kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

মায়া

তানজিদা আক্তার

২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মায়া

অঙ্কন : মাসুম

কাঠের টুলগুলো মুখোমুখি সাজানো। প্রাণহীন মরা কাঠের টুলগুলো জীবন খুঁজে পায় চঞ্চল কিছু প্রাণের পদচারণে। জীর্ণকে মৃতকে জড়কে জীবনের আনন্দ দেওয়াই প্রাণের লক্ষণ। জড়কে প্রাণের আনন্দ দিতে পারে যে স্পর্শ তাকে বড় প্রেমের থেকে কোনো অংশে ছোট বলা যায় না। এই প্রেমের প্রাণ পরিবর্তনশীল কিন্তু আনন্দ, সুখ সে তো চলমান।

জামসেদ ভাইয়ের চায়ের দোকান। ক্লাস শেষে সবার একসঙ্গে না বসলে চলে না। বেশির ভাগ দিন দেখা যায়, তরুণরা যে যার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠেছে। আড্ডার বিষয় কখনোই স্থির না, উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পুরোটাই। কয়েকটা কাঠের টুকরো একসঙ্গে করে দোকানিরা চায়ের দোকান দিয়েছে। চা-বিস্কুটের বেশি কিছু আশা করা যায় না এখানে। মানের বিচারে মনকাড়া না হলেও চা-বিস্কুটের স্বাদ রাজ অন্নের চেয়েও বেশি। কিছু একটা বসার ব্যবস্থা, কাঠ দিয়ে জোড়া দেওয়া। সবাই যাতে একসঙ্গে বসতে পারে সে ব্যবস্থাও খানিকটা রয়েছে। মুখোমুখি চারটি টুল, মাঝে চতুর্ভুজ আকৃতির ফাঁকা জায়গা। গল্প চলছেই—হঠাৎ সিদ্ধান্ত চল কোথাও যাওয়া যাক। সেদিনের দলটা অবশ্য একটু আলাদা, সাত-আটজনের একটা দল, ভিন্ন বয়সের, ভিন্ন আবহের। কথায় কথায় একজন একটি সাপের খামারের কথা বলে, সবাই মনোযোগী হয় তার প্রতি। জীবন্ত সাপের খামার, বিষয়ের নতুনত্ব সবাইকে আকৃষ্ট করে, তৎক্ষণাৎ দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। যে কথা সেই কাজ—যাত্রা শুরু।

গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে যেতে হয়। উঁচু-নিচু গ্রামের পথ। গ্রামের শেষ প্রান্তে—গ্রামের বাইরে ফাঁকা জায়গায় সেই কাঙ্ক্ষিত খামার। তনিমা ছোটবেলা থেকে সাপ ভয় পায়, সাপের কথা শুনলেই তার গা শিউরে ওঠে। এতক্ষণ সে অনেক সাহস দেখিয়ে আসছিল। আজ যখন বন্ধুদের সঙ্গে চলে এসেছে তখন আর তার আগের ভয় নেই। রাস্তা দিয়ে আসার সময় আনন্দের মধ্য থেকে সাহস সঞ্চয় করে এসেছে। এখন একেবারে কাঙ্ক্ষিত এ যাত্রার শেষবিন্দুতে, দাঁড়িয়ে আছে সাপের খামারের পাশে। গ্রামের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছানোর পর সে দেখল সামনে একটা ইটের প্রাচীরঘেরা ঘর আর সেই ঘরের মধ্যেই আছে সাপ নামের ভীতিকর প্রাণী। তনিমা আবার একটু মনের মাঝে হোঁচট খেল। তার পা কাঁপতে লাগল এই ভেবে যে দেখতে গেলে সাপ তাকে পেঁচিয়ে ধরবে। ভীতিকর ভাবনায় তনিমা যখন মগ্ন, খামার মালিকের অপেক্ষায় সবাই তখন অস্থির। বন্ধুদের ডাকে সে যখন হুঁশ ফিরে পেল ততক্ষণে তার ঠোঁট, মুখ, গলা সব শুকিয়ে গেছে।

অবশেষে খামারি এসে হাজির। খামার দেখানোর আগে সে তার খামারি হয়ে ওঠার গল্প শোনাতে লাগল। কেন, কোন মায়ায় সে এই পথ বেছে নিয়েছে সে গল্প চলছিল অবিরাম। তনিমা একটা সময় ভয় ভুলে খামারির গল্পের মধ্যে হারিয়ে গেল। খামারির গল্পগুলোর মধ্যে, তনিমার মনে হোঁচট দিল যে কথাটা—সেটা হলো এই ভিন্নধর্মী পথ বেছে নেওয়ার জন্য খামারিকে অনেক নিগ্রহের স্বীকার হতে হয়েছে। গ্রাম ছেড়ে গ্রামের বাইরে অবস্থান নিতে হয়েছে, সবাই তাকে পরিত্যাগ করেছে। অনেকটা সময় তার জীবন যাপন ছিল বেশ কষ্টের। সবাই তাকে ঘেন্না করেছে। অবশেষে সে একটা অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ একদল শিক্ষিত তরুণ যখন তার খামার দেখতে এসেছে তখন সে সত্যই বিমোহিত ও অত্যন্ত খুশি। খামারির গল্প শুনতে শুনতে হঠাৎ তনিমা হরিয়ে যায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুঞ্জয় চরিত্রের গহিনে। সে-ও ঘৃণার পাত্র ছিল সমাজের কাছে। সাপুড়ে পেশা বেছে নেওয়ার জন্য সমাজ তাকে পরিত্যাগ করে। তার জীবন ভিন্ন পথে প্রবাহিত হয়। মৃত্যুঞ্জয় প্রেমের টানে সাপুড়ে জীবন বেছে নিয়েছিল। তনিমার মনে প্রশ্ন জাগে, খামারি কোন প্রেমে বেছে নিয়েছে এই নিগৃহীত হওয়ার পথ?

হঠাৎ তনিমার ঘোর ভাঙে খামারির কথায়, চলুন তাহলে যাওয়া যাক। আমার বন্ধুদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। তনিমা ইতস্তত হয়ে সবাইকে অনুসরণ করল, ততক্ষণে তার মনের সব ভয় চলে গেছে। এক এক করে সব প্রজাতির সাপ দেখাল খামারি। দেখানোর ফাঁকে সে বারবার বলছিল : ‘সাপকে দেখে ভয় পাবেন না। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন ওদের চোখে মায়া আছে।’ তনিমা তন্ময় হয়ে শুনছিল খামারির কথা। বিস্ময়ের চোখে তনিমা দেখছিল সব কিছু, তার ভয়, ঘেন্না কোনো অনুভূতি আর নেই। কথায় কথায় খামারি বলছিল এই সাপগুলোর প্রতি তার মায়া জন্মেছে। তাদের সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়েছে। সে ছাড়তে চাইলেও এ পথ ছাড়তে পারে না।

টুকটাক কথা চলছিল ওদের মধ্যে। অবশেষে বিদায় নেওয়ার পালা। খামারির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন সবাই হাঁটতে শুরু করেছে, তখন সবার মুখে অনেক গল্প। কেউ বলছে তাদের নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। কেউ বলছে খামারি মিথ্যা বলছে, সাপের প্রতি মায়া আছে এ কথা সত্য নয়, এটা ব্যবসার একটা কৌশল মাত্র। কেউ বা বলছে যাই হোক, কিছু নতুন প্রজাতির সাপ দেখতে তো পেলাম, বুড়ো হয়ে নাতি-নাতনিকে গল্প শোনাতে পারব। শুধু কোনো কথা বলছে না তনিমা, তার ভাবনাজুড়ে ছিল প্রেম। তার কানে বারবার খামারির একটা কথাই বাজছিল—‘সাপকে দেখে ভয় পাবেন না। ভালো করে তাকিয়ে দেখুন ওদের চোখে মায়া আছে।’ তনিমা অবশ্য সাপের চোখে কোনো মায়া দেখতে পায়নি। তবে এটা সে বিশ্বাস করতে নারাজ যে সাপের চোখে মায়া নেই। সে মনকে এই বলে সান্ত্বনা দিল, থাক না সাপের চোখের মায়া খামারির দৃষ্টিতে। কত মায়া জগতে কত কারণে তৈরি হয়, ভেঙেও যায় বিনা কারণে জামসেদের কাঠের টুলের প্রতি মায়ার মতো। কোনো এক মায়ায় তনিমাও খামারির মায়াটাকে অবিশ্বাস করতে পারল না নিজের অজান্তেই।