kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

বার্লিন এক ব্যথিত শহর

আবুল হাসানের পরবাস

মোশতাক আহমদ   

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



আবুল হাসানের পরবাস

হাসান পূর্ব বার্লিন পৌঁছেই ২০ নভেম্বর চ্যারিটি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান। প্রাচীন এক প্রাসাদের মতো দেখতে এই হাসপাতাল, জার্মান ব্রিক গথিক স্থাপত্যের মিশেলে অষ্টাবিংশ শতাব্দীর ইউরোপিয়ান বৈশিষ্ট্যের এক অনবদ্য নিদর্শন। ভেতরে ঢুকতেই হাসানের মনটা বড় হয়ে গেল, মনে হলো বিনা অনুমতিতে এই প্রাসাদে ঢুকতে কেউ তাঁকে বারণ করছে না! তাঁর মনে হলো এটি যেন ঈশ্বরের নিজ গৃহ, পবিত্র এক ভবনে ঈশ্বরের তদারকিতে থাকবেন তিনি। 

বার্লিন চ্যারিটি হাসপাতালে হাসানের কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে রাইনহার্ট হেভিক্যা নামের এক চিত্রশিল্পীও হৃদরোগ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। সে ইংরেজি জানে বলে সেবাদানকারীদের সঙ্গে হাসানের জন্য একটা সেতু হয়ে গেল। হাসানকে প্রথম দেখেই সে পছন্দ করে ফেলল। ওকে ওর শিল্পীবন্ধুরা দেখতে আসে, হাসানের সঙ্গেও পরিচয় হয়, একসঙ্গে কফি খেতে যায় হাসপাতালের সামনের রাস্তার ক্যাফে ক্রানজলারে। চিত্রশিল্পী গ্যাব্রিয়েলাসহ অনেকেই হাসানের বন্ধু হয়ে যায়। রাইনহার্ট হাসানের ছবি আঁকে, সেসব ছবিতে হাসানের চাইতেও সুন্দর অবয়ব ফুটে ওঠে। হাসান ওর ছবি আঁকার কৌশল খুব নিবিষ্টভাবে খেয়াল করতে করতে বলেন, ‘আরে ইয়ার, তুমি তো আমাকে রোমান নায়কদের মতো করে আঁকছ! আমি তো আর আঁকতে পারি না, আমার বাংলা কবিতার বইটাই দিলাম তোমাকে।’

বার্লিন প্রাচীরের এ পাশেই হাসানের হাসপাতাল। হাসান বার্লিন প্রাচীরের পাশে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, একই জাতিকে জোর করে দুই ভাগ করে ফেলেছে লোহা আর কংক্রিটের দেয়াল। গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ছে। বৃক্ষগুলো কঙ্কালসার দাঁড়িয়ে আছে লেকের পারে। লেকের পানিও একসময় বরফে আচ্ছাদিত হয়ে যাবে। হাসান হাসপাতালের জানালা দিয়ে শুভ্র তুষারপাত দেখেন। ইউরোপের যে বর্ণিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা শুনে এসেছিলেন, এই তীব্র শীতে সেসব মৃত্যুময়।

চিকিৎসায় প্রথমে কিছুটা উন্নতি হয়, কবিতা লিখতে থাকেন এবং বেড়াতেও যান। হাসপাতালে মানুষের অসুস্থতা আর মৃত্যু দেখেন, দেখেন অবিচল আস্থায় সেবিকাদের দৈনন্দিন কাজ। নার্সদের নিয়ে লিখলেন ‘শাদা পোশাকের সেবিকা’ নামের কবিতাটি। ক্যাথি নামের এক অল্প বয়সী নার্স হাসানকে রোজ একটি করে তাজা গোলাপ দিয়ে যায়। হাসান বলেন, তোমার ভাষা তো বুঝি না ক্যাথি, গোলাপের ভাষা বুঝতে চেষ্টা করছি!

ক্যাথি বলল, তুমি তো কিছু কিছু জার্মান বোঝো। এ ছাড়া সব কথা কি আর দোভাষীর মাধ্যমে বলা যায়?

হাসান বললেন, গোলাপের ভাষাও শক্ত। রিলকে মারা গিয়েছিলেন গোলাপের দংশনেই! অতএব, আমি সাবধান থাকি।

হেভিক্যার বাবা সিনেমা পরিচালক ও অভিনেতা আছিম হুবনার বড়দিনের আগে ছেলেসহ হাসানকে তাঁর জোহানিস্তালের বাড়ি নিয়ে গেলেন। ৪৬ বছরের তরুণ তিনি, প্রাণশক্তিতে ভরপুর।

বার্লিন শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এই লোকালয়। যাওয়ার পথে কিছুটা ঘুরে থুরিঙ্গিয়া অরণ্য দেখাতে নিয়ে গেলেন। অরণ্য ঘেঁষে আইসেনাখ শহর। এখানেই জন্মেছিলেন সংগীতস্রষ্টা বাখ। রোমান আমলের ওয়ার্টবুর্গ দুর্গ দেখেই মনে পড়ে গেল এ রকম একটা দুর্গের কথাই বুঝি রিলকের ‘দুয়িনো এলিজি’ পড়ার সময় মনে ভেসে ওঠে। অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্রের প্রান্তে পাহাড়ের ওপরের সেই রাজকুমারীর প্রাসাদোপম দুর্গে একাকী হাঁটছিলেন রিলকে। ঝোড়ো হাওয়া, উত্তাল সমুদ্র; জল ও বাতাসের কলস্বর ছাপিয়ে তখন তাঁর কানে ভেসে এসেছিল এক অলৌকিক কণ্ঠস্বর ‘কে, আমি চিৎকার করে উঠি যদি, হবে শ্রোতা শ্রেণিবদ্ধ ঐ/দেবদূত-পর্যায়ের মধ্য থেকে?’

বড়দিনের উৎসবে বেশ খানাপিনার আয়োজন ছিল। আছিম হুবনারের মিউজিকের রেকর্ডের সংগ্রহ বিপুল। দিন-রাত বাখ কিংবা বিটোফেন বেজে চলেছে। সেই বাড়িতে সোমরসেরও অভাব ছিল না। আছিম সোমরসেরও সমঝদার। সুদৃশ্য, ভারী ভিনটেজ গবলেট গ্লাসে হাসানকে মদ পরিবেশন করলেন। হাসানের শরীর বেশ চনমনে। অসুখ তো তিনি ভুলেই থাকতে চান, রিজলিংয়ের বনেদি বোতল সামনে পেয়ে ভুলেই গেলেন সব। আছিমকে বললেন, ‘কাগজ-কলম দাও। এমন একটা দৃশ্য মাথায় এসেছে যে আমি আর গবলেট গ্লাসগুলো এক হয়ে গেছি—আমি আছি শেষ মদ!’ আছিম বললেন, ‘অনুবাদ করে শুনিয়ো!’ 

রাইনহার্ট হাসানকে বলল, হাসান আমি তোমার সব কবিতা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করার ব্যবস্থা করব। সঙ্গে থাকবে আমার হাতের ইলাস্ট্রেশন।

হাসান খুব খুশি হলেন, ‘অবশ্যই তুমিই করবে। আমার কোনো আপত্তি নেই।’

না না, মুখে মুখে হবে না। তুমি আমাকে লিখিত অনুমতি দাও!

রাইনহার্ট এই সুযোগে হাসানকে বাবার কাছ থেকে আলাদা করে নিল। হাসান লিখে দিলেন,

বার্লিন ১।১।১৯৭৫

আমি এই মর্মে আমার অকৃত্রিম বন্ধু রাইনহার্ট হুবনারকে আমার রচিত ‘রাজা যায় রাজা আসে’ ও ‘যে তুমি হরণ করো’ এই দুটি কবিতার বইয়ের জার্মান ভাষায় অনুবাদের একমাত্র অধিকার দিচ্ছি, কেননা এই প্রবাসে সে আমার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ভুবনের একান্ত সঙ্গী ও শুভাকাঙ্ক্ষী। সে ছাড়া আর কেউ এই বই দুটির অনুবাদ করতে পারবে না। তবে প্রয়োজনবোধে সে একজন দক্ষ অনুবাদকের সাহায্য নিয়ে এই কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে। সেই সঙ্গে আমার অনুরোধ থাকবে আমার কবিতার সংকলনটি যেন আমার শিল্পী বন্ধু রাইনহার্ট হুবনার নিজ হাতে অলংকরণ করে প্রকাশ করে।

—আবুল হাসান

এর পরে ছোট হুবনারকে আর পায় কে! বড়দিনের পর পর আরেকটি বিশাল উদযাপনের উপলক্ষ হয়ে গেল।

হাসান এ সময়ে বেশ অনিয়ম করে ফেললেন। তিন দিন-তিন রাত আনন্দে ভেসে গেলেন। বাখ আর বিটোফেনের সব রেকর্ড শোনা হয়ে গেল। মনে হলো কোনো এক বৈকুণ্ঠে ভেসে বেড়াচ্ছেন। এর ফলে জানুয়ারির শুরুতে আবারও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলো। আছিম হুবনার নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসানকে হাসপাতালে পৌঁছে দিলেন। গত এক মাসে যেটুকু উন্নতি হয়েছিল, এই তিন দিনে আবার ততটাই অবনতি হয়ে গেছে। দুই হুবনার অপরাধীর মতো মুখ করে হাসপাতালে ঘুরে বেড়ায়। বার্লিন চ্যারিটি হাসপাতালের ডাক্তাররা বাংলাদেশ দূতাবাসে খবর পাঠালেন। ডাক্তাররা জানালেন, এখন আর হাসানের হার্টের অপারেশন সম্ভব না। অপারেশন করাতে গেলে গুরুতর ঝুঁকি আছে। অপারেশন থিয়েটারের টেবিলেই মারা যেতে পারেন। ছুটে এলেন বাংলাদেশ দূতাবাসের আনোয়ার হাশিম সাহেব। ডাক্তারদের সঙ্গে বসে কী করা যায় ভাবছেন।

তিন দিন নিবিড় চিকিৎসার পর হাসান স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে শুরু করলেন। কবিতা লিখে চলেছেন ঝর্ণার মতোই। দেশের পত্রিকায় পাঠান ‘রোগ শয্যায় বিদেশ থেকে’ কবিতা।

বিকেলে ধূসর রঙের হাই নেক সোয়েটার পরে হাসপাতালের লেকের ধারে হাঁটছিলেন। গ্যাব্রিয়েলা এসে বললেন, ‘চলো হাসান, আজ তোমার একটা স্কেচ করি। লক্ষ্মী ছেলের মতো ওই রাজহাঁসটার দিকে তাকিয়ে থাকো তো! রাজহাঁসটাকে হিপনোটাইজ করতে থাকো। আমি আমার কাজ সারি! স্কেচ করা হলে তবেই আজ দুজনের সন্ধ্যার কফি পাওনা হবে!’

রাতে মাহফুজকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখলেন। মাহফুজকে লেখা সেই দীর্ঘ চিঠিতে ছড়িয়ে গেল হাসানের আশাভঙ্গের বেদনা। মহাদেব সাহা, সুরাইয়া খানম, শাহজাহান চৌধুরী, রফিক কায়সারসহ অনেককেই লম্বা লম্বা চিঠি লিখছেন। কিন্তু প্রাণের বন্ধু নির্মলকে কোনো চিঠি লিখছেন না।

দেশের খবর পান বন্ধুদের চিঠিতে। কোনো সুখবর নেই। মহাদেব নাকি অসুস্থ। সিরাজ শিকদার খুন হয়েছেন। বাকশাল গঠিত হয়েছে। আর সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ এখন। গণকণ্ঠ চূড়ান্তভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। সুরাইয়া খানমের চিঠি পড়ে কিছুক্ষণ জীবনের দিকে মুখ ফেরান। বুকের মধ্যে কেমন একটা অব্যাখ্যাত পরিপূর্ণতার অনুভূতি জাগে তাঁর। এরই নাম কি প্রেম? আগে তো কখনো এই অনুভূতি হতো না। রাত জেগে সুরাইয়াকে চিঠি লেখেন। বাইরে শীতের ছোবলে গাছে গাছে কনকন শব্দ, লেকের পানি মৃত্যুময় পাথরশীতল।

আনোয়ার হাশিম সাহেব ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে কবিকে চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগে নিয়ে যাওয়ার জোগাড়যন্ত্র করতে থাকেন। কিন্তু প্রাগে নিলেও সে অবস্থায় সফল অপারেশন করার নিশ্চয়তা ছিল না বলে চেক ডাক্তাররা অপারগতা প্রকাশ করেন। বার্লিনের ডাক্তাররা মনে করলেন তাঁদের আর কিছু করার নেই। কিছুটা ভালো অবস্থায় দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষণগণনা করছেন তাঁরা।  

দ্বিতীয়বার ক্যাথেটার করার পর চূড়ান্ত হতাশায় ভেঙে পড়েন হাসান। অনেক বেদনা নিয়ে মাহফুজকে আবারও চিঠি লেখেন। এবারের চিঠির ভাষা কিছুটা অসংলগ্ন, আর অতিরিক্ত আবেগাক্রান্ত। কিছুটা ব্যক্তিগত ডায়েরির আঙ্গিকে আর আত্মসমালোচনায় ভরা সেই চিঠিখানি।

চারদিক সুনসান। খারাপ রোগীদের কাতর আর্তনাদও আর শোনা যায় না। নার্স এসে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য তাড়া দেয়। তারপর নাড়ির গতি, তাপমাত্রা আর রক্তচাপ পরীক্ষা করে যায়। হাসান রোজকার মতো নিজের মতো করে নিঃসঙ্গ হয়ে যান। শব্দ করে পড়েন প্রিয় কবিতা থেকে কিছু লাইন। গথিক গড়নের ভবনটির বিভিন্ন খিলানে আছড়ে পড়ে কবির উচ্চারণ।