kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

‘নদীর পালিত এ জীবন আমার’

তুহিন ওয়াদুদ

৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শিল্প-সাহিত্যের বিষয় আর আঙ্গিকের বৈচিত্র্যময় সৃষ্টিতে ঐশ্বর্যপূর্ণ। ব্যাপ্ত শিল্পভুবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে নদী বিশেষায়িত। শৈশবে নদীর প্রেমে পড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের শেষলগ্নেও নদীবোধ থেকে দূরে থাকেননি।

শৈশবে একবার সংক্রামক ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে সপিরবারে কলকাতার পেনেটির বাগানবাড়িতে ছিলেন। সেই বাসা থেকে গঙ্গা দেখা যেত। সেই গঙ্গাপারে যাওয়ার জন্য একদিন বাড়ির জ্যেষ্ঠদের পিছু নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ছোট আর তাঁর তখনকার সাজ বাড়ির বাইরে যাওয়ার উপযুক্ত ছিল না বলে তাঁকে গঙ্গাপারে নেওয়া হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে সেই স্মৃতি বেদনাবিধূর হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর জীবনস্মৃতিতে। বাড়ির জ্যেষ্ঠরা তাঁকে সঙ্গে যেতে দেননি বলে সেই যাত্রায় তাঁর গঙ্গা দেখা হয়নি। কিন্তু কল্পনায় তিনি গঙ্গাবিহার থেকে বিরত থাকেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—‘সেই পিছনে আমার বাধা রহিল কিন্তু গঙ্গা সম্মুখ হইতে আমার সমস্ত বন্ধন হরণ করিয়া লইলেন। পাল-তোলা নৌকায় যখন-তখন আমার মন বিনা ভাড়ায় সওয়ারি হইয়া বসিত এবং যে-সব দেশে যাত্রা করিয়া বাহির হইত, ভূগোলে আজ পর্যন্ত তাহাদের কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নাই।’

শৈশবেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নদীর প্রতি অনেক গভীর টান অনুভব করতেন। বয়স যতই পরিণত হয়েছে নদীর প্রতি তাঁর ভালোবাসাও যেন পরিণত হয়েছে। জীবন যখন সায়াহ্নে পৌঁছেছে তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নদীবিষয়ক পরমতম উপলব্ধির কথা লিখে গেছেন। জন্মদিনে কাব্যগ্রন্থে তিনি লিখেছেন ‘নদীর পালিত এ জীবন আমার।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীর্ঘজীবন বিচিত্র অভিজ্ঞতায় কেটেছে। বিচিত্র পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতা সমৃদ্ধ তাঁর জীবন। দীর্ঘ এক পরিপূর্ণ জীবন সম্পর্কে তিনি লিখেছেন নদীই তাঁকে পালন করেছে। এই ব্যাখ্যা আক্ষরিক ও প্রতীকী উভয় অর্থেই করা সম্ভব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নদীবিষয়ক বিস্তৃত লেখায় বরং ‘নদীর পালিত এ জীবন আমার’-এর বিশদ বিশ্লেষণে অর্থগত ব্যঞ্জনা আক্ষরিকভাবে নেওয়ার ক্ষেত্রই সম্প্রসারিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্রাবলী’ পাঠ করার পর এ বিষয়ে আর কোনো সংশয় থাকবে না। ছিন্নপত্রাবলীতে কবির মনোযোগ ও মননযোগ সবটাই নদীবেষ্টিত। গদ্যে রচিত নদীবোধ কবিতামালায় এসে কাব্যিক ব্যাঞ্জনা লাভ করেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনে যে নদীর গভীরতর প্রভাব তা মূলত তাঁর নদীময় জীবনের। পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি তদারিক করতে আসেন তখন তাঁর জীবন হয়ে ওঠে নদীময়। এই নদীময় জীবন উপেক্ষা করার কোনো পথ ছিল না। সেই অভিপ্রায়ও তাঁর মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। তিনি প্রচণ্ড রকম উপভোগ করেছেন নদীজীবন।

জমিদারি দেখার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পূর্ববঙ্গে অনেকটাই থিতু হয়েছিলেন। কুষ্টিয়ার শিলাইদহ থেকে তিনি বর্তমান সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যেতেন এবং নওগাঁর পতিসরে যেতেন। তাঁর এই যাত্রাপথ প্রধানত ছিল নৌপথ। নৌপথে নৌকাতেই থাকা-খাওয়া চলত। একটানা কয়েক দিনও তাঁকে নৌকায় থাকতে হয়েছে। পদ্মা, গড়াই, ইছামতী, বড়াল, আত্রাই, নাগরসহ বেশ কিছু নদীতে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। যে নৌকাযোগে তিনি যাতায়াত করতেন সেই নৌকার নাম তিনি দিয়েছেন ‘পদ্মা’। শিলাইদহের যে কুঠিবাড়িতে তিনি ছিলেন সেই বাড়ির প্রাচীর করা হয়েছিল নদীর ঢেউয়ের আদলে। উনবিংশ শতকের শেষ দশক তাঁর কেটেছে পূর্ববঙ্গেই। এই কালখণ্ডে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনন্য উচ্চতায় ওঠা ছোটগল্পকার হয়ে ওঠেন। তাঁর এই ছোটগল্পের মানুষগুলো কিংবা প্রকৃতির যে বয়ান সে সবকিছুই নদীতীরবর্তী, নদীবিধৌত। তাঁর প্রত্যক্ষ করা জীবনের রূপায়ণ সেসব।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যাপিত জীবনে রচিত কবিতাসমূহে নদী প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় নদীর নিখাঁদ-নিপুণ বর্ণনা। নদীবিষয়ক বর্ণনায় তাঁর নৈপুণ্য স্বতন্ত্র স্বরে বিন্যস্ত। যেহেতু তিনি ঋতুভেদে সব ঋতুর নদী চেনেন তাই কবিতায় নদীর রূপ মৌসুম অনুগামী। শুধু বৃহৎ অর্থে মৌসুম অনুগামী বললে ভুল হবে, দিন-রাতের বিভিন্ন পর্বে নদীরও যে বিভিন্ন রূপ তারও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আছে। সকালের নদী, দুপুরের নদী, বিকেলের নদী, সূর্যাস্তের নদী, সন্ধ্যার নদী, রাতের প্রথম ভাগের নদী, মধ্যরাতের নদী—সব রকম নদীর কথাই তাঁর কবিতায় পাওয়া যায়। শীতের নদী, গ্রীষ্মের নদী, বর্ষার নদী, হেমন্তের নদী, শরতের নদীও উজ্জ্বল হয়ে আছে। নদীপারে শিশুর জীবন, নারীর কর্মব্যস্ততা, জেলেজীবন, মাঝিজীবন, এমনকি নদীপারের নিত্যদিনের অবস্থাও রূপায়িত হয়েছে তাঁর কাব্যে।

তিনি কাব্যগ্রন্থের নাম দিয়েছেন ‘সোনার তরী’। এই কাব্যগ্রন্থ নদীমুখর। তাঁর নদীবিষয়ক একটি দীর্ঘ কবিতা আছে। সেটি একটি গ্রন্থ। এই দীর্ঘ কবিতার নাম ‘নদী’। তাঁর অসংখ্য কবিতার বিষয়ই নদী। শুধু উপমা হিসেবে কিংবা প্রতীকী অর্থে নয়, নদীকে ঘিরেই লেখা হয়েছে অসংখ্য কবিতা। সে রকম একটি কবিতা ‘নদী’।

‘নদী’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নদীর যে বিস্তৃত বৃত্তান্ত তুলে ধরেছেন তা রীতিমতো নদীবিজ্ঞান কিংবা নদীপ্রযুক্তি। নদীর উৎস, বয়ে চলা সব কিছুই এখানে চরণবন্দি। এ যেন নদীজীবনী। কবি লিখেছেন—

নদী যত আগে আগে চলে/ততই সাথী জোটে দলে দলে/তারা তারই মতো ঘর হতে/সবাই বাহির হয়েছে পথে/পায়ে  ঠুন ঠুন বাজে নুড়ি/যেন  বাজিতেছে মল চুড়ি। গায়ে আলো করে ঝিক ঝিক/যেন পরেছে হীরার চিক।/মুখে কলকল কত ভাষে/কথা কোথা হতে আসে।/শেষে সখীতে সখীতে মিলি/হেসে গায়ে হেলাহেলি।/শেষে কোলাকুলি কলরবে/তারা এক হয়ে যায় সবে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নদী’ কবিতায় নদীবিষয়ক বিস্তর জ্ঞানের স্ফুরণ ঘটেছে।

‘নদী’ প্রসঙ্গ টেনে আনেননি এমন কবি বিরল। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে নদীর সঙ্গে জীবনের দারুণ সম্পর্ক। জীবনের ব্যঞ্জনার সঙ্গে নদীর ব্যঞ্জনা ধ্বনিত হয় অভিন্ন সুরে। ফলে এক সুরের সঙ্গে অপর সুরের তাল সহজে যুক্ত করা সম্ভব হয়। সে কারণেই আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা নদীকে উপমা হিসেবে নিয়েছেন বারবার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও অভিন্ন কাজটি করেছেন। কিন্তু তাঁর নদীবিষয়ক লিখিত কবিতা সংখ্যাগত ও প্রয়োগগত বিন্যাসে স্বতন্ত্র। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর একটি কথা এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। তিনি তাঁর একটি প্রবন্ধে লিখেছেন—‘অবশ্য রবীন্দ্রনাথ অন্য কথা বলেছেন। ফুলের ফোটা আর নদীর গতির সঙ্গে তুলনা করে তিনি নদীর গতির মধ্যেই মনুষ্যত্বের সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছেন।’ এরপর মোতাহের হোসেন চৌধুরী আরেকটু ব্যাখ্যা করেছেন—‘জানি বলা হবে; নদীর গতিতে মনুষ্যত্বের দুঃখ যতটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৃক্ষের ফুল ফোটানোয় ততটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। তাই কবি নদীকেই মনুষ্যত্বের প্রতীক করতে চেয়েছেন।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নদীবিষয়ক ন্যূনতম আলোচনার জন্যও দীর্ঘ পরিসরই অপরিহার্য। এককথায় বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নদীঅন্তপ্রাণ ছিলেন মনে-মননে-সৃষ্টিতে। তাঁর জন্মদিনে নদীময়স্মরণ।