kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বামপন্থী মার্কেসের চোখে রক্ষণশীল বোর্হেস

রাজু আলাউদ্দিন

২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



বামপন্থী মার্কেসের চোখে রক্ষণশীল বোর্হেস

১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে মার্কেস ‘এল এস্পেক্তাদর’ পত্রিকার এক লেখায় বলেছিলেন : ‘এটা অনস্বীকার্য যে ভালো লেখক মানেই বামপন্থী। সর্বোচ্চ ব্যতিক্রমটিও বিরাট : হোর্হে লুইস বোর্হেস।’

আর প্রায় বছর দশেক পরে একই রকম রাজনৈতিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে বোর্হেস সম্পর্কে বললেন, ‘যদি কোনো লেখক ভালো হন, তাহলে তিনি প্রতিক্রিয়াশীল নন। ব্যক্তি হিসেবে বোর্হেস প্রতিক্রিয়াশীল হতে পারেন; কিন্তু যে লেখা মানবজাতির অগ্রগতিতে অবদান রাখে, তাঁর সেই লেখার মহত্ত্ব দ্বারা লেখক হিসেবে তিনি যথেষ্টই জব্দ।’ (El Veijo Topo, 1979)

কিন্তু আমরা লেখকদের প্রগতি ও প্রতিক্রিয়াশীলতা সম্পর্কে যদি আশপাশে কান পাতি তাহলে শুনতে পাব, একেবারেই বিপরীত অভিমত এবং সেই অভিমত অমান্য করার উপায় নেই। অক্তাবিও পাস সেই ভিন্নমতের উৎস। তিনি মনে করেন :

‘আমাদের মহৎ লেখকদের কেউই প্রগতিশীল নন। রুলফো নন, বোর্হেসও নন। তাঁর প্রাথমিক মার্ক্সবাদ সত্ত্বেও নেরুদা তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতায় আধুনিকতাবিরোধী মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন এবং প্রকাশ করেছেন।’ (Ninguno de nuestros grandes escritores es progresista. No lo es Rulfo. y tanpoco lo es Borges. El mismo Neruda, a Pesar de su Marxismo Premario, exalto y expreso en sus mejores poemas valores y visiones antimodernas!)

মানুষের ইতিহাসে প্রগতি ও প্রতিক্রিয়াশীলতার ধারণাটি অপেক্ষাকৃত নতুন এবং তা রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। রাজনৈতিক মানদণ্ডে কালাতিক্রমী ও প্রচলবিরোধী শিল্পের স্পন্দন পরিমাপ করাটা ভুল পন্থার স্মারক হয়ে উঠতে পারে। মার্কেস নিশ্চয়ই এ বিষয়ে অবগত; কিন্তু বামপন্থায় কট্টর অবস্থানের কারণে ভ্রান্তির চোরাটান অনুভব করলেও তিনি পরস্পরকে কৌতুকের কৌশলে বেঁধে রাখেন। ওপরের দুটি উদ্ধৃতি তেমনই দুই দৃষ্টান্ত।

১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বরে Gente পত্রিকায় রাজনৈতিক বিশ্বাসকে এক পাশে সরিয়ে তিনি বলছিলেন :

‘বোর্হেস আমাকে খুব ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন। সর্বোপরি আমি তাঁর জন্য গভীর শ্রদ্ধা এবং বিরাট বিস্ময় অনুভব করি। তাঁকে আমি সব সময় পড়ি। তিনি আমার বিছানার বালিশের পাশেই। তা ছাড়া একটা গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হচ্ছে এই যে যেকোনো সময় আপনি তাঁর বই নিয়ে যেকোনো একটা লেখা সম্পূর্ণ পড়ে ফেলতে পারবেন। কারণ লেখাগুলো ছোট ছোট।’

বোর্হেসের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধার কথা অন্য একটি লেখাতেও উল্লেখ করেছিলেন, গুয়াতেমালার কথাসাহিত্যিক মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসের নোবেল পুরস্কার প্রসঙ্গে। ১৯৬৭ সালে তিনি পুরস্কারটি পেয়েছিলেন। পরের বছর ১৯৬৮ সালের নভেম্বরে Indice পত্রিকায় মার্কেস লিখলেন :

‘আস্তুরিয়াসের আগে নোবেল পুরস্কারটি পাওয়া উচিত ছিল নেরুদা ও বোর্হেসের—ঠিক এই ক্রমে। যে আস্তুরিয়াস পুরস্কারটি পাওয়ার জন্য নিজেকে বিকিয়ে দিয়েছেন, সেই আস্তুরিয়াসের রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনায় বোর্হেসের রাজনৈতিক অবস্থান অনেক বেশি সৎ। হতভাগা বুড়ো! আমি বলব, অত বেশি সত্ভাবে রক্ষণশীল হওয়টাই বোর্হেসকে নোবেল পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে।’

এটা ঠিক যে রাজনৈতিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতা, কমিউনিজমের প্রতি কটাক্ষ এবং নিজের দেশের ও চিলির কোনো কোনো সামরিক শাসকের প্রতি সমর্থন তাঁকে নিশ্চিতভাবেই পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করেছে। অথচ বামপন্থী নেরুদা থেকে শুরু করে মার্কেস পর্যন্ত মনে করতেন নোবেল পুরস্কারটি বোর্হেসের বহু আগেই পাওয়া উচিত ছিল। পুরস্কার পাওয়ার প্রশ্নটি যদি না-ও আসে, সবাই অন্তত একবাক্যে বোর্হেসের সাহিত্যকৃতির অনন্যতাকে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করে নেন—রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতাকে একপাশে সরিয়ে রেখেই। সে কথা মার্কেসও মনে করতেন বলেই ১৯৮২ সালের অক্টোবরে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরপরই Gente পত্রিকায় বলেছিলেন :

‘বোর্হেসের সাহিত্যকর্মের বিরাট মূল্যকে স্বীকার করা আর ডানপন্থী ধারণা প্রকাশ করার কারণে তাঁকে নোবেল পুরস্কার না দেওয়াটা এক বিরাট ভুল, ... এক শতাব্দীর মধ্যেই বোর্হেস, কানেত্তি কিংবা মার্কেস, তাঁদের রাজনৈতিক ধারণার জন্য নয়, বরং স্মরণ করা হবে তাঁদের কাজের জন্য। প্রকৃত লেখক, প্রকৃত স্রষ্টার ক্ষেত্রে রাজনীতি সব সময়ই বাড়তি এক মূল্য।’

ভুল বলেননি মার্কেস। বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িত কোনো তরুণ বা প্রবীণ হয়তো রাজনৈতিক মতাদর্শের সাযুজ্যের ফলে কৌতূহল নিয়ে নেরুদা কিংবা মার্কেস পড়বেন, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নেরুদা ও মার্কেসের জনপ্রিয়তা এতই বেশি যে নিশ্চতভাবেই অনুমান করা যায় ওই বিপুল পরিমাণ পাঠকের সবাই বামপন্থী নন, বরং নানা রাজনৈতিক মতের মানুষ। আর এই ভিন্ন ভিন্ন মতের পাঠকদের মৌচাকের মতো একটি জায়গায় এনে বসাতে পারছেন তাঁরা, তা রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নয়, বরং মানুষের শাশ্বত ও চিরন্তন, কিংবা সর্বজনীন এমন কিছু চিত্তবৃত্তি ও অনুভূতির প্রকাশ রয়েছে, যার চুম্বকীয় টানে তাঁরা একত্র হন।

তবু এসব জানা সত্ত্বেও মার্কেসের কাছে বোর্হেস ছিলেন মিশ্র অনুভূতির জন্মদাতা। মিশ্র হওয়ার কারণ একদিকে রাজনীতি, যা বোর্হেসকে গ্রহণে প্রবল কোনো প্রতিরোধ গড়ে না তুললেও দ্বিধার এক চিকন রেখায় তিনি বোর্হেসকে গণ্ডীভূত করতে ভোলেন না, আবার বোর্হেসের সাহিত্যের বিপ্লবী ভূমিকাকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। ফলে তিনি যখন বোর্হেসকে গ্রহণ করেন, তখন সেই গ্রহণে তিনি কিছু কিছু বিষয়ে নিঃসংশয় হতে পারেন না, যেমনটা পারেন ফুয়েন্তেস কিংবা মারিও বার্গাস যোসা। বার্গাস যোসার সঙ্গে কথোপকথনে এটা অনেক বেশি আমাদের নজরে পড়বে যদি একটু সতর্ক হয়ে তাঁদের কথাবার্তা শুনি।

বার্গাস যোসা : এবার আমি চাইব, তুমি যদি একটু খুলে বলতে, ঠিক কোন অর্থে তুমি নিজেকে ঔপন্যাসিক মনে করো? যে বিষয়গুলোকে তুমি স্পর্শ করো সে কারণে? তোমাকে এ প্রশ্নটি করলাম বোর্হেসের উদাহরণটি মাথায় রেখে। বোর্হেসের রচনাকর্মের বেশির ভাগ জুড়ে এমন বিষয় উপস্থিত যেগুলোকে ঠিক আর্হেন্তিনীয় বলা যাবে না।

গার্সিয়া মার্কেস : দেখো, বোর্হেসের মধ্যে আমি লাতিন আমেরিকা দেখি না, আর আমি এ ব্যাপারটি নিয়েও একটু বলতে চাই যে কোর্তাসারকে যে লাতিন আমেরিকান লেখক হিসেবে গণ্য করা হয় না, সে ব্যাখ্যাটিও একপেশে, ঢালাওভাবে বলা, যে ভুল ধারণাটির অবসান হওয়া উচিত। আমি বুয়েনস এইরেসে গেছি। একপাশে জঙ্গল ও একপাশে সাগরের মধ্যে অবস্থানকারী এই বিশাল ইউরোপীয় শহরটিকে সশরীরে চেনার পর আমার কাছে মনে হয়েছে, আমি কোর্তাসারের কোনো বইয়ের মধ্যে আছি। কোর্তাসারের মধ্যে যে ইউরোপ, সেটা আসলে বুয়েনস এইরেসের ইউরোপীয়, অর্থাৎ ইউরোপীয় প্রভাবের ফল। বুয়েনস এইরেসে গিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে কোর্তাসারের গল্প, উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে রাস্তাঘাটে সবখানে দেখা যায়। এভাবে আমার উপলব্ধি ঘটেছে যে কোর্তাসার ভীষণভাবে লাতিন আমেরিকান, কিন্তু বোর্হেসে তেমনটা দেখা যায় না। (সংলাপ : ‘লাতিন আমেরিকান উপন্যাস নিয়ে’, তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, পৃ. ৪০)

উদ্ধৃত এই উক্তির মধ্যে আমরা লক্ষ করব, মার্কেস লাতিন আমেরিকান লেখক বলে মনে করেন না বোর্হেসকে। বোর্হেসকে কেন তিনি লাতিন আমেরিকান, এমনকি আর্হেন্তিনীয় লেখক বলেও মনে করেন না? আর্হেন্তিনীয় কেন মনে করেন না, তাঁর ব্যাখ্যাটা আমরা লক্ষ করব যখন তিনি বোর্হেস ও কোর্তাসারের মধ্যে তুলনা করে বলেন যে কোর্তাসারে বুয়েনস এইরেসে উপস্থিত। সেই উপস্থিতি যদি বোর্হেসের মধ্যে থাকত তাহলে তিনি বোর্হেসের কথাও উল্লেখ করতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এটা অনুমান করা অসম্ভব নয় যে বোর্হেসকে লাতিন আমেরিকান না ভাবার পেছনে বোর্হেসের লেখার বিষয়বস্তুই প্রধান। তার আগে, এমনকি সমকালেও বেশির ভাগ লেখকই লেখার প্রেক্ষাপট কিংবা বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিয়েছেন স্বদেশ, আর যদি স্বদেশ পেরিয়ে আরেকটু দূরে কোথাও যান, তবে বড়জোর লাতিন আমেরিকারই কোনো দেশে। কিন্তু বোর্হেসের Hombre de la Esquina Rosada কিংবা ওরকম দু-একটি গল্প বাদে বেশির ভাগ গল্পেরই প্রেক্ষাপট, বিষয় কিংবা চরিত্র লাতিন আমেরিকার বাইরে; প্রায়শই ইউরোপ, মাঝেমধ্যে দূরপ্রাচ্য ও ভারতবর্ষ, চীন। ইউরোপীয় জ্ঞান ও দর্শনকে তিনি সচরাচর আবহ হিসেবে ব্যবহার করেন বলে তাঁকে ইউরোপীয় ধরনের লেখক বলে মনে করা হয়েছে। আর যখন তাকে কেউ ইউরোপীয় বলছেন না, তখন অন্তত লাতিন আমেরিকা সম্পর্কে তিনি ‘অনভিজ্ঞ’ বলে রায় দিয়েছেন কেউ কেউ।

মার্কেসের আগে থেকেই ইউরো-বিরোধিতার একটা ধারা তৈরি হয়েছিল আলেহো কার্পেন্তিয়ের ও মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াসের মাধ্যমে, যদিও তাঁরা দুজনই পড়াশোনা করেছেন এবং জীবনের একটা বড় সময় কাটিয়েছেন ইউরোপেই। বংশ পরিচয়েও তাঁরা ইউরোপীয় রক্তপ্রবাহের ধারক। তবু লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য ও দেশজতার প্রশ্নে এই দুই লেখকই ছিলেন ইউরোপীয় জ্ঞানের প্রয়োগের বিপক্ষে। কার্পেন্তিয়ের তো সরাসরি বলেছেনই যে,

‘যা আমাদের এড়িয়ে চলা উচিত, তা হলো আমাদের সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় শক্তির প্রবল উপস্থিতি। ...উদাহরণস্বরূপ, একদিকে বোর্হেসকে আমরা পাচ্ছি, যিনি সর্বকালের সেরা গল্পকারদের একজন; তিনি Manuel de Zoologia Fantastica লেখেন; কিন্তু দক্ষিণ কোণের এই মানুষটি মনে হয় মহাদেশের উরুগুয়ে পেরিয়ে কী ঘটছে তা তিনি জানেন না। যদিও তাঁর অসংখ্য পাঠক রয়েছে। ফলাফলটা এই যে তাঁর গধহঁবষ-এ মানুষের কল্পনার কাল্পনিক সব প্রাণী এবং দানবীয় সব জন্তুর সমাবেশ ঘটিয়েছেন... স্পানঞলদের দ্বারা বিজিত আমেরিকার প্রাণীগুলো ছাড়া। (Palabras en el Tiempo de Alejo Corpentier, Ramon Chao, 1984, P 158)

আলেহো কার্পেন্তিয়েরের মতো বামপন্থী হিসেবে পরিচিত গুয়াতেমালার লেখক মিগেলেরও একই অভিযোগ :

‘আমেরিকান-আদিবাসী হিসেবে আমি যখন বোর্হেস পড়তে যাই, তখন মনে হয় যেন আমি ইউরোপীয় কোনো লেখককে পড়ছি, যিনি ইউরোপীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর পাণ্ডিত্যসম্পন্ন, যাঁর আগ্রহ ইউরোপীয় বিষয়ে, যিনি বিরামহীনভাবে নিজের ব্যক্তিত্ব, নিজের অহংয়ের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে যাচ্ছেন। তাঁর লেখার মধ্যে প্রচুর ইউরোপীয় উপাদান এবং আমি এর মধ্যে আমেরিকান শিকড় খুঁজে পাই না, এমনকি আপনি যদি বলেন, আমাদের ত্রুটিগুলোও ওতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। এতে করে অবশ্য মহান লেখক হিসেবে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না বটে, কিন্তু আমার প্রশ্নটা হচ্ছে তিনি আসলে লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের প্রতিনিধিত্ব করেন কি না!’ (Seven Voices, Rita Guibert, Alfred A. Kaopf, 1972, P 155)

কার্পেন্তিয়ের ও আস্তুরিয়াস, দুজনই বোর্হেসের সাহিত্যের শিকড়হীনতার ব্যাপারে অভিন্ন এক উপলব্ধির সহোদর। কিন্তু লাতিন আমেরিকার ভিন্ন দুই প্রান্তের দুই লেখক কার্লোস ফুয়েন্তেস ও মারিও বার্গাস যোসা, দুজনই একেবারে পুরোপুরি বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে একই বিষয়ে আমাদের জানাচ্ছেন বোর্হেস সম্পর্কে তাঁদের অভিমত। প্রথমে দেখা যাক বোর্হেসের লেখায় আর্হেন্তিনা বা লাতিন আমেরিকার উপস্থিতি/অনুপস্থিতি সম্পর্কে ফুয়েন্তেসের মন্তব্য, যেখানে আমরা দেখব অনুপস্থিতির মাধ্যমে উপস্থিতি, কল্পনার মাধ্যমে বাস্তবতার নির্মাণ।

১. ‘এই সংকট জ্যাকব ব্রনস্কির দাবাসম্পর্কিত ভাবনার কথা মনে করিয়ে দেয় এবং তাতে যেন একটু স্বস্তিও বোধ করি। ব্রনস্কি বলেছিলেন যে আমরা দাবার যেসব চাল দেব বলে ঠিক করি অথচ পরে বাতিল করে দিই, সেগুলোও কিন্তু দেওয়া চালের মতোই সম্পূর্ণ খেলাটির অংশ। আমার মনে হয় বোর্হেসের যেকোনো পাঠ সম্পর্কেও কথাটা সত্য।’ (‘প্রসঙ্গ বোর্হেস’, সম্পা: রাজু আলাউদ্দিন, ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০, পৃ ৫৩, ৫৪)

২. ‘আর্হেন্তিনার লেখক হিসেবে, লাতিন আমেরিকার লেখক হিসেবে বোর্হেসের পরিচয়টি তুলে ধরতে চাই। এভাবে সীমিত করে আমি অবশ্য তাঁকে খাটো করছি না। এ কথা আমার বেশ মনে আছে যে বোর্হেস আদৌ আর্হেন্তিনার লেখক কি না এবং তেমন হলে কেন কিংবা কিভাবে তিনি আর্হেন্তিনার লেখক—এসব প্রশ্নের চেয়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তাঁর লেখায় রয়েছে।’ (পৃ. ৫৫)

ফুয়েন্তেস কথিত বোর্হেসের আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের দিকে না তাকিয়ে আলোচ্য বিষয়ে নিজেদের কেন্দ্রীভূত রাখতে চাই। লাতিন আমেরিকান লেখক না হওয়ার যে-অভিযোগটি কার্পেন্তিয়ের থেকে শুরু করে মার্কেস পর্যন্ত এসে যেমনটা ঘনীভূতরূপে দেখতে পাচ্ছি, আমরা তার উত্তর পাওয়ার জন্য ফুয়েন্তেস ও মারিওর অভিমতগুলোয় বিলি কাটব খানিকটা।

এ প্রসঙ্গে ফুয়েন্তেসের আরো দুটি উক্তি পাঠকদের সামনে হাজির করব।

৩. “‘মৃত্যু ও কম্পাস’ গল্পে কিন্তু বুয়েনোস এইরেসের নামও উচ্চারণ করা হয় না। কিন্তু গল্পটা তাঁর ওই শহরেরই কাব্যিক দর্শন—প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিতে লেখা ‘রাস্তার লোক’ জাতীয় গল্পের চেয়ে অনেক বেশি।” (পৃ. ৬১)

এমন ভাবার কোনোই কারণ নেই যে এসব ফুয়েন্তেসের কষ্টকল্পিত ব্যাখ্যা, স্বয়ং বোর্হেসও যে ওভাবেই ভেবেছিলেন, তার উদাহরণ পাওয়া যাবে বোর্হেসের স্বীকারোক্তিতেই :

‘১৯২৩ সাল থেকেই আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আসছিলাম বুয়েনোস এইরেসের কবি হওয়ার, কিন্তু কখনোই খুব একটা সফল হইনি। ১৯৪২ সালে যখন ‘মৃত্যু এবং কম্পাস’-এ শহরের একটা দুঃস্বপ্নময় সংস্করণ তৈরি করলাম, তখন আমার বন্ধুরা বলল যে শেষ পর্যন্ত বেশ ভালোভাবে চিনে নেওয়ার মতো করে শহরটার একটা আদল আমি জাগিয়ে তুলতে পেরেছি।’ (The Aleph and Other Stories, Translated by Norman Thomas di Giovanni, E. P. Dutton & Co, 1970, P. 268)

এটা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক যে বোর্হেসের লেখায় আর্হেন্তিনা এবং লাতিন আমেরিকাকে বোর্হেসের বন্ধুরা এবং কার্লোস ফুয়েন্তেস ও মারিও খুঁজে পেলেও কার্পেন্তিয়ের, আস্তুরিয়াস ও মার্কেস কখনো খুঁজে পাননি। তাঁদের কাছে কি বোর্হেসের আর্হেন্তিনা এবং লাতিন আমেরিকা রবীন্দ্রনাথের সেই গানের মতোই : ‘সে যে চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়?’ কিন্তু চোখ এড়ায় না ফুয়েন্তেসের।

আবার ফিরে আসা যাক বোর্হেস সম্পর্কে মার্কেসের আরো কিছু মন্তব্যে। মন্তব্যগুলো আসছে মারিওর সঙ্গে আলাপের সূত্রেই।

বার্গাস যোসা : যখন তুমি বলছ যে তোমার কাছে বোর্হেসের সাহিত্য আর্হেন্তাইন বা লাতিন আমেরিকান মনে হয় না, বরং মনে হয় এ এক বিশ্বজনীন বা কসমোপলিটান সাহিত্য—সেটা কি কোনো সোজাসাপ্টা মূল্যায়ন বা নিরিখ?

গার্সিয়া মার্কেস : আমার ধারণা এ এক ছলছুতার সাহিত্য। বোর্হেস প্রসঙ্গে একটি কথা বলি : তিনি সেই লেখককুলের একজন, যাঁদের লেখা আমি সবচেয়ে বেশি পাঠক করি, আর হয়তো তাঁর লেখাই সবচেয়ে কম পছন্দ করি। বোর্হেসকে পড়ি তাঁর অসাধারণ কারিগরি দক্ষতার জন্য। তাঁকে পাঠ করলে লেখালেখি শেখা যায়। অর্থাৎ তিনি গল্প বলার মুশনিয়ানা ও নির্মাণশৈলী শেখান। সেদিক থেকে বিচার করলে আমার এ বক্তব্য একটি মূল্যায়নই বটে। আমি বলব বোর্হেস মানসিক বাস্তবতা নিয়ে কাজ করেন শারীরিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে, এ এক ছলছুতো, অন্যদিকে কোর্তাসার তা নন।’ (সংলাপ : ‘লাতিন আমেরিকান উপন্যাস নিয়ে, তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, শুদ্ধস্বর, পৃ. ৪০, ৪১)

বোর্হেসের মহত্ত্ব ও শিল্পকুশলতা নিয়ে মার্কেসের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই, কিন্তু বোর্হেসের দেশজতা ও বাস্তবতা নিয়ে তাঁর গভীর সংশয় রয়েছে। তবে বোর্হেসের বাস্তবতাকে সরাসরি লাতিন আমেরিকার না বলে, ওটাকে তিনি সুভাষিত চাতুর্যে এড়িয়ে যান। মারিওর সঙ্গে বোর্হেস সম্পর্কে তাঁর সর্বশেষ উক্তিতেও আছে মার্কেসের সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন :

বার্গাস যোসা : তোমার এ ভাবনা উদ্দীপনা জোগাবে। সেই অভীপ্সিত সমগ্রতাস্পর্শী উপন্যাস, যা ভবিষ্যতে সব লাতিন আমেরিকান ঔপন্যাসিক লিখবেন, যা লাতিন আমেরিকার সামগ্র্যকে প্রতিনিধিত্ব করবে, তোমার কি মনে হয় সেই উপন্যাস কোনো এক উপায়ে বাস্তবতার সেই অংশ, যাকে আমরা অবাস্তব বলে চিহ্নিত করি, তারও জায়গা থাকবে, যে ঘরানায় মূলত অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন বোর্হেস? তোমার কি মনে হয় না যে বোর্হেস কোনো এক উপায়ে আর্হেন্তাইন অবাস্তবতা, লাতিন আমেরিকান অবাস্তবতার ছবি আঁকছেন, যা সেই অবাস্তবতাকে বিবৃত করছেন? এ অবাস্তবতা কি সমগ্রতাস্পর্শী বাস্তবতার একটি বিস্তার বা মাত্রাও নয়? তোমাকে এ প্রশ্ন করছি কারণ বোর্হেসের প্রতি আমার অনুরাগকে ঠিকমতো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সব সময়ই সমস্যায় পড়েছি।

গার্সিয়া মার্কেস : ওহ, তাঁর ব্যাপারে আমার কোনো সমস্যা নেই। বোর্হেসের প্রতি আমার প্রবল অনুরাগ, প্রতি রাতে তাঁর লেখা পড়ি। বুয়েনস এইরেস থেকে একটি মাত্র জিনিসই কিনেছি আমি, আর তা হলো বোর্হেসের রচনাসমগ্র। আমি যেখানেই যাই, আমার সুটকেসের ভেতর খণ্ডগুলো থাকে, প্রতিদিন পড়ি এবং তিনি এমন একজন লেখক যাঁকে অপছন্দ করি... কিন্তু পাশাপাশি তাঁর গল্পগুলো ফাঁদতে গিয়ে তিনি যে সুর ও স্বর বাঁধেন সেটা আমার ভীষণ পছন্দ। আমার ধারণা বোর্হেসের রচনায় যে অবাস্তবতা, তা ছলনাপূর্ণও বটে, ওটা লাতিন আমেরিকার অবাস্তবতা নয়। এখন যা বলব তা একটি কূটাভাস : লাতিন আমেরিকার অবাস্তবতা এতটাই বাস্তব ও আটপৌরে যে বাস্তবতা বলতে ঠিক কী বোঝায় তা একদম গোলমেলে।’ (সংলাপ : ‘লাতিন আমেরিকান উপন্যাস নিয়ে, তর্জমা : রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, শুদ্ধস্বর, পৃ. ৪৪, ৪৫)

আমরা এরই মধ্যে মার্কেসের মন্তব্যগুলোয় লক্ষ করেছি, বোর্হেসকে পছন্দ করার পাশাপাশি বোর্হেসের লেখায় লাতিন আমেরিকা এবং এর বাস্তবতার অনুপস্থিতির কথা বলেছেন। তাঁরই সমসাময়িক ও সহযাত্রী বিশ্বমানের দুই লেখক ফুয়েন্তেস ও মারিও, বোর্হেস সম্পর্কে ওই দুটো অভিযোগকেই শুধু প্রত্যাখ্যান নয়, খণ্ডন করে দেখিয়েছেন কেন অভিযোগ দুটো সত্য নয়। ফুয়েন্তেস তো স্পষ্ট করেই বলেছেন : ‘বোর্হেসের মতো লেখক হচ্ছেন খাঁটি লাতিন আমেরিকার লেখক। ঘটনা হচ্ছে, তিনি তীব্র ইউরোপীয় হওয়ার মাধ্যমে শুধু আর্হেন্তিনীয় হওয়ারই ইঙ্গিত দেন। কোনো ইউরোপীয়ই এতটা তুঙ্গ পর্যায়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা অনুভব করেননি, যা বোর্হেস একটি বাস্তবতা তৈরির জন্য করেছেন’, (প্রসঙ্গ বোর্হেস, প্রসঙ্গ বোর্হেস, সম্পা: রাজু আলাউদ্দিন, ঐতিহ্য প্রকাশনী, ২০১০, পৃ ১৪)

মার্কেসের নজর থেকে বারবার পিছলে গেছে বোর্হেসের বৈশিষ্ট্য।