

চোখ পিটপিট করছে সদ্য ঘুম থেকে ওঠা ছেলেটা।

‘আরে, অ্যাই! ওঠ না, বাবা!’ অধৈর্য শোনাল সুব্রতর গলাটা।

ঘুম ঘুম চোখে জানালা খুলে দিল রকি।

‘কী রে!’—মৃদু তিরস্কারের ছোঁয়া সুব্রতর কণ্ঠস্বরে। ‘যাবি না সৈকতে? টি-ফাইভ ম্যাচ আছে আজকে, ভুলে গেলি নাকি?’

না, ভুলে যায়নি। তবে খেলতে যে পারবে, আশা করেনি এটা। কিন্তু বৃষ্টি তো থেমেছেই, পানি শুষে নিয়ে খেলার উপযোগীও হয়ে যাওয়ার কথা সাগরপারের বালি। টি-টোয়েন্টির আদলে টি-ফাইভ ক্রিকেট ম্যাচ। পাঁচ ওভার করে বোলিং করবে দুই দল।

‘চলে আয় দোস্ত’—তাড়া দিল সুব্রত। ‘এতক্ষণে বোধ হয় পৌঁছে গেছে বাকিরা।’

দস্তানাজোড়া মুঠোয় পুরে একছুটে বাড়ি থেকে বের হলো রকি।

নুড়ি বিছানো গাড়িপথ ধরে ঠেলে নিয়ে চলেছে যার যার সাইকেল, কিছু একটা মনে পড়ার ভঙ্গিতে বন্ধুর মুখের দিকে তাকাল সুব্রত। ‘অ্যাই, জানিস, মজার একটা ঘটনা ঘটেছে!’

‘কী ঘটনা?’

‘আমিও তোর মতো ঘুমিয়ে পড়েছিলাম পড়তে পড়তে।’

‘এটাই তোর মজার ঘটনা?’ বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে রকিকে।

‘আরে দূর! এর মধ্যে মজা দেখলি কোথায়?’

‘তাহলে?’

‘মজার একটা স্বপ্ন দেখেছি। সেটার কথাই বলছিলাম আরকি।’

‘ও। তা, কী দেখলি?’

‘উড়ে বেড়াচ্ছি আকাশে।’

‘পাখির মতো?’

‘না, সুপারম্যানের মতো।’

‘মানে, পাখা ছাড়াই?’

‘হুম।’

‘তারপর?’

‘পড়ছিলাম তো পরীক্ষার পড়া। দেখি কী, সেটারই এফেক্ট পড়েছে স্বপ্নে।’

‘কী রকম?’

‘প্রথমে দেখলাম, চীনের প্রাচীরের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি। চোখের পলকে পেরিয়ে গেলাম সেটা। তারপর জর্দানের পেত্রা ঘুরে হাজির হলাম এসে রোমান কলোসিয়ামের ওপর।

ইতালি এসে পিসার হেলানো টাওয়ারটা দেখবো না, তা কি হয়! অতএব একটানে সেখান থেকে পৌঁছে গেলাম পিসাতে, সেখানে একবার চক্কর দিয়ে উড়ে চললাম ইংল্যান্ডের স্টোনহেঞ্জের দিকে। সেখান থেকে মেক্সিকোর চিচেন ইতজা, পেরুর মাচুপিচু পার হয়ে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে এসে দেখি, দুই হাত দুই দিকে মেলে দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার নামের বিশাল স্ট্যাচুটা।

এমনকি বাদ পড়ল না আগ্রার তাজমহলও।’ একটানা এতগুলো কথা বলে থামল সুব্রত দম নেওয়ার জন্য।

‘সত্যিই ইন্টারেস্টিং’—স্বীকার করল রকি।

‘আরে, ইন্টারেস্টিং অংশটা তো বলিইনি এখনো।’

‘আরো আছে নাকি? বল, বল, বলে ফেল।’

‘হ্যাঁ...বল তো, কোথায় গেলাম ইন্ডিয়া থেকে!’

‘মিসরে?’ আন্দাজে ঢিল ছুড়ল রকি।

‘এগজ্যাক্টলি! কল্পনাই করতে পারবি না, কাকে দেখেছি পিরামিডের পাশ দিয়ে যেতে যেতে।’

‘উম...পারছি বোধ হয়।’

‘ইহ্...বল দেখি!’

‘আমাকে।’ রহস্যময় হাসি রকির ঠোঁটে।

‘খাইছে! কী করে বুঝলি?’ হাঁ হয়ে গেছে সুব্রত।

নিজের সাইকেলে উঠে পড়ল রকি। দস্তানা পরা হাতে চেপে ধরল হ্যান্ডেল। ‘কারণ, আমিও যে স্বপ্ন দেখছিলাম!’

‘তো?’

হাসল রকি সবকয়টা দাঁত বের করে। ‘স্বপ্নের মধ্যে মিসরে ছিলাম আমি। দাঁড়িয়েছিলাম পিরামিডের সামনে!’

মন্তব্য