kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

কবি আবুল হোসেনের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

‘রবীন্দ্রনাথ আমার লেখার প্রতিবাদ করে একটি প্রবন্ধ লেখেন’

চল্লিশের দশকের অন্যতম কবি আবুল হোসেন (১৫ আগস্ট ১৯২২-২৯ জুন ২০১৪)। ১৯৪০ সালে তাঁর প্রথম বই ‘নববসন্ত’ বের হয়। ‘ঘোড়সওয়ার’, ‘ডি. এইচ. রেলওয়ে’, ‘বাংলার মেয়ে’ প্রভৃতি কবিতা তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। ২০১৩ সালের ১৮ জুন কবির ধানমণ্ডির বাড়ি সাহানায় তাঁর অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কবি শ্যামল নাথ

১২ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘রবীন্দ্রনাথ আমার লেখার প্রতিবাদ করে একটি প্রবন্ধ লেখেন’

বাসভবন সাহানায় আলাপরত কবির সঙ্গে শ্যামল। ছবি : মারুফ আহমেদ

শ্যামল নাথ : কেন কবি হতে গেলেন? কবি পরিচয়ে কেমন বোধ করেন?

আবুল হোসেন : ঘটনাক্রমে একদিন একটা কবিতা লিখে ফেলি। লিখতে খুব ভালো লাগল। সেই থেকে ইচ্ছা হলেই লিখতে বসতাম। এই করে শুরু।

বিজ্ঞাপন

নিজের খুশিটা প্রকাশ করতে চেয়েছি। সব মানুষের একটা স্বাভাবিক প্রবণতা থাকে। সে কী হবে, কী করবে, তা নির্ভর করে সেই প্রবণতার ওপর। প্রবণতাটা আমি খুব কম বয়সেই ধরতে পেরেছিলাম। বুঝেছিলাম কবিতা লেখাই আমার কাজ।

শ্যামল : কবিতায় দশক বিভাজনকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

আবুল হোসেন : কবিতায় দশকওয়ারি মূল্যায়ন আমার মনে হয় বাড়াবাড়ি। দশক ধরে কবিতার ধারা বদলায় না। নতুন কবির নাম দেখা যায় হয়তো, কিন্তু নতুন কবিতা হয় না। কবিতায় মোড় নিতে অনেক সময় লাগে। সে পরিবর্তন কখনো কয়েক বছরে হতে পারে। কখনো ৫০ বছরেও না ঘটতে পারে। কবিতার পরিবর্তন আসে সাধারণত দুই দিক থেকে। একটি বিষয়, অন্যটি আঙ্গিক। এই দুটি বিষয়ের যেকোনো একটি যখন পরিবর্তিত হয়, নতুন রূপ নেয়, তখন তাকে সহজেই ভিন্নভাবে চিহ্নিত করা যায়। ছন্দ, মিল, শব্দ ব্যবহার, বাকভঙ্গি প্রভৃতি অবলম্বন করে। যেমন—বৈষ্ণব কবিতার যুগ, রবীন্দ্রনাথের যুগ, মাইকেলের যুগ, আধুনিক বাংলা কবিতা। এখানে পরিবর্তনের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট। সব ভালো কবির কণ্ঠই ভিন্ন। কণ্ঠস্বর দিয়েই তো কবিকে চেনা যায়। সে স্বর যখন তাঁর একান্ত নিজস্ব হয়, তখনই তিনি কবি হয়ে ওঠেন। এটি দশক অনুযায়ী ঘটে না।

শ্যামল : সাতচল্লিশ সালে দেশভাগ হলো। এর ফলে একটি রাজনৈতিক শক্তি ক্রিয়াশীল ছিল। অনেকের লেখায় এর প্রভাব বিদ্যমান ছিল, কিন্তু আপনি কিভাবে লেখায় বা কবিতায় আধুনিক ধারা রক্ষা করেছেন?

আবুল হোসেন : আমার কবিতায় যদিও রাজনৈতিক ছোঁয়াচ ছিল, তবু আমি কোনো দলে ঢুকিনি। দলে ঢুকে পড়লে লেখক তার নিজস্বতা হারায়, তাকে বেশ কিছু মূল্য দিতে হয়। আমি চিরকালই নির্ভেজাল বাঙালিয়ানার অনুরাগী। এ দেশের ঐতিহ্যই আমার উত্তরাধিকার। এই কথাটি কখনো ভুলিনি।   ভাষার ক্ষেত্রে চলতি ভাষাই আদর্শ হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম অনেক আগে। দেশভাগের ফলে আমাকে কিছুই বদলাতে হয়নি। আমি আমার মতোই লিখে গেছি। লেখার ব্যাপারে জীবনে কখনো আপস করিনি।

শ্যামল : আপনার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘বিরস সংলাপ’ বের হয় ১৯৬৯ সালে, কিন্তু ১৯৪০-এর পর মনে হয় অনেক সময় পার করে দিলেন এই বই করতে; তবে ওই বই বের হতে নাকি শামসুর রাহমানের অবদান ছিল?

আবুল হোসেন : কবিতা লেখা আমি বন্ধ করিনি। ছেপেছি কম। বেশির ভাগই ফেলে দিয়েছি। ছাপা কবিতার কপি রাখিনি। আইয়ুবের সংস্পর্শে এসে মনে হলো যে সব লেখাই ছাপার যোগ্য নয়। দেখলাম আবু সয়ীদ আইয়ুব তাঁর কোনো লেখায় সন্তুষ্ট নন। অথচ তাঁর লেখা নিয়ে ব্যাপক হইচই পড়ে যেত। হ্যাঁ, দ্বিতীয় বইটি যে বের হলো, এতে শামসুর রাহমানের অবদান ছিল। একটি খাতার বেশ কিছু কবিতা নিজের হাতে লিখে দিয়েছিল।

শ্যামল : আপনার ‘হাওয়া, তোমার কি দুঃসাহস’ কাব্যগ্রন্থে একটি কবিতা আছে কলকাতা শহরকে নিয়ে। আপনি কলকাতায় ছিলেন। এই কবিতাটির প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যদি কিছু মনে করতে পারেন। ওই সময়ে নাকি আপনি প্রথম প্রেমে পড়েন বলে কথিত আছে।

আবুল হোসেন : আমি তো কলকাতায় ছিলাম। প্রেমেও পড়েছিলাম (হেসে উঠলেন)। অনেক স্মৃতি ওই শহরকে ঘিরে। রবীন্দ্রনাথকে তো ওখানেই পাই। ওটা ভুলে যাই কী করে। তাই অনেক দিনের স্মৃতিকে কবিতায় রূপ দিলাম।

শ্যামল : আপনি ওই কবিতায় লিখেছেন, ‘সেই সব লাল নীল খামেমোড়া দিন রাত, চিঠি দেয়া (রবিঠাকুরের কাছে ঋণ)। ’ কিন্তু এর পরেই লিখলেন, ‘আজ সারাদিন আমি মাতালের মতো হেঁটেছি, বসেছি রাস্তায়, গঙ্গার ধারে, মাঠে একা, শুনতে চেয়েছি শাড়ির খসখস, চুড়ির রিমিকি ঝিমিকি, চুলের অবশ গন্ধ। ’ তাহলে কি ওই কবিতায় শুধু রবিঠাকুরের কাছে ঋণ নয়, হারানো ভালোবাসার কাছেও ঋণী হয়ে রইলেন?

আবুল হোসেন : শ্যামল, তুমি ধরতে পেরেছ। জীবনে মানুষ সব পায় না। ভালোবাসা তো  হারাইনি। মানুষটিকে হারিয়েছি। পরিবার মেনে নেবে না বলে তো আর পালিয়ে বিয়ে করিনি। আমরা দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি বিয়ে করব না। কিন্তু সাহানাকে বিয়ে করার পরও তাকে ভুলে যাইনি। আর রবীন্দ্রনাথের কাছে তো ঋণী। তাঁকে কত পড়েছি, জেনেছি। সে স্মৃতি, সে যৌবন তো আর ফিরে আসবে না।  

শ্যামল : জীবনের ভালোবাসার কথা বললেন; তবে আপনার লেখা ‘ডি. এইচ. রেলওয়ে’ কবিতার মতো কবিতা বাংলা ভাষায় আর একটিও নেই, রশীদ করিম লিখেছেন। ওই কবিতার ভালোবাসায় নাকি অনেকেই পড়েছিলেন। আপনার কী মনে হয়?

আবুল হোসেন : রশীদ করিম আবেগপ্রবণ লেখক নন। উনি যখন কথাটি বলেছেন, ভেবেচিন্তেই বলেছেন। হয়তো বলতে চেয়েছেন এ ধরনের এত ভালো কবিতা বাংলায় তিনি আর একটিও পড়েননি। শুধু রশীদ করিম নন, আবদুল মান্নান সৈয়দ ছাড়াও আরো অনেকেরই ভালো লেগেছে এই কবিতাটি।

শ্যামল : এ রকম লেখার পেছনে নিশ্চয়ই বই পড়ার প্রতি একটা আগ্রহ ছিল আপনার। সে  সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন।

আবুল হোসেন : ছোটবেলা থেকেই আমি বই পড়ার আগ্রহ অনুভব করতাম। বই পড়ার জন্য একটা তৃষ্ণা এবং আনন্দ অনুভব করতাম। নিয়মিত বই পড়া শুরু করি স্কুলে থাকতে। এখন তো আর সব মনে পড়ছে না। তবে ক্লাস থ্রি কি ফোরে থাকতেই ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘বিষাদ সিন্ধু’ পড়ে ফেলি।

শ্যামল : আপনি এত সব বইয়ের কথা বললেন, কিন্তু স্কুলে পড়া অবস্থায় নাকি আপনার বই পড়ার প্রতি আগ্রহটা আরো বেড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ পড়ার পর।

আবুল হোসেন : হ্যাঁ, তা তো অবশই। যত দূর মনে পড়ে, যখন আমি ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে উঠলাম, তখন আমি পুরস্কার হিসেবে একসঙ্গে পেয়েছিলাম অনেকগুলো বই। ওখানে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ ছিল। ওটা পড়ে ভীষণ মুগ্ধ হই। বারবার ভাবতে থাকি এবং পড়তে থাকি যে রবীন্দ্রনাথের মতো লেখা যায় না। এটাই আমার লেখার মূল প্রেরণা। এরপর তো রবীন্দ্রনাথের কবিতায় আকণ্ঠ ডুবে গেলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ধাঁচের কবিতা লিখতে শুরু করি। আমি একা নই, সবাই। রবীন্দ্রনাথ এত বড় প্রতিভাবান ছিলেন, যে যা-ই লিখেছে তার ওপর রবীন্দ্র প্রভাব পড়েছে।

শ্যামল : পরে তো সবাই রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এটাকে কিভাবে দেখেন?

আবুল হোসেন : তিরিশের কবিদের প্রথম কাজ ছিল বিদ্রোহ, রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। রবীন্দ্রনাথকে ছাড়িয়ে যাওয়া। রবীন্দ্রনাথকে তো আর ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না।

শ্যামল : ওই সময়ে শুধু দুজন কবি এসেছিলেন, নজরুল ইসলাম ও জীবনানন্দ দাশ। তাঁরা কবিতায় একেবারে নতুন একটা স্বাদ নিয়ে এলেন। আপনার প্রথম বইয়ে তো রবীন্দ্রনাথের ধারা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ওই বই প্রকাশের কোনো স্মৃতি যদি মনে পড়ে?

আবুল হোসেন : তা করেছি। সফলও হয়েছি বলা যায়। কারণ প্রথম বই ‘নববসন্ত’ প্রকাশের ক্ষেত্রে আমি অনেক সৌভাগ্যবান। হাবীবুল্লাহ বাহার বুলবুল এর সম্পাদক। উনি প্রথম আমাকে বই ছাপার প্রস্তাব দেন। তখন বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত ও অমিয় চক্রবর্তী নিজেরাই পয়সা খরচ করে কবিতার বই ছেপেছিলেন।

শ্যামল : আপনি তো রবীন্দ্রনাথের গদ্য কবিতার পক্ষে তাঁর যুক্তির সমালোচনা করলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবার গদ্য কবিতা লিখলেন। আসলে বিষয়টি কী?

আবুল হোসেন : আমি প্রথমে এর বিরুদ্ধে দুটি প্রবন্ধ লিখি। একটি রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়ে। তিনি (রবীন্দ্রনাথ) আমার লেখা প্রবন্ধের প্রতিবাদ করে একটি প্রবন্ধ লেখেন। মানুষকে তো আর, লেখকে বা কবিকে প্রত্যেক সময়ে এক জায়গায় পড়ে থাকলে চলে না। তাই পরবর্তী সময়ে আমার চিন্তা ও লেখায় পরিবর্তন আনলাম।

শ্যামল : আপনি নাকি সমর সেনের গদ্য কবিতা দ্বারা আকৃষ্ট হলেন?

আবুল হোসেন : তা তো বটেই। সমর সেনই গদ্য কবিতাকে তার আসল রূপ দিল। আমি তার কাছেই পেলাম ভিন্ন ধরনের কবিতা লেখার চাবিকাঠি। কবিতার ভাষাকে গদ্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। আর আমার ‘বাংলার মেয়ে’ কবিতায় তার ছাপ রয়েছে। ওই কবিতা সম্পর্কে আবদুল কাদির বলেছেন, তাঁর নিজের ধারণা, ‘বাংলার মেয়ে’র মতো একটি কবিতা লিখে কেউ যদি লোকান্তরিত হন, তিনি সাহিত্য অমরতার দাবি রাখেন।

শ্যামল : আপনি গদ্য কবিতার কথা বললেন, কিন্তু আপনার কাছে জানতে চাই অগ্রজ ও সমসাময়িক কার গদ্য আপনি ভালো বলবেন?

আবুল হোসেন : অবশ্যই বুদ্ধদেব বসু। কবিরা আর কেউ তেমন ভালো গদ্য লিখলেন না। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু অসাধারণ গদ্য লিখলেন। আরো একটি ভালো বই আছে, সেটি হলো ‘হুমায়ুন কবিরের বাংলা কাব্য’।

শ্যামল : জ্যেষ্ঠতম কবি হিসেবে পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্য আপনার পরামর্শ।

আবুল হোসেন : কেউ যদি কবি হতে চায় পড়তে হবে। জানতে হবে পুরো বাংলা কবিতার ইতিহাস।