kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

জল, জোছনা কিংবা লখিন্দরের নাও

শাহ নিসতার জাহান

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জল, জোছনা কিংবা লখিন্দরের নাও

অঙ্কন : মাসুম

সন্ধ্যার আকাশ। তারারা ভরায় তার স্বপ্ন। মাধবী নির্লিপ্ত, একাকী কথোপকথনে। আনন্দ ধারায়, তারায় ভরা, অনন্য স্বপ্ন সেখানে। জোনাকি-আলো রঙা জোছনা নামে। আজ কি একাদশী? তারারা চুষে নেয় জোছনার রস যেন। বালুকাবেলায় ঝিকিমিকি। চঞ্চলা জোছনার লুটোপুটি। ছাতিম ফুল ফুটেছে কোথাও। মাতাল মনকে উতলা করেই যেন চকিতে আসে হালকা বাতাস। উতলা মাধবী চমকিত হয়। মাতাল ছাতিম আবিষ্ট করে তার মন। কোত্থেকে এক অভিশপ্ত পাখি ডেকে ওঠে। মায়াবী রাতকে গালাগাল করে। প্রিয়ার সান্নিধ্য লাভে ব্যর্থ। তাই শাপ-শাপান্ত নিষ্ঠুর জনপদ। উদ্বেলিত রাত্রির একাকিত্ব।

মাধবী বাইরে নামে। শরম লাগা ঘাসফড়িংয়ের মতো ভীরু তার পা। লাজুকতার আবিষ্ট মোহ তাতে। মিলিয়ে যেতে হবে সবার অলক্ষ্যে জোছনার আহ্বানে। বনের ঘন ছায়ার ওই দিকে বাঁশবন। তারপর কৃষ্ণচূড়া। সেখানে বালুবন। মায়াময় জোছনারা লুটিয়ে পড়ে সেখানে। নির্জন বালুকাবেলা। তৃপ্ত মুখে দেবীরা দাঁড়িয়ে থাকে। ঈষদ আনত নয়ন। সাজানো ঝুল বারান্দায় পাত্র হাতে অপেক্ষমাণ দেবতারা। মাধবী চুতুর-চপল নয়নে তাকায় আকাশে। বিরহের দেবী মুখ ফিরিয়ে নেয় তাকে দেখে। মধুর সম্ভোগ অপছন্দ তার। অথচ সম্ভোগের আহ্বানে সারা রাত জেগে থাকবে আজ স্বর্গের দেবতারা। দেবীর খোঁপায় ফুল। তাদের সযতন সাজে জোছনারা আনন্দে মাতোয়ারা। আনন্দের অনন্য মায়ায়। তাই বুঝি জোছনার মহাপ্লাবন। তারই পেলবতা ছুঁয়ে যায় মাধবীর গা। কম্পিত পা। উদ্ধত বক্ষযুগল। অপূর্ব এক স্পন্দন। কম্পিত ঠোঁট উষ্ণ। অপেক্ষমাণ নিবিড় আলিঙ্গনের।

 

খ.

বালুকাবেলার পাশে অপেক্ষমাণ আর এক বিনিদ্র রজনীর কবি কিংবা মহাপুরুষ। এ রাত দীর্ঘ, দীর্ঘ এই দিন। দীর্ঘ প্রতিটি মুহূর্ত। এই জীবন লাগে না ভালো। সে-যে কেন থাকে না তার পাশে! সারাক্ষণ। কাপুরুষ সময়কে তখন মনে হতো না গ্লানিকর, ক্লান্তিকর। প্রতিমুহূর্ত হয়ে উঠবে অনন্য কথনে। তার ছোঁয়ায়, তাকে স্পর্শ করে। যে জীবনে সে নেই, সে জীবন বৃথা নির্ঘাত। ধ্বংস হোক সেই নিষ্ঠুর চরাচর। নিষ্ফলা, বন্ধ্যা হোক সেই পৃথিবী। কিংবা হোক মৃতবৎসা। আসলে পথ চাওয়া তার ভালো লাগে না। ভালো লাগে না মাধবীকে ছাড়া। কিন্তু মুহূর্ত যেন। চকিতে একটি ছায়া এগিয়ে আসে। পরিপূর্ণ এই পৃথিবী এখন। পদ্ম সরোবরে জেগে ওঠে অগুনতি কলি। মাধবী, একাকী মাধবী! স্বর্গের দেবতারা ফিসফিসিয়ে কথা বলে। নিবিষ্ট সম্ভোগে তৃপ্ত তারা।

মাধবী এগিয়ে যায় মহাপুরুষের কাছে। শক্ত বাহুতে মুহূর্তেই নিবিষ্ট হয় সে। এই পৃথিবী যদি ধ্বংস করে দেওয়া যেত আজ! মাধবী অস্ফুটে বলে, আমি ভ্রষ্টা তোমার জন্য। আমি কলঙ্কিনী।

কলঙ্ক আমারও কম নেই। পৃথিবীর ধ্বংস চাই। এ জ্বালা সইতে পারি না। তুমি ছাড়া!

আমি তো তোমার!

মানে না সমাজ; দুনিয়া। মানবে না তারা।

ঘৃণা করি তাকে। আমার পৃথিবী তুমি। আমার জন্য তোমার প্রতীক্ষা। যেমন তোমার জন্য আমার। আর কিছু কি মূল্য নেবে তুমি?

না। তুমি স্বর্গের ফুলের চেয়েও সুন্দর। তোমার ঠোঁট, জঙ্ঘা, বুক। বিনিময়ে ছাড়তে পারি পৃথিবীর সব। তার মূল্য দিতে পারে না কেউ। মাধবী, মরে যাই তোমাতে।

সে যেন নিংড়ে নেয় মাধবীর রস। প্রথিত মাধবীতে। আঁকড়ে ধরে পরস্পরে। বিনিদ্র তারারা ঈর্ষান্বিত। পরস্পরে হারিয়ে যেতে চায়, হারিয়ে যায় বিশ্ব চরাচর ভেদ করে। সাক্ষী থাকে ঘাস, ফুল, নদী। আর নদীতে জেগে থাকা নৌকা। শব্দ হয় রাতজাগা এক কাঠবিড়ালির। সে খবরও নেই তাদের। তারা অমৃত লাভের তৃষ্ণায় অমরত্বের পথে। এগিয়ে যায় তারা।

 

গ.

পরের দিন। রোদে ঝলমল। অথচ মলিন সকাল, সকল। লোকের সমাগম। গুরুত্বপূর্ণ তারা। উঠানে হাজির সে। পালাতে চায়নি। ভালোবাসার জন্য প্রাণদণ্ড হবে? হোক। বরণ করবে সে। এই ক্ষমতা মাধবী দিয়েছে তাকে। রোদেরা আড়াল করে রাখে তাকে প্রাণপণ। মানুষেরা হাসে। কটু কথা বলে। অপবাদ দেয়। নির্বাক নির্ভীক তবু সে। মাধবী ভালোবাসতে শিখিয়েছে তাকে। ভালোবাসায় নত নয়; উদ্ধত হতে হয়। এই মানুষেরা কতটুকু ঘৃণা করবে তাকে? মাধবী, অনন্য মাধবী! চিৎকার করে সে। ভালোবাসার জন্য সে আজ দণ্ডিত মহাপুরুষ।

 

ঘ.

কদিন পর। নদীর জলে ভেসে ওঠে এক লখিন্দর। ফটিক জলে, এগিয়ে চলে যেন সোনার নাও। নদী ভালোবেসেছিল তাকে কিংবা সে ভালোবেসেছে নদীকে। লোকেরা ভিড় করে তীরে। মায়াময় স্বপ্ন ছিল তার মাধবীকে ঘিরে। ছেলেটি বোঝেনি, মানুষেরা দেয় না ভালোবাসার দাম। বিড়বিড় করে কাটত সময় তার। সবাই মিলে করেছিল অপমান। নাকে খত, জুতাপেটা। আহারে, রাজার কুমার! ছোট ঘরের ছেলে। চাল-চুলো নেই। শুধু ভালোবাসা ছিল। কিন্তু হলে হবে কি! গোসলে নেমে মনে হয়েছিল, এই নদী, এই জল ভালোবাসে তাকে। সে-ও তো এক লখিন্দর। মাধবীবিহীন। কী যে হয় তার। ভালোবেসে ফেলে নদীর জল। তারপর নদী চুপচাপ। শান্ত নদীর জল। ভালোবাসার মূল্য নিয়ে ঘুরছে তাই নদী। বুকে তার চলছে বয়ে লখিন্দরের নাও।