kalerkantho

রবিবার । ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৫ ডিসেম্বর ২০২১। ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৩

ধারাবাহিক লেখা ৪

কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল

কামাল চৌধুরী

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কবিতার অন্বেষণ, কবিতার কৌশল

কবিতার ভাষা

বাংলা ভাষায় শব্দসংখ্যা আনুমানিক দেড় লাখ। এতে প্রমিত শব্দের পাশাপাশি আঞ্চলিক শব্দ, তৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দ আছে। এর সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাও আছে। কিন্তু কবিতায় সব শব্দ ব্যবহৃত হয় না। সব লেখকের নিজস্ব সক্রিয় শব্দভাণ্ডার থাকে। কবি পছন্দমতো কিছু শব্দ ব্যবহার করেন। ইদানীং কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার শুরু হলেও মূলত প্রমিত বা মান ভাষাই বেশি ব্যবহৃত হয়। কবি কোন ভাষা ব্যবহার করবেন সেটি তাঁর বিবেচ্য। তবে কবি শুধু শব্দচয়ন করেন না, কবি শব্দ নির্মাণও করেন—সব শক্তিমান কবির ভেতর নতুন শব্দ নির্মাণ, শব্দ ভাঙার প্রবণতা থাকে। মধুসূদন দত্তের লেখায় এ উদাহরণ প্রচুর। মোহিতলাল মজুমদার ‘কবি শ্রী মধুসূদন’ গ্রন্থে দৃষ্টান্তসহযোগে দেখিয়েছেন কিভাবে মধুসূদন অপরিচিত ও অতিপরিচিত শব্দকে এক বন্ধনে বেঁধেছেন, সামান্য আকার পরিবর্তন করে পুরনো শব্দে নতুনত্ব দিয়েছেন। ‘কৃশকটিদেশে’, ‘নিতম্ব-বিম্বে’, ‘হৈমবতী পুরী’, ‘অনম্বর পথে’ এ ধরনের অনেক শব্দ তিনি কবিতায় ব্যবহার করেছেন। এসব করতে গিয়ে তিনি আভিধানিক রীতি ক্ষুণ্ন করেও শব্দ তৈরি করেছেন। যেমন—মুক্তিল, বৃষ্টিল, হিল্লোলিছে, পুষ্পিয়া—এভাবে ক্রিয়াপদ ভেঙেছেন। শব্দ প্রয়োগের এই অভিনবত্ব শব্দ ও ধ্বনিতে ভিন্ন ব্যঞ্জনা এনেছেন।

প্রতিটি কবিতার পেছনে কবি সক্রিয় থাকেন। এভাবে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা চেনা জগৎ থেকে কবিকে শব্দ আহরণ করতে হয়, বাছাই করতে হয় তার কাঙ্ক্ষিত শব্দ। সে জন্য শব্দকে বাজিয়ে নিতে হয়। অনেকটা তুড়ি বাজিয়ে দেখার মতো। এভাবে শব্দ ও কবির মাঝখানে একটা আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। যেখানে শব্দ ও কবির যুগলবন্দি জগৎ তৈরি হয়। শব্দের ধ্বনিরূপ ও চিত্রময়তার জগতে পরিভ্রমণ কবির আত্মবিশ্বাসও সৃষ্টি করে। এ আত্মবিশ্বাস কবিকে তাঁর নিজের পছন্দের শব্দকে নানাভাবে ব্যবহারের সক্ষমতা দেয়। অনেক কবির কবিতায় বহু শব্দ বারবার ঘুরে-ফিরে আসে। নানা অর্থে এই শব্দ ব্যবহার হয়। ভাষা বা শব্দ ব্যবহারে এ স্বাতন্ত্র্য কাব্যভাষাকে আলাদা রূপ দেয়।

শব্দের ভেতরেই ধ্বনি থাকে। ধ্বনি বুঝতে হলে ধ্বনিবিজ্ঞান জানা কবির জন্য জরুরি নয়, কবির প্রয়োজন ধ্বনি সৃষ্টির জন্য শব্দ অন্বষণের কৌশল জানা, শব্দের নিহিতার্থ বোঝা। কবিকে সেই ধ্বনি তৈরি করতে হয়—সে ধ্বনি অনুরণিত হবে কবিতায়, পাঠক হৃদয়ে। এ ধ্বনি আকস্মিক বিষয় নয়। হঠাৎ বজ্রপতনের শব্দ নয়, নির্বাচিত শব্দ। সব শব্দ এক রকম নয়—পুকুরে টিল ছোড়ার শব্দ, পাথরে আঘাত করার শব্দ, বৃষ্টি পতনের শব্দ, গুলির শব্দ—এসব এক নয়। শব্দের তীব্রতাও এক নয়। সে জন্য কবিকে শব্দ বাছাই করতে হয়। তা থেকে আনতে হয় ধ্বনিবৈচিত্র্য। এর মাধ্যমে শব্দ বা ধ্বনির সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের সংযোগ ঘটাতে হয়।

কেউ যদি প্রথাগত ছন্দে কবিতাকে সাজাতে চান সেখানে মাত্রার হিসাবে শব্দ বা ধ্বনি বিন্যাস করতে হয়। কিন্তু একই ছন্দোরীতি অনুসরণ করলেও কবিতার ভাষা এক হয় না। সমকালের কবিরা অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত, মুক্তছন্দ, গদ্য—সব ছন্দেই লেখেন; কিন্তু ভাষা আলাদা। কবিকে তাই বিকল্প ভাষাও খুঁজতে হয়। অনুশীলন করতে হয় বিকল্প শব্দ, পঙক্তির জন্য। কবিকে ভাষা খুঁজতে হয় মুখের ভাষায়, সামাজিক অসাম্য, ভালোবাসা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য সব কিছু থেকে। এ জন্য অনুশীলনও জরুরি—বর্তমান সময়ের কবিতা সৃজন ও মননের সমাহার, যুগপৎ স্বতঃস্ফূর্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত। তাই অনুশীলনের মাধ্যমে কবিতাকে স্বাভাবিক কবিতায় রূপান্তর করতে হয়। এ কাজ করতে হয় সচেতনভাবেই, কারণ এ থেকেই কবি ও কবিতার কণ্ঠস্বর আলাদা হয়ে যায়।

কবিতা মূলত কবির নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাজাত। সেই সঙ্গে যোগ হয় স্বপ্নকল্পনা। এটি সব কবির ক্ষেত্রই প্রযোজ্য, কখনো কখনো সামাজিক সংকটে সময়ের অভিঘাতে কবিতায় সমষ্টির প্রবণতা প্রতিধ্বনিত হয়—সে প্রবণতা থেকে সময়ের আবেগ, সময়ের কবিতাকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতারও পরিবর্তন হয়, রবীন্দ্রনাথ একে বলেছেন ‘ঋতু পরিবর্তন’—সময়ের প্রবাহে নানা অনুষঙ্গ ভিড় করে, ভাষা পরিবর্তন হয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন :

‘আমার কাব্যের ঋতু পরিবর্তন ঘটেছে বারে বারে। প্রায়ই সেটা ঘটে নিজের অলক্ষ্যে। কালে কালে ফুলের ফসল বদল হয়ে থাকে। তখন মৌমাছির মধু-জোগান নতুন পথ নেয়। ফুল চোখে দেখবার পূর্বেই মৌমাছি ফুলগন্ধের সূক্ষ্ম নির্দেশ পায়, সেটা পায় চার দিকের হাওয়ায়। যারা ভোগ করে এই মধু তারা এই বিশিষ্টতা টের পায় স্বাদে। কোন কোন বনের মধু বিগলিত তার মাধুর্যে, তার রঙ হয় রাঙা; কোন পাহাড়ি মধু দেখি ঘন, আর তাতে রঙের আবেদন নেই, সে শুভ্র; আবার কোন আরণ্য সঞ্চয়ে একটু তিক্ত স্বাদেরও আভাস থাকে।

কাব্যে এই যে হাওয়াবদল থেকে সৃষ্টিবদল এ তো স্বাভাবিক, এমনি স্বাভাবিক যে এর কাজ হতে থাকে অন্যমনে। কবির এ সম্বন্ধে খেয়াল থাকে না। বাইরে থেকে সমজদারের কাছে এর প্রবণতা ধরা পড়ে।’

এ সমজদারই প্রকৃত পাঠক। তার কাছে পৌঁছাতেই হবে কবির কণ্ঠস্বর।

বাংলা কবিতায় বিদ্রোহী ঘরানার সৃষ্টি করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সমকালে কবিতার আলাদা এক ভাষা নিয়ে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন। আমরা দেখি নজরুল ঔপনিবেশিকতার শৃঙ্খল আবদ্ধ সমাজের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে রূপায়িত করতে গিয়ে সংগ্রাম আন্দোলনের সমান্তরাল শব্দ বাছাই করেছেন। মানব, জয়ধ্বনি, শৃঙ্খল, দাবানল, সাম্য, জাগরণ, মুক্তি—কবিতায় এ ধরনের শব্দ প্রাধান্য পেয়েছে। এ ছাড়া যৌগিক শব্দ সৃজনের দিকে ছিল তাঁর ঝোঁক। যেমন—চির বিস্ময়, চির উন্নত, চির দুর্জয় ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে এ ধারার কবিতা গতি পেয়েছে সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়সহ অনেকের লেখায়। কিন্তু প্রত্যেকের ভাষাই আলাদা। সমকালের রাজনীতি ও ক্ষোভ এসেছে ভিন্নভাবে।

বিদ্রাহী কবিতায় নজরুল লিখছেন :

আমি মানব দানব দেবতার ভয়

বিশ্বের আমি চির দুর্জয়—

চল্লিশের দশকে সুকান্ত লিখেছেন :

আদিম হিংস্র মানবিকতার যদি আমি কেউ হই

স্বজনহারানো শ্মশানে তোদের

চিতা আমি তুলবই

সেখানে একই সময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন :

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য

ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা

তিনজনের কণ্ঠই বিদ্রোহী, কণ্ঠস্বর কিন্তু আলাদা। এই আলাদ কণ্ঠস্বর চিনতে কোনো অসুবিধা হয় না।

     ►   চলবে