kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

পাবলো নেরুদার মাতিলদে উরুটিয়া

আন্দালিব রাশদী

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



পাবলো নেরুদার মাতিলদে উরুটিয়া

১৯৭১-এর নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী পাবলো নেরুদা (জন্ম : ১২ জুলাই ১৯০৪, মৃত্যু : ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩) বিশ শতকের সর্বাধিক পঠিত কবি। ১৯৪৬-এর এক আলসে অপরাহ্নে পাবলো নেরুদা ও গায়িকা মাতিলদে উরুটিয়ার (জন্ম : ৩০ এপ্রিল ১৯১২, মৃত্যু : ৫ জানুয়ারি ১৯৮৫) সাক্ষাৎ চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোর একটি পার্কে, তখন একটি কনসার্ট চলছিল। কয়েক বছর পর ১৯৪৯-এ আবার দেখা মেক্সিকো সিটিতে। চিত্রশিল্পী হোসে ক্লেমেন্তে ওরোজকোর শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার পর কবি যখন ফ্লেবাইটিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হলেন, তাঁর সেবা করতে এগিয়ে এলেন মাতিলদে।

বিজ্ঞাপন

পাবলো নেরুদা তখন দেশ-দেশান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। চিলির ডানপন্থী সরকারের হাতে তিনি নিগৃহীত ও লাঞ্ছিত। সেবিকা-গায়িকা মাতিলদের সঙ্গে নেরুদার প্রেম হয়ে ওঠে সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোপন কাহিনি।

চিলিতে তখন নেরুদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। নেরুদা মাতিলদেকে নিয়ে চলে এলেন ইতালির ক্যাপ্রিতে। চন্দ্রালোকে আমৃত্যু একসঙ্গে থাকার শপথ নিয়ে দুজন বিয়ে করলেন। বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন—বর ও কনে। বিয়েতে কোনো ধর্মযাজকেরও দেখা নেই। বিয়েটা আইনসিদ্ধ ছিল না। তাঁর স্ত্রী বর্তমান। নেরুদা লিখলেন :

সারা রাত তোমার সঙ্গে ঘুমাব এই দ্বীপে সমুদ্রের কাছে

আনন্দ ও ঘুমের মাঝখানে তুমি বুনো ও মিষ্টি

আগুন ও পানির মাঝখানে।

নেরুদার শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতাগুলো যে মাতিলদেকে নিয়েই, ধীরে ধীরে তা প্রকাশিত হতে শুরু করল। মাতিলদে বিয়ের জন্য নেরুদাকে চাপ দেননি কিংবা বর্তমান স্ত্রী দেলকে তালাক দেওয়ার জন্যও নয়। তিনি বললেন, ‘দেল থাকুক নেরুদার দাপ্তরিক জীবনে পাটরানি হয়ে, আমার সমস্যা নেই। ’ তিনি জানেন নেরুদার হৃদয়ের সিংহাসনটি তাঁরই অধিকারে।

নেরুদার সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদ হতে যাচ্ছে মাতিলদের, নেরুদাকে আত্মগোপনেই থাকতে হবে। বিদায়ের একটি দৃশ্য বর্ণনা করছেন মাতিলদে : আমার মুখমণ্ডল গড়িয়ে পড়া অশ্রু নিয়ে ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে ঢুকলাম। আমি কান্না লুকোনো বা শুকোনোর চেষ্টা বন্ধ করে দিলাম। আমি পরাজিত বোধ করছি, এখন আমার কিছুতেই কিছু এসে যায় না। ...ট্রেন চলতে শুরু করেছে। আমি পাবলোর চিঠিটি খাম থেকে টেনে বের করলাম। খামের ভেতর একটি কবিতা—

তোমার হাঁটু তোমার স্তন, তোমার কোমর

আগুনপোড়া মাটির শূন্য গহ্বরের মধ্যে

আমি হাতড়ে বেড়াই, পাই না—তাদের আকার

মিলিয়ে গেছে

একত্রে আমরা একক নদীর মতো সম্পূর্ণ

এক কণা বালুর কণিকার মতো।

আমি তার কাছে ফিরে যেতে চাচ্ছি। আমি এখন উদ্বিগ্ন, আমি তার পাশেই থাকতে চাই। ইউরোপে আসার আগে আমি পাবলোর সন্তান ঠিকভাবে ধারণ করতে পারিনি, নষ্ট হয়ে গেছে। তখন আমার তিন মাসের গর্ভাবস্থা। আমি নিজের যত্ন নিইনি, সে জন্য পাবলো আমাকে অভিযুক্ত করেছে।

মাতিলদে লিখছেন : আমাদের এ অবৈধ সম্পর্কের দুষ্কর্মে দুজনের সহযোগিতা আমাদের ভালোবাসা আরো আবেগময় করে গড়ে তুলতে থাকে। আমরা শুধু একসঙ্গে থাকতে চেয়েছি, পরস্পরকে স্পর্শ করতে চেয়েছি। এ কামনা আমাদের গিলে খাচ্ছে। এ তাড়না আমাদের মধ্যে এমন একটি বিশ্বাস সৃষ্টি করল যে আমরা আর কখনো পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করতে পারব না। এই প্রথম আমি যন্ত্রণা অনুভব করতে শুরু করলাম। আমি জানি আমাদের সম্পর্কটি কেবল ‘মজা করো’ ধরনের প্রেম—সম্পর্ক নয়, আমি বুঝতে পারছি এ সম্পর্ক আমাকে কেবল বিশুদ্ধ আনন্দই দেবে না, তিক্ততাও দেবে। সেই যন্ত্রণার কথা ভেবে আমি আতঙ্কিত হই এবং সক্ষমতা থাকতে থাকতে আমি পালিয়ে যেতে চাই। হতবুদ্ধি করা এসব চিন্তা আমার মনে এফোঁড়-ওফোঁড় করতে থাকে, আমি একসঙ্গে লাখো বিষয় ভাবতে শুরু করি। আমি ঠিক তখনই মেক্সিকোর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে চাই। আমার জীবনের ও কাজের প্রতিরক্ষাব্যূহের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকব। যে ভালোবাসা আমাকে এত সুখ এনে দিয়েছে, তা বিস্মৃত হতে আমি প্রলুব্ধ হব।

শেষ পর্যন্ত আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। স্বপ্নে দেখলাম মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা ঘন মূলের একটি অরণ্যের ভেতর দিয়ে আমি হাঁটছি; পায়ের তলায় পিছলে মাটি। হাজার হাজার ছোট বৃক্ষ, বহুবর্ণের ছোট্ট ফুলগুলো পুষ্ট পাতাসহ আমার সামনে উপস্থিত, আমি ফুল তোলার জন্য মাথা নুইয়ে আনি, কিন্তু ফুল যেন আমার কাছ থেকে সরে যাবে, আমাকে আরো দূরে পৌঁছতে হবে। হঠাৎ আমি অনুধাবন করি কালো কাদা আমাকে গিলে ফেলছে। ঠিক একই সময় আমি দেখছি দূরে পাবলো বন্ধু নিকোলাস গুইলেনকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি তাদের ডাকলাম, কিন্তু তারা আমার ডাক শুনল না।

কাদা আমাকে ঢেকে ফেলছে। আমি কেবল একটু নড়তে পারছি। কাদা থেকে বেরোতে আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি, কিন্তু পারছি না।

দরজায় একটি টোকা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিল—পাবলো এসেছে। আমি রুষ্ট, বললাম, ‘তুমি আমাকে শান্তিতে ঘুমাতে দেবে না। আমি মাত্র একটি ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখেছি। ’

আমি আমার স্বপ্নের বর্ণনা দিলাম আর সে খুবই বিস্মিত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। বলল, ‘তুমি যখন ঘুমাচ্ছিলে, নিকোলাসের সঙ্গে আমি সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম, সেই সৈকত কালো কাদায় পূর্ণ। যখন আমি নিকোলাসকে বলছিলাম যে তুমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছ। কাদায় আমার পা আটকে গিয়েছিল। ’

আমার মনে আছে, সেই বিকেলটা ছিল সুন্দর। আমি জুতা খুললাম, ঢেউ এসে আমার পায়ের পাতার সঙ্গে খেলতে লাগল। বিচলিত অবস্থার কারণে আমার মাথায় চিন্তার ছোটাছুটিতে আমি দ্রুত হাঁটি। শিগগির সূর্য অস্ত যেতে শুরু করে, সন্ধ্যার বেগুনি বর্ণের আভা আমার যন্ত্রণাকাতর আত্মাকে শান্ত করল। এই প্রেমকে আমার শিকলবন্দি করতে হবে, আমার যা-ই হোক, এর টুঁটি চেপে ধরতে হবে। আমি হাজারবার নিজেকে বললাম, আমাকে অদৃশ্য হয়ে পড়তে হবে।

আরো একবার পাবলোর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে যাচ্ছেন মাতিলদে। কেমন সেই অনুভূতি :

আমরা নিঃশব্দে একত্রে দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর পরস্পরকে চুমো খেতে শুরু করলাম। আমরা ভীষণ আবেগাক্রান্ত। পাবলো বলল, ‘বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। ’

যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে চাইলাম। কিন্তু আমার ফোঁপানোর শব্দ বেরিয়ে এলো, কিন্তু তা এত সশব্দ, গভীর ও অনিয়ন্ত্রিত ছিল যে পাবলোর পরের কথাগুলো চাপা পড়ে যায়।

আমি তার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে বের করে নিই, তারপর দৌড়ে ছুটতে থাকি। আমি রাস্তার শেষ প্রান্তে না পৌঁছা পর্যন্ত দৌড়াতে থাকি। তারপর ফিরে তাকাই। দূরে পাবলো দাঁড়িয়ে, সেই একই জায়গায়, কালো বিন্দুর মতো পড়ে আছে, তার দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে গেছে। আমি বিধ্বস্ত হয়ে গেছি। নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয় এমন কিছু একটা আমার ভেতর মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা আমাকে এক শ্বাসরুদ্ধকর হুমকি দিচ্ছে।

আমি হাতে ধরে আছি পাবলোর চিঠি। আমি ট্রেনে ওঠার আগে এ চিঠি খুলব না—আমি ভাবতে থাকি পাবলো কী লিখেছে!

খামটি খোলার প্রলোভন এড়াতে আমি এটি আমার স্যুটকেসে লুকিয়ে রাখি। নিশ্চয়ই এটি শেষবিদায়। আমি ভীষণ নিঃসঙ্গ বোধ করলাম।

আমার কী করা উচিত? কোথায় আমি আমার শান্তির অনুভব খুঁজে পাব? এটি সত্য, আমি পাবলোকে ছেড়ে চলে যেতে চাচ্ছি।

আমি আমার পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ করে নিজেকে কাঁদতে সুযোগ করে দিলাম। আমি কাঁদতে থাকলাম, সব কিছুর জন্য এ কান্না—আমার শূন্য জীবনের জন্য, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ত্যাগ করার জন্য, পাবলোর প্রতি আমার ভালোবাসার জন্য। আমার নিঃসঙ্গতার জন্য কাঁদলাম—অপরিপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার জন্য, জীবন আমার কাছে যে ভালোবাসা এনে দিয়েছে, তাতে নিবেদিত থাকতে আমার ব্যর্থতার জন্য। আমি কেঁদেই চলেছি।

আমি কাঁদলাম, কারণ কঠিন পরিশ্রম ও আত্মোৎসর্গের একটি জীবনে আমার জন্ম। আমি কী চাই তা-ও জানি না, কাঁদি সে জন্য। আমি কাঁদি আমার হিসাবি মন আমার অন্তরের আকাঙ্ক্ষাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে, আমি পাবলোর জন্য কাঁদি। সব কিছুর ওপরে আমার এ কান্না পাবলোর জন্যই। আমি তো জানি পাবলো আমাকে কতটা ভালোবাসে, সে মুহূর্তে আমি তো তাকে সুখী করতে জীবন দিতেও তৈরি ছিলাম।

আরো একবার, এবার বিদায় নেবেন পাবলো নেরুদা স্বয়ং, আর ফিরবেন না। মাতিলদে লিখছেন : পাবলো সমাহিত হলো, তার কবর ঢেকে দেওয়া হলো ফুলে ফুলে। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ফুল সাজাই, সবচেয়ে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত রঙের ফুল আমি বাছাই করি। যেগুলো শিগগিরই নুয়ে পড়বে না, আমার পছন্দ সেগুলো। আমি ওখানে থেকে যাই, ধীরে ধীরে সবই একটু একটু করতে থাকি, যেন আমি কখনো এই স্থানটি ছেড়ে যাব না। এটিই হবে আমার সবচেয়ে বড় বিচ্ছেদ। আমি ভেতরে ভেতরে তীব্র মনঃকষ্ট পেতে থাকি। আমি তাকে এই অতিথিপরায়ণ নয়, এমন একটি কবরে রেখে যাব।

আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে থাকি, পাবলোকে কেন এখানে এনেছি।

পাবলোর বন্ধু চিলির প্রেসিডেন্ট আয়েন্দে সামরিক ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছেন। শুরু হয়েছে অগুস্তো পিনোশের দুঃশাসন। অল্পদিনের ব্যবধানে মৃত্যু, ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ চলে গেলেন পাবলো নিজেও। বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ কবিকে সমাহিত করছেন তাঁর চন্দ্র সাক্ষী করে বিয়ে করা স্ত্রী মাতিলদে নিজেই। এমন দৃশ্য পৃথিবীতে বিরল।