kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

বিনোদপুরের জ্যোতি

হরিশংকর জলদাস

২২ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিনোদপুরের জ্যোতি

জ্যোতির সঙ্গে আমি ক্লাস ফাইভ অবধি পড়েছি, বিনোদপুর প্রাইমারি স্কুলে।

আমি আসতাম নমুদের পাড়া থেকে। আর জ্যোতি আসত জমিদারবাড়ি থেকে। জ্যোতির বাবা ক্ষিতীশ চৌধুরী বিনোদপুর জমিদারবাড়ির শেষ প্রতিনিধি। চৌধুরী পদবিটি ছাড়া ক্ষিতীশ চৌধুরীর পোশাক-আশাকে বা গায়ে-গতরে জমিদারের কোনো চিহ্ন ছিল না। কাঁধ বরাবর লম্বা সাদা চুল, দীর্ঘ শ্মশ্রু, দুই জেরের শুভ্র ফতুয়া পরে গাঁময় ঘুরে বেড়াতেন ক্ষিতীশ চৌধুরী। ধুতির গোছা বাঁ হাতে ধরে সামনের দিকে একটু ঝুঁকে হাঁটতেন। লোকেরা প্রণাম জানালে পুরু লেন্সের চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে সামান্য মাথা নাড়তেন তিনি। তাঁর কাজ ছিল বিনোদপুরের আনাচকানাচে ঘুরে ঘুরে খাসজমি চিহ্নিত করা। তাঁর হাতে গোল করে গোটানো বিনোদপুরের ছিট। জেবে থাকত কাঠপেনসিল, কাঁটা কম্পাস আর আতশ কাচ। খাল-নাল, স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি দেখলে মাটিতে ছিটটি বিছিয়ে কম্পাস দিয়ে ছিটের ওপর মাপজোখ শুরু করতেন। তারপর ওই জমির ক্রেতা খুঁজতেন। ক্রেতারা যত টাকা বলত, তা নিয়ে খুঁটি পুঁতে ক্রেতাকে জায়গা বুঝিয়ে দিতেন। এমনও হয়েছে, এক জায়গা দু-তিনজনের কাছে বিক্রি করেছেন চৌধুরী মশাই। মাঝেমধ্যে মান-অপমানেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। এসব গায়ে মাখতেন না তিনি।

ক্ষিতীশ চৌধুরী এসব করতেন শুধু পেটের দায়ে। পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য ক্ষয়াটে জমিদার বাবুর আয়ের অন্য কোনো পথ ছিল না। ঘরে তাঁর দুই পুত্র, এক কন্যা। স্ত্রীও তখন রোগগ্রস্ত। বখাটে পুত্র দুটিকে নিয়ে চৌধুরী মশাইয়ের কষ্টের অন্ত ছিল না।

জমিদারবাড়িটি তখন বারোভূতে টানাটানি করছে। নিচের তলাটা নানা আত্মীয়-স্বজন দখল করে নিয়েছে। ওপরতলার অর্ধেকাংশ কাকাতো ভাই সুমন্ত চৌধুরী ভাড়া দিয়ে সপরিবারে শহরে থাকে। বাড়ির চারদিকে চৌহদ্দি একটা আছে বটে, তবে তা না থাকারই শামিল। ভাঙাচোরা দেয়ালের ফাঁকফোকর দিয়ে জমিদারবাড়িতে ঢুকতে কেউ বাধা দেয় না।

এ রকম জমিদারবাড়ি থেকে জ্যোতি প্রাইমারি স্কুলে পড়তে আসত। একটু দেরি করেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল জ্যোতি, একেবারে ক্লাস থ্রিতে। ভর্তি হয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় ফার্স্ট। জ্যোতির ফার্স্ট হওয়ার পেছনে হেডস্যারের কোনো কারসাজি ছিল না। জ্যোতি মেধাবী ছিল। মেধার জোরেই সে ফার্স্ট হয়েছিল। ফোরের প্রথম দিকে আমাকে খেয়াল করেছিল জ্যোতি। মুখচোরা আমি পেছন বেঞ্চে বসতাম। বসতাম মানে অজিত চক্কোত্তি স্যারই বলে দিয়েছিলেন পেছনের বেঞ্চিতে বসতে। নমুপাড়া থেকে আসা বিভাস তো পেছনের বেঞ্চেই বসবে!

‘নমুপাড়ার ছাওয়াল’ হলে কী হবে, দেখতে আমি লালটুস ছিলাম। মহেন্দ্র স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে অঙ্ক করাতে করাতে পেছন দিকে সরে আসতেন। আমার গাল দুটি ডান হাতের বুড়ো আর তর্জনী দিয়ে টিপে দিয়ে বলতেন, ‘কিরে লালটুস, অঙ্কটা বুঝতে পারছিস?’

আমি দাঁড়িয়ে অঙ্ক খাতাটা এগিয়ে ধরে বলতাম, ‘অঙ্কটা আমি করে ফেলেছি, স্যার।’

খাতায় চোখ বুলিয়ে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মহেন্দ্র স্যার হৈচৈ করে বলে উঠতেন, ‘বিভাস রে, তুই আমাদের স্কুলের মান বাড়াবি রে!’

একদিন অঙ্ক ক্লাস শেষ হলে জ্যোতি আমার কাছে এসেছিল। জ্যোতি ক্ষয়িষ্ণু জমিদারবাড়ির মেয়ে হলে কী হবে, ভেতরে ভেতরে দেমাগটা ছিল। যার-তার সঙ্গে কথা বলত না জ্যোতি। সামনের বেঞ্চে বসত। সেই জ্যোতি যখন একদিন আমার বেঞ্চির কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, সহপাঠীরা সবাই আঁতকে উঠেছিল, এই বুঝি জ্যোতি বিভাসকে অপমান করে!

জ্যোতি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি অঙ্কে এত ভালো কী করে?’

জ্যোতির জিজ্ঞাসার উত্তরে কী বলব বা কী বলা দরকার, তা ওই মুহূর্তে ঠিক করতে পারছিলাম না। কিছু না বলে আমি খাতায় পেনসিল দিয়ে এলেবেলে আঁকছিলাম।

জ্যোতি আমার বাহুতে মৃদু ঠেলা দিয়ে বলেছিল, ‘এই বিভাস, তোমাকে বলছি, শুনতে পাওনি?’

আমি জ্যোতির দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, ‘জানি না। এমনি এমনি।’

‘কী জানো না! কী এমনি এমনি!’ আমার ছন্নছাড়া উত্তর শুনে জ্যোতি বলে উঠেছিল।

আমি বোকা কণ্ঠে বলেছিলাম, ‘কী করে যে কঠিন অঙ্কগুলি হয়ে যায়, জানি না। অঙ্ক করতে শুরু করলে এমনি এমনি হয়ে যায়।’

ওই দিন সে আমাকে আরেকটি প্রশ্ন করেছিল, ‘তুমি এত ভালো ছাত্র, পেছনে বসো কেন?’

কেন পেছন বেঞ্চিতে বসি, সে কথা কি আর জ্যোতিকে বলা যায়! চক্কোত্তি স্যার যে এখানে বসতে বলে দিয়েছেন, সে কথা চেপে রেখে চুপ করে থাকলাম।

জ্যোতি বলল, ‘কাল থেকে তুমি সামনের বেঞ্চে বসবে। আমার পাশে বসবে।’

এবার আমার অবাক হওয়ার পালা—বলে কী জ্যোতি! পাগল নাকি! মেয়ের পাশে বসব! তা-ও আবার জ্যোতির পাশে! জমিদার বংশের মেয়ের পাশে!

পরদিন ক্লাসে ঢুকতেই দরজার মুখে আমাকে আটকে দিয়েছিল জ্যোতি। নিজের পাশে জায়গা দেখিয়ে বলেছিল, ‘এখানে বসো।’

আমি ইতস্তত করলে জ্যোতি নামের ফ্রক পরা মেয়েটি আমার হাত থেকে একঝটকায় বই-খাতা কেড়ে নিয়েছিল। থপ করে হাই বেঞ্চিতে ওগুলো রেখে বলেছিল, ‘আজ থেকে তুমি এখানেই বসবে।’

আমি জড়সড় হয়ে জ্যোতির পাশে বসে পড়েছিলাম। তার জন্য খেসারতও দিতে হয়েছিল।

অজিত চক্কোত্তি স্যার ক্লাস নিতে এসে বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ পর  বললেন, ‘কী, নমুর পোলা রাজকইন্যার পাশে! চাঁদ পাইতে ইচ্ছা করতাছে তোর? বাঁদরের গলায়...।’

চক্কোত্তি স্যারকে আর কথা বলতে দিল না জ্যোতি। হিসহিসিয়ে বলল, ‘আপনি জাত নিয়ে কথা বলছেন কেন, স্যার? বিভাস নমু বলে কি মানুষ নয়, আর আপনি চক্রবর্তী বলে কি দেবতা?’

চক্কোত্তি স্যারের চোখ দুটি বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। ওই সময় পেছন দিকের বেঞ্চি থেকে কে একজন হাততালি দিয়ে উঠল। তার দেখাদেখি গোটা ক্লাস হাততালিতে ভরে গেল! স্যারের ওপর ছেলে-মেয়েরা ক্ষুব্ধ ছিল। আজ সুযোগ পেয়ে ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা হাততালি দিয়ে সেই অপমানের শোধ নিল।

এর পর থেকে ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষার আগ পর্যন্ত জ্যোতির পাশেই বসে পড়ালেখা করে গেছি।

জ্যোতি আমার জন্য কত কিছু যে নিয়ে আসত! ডাঁসা পেয়ারা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে বলত, ‘আমাদের গাছের।’

এইভাবে আমাদের প্রাইমারি স্কুল শেষ হলো। জ্যোতি বলল, ‘আমাদের বাড়িতে এসো, বিভাস।’

আমি বলেছিলাম, ‘হাই স্কুলে পড়বে না?’

‘আমাদের গ্রামে তো মেয়েদের জন্য হাই স্কুল নাই। দেখি বাবা কী করে!’ বলেছিল জ্যোতি।

ও-ই জ্যোতির সঙ্গে আমার শেষ দেখা। আমি বিনোদপুর হাই স্কুলে সিক্সে ভর্তি হলাম। হিন্দুপাড়ার রঞ্জনের কাছে শুনলাম, জ্যোতিকে কুমিল্লায় তার মাসির বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানেই মেয়েদের স্কুলে পড়বে সে।

তারপর ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ লেগেছে। পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা হয়েছে। অনেক হিন্দু ভারতে চলে গেছে। ক্ষিতীশ চৌধুরীর কাকাতো ভাই তার অংশটি একজন মুসলমানের কাছে বিক্রি করে দিয়ে দেশত্যাগ করেছে। ওই ক্রেতাটি সেই সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার সময়ে নিজের অংশটির দখল নিতে এসে গোটা জমিদারবাড়িটিই দখল করে বসেছে। ক্ষিতীশ চৌধুরী এরপর সপরিবারে কোথায় যে হারিয়ে গেছেন, খবর রাখিনি!

 

স্বাধীনতার পর পঁয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেছে।

আমি ইনকাম ট্যাক্স অফিসের মাঝারি কর্মকর্তা। অনেকের ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল আমার টেবিলে। তদবিরের জন্য প্রতিদিন নানা ধরনের লোক আসে।

একদিন মধ্যবয়সী একজন মানুষ এলেন আমার টেবিলে। দেখলাম, লোকটি সামনের চেয়ারে বসে আমার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে আছেন।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো সমস্যা?’

তিনি টেবিলে পড়ে থাকা লাল একটি ফাইল দেখিয়ে বললেন, ‘যদি দয়া করেন!’

আমি ফাইলটি নিয়ে দেখলাম, সামান্য কাজ। আমি ফাইলটি পাস করে দিলাম।

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, যান। আপনার কাজ হয়ে গেছে।’

তার পরও লোকটি যান না। আচমকা বলেন, ‘আপনি জ্যোতি নামের কাউকে চিনতেন?’

‘জ্যোতি!’ আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

‘হ্যাঁ। জ্যোতিদি এখনো আপনার কথা বলেন।’

আমার ঘোর তখনো কাটেনি। ঘোরের মধ্যেই আমি বললাম, ‘জ্যোতি! কোথায়!’

লোকটি বলল, ‘আমি অমূল্যরতন। জ্যোতিদির বড়দার শ্যালিকাকে বিয়ে করেছি। জ্যোতিদি এখন খুলনা শহরে থাকে।’

‘তার ফোন নম্বর?’ আমি তখনো সুস্থির হতে পারিনি। পঞ্চাশ বছর আগেকার স্মৃতিগুলো আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

একটা কাগজে জ্যোতির মোবাইল নম্বর লিখে আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল অমূল্যরতন।

 

কী কাকতালীয় ব্যাপার! আগামী সপ্তাহে আমি খুলনা যাচ্ছি, অডিটে। আগে থেকেই ঠিক করা আছে, আমার সঙ্গে স্ত্রী ও পুত্রটিও যাবে। যথাসিদ্ধান্তে খুলনা গিয়েছিলাম আমরা। দুদিনের অডিটের কাজ।

এক বিকেলে জ্যোতিকে ফোন দিয়েছিলাম।

জ্যোতি বলেছিল, ‘কে?’

আমি বলেছিলাম, ‘বিভাস। বিনোদপুরের বিভাস।’

ওপার থেকে কোনো কথা বলছিল না জ্যোতি। আমি ‘হ্যালো হ্যালো’ করে যাচ্ছিলাম। বহুক্ষণ পর জ্যোতি ফোঁপানো গলায় বলেছিল, ‘আমাকে কাঁদতে দাও, বিভাস। বুক ভরে একটু কেঁদে নিই, বিভাস!’

অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল জ্যোতির সঙ্গে। কোথায় আছি? কেন খুলনা শহরে এসেছি? সঙ্গে কে কে আছে? একের পর এক প্রশ্ন করে গেছে জ্যোতি। জ্যোতি বলেছে, ‘কাল বিকেলে আমার ছেলে গিয়ে তোমাদের নিয়ে আসবে। রাতে আমাদের বাড়িতে খাবে তোমরা।’ তারপর ঠাট্টা করে বলেছে, ‘বউকে নিয়ে আসবে কিন্তু। দেখি আমার চেয়েও সুন্দরী বউ পেয়েছ কি না!’

আমি বলেছি, ‘রাতে খেতে পারব না, জ্যোতি। অফিসের পক্ষ থেকে ডিনার আছে। ডিনারে অ্যাটেন্ড করা জরুরি।’

‘আচ্ছা বাবা, আচ্ছা। নাশতা তো খেতে পারবে।’

রাতে স্ত্রী-পুত্রকে বলে রেখেছি, ‘আগামীকাল বিকেলে আমার এক ক্লাসমেটের বাসায় যেতে হবে। পঞ্চাশ বছর পর দেখা হবে জ্যোতির সঙ্গে। আমার প্রাইমারি স্কুলের সহপাঠী।’

পরদিন বিকেলে জ্যোতির ছেলে এসে আমাদের নিয়ে গিয়েছিল। জ্যোতির ছেলেটি আমার ছেলেরই বয়সী, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে।

ছিমছাম দোতলা বাড়ি। উঠানজুড়ে আম-জাম-কাঁঠালগাছ। দরজা খুলেই আমার ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল জ্যোতি। দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে বলতে থাকল, ‘সেদিনের সেই পুঁচকে বিভাস কত বড় হয়ে গেছ রে! একটু মোটা হয়েছ ঠিক, দিব্যি চেহারাটা ধরে রাখতে পেরেছ, বিভাস!’ যেন শুধু আমি প্রবীণ হয়েছি, জ্যোতি হয়নি!

আমার স্ত্রীর হাত ধরে, পুত্রটিকে জড়িয়ে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল জ্যোতি। সাজানো ড্রয়িংরুমে বসতে দিল। স্বামীকে দোতলা থেকে ডেকে এনে পরিচয় করিয়ে দিল। স্বামী নবকুমার বাবু স্থানীয় একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক।

একসময় আমার মুখোমুখি বসে পড়ল জ্যোতি। বলে গেল আমার অজানা তার জীবনের বৃত্তান্ত।

টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। এসএসসি ফাইনালের জন্য তৈরি হচ্ছিল জ্যোতি। ৭ই মার্চের ভাষণের পর দেশে ঝড় উঠল। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল সব কিছু। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। জ্যোতি মাসির পরিবারের সঙ্গে আগরতলার শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিল। কাট্টলিতে আশ্রয় নেওয়া জ্যোতির মা-বাবাকে পাকুরা গুলি করে মারল। ভাইয়েরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল।

মিষ্টি একটু হেসে জ্যোতি বলল, ‘ওই শরণার্থীশিবিরে নবকুমারের সঙ্গে আমার পরিচয়। বরিশালে বাড়ি। কলেজে পড়ছিল তখন। যুদ্ধশেষে দেশে ফিরে আমি ভুলে গেলেও নবকুমার ভোলেনি। একসময় বিয়ে হলো আমাদের। খুলনায় পোস্টিং নবকুমারের। সেই সুবাদে এই শহরে গাড়ি-বাড়ি।’

এর মধ্যে খাওয়া হয়ে গিয়েছিল আমাদের। উঠি উঠি করছি, উঠতে ইচ্ছা করছে না। জ্যোতি বারবার বলে যাচ্ছে, ‘আরেকটু বসে যাও। আবার কখন দেখা হয়! পঞ্চাশ বছর পর দ্বিতীয়বার দেখা হলো।’

আমি হেসে বললাম, ‘একবার যখন খুঁজে পেয়েছি তোমায়, আর হারাতে দেব না। তা ছাড়া ফোন তো রইলই। যখন-তখন কথা বলা যাবে।’ ঘড়ি দেখলাম, ডিনারের সময় হয়ে গেছে। জ্যোতিকে তাড়া দিলাম, ‘এবার আমাদের সত্যি ছেড়ে দিতে হবে, জ্যোতি।’

জ্যোতি অদ্ভুত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তোমাকে ছাড়তে যে ইচ্ছা করছে না, বিভাস!’ যেন পাশে তার পুত্রটি নেই, যেন স্বামীটি নেই, যেন আমার পাশে আমার পুত্র-পরিবার নেই। সব কিছু ভুলে জ্যোতি আমার দুটি হাত তার হাতের মুঠোয় ভরে নিল। তারপর গাঢ় কণ্ঠে বলল, ‘সব কিছু ঠিক থাকলে আমি তোমাকেই তো বিয়ে করতাম, বিভাস!’

রাস্তার মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দিল জ্যোতি। বারবার বলতে লাগল, ‘ফোন কোরো, বিভাস। আবার দেখা হওয়া চাই। মরার আগে অন্তত একবার!’

না, জ্যোতির সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। ফোনে কথা হয়েছে কয়েকবার। যতবারই ফোন করেছে জ্যোতি, বলেছে, ‘তোমার সঙ্গে দেখা করতেই আমি চিটাগাং আসব। তুমি খুলনায় এসো, বিভাস।’

তারপর একসময় ফোন করাকরি কমে এসেছিল। চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টে গেছি আমি। পরিবার গোছাতে গোছাতে কখন বছর তিনেক পার হয়ে গেছে!

এরপর এলো করোনার কাল। বিষাদের রাত্রি! নিরন্নের দিন। হাজারে লাখে মানুষ মরছে। গৃহের অভ্যন্তরে মরণের ভয়ে মাথা গুঁজে বসে আছি।

এই বিপন্ন সময়ে হঠাৎ এক দুপুরে আমার জ্যোতির কথা মনে পড়ে গেল। আমি পড়িমরি করে মোবাইল হাতে নিলাম।

বললাম, ‘হ্যালো! হ্যালো জ্যোতি!’

ওপার থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘কে আপনি?’

আমি বললাম, ‘আমি বিভাস। জ্যোতি কোথায়! তার সঙ্গে কথা বলতে চাইছি!’

পুরুষ কণ্ঠ বলল, ‘ও, বিভাসদা! জ্যোতি তো নেই!’

আমি বললাম, ‘নেই! নেই মানে!’

নবকুমার বাবু বললেন, ‘চার দিন আগে জ্যোতি মারা গেছে। করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল। বাঁচাতে পারিনি।’ বলে ছোট শিশুর মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন নবকুমার।

নবকুমার তো কেঁদে বুক হালকা করছেন, আমি কিভাবে হালকা করব? এই মুহূর্তে আমার বুক ছাপিয়ে দুচোখ ভাসিয়ে যে কান্না আসছে না!

মন্তব্য