kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

সাক্ষাৎকার

পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনে সব কিছুই বিকৃত হয়ে যায়

জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ভাষাসংগ্রামী ও নজরুল গবেষক। ভাষা আন্দোলনের দুর্লভ কিছু ছবি তুলেছেন তিনি। অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকও ছিলেন। উত্তরার বাসভবনে একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন লেখক ও নির্মাতা শ্যামল নাথ

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনে সব কিছুই বিকৃত হয়ে যায়

২০১৩ সালের ২৫ জানুয়ারি রফিকুল ইসলামের উত্তরার বাসভবনে

প্রশ্ন : আপনার শৈশব কেমন কেটেছিল, যা আপনাকে এখনো আন্দোলিত করে?

রফিকুল ইসলাম : আমার বাবা ডা. জুলফিকার আলী রেলওয়ের ডাক্তার ছিলেন। তাঁর চাকরি শুরু হয় কলকাতার বি আর সিং হাসপাতালে। এরপর কখনো নলিয়া গ্রাম, কখনো তুদ্যুতনগর, কখনো জামালপুর, লালমনিরহাট জংশনে। লালমনিরহাটে প্রথম স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাই।

বিজ্ঞাপন

তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। বাবার চাকরি আর্মি মেডিক্যাল কোরে পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রশ্ন : ওই সময় আপনার পারিবারিক কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে? তখন তো দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল।

রফিকুল ইসলাম : লালমনিরহাটে ছিল শাহেদপাড়া আর নেটিভপাড়া। হাসপাতাল ছিল শাহেদপাড়ায়।   আমরা শাহেদপাড়ায় থাকতাম। আমাদের বন্ধুরা ছিল অ্যাংলো ইন্ডিয়ান আর ইউরোপিয়ান। তাদের সঙ্গে খেলতাম। তাদের কয়েকজনের নামও মনে আছে যেমন—ম্যালকন ও জয়েস। এরপর বাবা লালমনিরহাট থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় বাবা ’৪৩ থেকে ’৫৫ পর্যন্ত ছিলেন। আমরাও চলে আসি। এরপর তিনি ময়মনসিংহে বদলি হন। ঢাকায় আমরা থাকতাম রমনায়। ঢাকায় যেটা অবাক লেগেছে সেটা হলো, ঢাকায় খুব হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হতো। এটা ১৯২৬ সাল থেকে শুরু। নবাবপুরের পুরো এলাকা ছিল হিন্দু অধ্যুষিত আর ফুলবাড়িয়ার অংশটা ছিল পাকিস্তান অধ্যুষিত। শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজারের দিকে হিন্দুরা থাকত আর নাজিরাবাজার, চক, ইসলামপুরে মুসলমানরা থাকত। ঢাকায় ১৯৪০ সালের দিকে মোটামুটি হিন্দুস্তান-পাকিস্তান হয়ে গিয়েছিল। আমরা পড়তাম বিপদে, থাকতাম রমনায়, পড়তাম সেন্ট গ্রেগরীস স্কুলে। আমরা হেঁটে যেতাম-আসতাম। দাঙ্গা লাগলে স্কুলে যেতে পারতাম না। বাবা আমাদের স্কুল পরিবর্তন করে আরমানিটোলা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। সেখানে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম যে সামনের গেট দিয়ে মুসলমান ছাত্ররা ঢুকছে আর পেছনের গেট দিয়ে হিন্দু ছাত্ররা ঢুকছে। স্কুলে ঠিক ছিল হিন্দু-মুসলমান।  

প্রশ্ন : দেশভাগ দেখলেন, সেই সময়ের স্মৃতির ফ্রেমে বন্দি কথাগুলো শুনতে চাই।

রফিকুল ইসলাম : দেশভাগের পর অনেক হিন্দু ওই পারে চলে গেল। যাঁরা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন তাঁরা কিছু এলেন এ দেশে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকেও এলেন। তাঁদের বেশির ভাগই অবিভক্ত বাংলাদেশ সরকারের কর্মচারী ছিলেন। তাঁদের ছেলেমেয়েরাও চলে এলো। ঢাকা শহরে যে ভাগাভাগি ছিল সেটা উঠে গেল। ওখানকার কলকাতার মুসলমান আর এখানকার হিন্দুদের মধ্যে বাড়ি এক্সচেঞ্জ হলো। তখন অভিজাত এলাকা বলতে ছিল সেগুনবাগান, ওয়ারী ও গেণ্ডারিয়া। ওদিক থেকে প্রচুর বিহারি এলো। তারা রেলওয়ের চাকরি নিয়ে নিল। বিহারিদের জন্য আলাদা কলোনি তৈরি হলো মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও খুলনায়।

প্রশ্ন : আপনি ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরু করেন।  

রফিকুল ইসলাম : হ্যাঁ, আমি ১৯৫১ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৩ সালের ডেমোক্রেটিক ইউনাইটেড ফ্রন্ট, ১৯৫৪ সালে গঠিত যুক্তফ্রন্ট, ১৯৫৪ সালের সাহিত্য সম্মেলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের কিছু ছবি তুলেছিলাম। এ ছাড়া কালো পতাকা উত্তোলন, কালো ব্যাজ ধারণ, খালি পায়ে শহীদদের কবরে গিয়ে ফুল দেওয়া—সব কিছুতেই অংশ নিতাম। তখন শহীদ মিনার ছিল না। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা যে শহীদ মিনার বানায় সেটা ২৬ তারিখে ভেঙে ফেলা হয়েছিল। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা কলেজে শহীদ মিনার তৈরি করা হয়। ১৯৫৩ সালে ব্রিটানিয়া সিনেমা হল ছিল পুরানা পল্টনে, সেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। সেখানেই প্রথম আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানটি পরিবেশন করা হয় আব্দুল লতিফের সুরে। এর প্রতিটির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনটা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। আমি কোনো ছাত্রপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছিলাম না; কিন্তু সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে ছিলাম। সংস্কৃতি সংসদের সঙ্গে ছিলাম।

প্রশ্ন : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আগে যে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই সময়ে আপনার জীবনের অন্যতম কোনো ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাই।

রফিকুল ইসলাম : ঘটনা তো অনেকই আছে। আমতলায় যে সভা, সেখানে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা হয়। প্রথম শহীদ হয়েছিলেন রফিক। তাঁর মাথায় গুলি লাগে। তাঁকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাথার খুলি ফেটেছে, মাথা থেকে ধোঁয়া উড়ছে, মাথার ঘিলু বের হয়ে গেছে। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে একটা বড় ট্র্যাজেডি। আরেকটা হলো, ২৩ ফেব্রুয়ারি যে শহীদ মিনারটি তৈরি করা হলো, ২৪ ফেব্রুয়ারি এটা বাঙালির তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হলো। এই অনুভূতিটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সেই সব ছাত্রকে ধন্যবাদ জানাই যে তাঁরা রাতারাতি শহীদ মিনার তৈরি করে ফেলেছে। তখন ওইখানে একটি পোস্টারে লেখা ছিল যে বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারার যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা। ওই জায়গাটাকে আমরা একটি কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখি। ’৫৩, ’৫৪, ’৫৫ ও ’৫৬, যে পর্যন্ত শহীদ মিনার তৈরি না হয়েছিল, আমরা ২৬ ফেব্রুয়ারি ভেঙে ফেলা ওই শহীদ মিনারেই শ্রদ্ধা জানাতে থাকলাম।

প্রশ্ন : ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা। এরপর জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা। এই বিষয়টাকে আপনি কিভাবে দেখেন?

রফিকুল ইসলাম : এর পেছনে পাকিস্তান জড়িত আর যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল তারা জড়িত। এর একটা কারণ হলো কী, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ আত্মসমর্পণ করেছিল কারা? আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। রাজাকার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেনি কিংবা আলবদর বাহিনীও আত্মসমর্পণ করেনি। এটা তাদের কাজ। না হলে একদিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হচ্ছে আর পাকিস্তান থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টো রেডিওতে কী করে বলছেন, তিনি ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেন। এটা কী করে হয়! একই সময়ে, সকাল বেলায়; তার মানে তিনি এটা জানতেন। এটাই   হচ্ছে ট্র্যাজেডি।

[সংক্ষেপিত]