kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

আবদুল গাফফার চৌধুরীর গল্প

চেহারা

সাংবাদিক, কলাম লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী (১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪-১৯ মে ২০২২) আমাদের কাছে পরিচিত ভাষা আন্দোলনের স্মরণীয় গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র রচয়িতা হিসেবে। কিন্তু তিনি লিখেছেন অনেক গল্প-উপন্যাসও। পেয়েছেন ইউনেসকো (১৯৬৩), বাংলা একাডেমি (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা পদক ২০০৯সহ অসংখ্য পুরস্কার। ‘চেহারা’ গল্পটি তাঁর ‘সম্রাটের ছবি’ গল্পগ্রন্থ থেকে নেওয়া। তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কালের কণ্ঠের পাঠকদের জন্য গল্পটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো।

২৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



চেহারা

অঙ্কন : মাসুম

—রাত কত হলো, দেখেছেন?

—হুঁ, সোয়া ১০টা।

—স্টিমারের আলো দেখা যাচ্ছে নাকি?

মৃদু হাসলাম, আজ আর সে আশা করবেন না।

—হুম! বিরক্ত হয়ে ডাক্তার চৌধুরী হাতের খবরের কাগজটা ছুড়ে ফেলে দিলেন। মোটা ফ্রেমের চশমাটা ফের চোখে পরে নিলেন।

বিজ্ঞাপন

তারপর ইজি চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দায় চলে গেলেন, হয়তো পায়চারি করতে।

সত্যি, এ রকম দেরি সচরাচর হয় না। কুমিল্লা থেকে ট্রেনটা চাঁদপুর এসে পৌঁছেছে বিকেল ৫টার আগে। আর এখন রাত ১০টা। বরিশাল এক্সপ্রেসের দেখা নেই। যদ্দুর জানি, সন্ধের মধ্যে এসে যাওয়ার কথা। আর তারই অপেক্ষায় এত রাত পর্যন্ত গুটিকয় যাত্রীর উদ্বেগের অন্ত নেই। কী হলো আজ স্টিমারের? আকাশে মেঘ, বাদল, বাতাসের তো চিহ্নমাত্র নেই। ওয়েটিং রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে কয়েকবারই আকাশ আর নদীর দিকে তাকিয়েছি। সেই অন্ধকার আর নদীর তরঙ্গ-ভঙ্গের মৃদু সুর। তারই মাঝে এপারে জেটির আর ওপারে পুরনো শহরের আলোতে নদীর বুকে ম্লান প্রতিভাস।

বারান্দা থেকে ডাক্তার চৌধুরীর গলা ভেসে এলো, ইয়ং ম্যান, এ রকম বসে থাকতে আপনার ভালো লাগে? কী পড়ছেন?

—আগাথা ক্রিস্টি।

—ক্রাইম নভেল?

—হুঁ।

ডাক্তার চৌধুরী এগিয়ে এলেন, কী ভাপসা গরম পড়েছে, দেখেছেন? বই রাখুন, চলুন রেলওয়ের ওভারব্রিজটা একটু ঘুরে আসি।

ঘণ্টা কয়েকের স্বল্প পরিচয় হলেও ‘না’ বলার মতো মনের জোর পেলাম না। অগত্যা উঠতে হলো। বললাম, চলুন।

বাইরে সেই আলো-আঁধারের খেলা, নদীর তরঙ্গ-ভঙ্গের আর্তি, গুটিকয় নক্ষত্রের স্তিমিত আলোকে আকাশপথের চির পুরনো ইশারা।

ওয়েটিং রুমের দুঃসহ গরম নেই ব্রিজে। নদীর হাওয়া যেন পাগল হয়ে বইছে এখানে। ডাক্তার চৌধুরী তাঁর লংকোটের সব কটা বোতাম খুলে দিলেন। পুরনো কথার জের টেনে বললেন, ক্রাইম নভেল পড়ছেন। দেশে কিভাবে ক্রাইম বেড়ে যাচ্ছে, দেখছেন? আজও তিনটা তরুণী হরণের মামলার খবর আছে কাগজে।

কথা প্রসঙ্গে কথা বলা। গুরুত্ব না দিয়ে বললাম, দেশে শিক্ষার অভাবও কম নয়, তাই এসব হচ্ছে।

—বটে, তাই নাকি! হঠাৎ কৌতুক যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল ডাক্তার চৌধুরীর কণ্ঠে। এ কণ্ঠ আমার কাছে নতুন। ট্রেনে সহযাত্রী হিসেবেই তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ। পরিচয়ে জেনেছিলাম নাম ডক্টর মঈনুদ্দিন চৌধুরী,

মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাবিদ। পেশার সঙ্গে চেহারার এবং চেহারার সঙ্গে চরিত্রের মিল ছিল। অর্থাৎ সৌম্য, গম্ভীর পুরুষ। এ কণ্ঠে কৌতুক অশ্রুত-পূর্ব। তর্ক করার ইচ্ছে হলো না। চুপ করে রইলাম। ডাক্তার চৌধুরীও কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, জেটির টিকিট কালেক্টরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। সে বলল, আমাদের থ্রু-টিকিট নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত।

: তাহলে?

: বরিশাল এক্সপ্রেসে যাওয়া হবে না। গোয়ালন্দ মেইলে নারায়ণগঞ্জে পৌঁছে তারপর ঢাকায় যেতে হবে। ওই মেইল আসবে দুপুর রাতের পর। আসুন, ততক্ষণ আপনাকে একটা গল্প বলি।

দুজনেই ব্রিজের উন্মুক্ত স্থানে এসে দাঁড়ালাম। ডাক্তার চৌধুরী রেলিং চেপে বসলেন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন দূরে। হয়তো ওপারে মসজিদের মিনার ঘরের আলোকের দিকে। মৃদু হেসে শুরু করলেন, কয়েক বছর আগের কথা। মফস্বল শহর আর ভালো লাগছিল না বলে সবে ঢাকায় এসে প্র্যাকটিস শুরু করেছি। বেশিদিন কাটেনি। একদিন এক প্রৌঢ় রোগী এলেন। নাম বললেন, ধরুন আশরাফ খান। দেখেই বুঝলাম, বেশ ধনী লোক। পরনে ওল্ড প্যাটার্নের স্যুট, চোখে রিমলেস চশমা। রাশভারি গোছের লোক।

কিন্তু পেশেন্ট চেম্বারে ঢুকেই তিনি একেবারে শিশুর মতো অসহায় কণ্ঠে বললেন, দেখুন, রোগী আমি নই। একটা জটিল কেসে আপনার কাছে এসেছি।

মুহূর্তে মনটা বিরূপ হয়ে উঠল। কী ধরনের জটিল কেসে বড়লোকেরা জড়িত হয়ে থাকেন, তা আমার অজানা থাকার কথা নয়। তাই বিরক্তি চেপে বললাম, ভুল করে এখানে আসেননি তো আবার! এটা মেন্টাল...

আশরাফ খান আমাকে কথা শেষ করতে দিলেন না। দ্রুত বলে উঠলেন, না না, ভুল করে আসিনি। আর আপনি যা ভাবছেন, তা-ও নয়।

—বেশ তো, রোগী কোথায়?

—রোগী নয়, রোগিণী। আপনাকে ময়মনসিংহ যেতে হবে। আশরাফ খান আমার হাত চেপে ধরলেন। যেতেই হবে আপনাকে। টাকার জন্য ভাববেন না।

রোগের বিবরণ প্রাঞ্জল। মেয়ে শাহানার বয়স পনেরো কি ষোলো। ছোটবেলা থেকে স্বাস্থ্য ভালো, প্রাণপূর্ণা। কিন্তু ইদানীং কী যেন হয়েছে? ঘুমের ঘোরে ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে বিমনা হয়ে যায়। কখনো জেগে থেকেই মনের অব্যক্ত কোনো ভয়ে বা ঘৃণায় কাঁপতে থাকে, চিৎকার করে। বাপ-মা ভারি বিপদে পড়েছেন। রাজি হতে হলো আমাকে।

—ময়মনসিংহে কখনো গিয়েছেন? ডাক্তার চৌধুরী হঠাৎ তাঁর পুরু লেন্সের চশমার ভেতর থেকে সপ্রশ্ন চোখে তাকালেন।

কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, পরদিনই রওনা হলাম সকাল ৬টার ট্রেনে। ঘাস থেকে তখনো শিশিরকণা শুকায়নি। আকাশে রোদের তাপ নেই। ক্রমে বেলা বাড়ল। ভাওয়ালগড়ের শালবন পাড়ি দিয়ে ট্রেন ছুটল। বহুদিন রোগী ঘেঁটে ঘেঁটে ভুলেই গিয়েছিলাম, রোগশোকের বাইরেও এক অনাময় পৃথিবী আছে, মানুষ যেখানে বিষয়-বিমনা, চোখ তৃষ্ণার্ত, মন পাখির ডানা। ইচ্ছে হচ্ছিল গান গাই, ‘তার অন্ত নাই গো যে আনন্দে গড়া আমার অঙ্গ’।

আশরাফ খানের দিকে তাকালাম। তিনি আমার পাশে তেমনি বসে। হৃদয়ের কোনো স্বাভাবিক উত্তাপ নেই তাঁর চোখেমুখে। কী হলো তাঁর?

জবাব পেলাম ময়মনসিংহে গিয়ে। সত্যি, শাহানা মেয়েটি সুন্দরী। পাথরে কুঁদে গড়া শরীর যেন। অথচ মনে হয়, ছুঁলে এখনই মোমের মতো গলে যাবে। যেমন ঘন চুলের বুনুনি, তেমনি আশ্চর্য নীল চোখ। দুই টানা ভুরুর নিচে আয়ত চোখ দুটিতে যেন সমুদ্রের মায়া জড়ানো। ডাক্তারি মন নিয়েও মুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু সে মোহ হোঁচট খেল আকস্মিক প্রচণ্ড আঘাতে।

আশরাফ খানকে একান্তে ডেকে নিয়ে সোজাসুজি বললাম, ব্যাপারটা কদ্দিন আগে ঘটেছে?

তিনি ভেজা গলায় বললেন, বেশ কিছুদিন আগে।

—কোথায়?

—বাইরে বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেখানে। আমাদেরই ভুল হয়েছিল ওকে সেদিন একা ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু সেই একদিনের ভুলেই এমন একটা কাণ্ড ঘটবে, ভাবতে পারিনি। অচেনা-অজানা জায়গা, রিকশায় করে একা শানু বাসায় ফিরছিল। তখন সন্ধে। বিজন পক্ষে একা পেয়ে কারা জোর করে নিয়ে গিয়েছিল।

আশরাফ খান কেঁদে ফেললেন। দুই হাতে আমার হাত চেপে ধরে বললেন, তারপর পুলিশেও আর ব্যাপারটা জানাইনি। আজ পর্যন্ত এ বংশের সুনামে এতটকু কালি পড়েনি, কারো মাথা নত হয়নি। তাই আমাদের ফ্যামিলি-ফিজিশিয়ান ছাড়া ব্যাপারটা কেউ জানে না। তিনিই এদ্দিন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করেছেন। তারপর গিয়েছি আপনার কাছে। আপনার ওপর আজ শুধু ওর নয়, এত বড় একটা বংশের মান-ইজ্জত নির্ভর করছে। বলুন, রাখবেন?

তার হাতের মুঠোয় তখনো আমার হাত বন্দি। বললাম, আপনি নিশ্চিত হোন, আমিও মানুষ।

ঢাকায় এনে কিছুদিনের চিকিৎসায়ই শাহানা সুস্থ হলো। আশরাফ খানকে বললাম, এবার ওর মনটাকে একটু রেস্ট নিতে দিন। অতীতের ব্যাপারটা যেন বড় হয়ে দেখা দিয়ে মনে প্রতিক্রিয়া ঘটাতে না পারে, সেদিকে লক্ষ রাখবেন। এবার আমার ছুটি।

কৃতজ্ঞতায় তাঁর চোখে পানি এলো। বললেন, আপনার কাছে চিরদিনের জন্য বাঁধা হয়ে রইলাম। ওর মনটা একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠলেই তাড়াতাড়ি বিয়ের কথাবার্তা সেরে ফেলব। একমাত্র মেয়ে, ইচ্ছে ছিল দেখেশুনেই বিয়ে দেব। তা যখন কপালে নেই।

এতক্ষণে ডাক্তার চৌধুরী একটা সিগারেট ধরালেন এবং কেসটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন...

তারপর বহুদিন আর ওদের খোঁজখবর পাইনি। কাজের চাপে ভুলেই গিয়েছিলাম প্রায়। একদিন আশরাফ খান এসে হাজির। হাতে রঙিন দাওয়াতপত্র। বললেন, শানুর বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে। মেয়ের খুঁত রয়েছে। ভেবেছিলাম সাত তাড়াতাড়ি ভালো পাত্র পাব না। কিন্তু আমার ধারণা ভুল হয়েছে। ছেলের নাম মুশতাক, এমএ পাস! বেশ সুশ্রী, ভদ্র। আমাদের বংশের নামডাকে ওরাও ততটা দেখাশোনা, খোঁজখবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তাই তাড়াতাড়িই কাজটা হয়ে যাচ্ছে।

ঠিক সেই আগের মতো আমার হাত চেপে ধরে সানুনয় কণ্ঠে তিনি বললেন, আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে ডক্টর চৌধুরী।

হঠাৎ রাজি হয়ে গেলাম। হয়তো শাহানাকে আরেকবার দেখার ইচ্ছে অলক্ষ্যে আমার মনে সঞ্চারিত হয়েছিল।

বিয়ের দিন ট্রেন ফেল করে একটু দেরি করে পৌঁছলাম। তখন বিয়ে শেষ হয়ে গেছে। ভেতরে বর-কনের শা’নজর হচ্ছে। শাহানার জন্য আনা উপহারের মধ্যে শখ করে এনেছিলাম একগোছা ফুলের তোড়া। ইচ্ছে ছিল নববধূবেশে সজ্জিতা শাহানার হাতে নিজে তুলে দেব। তাই সেটা হাতে নিয়ে বারান্দায় পায়চারি করছিলাম। সারা বাড়ি উৎসবমুখর। বিচিত্র বর্ণের আলোর সমারোহ। মিলিত কণ্ঠের কলগুঞ্জনে বারবার নিজের চিন্তা হারিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ আশরাফ খান ছুটে এলেন। ঘরের আর সবার উপস্থিতি যেন তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেছে। সোজা আমার কাছে এসে হাত চেপে ধরলেন। সেই রঙিন বর্ণ-সমারোহেও বোঝা গেল তার মুখ বিবর্ণ। প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে অস্ফুট কণ্ঠে তিনি বললেন, ডক্টর চৌধুরী, শানু—শানুর আবার সেই রোগ। আমার ইজ্জত আর রইল না।

আমার সমস্ত স্নায়ু ধরে কে যেন সজোরে নাড়া দিল। মুহূর্তে সচেতন হয়ে বললাম, চলুন তো দেখি।

ভেতরের ঘরে এসে ঢুকলাম। অচেতন শাহানার মাথায় তার মা বাতাস করছেন। আমাকে দেখেই ভিড় সরে গেল। যে মেয়েটি বর-কনেকে পর্দায় ঘিরে আয়নায় পরস্পরকে পরস্পরের মুখ দেখাচ্ছিল, সে-ই একান্তে এসে বিবরণটি দিল :

সবে সে আয়না ধরেছে। এতে ধীরে ধীরে ধরা পড়ছে গৌরবর্ণ বরের সুশ্রী, শান্ত মুখ। শাহানা কি চোখ খোলে! মুখে যৌবন-গরিমা ভরা সলাজ হাসি, তবু সে চোখ খুলবে না। কিন্তু কতক্ষণ আর! একসময় চোখ মেলে আয়নায় সলজ্জ, সন্ধানী দৃষ্টিতে চেয়েছে, তার পরই এই কাণ্ড। হঠাৎ ভয় পাওয়া চিৎকার, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মূর্ছা।

ততক্ষণে শাহানা মূর্ছা ভেঙে প্রকৃতিস্থ হতে শুরু করেছে। বললাম, ভয়ের কিছু নেই, এখনই সেরে উঠবে। ডাক্তারের তেমন প্রয়োজন নেই।

ফেরার পথে তাকালাম সেই সুবেশ, সুশিক্ষিত যুবকের মুখের দিকে।

শাহানার স্বামী। চেহারায় সে কী ভদ্র, মার্জিত বুদ্ধির ছাপ। শুধু মুখে ভয় ও শঙ্কার ছায়া। দুঃখেও হেসেছিলাম।

ডাক্তার চৌধুরী থামলেন। বললেন, গোয়ালন্দ মেইলের আলো দেখা যাচ্ছে। চলুন, হাঁটতে হাঁটতে গল্পের নীতি-কথাটাও আপনাকে বলি।