kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বই আলোচনা

করুণ করোনার বিশ্বস্ত ভাষ্য

পিয়াস মজিদ   

২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



করুণ করোনার বিশ্বস্ত ভাষ্য

করোনাকালে বহতা জীবন : শাইখ সিরাজ। প্রকাশক : অন্য প্রকাশ। প্রচ্ছদ : মাসুম রহমান। দাম : ৮০০ টাকা

শাইখ সিরাজ মানে কৃষিবাংলা, তাঁর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ। সেই মানুষটি আগেও কৃষি, উন্নয়ন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা নিয়ে বই লিখেছেন; কিন্তু এবার ‘করোনাকালে বহতা জীবন’ শীর্ষক তাঁর বইটি একেবারেই অন্য রকম।

বছরখানেক ধরে প্রিয় এই পৃথিবীর ওপর জেঁকে বসা কভিড-১৯ অর্থাৎ করোনা মহামারির ভেতর দিন-রাত যাপনের শব্দগাথা এটি। ব্যক্তিগত অনুভবের সংকলন কিন্তু সামষ্টিক আবেদনে ঋদ্ধ।

প্রাককথনে লিখেছেন তিনি : ‘প্রচলিত গবেষণা, আত্মজীবনী, প্রবন্ধের বই এটি নয়। এমনকি নয় দিনলিপির বই। একটি সময় এসে আমি যখন আমার লেখাই পড়তে বসেছি, তখন আমি নিজেই হারিয়ে গেছি করোনার কঠিন দিনগুলোতে।’

হ্যাঁ, লেখকের মতো পাঠকও মিলিয়ে দেখবেন করোনাকালে তাদের নিজ নিজ স্থবির জীবনের বহতা ভাষ্য। এখানেই বইটির বিশেষত্ব। শুরু হয়েছে ২৩ মার্চ ২০২০ তারিখে করোনাজনিত সাধারণ ছুটির ঘোষণার প্রসঙ্গে আর শেষ হয়েছে মার্চ ২০২১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর উল্লেখ আভায়।

প্রথম দিনের ভুক্তিতে যখন পড়ি : ‘ব্যক্তিজীবনে আমি কাজপাগল মানুষ। সব সময়ই ছুটে বেড়াই। জেলায় জেলায়, দেশে দেশে, এখানে-ওখানে। কদ্দিন ঘরে বসে থাকতে হবে জানি না!’

১৪ মে ২০২০-এর ভুক্তিতে পাই জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের চলে যাওয়ার বিয়োগান্ত সংবাদ : ‘অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আজ বিকেলে ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যুর পর ড. আনিসুজ্জামানের করোনা পজিটিভ আসে। যদিও এর আগে করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ ছিল।’

অবরুদ্ধ অবস্থার উৎসবের বিবরণ দিতেও ভোলেননি তিনি। ২৫ মে ২০২০-এ লিখছেন—‘স্বাভাবিক সময়ে ঈদের দিন সকালে ঈদ জামাত ধরতে মসজিদে যাওয়ার ব্যাপারে যে তাড়া থাকে, এবার সেটা একেবারেই নেই। কারণ আমরা পারিবারিক ঈদ জামাতের সময় নির্ধারণ করেছি সকাল ৯টায়, আমাদের বাসার কমিউনিটি হলে।’

করোনায় করুণ খবরের পাশাপাশি আশার আলোগুলোও দেখিয়েছেন লেখক। ২ জুন ২০২০-এর ভুক্তিতে লেখেন—‘মহামারি করোনাভাইরাসের সংকটেও আশার আলো দেখাচ্ছে রেমিট্যান্স। চলতি অর্থবছরের এক মাস বাকি থাকতেই প্রায় গত অর্থবছরের সমান রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।’

দেশের বাইরের খবর বিষয়েও সমান উৎসাহী লেখক। তাই মার্কিন মুল্লুকে করোনারকালে বর্ণবাদী আক্রমণে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েডের চাপা শ্বাস কিভাবে নতুন  সংগ্রামী শ্বাসের জন্ম দিয়েছে তার সাক্ষ্য ধরা রইল এই বইয়ে—‘যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুতে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে আরেক মহাদেশ অস্ট্রেলিয়াতেও। সেখানে দেশজুড়েই ‘ব্ল্যাক লাইভস মেটার’ বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এই বিক্ষোভকারীরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছেন না, বরং এই আন্দোলনকে তাঁরা তাঁদের দেশের আদিবাসীদের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশের একটা সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন।’

অল্প কথায় এই বই নিয়ে বলা কঠিন; কিন্তু মানব ইতিহাসের যে কঠিন সময়কেও শাইখ সিরাজ এই বইয়ে ধারণ করে রাখলেন তা উত্তরপ্রজন্মের কাছে মানুষ সম্পর্কে এই বার্তাই দেবে যে করোনার দুষ্কালেও আমরা বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছি। মৃত্যুর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে জীবনের গান গেয়েছি আর জীবন যেকোনো সংকট অতিক্রম করেই বয়ে চলে অনির্বাণ আলোর পানে।