kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

‘নিজের চেতনার কাছে কখনো পরাজিত হইনি’

১৪ জুন পঁচাত্তরে পা দিচ্ছেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। জন্মদিন উপলক্ষে সাম্প্রতিক কাজকর্ম ও লেখালেখি নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১১ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘নিজের চেতনার কাছে কখনো পরাজিত হইনি’

কী হতে চেয়েছিলেন, কী হলেন?

শৈশবে লেখক হবো এমন কোনো ইচ্ছা ছিল না। বাবার চাকরিসূত্রে বগুড়ার গণ্ডগ্রামে থাকতাম। সেখানে প্রবল আনন্দের জোয়ার ছিল। বারুয়া মাঝি নামে করতোয়া নদীতে একজন খেয়াঘাটের মাঝি ছিলেন। আমরা ৮-১০ জন ছেলে-মেয়ে ঘুরে বেড়াতাম। তাঁর কাছে গিয়ে বলতাম, ‘কাকু, আমাদের একটু ওপাশে পার করে দেন না। ওদিকে কত গাছটাছ আছে। আমরা একটু দেখব।’ উনি আমাদের ওঠাতেন। বড়দের বলতেন, ‘আপনাদের পরে নেব।’ বড়রা রেগে বলত, ‘ওরা কী তোকে পয়সা দেবে?’ উনি বলতেন, ‘না, আমি তো ওদের কাছ থেকে পয়সা নেব না।’

‘তাহলে ওদের নিচ্ছিস কেন?’ উনি বলতেন, ‘ওরা আমার ভবিষ্যৎ। ওদের দেশ দেখাই, মাটি দেখাই। গাছ দেখাই।’ এই ৭৫ বছর বয়সেও ওই মানুষটিকে মনে করি আমার একজন শিক্ষক। আমার প্রাইমারি স্কুলের একজন হেডমাস্টার ছিলেন। একটা পা যাঁর অ্যাক্সিডেন্টে কেটে গিয়েছিল। তিনি ক্রাচে ভর করে আসতেন। স্কুল শুরুর আগেই অ্যাসেম্বলি করাতেন। জাতীয় সংগীত শেষ হলে তিনি দুটো লাইন বলতেন, ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল/কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল।’ তারপর চিৎকার করে বলতেন, ‘কানন মানে বাগান। তোদের সবাইকে এই কাননে ফুটে উঠতে হবে। মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনবি। সবাইকে শ্রদ্ধা করবি, ভালোবাসা দিবি।’ এসব ঘটনা আমার লেখালেখিকেও প্রভাবিত করেছে। এখনো আমি যখন যেটাকে পটভূমি হিসেবে চিন্তা করি, আগে সেই জায়গাটাতে যাই।

 

গল্প দিয়েই তো আপনার লেখালেখির সূচনা?

১৯৬৪ সালে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার একটি সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। মহিলা কলেজ থেকে অধ্যাপক আবদুল হাফিজ আমার নাম পাঠালেন। সেখানে সাতটা ইভেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য বলা হলো। এর মধ্যে গল্প লেখাও আছে। আমি কেঁদেই দিলাম—‘স্যার, আমি তো কোনো দিন গল্প লিখিনি।’ স্যার বললেন, ‘লেখনি তো কী হয়েছে। এখন লিখবে। না পারলে বাদ পড়ে যাবে। কিন্তু অংশ তোমাকে নিতেই হবে।’ শেষে আমি উপস্থিত বক্তৃতা ও গল্প লেখায় প্রথম হলাম! সে জন্য আমার লেখালেখির সূচনা ধরি ১৯৬৪ সাল। অবশ্য গল্পটা কোথাও ছাপা হয়নি। পরে হারিয়ে ফেলেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক গল্প লেখি। আবদুল হাফিজ স্যার তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘এই গল্পগুলো দিয়ে একটা বই করো। চাকরি পেতে সহজ হবে। কারণ তোমার সিভি বাড়বে একটা বই থাকলে।’ আমি আবার কাঁদতে শুরু করলাম, ‘কে আমার বই করবে?’ তখন তিনি ধমক দিয়ে বললেন, ‘তোমাকে ঐভাবে কে চেনে? তার চেয়ে বরং বাবা-মার কাছে গিয়ে টাকা চাও। প্রেসের মালিককে আমি বলে দেব।’ বাবার কাছে গেলাম। বললেন, ‘তোর চাকরি হবে? তাহলে তোকে টাকা দেব।’ মানে আমি চাকরি পাওয়ার জন্য বই করেছি, লেখক হওয়ার জন্য না (হাসি)। ১৯৬৯ সালে বইটা বের হলো ‘উৎস থেকে নিরন্তর’।

 

আত্মপ্রকাশলগ্নে কোনো প্রতিবন্ধকতার কথা মনে পড়ে?

আসলে সে অর্থে প্রতিবন্ধকতা পাইনি। রাজশাহী থেকে ডাকে লেখা পাঠাতাম। এক-দুইবার ছাপা হতো। বাকি সময় হতো না। মনে হতো, বোধ হয় ভালো লিখিনি। সে জন্য সম্পাদক ফেলে দিয়েছেন। এটা ছিল আমার জিদ। আমি নিজের চেতনার কাছে কখনো পরাজিত হইনি। তারপর আবার ভালো করে লিখে পাঠাব। দেখে যেন সম্পাদক বলেন—ভালো লিখেছে। এভাবে তৈরি করেছি নিজেকে।

 

একসময় তো কবিতাও লিখতেন?

১৯৬৪ সালের পর আর কবিতায় ঢুকিনি। আমার স্মৃতির সঞ্চয় থেকে যা চিন্তা করেছি, সেটা প্রকাশে বড় ক্যানভাস দরকার বলে গদ্যে চলে এসেছি।

 

আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা জুগিয়েছে কোন বই?

রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’। পরে তাঁকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছি—‘পূর্ণ ছবির মগ্নতা’। ‘ছিন্নপত্র’ পড়ে মনে হয়েছে সাধারণ মানুষকে ভালোবাসার জায়গাটা সবার থাকা উচিত।

 

এখন কী লিখছেন?

মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থীদের নিয়ে একটি উপন্যাস লিখছি। ‘শরণার্থীর সুবর্ণরেখা’। আমার ফাউন্ডেশনে একটা ছেলে আছে। তার বাপ-মা শরণার্থী শিবিরে ছিল। ওদের কাছ থেকে চমৎকার একটা গল্প পেয়েছি।

 

কেন লেখেন?

লেখালেখি আমার জীবন-স্বপ্নের সাধনা।

 

সেই সাধনায় বর পেয়েছেন?

আমি লিখছি। পূর্ণতা পেয়েছে কি না সেই মূল্যায়ন করবে পাঠকসমাজ। সেই অর্থে মূল্যায়নটা পেয়েছি এটাও বলতে পারি। কারণ আমার এতগুলো বই বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়েছে।

 

লিখতে চেয়েছেন কিন্তু পারেননি, এমন কোনো আক্ষেপ আছে?

হ্যাঁ। সে রকম কিছু জিনিস আছে। তবে আপনাকে বলব না। তাহলে কেউ যদি আবার ধরে লিখে ফেলে (হাসি)।

 

ব্যক্তি সেলিনা হোসেনের চরিত্রের শক্তির দিক কোনটা?

আমার সহ্য ক্ষমতা। আমি অনেক কিছু সহ্য করতে পারি।

 

আপনার কাছে জীবন মানে কী?

আমার কাছে জীবন মানে বেঁচে থাকার সত্যকে আলোকিত করা। যে সত্য দিয়ে মানবিক সভ্যতাকে দেখা যায়।

 

জীবনের কোন ঘটনা এখনো আপনাকে কাঁদায়?

আমার জীবনে একটা বড় শোক লারার মৃত্যু। এক দিন আমার বৈঠকখানায় দাঁড়িয়ে আমার বুড়ো আঙুলটা নিজের গায়ে রেখে বলল, ‘এই লারা, এই লারা তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না। তোমার আর দুই ছেলে-মেয়ে তো খালি বিদেশ বিদেশ করে। ওরা বিদেশে গেলে আর আসবেও না বলে। কিন্তু এই লারা তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবে না।’