kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

ক্যান্সার শনাক্ত যন্ত্র উদ্ভাবক

জহিরুল আলম

প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার ধরা পড়লে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে নিরাময় সম্ভব। সে চিন্তা থেকেই শুরুর দিকে ক্যান্সার শনাক্তের জন্য একটা ডিভাইস (যন্ত্র) উদ্ভাবন করেছেন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. জহিরুল আলম সিদ্দিকী। তিনি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং এবং ন্যানোটেকনোলজির জ্যেষ্ঠ গবেষক। তাঁকে নিয়ে এবারের আয়োজন

লেখা ও সাক্ষাৎকার : আব্দুল্লাহ আল মামুন   

৩ জানুয়ারি, ২০১৫ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জহিরুল আলম

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের এক ছোট্ট গ্রাম জয়শ্রী। সেখানের দরিদ্র কৃষক পরিবারের ছেলে শামীম। খাওয়া-পরার পর পড়ালেখাটা সেখানে বিলাসিতা। কিন্তু ছেলেটা পড়তে ভালোবাসে।

বিজ্ঞাপন

প্রাথমিক শিক্ষাটা টেনেটুনে শেষ করল। লজিং থেকে শুরু করল মাধ্যমিক। যে বছর লজিং নেই, পড়াও বন্ধ! এভাবেই সিলেটের রেবতি-রমণ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৩ সালে মাধ্যমিক পাস করে শামীম। ১৯৯৫ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্টার মার্কস পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক, ২০০১ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভৌত রসায়নে স্নাতকোত্তর। এরপর পেয়ে যান কোরিয়া যাওয়ার সুযোগ। ২০০৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার পুসান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেন 'ব্রেইন কোরিয়া ২১' নামের শ্রেষ্ঠ গবেষণাপদক। প্রতিবছর কোরিয়ার বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িকীতে যেসব গবেষণা নিবন্ধ ছাপা হয়, তার ওপর ভিত্তি করেই দেওয়া হয় এই পদক। ২০০৭ সালে পিএইচডিতে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য পুসান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরা ছাত্র নির্বাচিত হন এই শামীম। বিষয় বিশ্লেষণী রসায়ন। এরপর তিন বছর অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এলান বন্ডের কাছে পোস্ট ডক্টরাল করেন। ২০১০ সালে ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট ফর বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এবং ন্যানো টেকনোলজিতে (এইবিএন) যোগ দেন। এখন সেখানে জ্যেষ্ঠ গবেষক ও সহযোগী দলনেতা। এই শামীমই আমাদের ড. জহিরুল আলম সিদ্দিকী, যিনি উদ্ভাবন করেছেন প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তের ডিভাইস।

ড. সিদ্দিকী মূলত প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার শনাক্তকরণের ডিভাইস ডেভেলপমেন্টের ওপর কাজ করেন। বিষয় হলো কম টাকায় কিভাবে ক্যান্সার চিকিৎসা করা যায়। কারণ দরিদ্র দেশগুলো বেশি টাকা ব্যয় করে এর চিকিৎসা করাতে পারেন না। ড. সিদ্দিকী বলেন, 'হৃদরোগের পর দ্বিতীয় বড় ঘাতক রোগ ক্যান্সার। প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। অনেকেই মারা যান। ক্যান্সারের চিকিৎসায় ১০ থেকে ৪০-৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। খুব ব্যয়বহুল চিকিৎসা। টাকা খরচ করেও অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো যায় না। হুমায়ূন আহমেদের মতো জনপ্রিয় বাঙালি লেখকও এই রোগে মারা গেছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্যান্সার যখন ধরা পড়ে, তখন শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ক্যান্সার নিরাময় করা সম্ভব। ' ২০১৪ সালে চালানো এক জরিপে দেখা যায়, আমেরিকায় প্রতিবছর দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ মারা যায় ক্যান্সারে। এটি এমন একটি ব্যাধি, যেটি অজ্ঞাতসারে শরীরে বেড়ে ওঠে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ে শেষ পর্যায়ে, যখন চিকিৎসার মাধ্যমে এটি পুরোপুরি নিরাময় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিলে ক্যান্সার নির্দেশক একটা ডিভাইস তৈরির প্রস্তাবনা পাঠান ড. সিদ্দিকী। যে ডিভাইস দিয়ে শরীরে ক্যান্সারের কোষ শনাক্ত করা যাবে। ড. সিদ্দিকীর মতে, ক্যান্সারের কোষগুলো এ রকম যে শরীরে মিলিয়ন মিলিয়ন কোষের মধ্যে এই কোষ ১০ থেকে ১০০টার মতো থাকে।

অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল তাঁকে 'ডিসকভারি অ্যাওয়ার্ড' ফান্ড দেয়। গবেষণা করে তিনি একটি ডিভাইস তৈরির পদ্ধতি বের করেন, যাকে বলা হয় 'ন্যানোশেয়ারিং' পদ্ধতি। উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক প্যাটেন্ট করেন ড. সিদ্দিকী। কিন্তু এই উদ্ভাবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তখনো অনেক গবেষণা দরকার ছিল। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ কাউন্সিল থেকে তিন লাখ ৭২ হাজার ডলার অনুদান পান সিদ্দিকী। সেই দিয়ে তিনি ও তাঁর গবেষকদল এমন একটি ডিভাইস বানান, যার মাধ্যমে মানব রক্তের ভেতরে অবস্থিত অতি বিরল এক ধরনের কোষ (সার্কুলেটিং টিউমার সেল বা সিটিসি) সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়, যেটি প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সারের সুনির্দিষ্ট তথ্য বহন করে।

এই ডিভাইসকে সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী করে তুলতে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বুঝতে পারেন ড. সিদ্দিকী। সহযোগিতায় এগিয়ে আসে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল। গত ১৭ অক্টোবর সেখান থেকে চার লাখ ১১ হাজার ডলার অনুদান পান ড. সিদ্দিকী। তিনি বলেন, 'আশা করছি, এই অনুদানের মাধ্যমে আমি স্বল্প মূল্যের একটি যন্ত্র তৈরি করতে পারব, যেটি ক্যান্সার শনাক্তকরণের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড যন্ত্র হিসেবে সর্বত্র ব্যবহার সম্ভব হবে। এই যন্ত্রটি যেমন বিভিন্ন পর্যায়ের ক্যান্সার শনাক্তকরণে ব্যবহার করা যাবে, তেমনি এর মাধ্যমে চিকিৎসকরা ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার বিভিন্ন পর্যায়ে শরীরে ক্যান্সারের বৃদ্ধি বা হ্রাস পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ফলে রোগীর চিকিৎসা ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না, সেই ব্যাপারে সঠিক ধারণা পাবেন। '

গবেষণায় সফলতার কারণে পরপর দুইবার ২০১১ ও ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ পান সিদ্দিকী। বর্তমানে স্ত্রী সিরাত সিদ্দিকী, ছেলে ইওয়ান ও মেয়ে হৃদাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বাস করেন এই বাঙালি বিজ্ঞানী। সম্প্রতি দেশে এসে মানুষের ভালোবাসা পেয়ে রীতিমতো মুগ্ধ। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট সিটি করপোরেশন, হাওর উন্নয়ন সংস্থা, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ, জগন্নাথপুর সুধীসমাজসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান তাঁকে সংবর্ধনা দিয়েছে। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, হোটেল সোনারগাঁওসহ একাধিক বিজ্ঞানবিষয়ক সেমিনারে বক্তব্য রেখেছেন। ধর্মপাশার জয়শ্রী গ্রামে বাবা আবদুুল হাকিম তালুকদার, মা মজলিছুননেছা তালুকদার ও ভাইবোনদের সঙ্গে চমৎকার সময় কাটাচ্ছেন এই বিজ্ঞানী।