kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ১০

১৯৭৫

মোস্তফা কামাল

২২ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



১৯৭৫

আজ যে অনেকক্ষণ ধরে অন্ধকারে বসে চিন্তা করলেন, তার ফল কি পেয়েছেন? আ স ম রব জানতে চাইলেন।

সিরাজুল আলম খান বললেন, আমি চিন্তা করে দেখলাম, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ছাড়া এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না। তাই আমাদের সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে। আমরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করব। তার নাম হবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ‘জাসদ’। আপনাদের নেতৃত্বে যে ছাত্রলীগ গঠিত হলো সেটি জাসদের সঙ্গে একীভূত হবে। মূল নেতৃত্বে থাকবেন আপনারা দুজন। আমি থাকব নেপথ্যে। মেজর জলিল বললেন, আপনি কেন নেপথ্যে থাকবেন সিরাজ ভাই? অগ্রভাগে চলে আসেন। আপনি মাঠে নামলে পরিস্থিতি অন্য রকম হবে।

না, না। আমার সামনে যাওয়া ঠিক হবে না। নেপথ্যে থাকলেই ভালো হবে। শোনেন, আমি তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি। আমি সরাসরি রাজনৈতিক দল গড়তে গেলে বঙ্গবন্ধু বাধা দেবেন। করতে দেবেন না। আমাকে ডেকে বলবেন, এসব বন্ধ কর। তখন আমি কী করব? বঙ্গবন্ধুর কথা না শুনে পারব না। আমি নেপথ্যে থেকে সব ধরনের সহায়তা দেব আপনাদের। কখন কী করতে হবে, না হবে—সবই বলে দেব। আপনাদের কাছে একটাই অনুরোধ, আমি যখন যা বলি সেটা বুঝে কাজ করার চেষ্টা করবেন। আর কিছু না। আমি বলি না যে আমাকে আপনাদের গুরু মানতে হবে।

মেজর জলিল বললেন, সিরাজ, আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবেই হবে। তার পরও বলছি, আপনি সরাসরি নেতৃত্বে থাকলে ভালো হতো না?

দেখেছেন, আমাকে কখনো নেতৃত্ব দিতে দেখেছেন? আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি। নিউক্লিয়াস গঠন করেছি। সেই নিউক্লিয়াস দেশের মুক্তিসংগ্রামে কী ভূমিকা রেখেছে তা আপনারা জানেন।

দুজনেই ইতিবাচক মাথা নেড়ে বললেন, জি, জি।

তখন আমার অনেক কথাই বঙ্গবন্ধু রেখেছেন। কিন্তু সমাজতন্ত্রের বিষয়টি কেন জানি তিনি এড়িয়ে যাচ্ছেন। তাই আমি মনে করছি, সমাজতান্ত্রিক দল গঠন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

মেজর জলিল বলেন, জি। আমরা আপনার বক্তব্যের সঙ্গে একমত।

তাহলে আপনারা আর দেরি করবেন না। দুই-একের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে দল গঠন করে ফেলেন।

আ স ম রব বললেন, আপনি তাহলে উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন।

না, না! সেটাও না। আমি যে আপনাদের সঙ্গে আছি সেটাও কেউ জানবে না। আমি নেপথ্যে থেকে আপনাদের সঙ্গে কাজ করব। আপনাদের কিংবা আমার প্রয়োজনে আপনাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করব। আরেকটা কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন, আমাদের প্রকাশ্য সংগঠনের নেতৃত্ব দেবেন আপনারা দুজন। আরেকটি গোপন সংগঠন থাকবে, যারা আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করবে। সেই সংগঠনের নাম হবে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী।

ওই সংগঠনের নেতৃত্বে কে থাকবে? আ স ম রব জানতে চাইলেন।

সেটা আপনারা সময়মতো জানতে পারবেন। আপনারা আগে রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেন। তারপর দেখা যাক।

কবে ঘোষণা করব? মেজর জলিল জানতে চাইলেন।

কালই করেন।

কালই?

কেন, কোনো অসুবিধা আছে?

না, মানে অরেকটু সময় নিলে ভালো হতো না? 

মেজর জলিল কেন সময় নিতে চাচ্ছেন তা বুঝতে পারছেন না সিরাজুল আলম খান। তিনি আবারও বোঝাতে চাইলেন, দেখেন, চীনা উগ্র বামপন্থীরা গোপন সংগঠন গড়ে তুলেছে। ডানপন্থীরাও মুসলিম বাংলা করার জন্য গোপন সংগঠন করেছে। আমাদের দেরি করা যাবে না।

জি, জি। আমরাও করে ফেলব। তার আগে আমরা দুজন আলাদা করে একটু বসি! ভালো বোঝাপড়ার জন্যই আমাদের বসা উচিত।

ঠিক আছে। তা বসেন। কোনো অসুবিধা নেই।

মেজর জলিল চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বললেন, আমরা দুজন কাল বিকেলে বসে চূড়ান্ত করে ফেলব। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আমরা এখন আসি।

সিরাজুল আলম খান হাতে হাত মিলিয়ে বললেন, শুভ কামনা।

মেজর জলিল ও আ স ম রব চলে যাওয়ার পর আবারও আলো নিভিয়ে বসলেন সিরাজুল আলম খান। অন্ধকারে বসে তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন।

 

দশ.

 

মেজর (অব.) এম এ জলিল অদ্ভুত ধরনের একটা স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন দেখে তিনি লাফিয়ে ওঠেন। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বিছানায় বসে রইলেন। তাঁর অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর তিনি স্বপ্নের বিষয় নিয়ে ভাবলেন। তিনি স্বপ্নে দেখেন, তাঁর বাড়ির আঙিনায় হাজার হাজার মানুষ। তাদের সবার হাতে ফুল। তিনি দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই লোকজন তাঁর গায়ে বৃষ্টির মতো ফুল ছিটিয়ে দেয়। তাঁকে নিয়ে স্লোগান তোলে, জলিল ভাই জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ!

মেজর জলিল মনে মনে বলেন, আমি কেন এ রকম একটি স্বপ্ন দেখলাম! এই স্বপ্নের মাজেজা কী? আমরা নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করলে সেটি কি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাবে? ভবিষ্যতে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবে? স্বপ্নের অর্থটা তো সে রকমই। আজ না রব সাহেবের সঙ্গে আমার চূড়ান্ত বৈঠক! হুম, রব সাহেব তো সকালেই আসার কথা! যাই, গোসল সেরে আসি।

মেজর জলিল আর দেরি করলেন না। তিনি গোসল সারলেন। নাশতা খেয়ে এক মগ কফি নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলেন। কফির মগটা টি টেবিলের ওপর রেখে তিনি সোফায় স্থির হয়ে বসলেন। তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। মনে মনে বলেন, সিরাজুল আলম খান ঠিকই বলেছেন। এটাই মোক্ষম সময়! এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। চীনা উগ্র বামপন্থীরা গোপন সংগঠন করেছে। তারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সরকার উত্খাতের ঘোষণা দিয়েছে। ডানপন্থী দলগুলো মুসলিম বাংলা কায়েমের উদ্দেশ্যে গোপন তৎপরতা শুরু করেছে। আমাদের লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া দেশে শান্তি আসবে না। কিন্তু আমরা এগোতে পারব তো! বঙ্গবন্ধুর যে জনপ্রিয়তা! শুধু আন্দোলন করে তাঁকে হটানো যাবে না। গোপন সংগঠনও করতে হবে। রব সাহেব কোথায়? রব সাহেব এখনো আসছেন না কেন?

আ স ম আবদুর রব তখনই জলিল সাহেবের বাড়ির দরজায় টোকা দিলেন। জলিল সাহেব নিজেই দরজা খোলার জন্য এগিয়ে গেলেন। রব সাহেবকে দেখে বললেন, আসেন আসেন রব সাহেব। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। এত দেরি হলো কেন?

আর বলবেন না। সকাল থেকে আমার বাসা লোকে লোকারণ্য। একটা কিছু করেন, একটা কিছু করেন। আমি বললাম, সবুর করো। এত তাড়াহুড়া করলে তো হবে না। তাদের এক কথা, এভাবে চলতে পারে না।

এরা কারা? জলিল সাহেব জানতে চাইলেন।

আমার কিছু ভক্ত আছে না!

হুম। তারা তো ঠিকই বলেছে। এভাবে চলে নাকি?

তারপর, আপনি কী ভাবছেন বলেন?

বলছি। আগে চা-নাশতা দিতে বলি? তারপর কথা শুরু করি।

জলিল সাহেব ঘরের ভেতরে গিয়ে চা-নাশতা দিতে বলে আবার ড্রয়িংরুমে এলেন। এসেই বললেন, বুঝলেন রব সাহেব, তথাকথিত রাজনৈতিক সংগঠন করলেই হবে না। সশস্ত্র গোপন সংগঠনও করতে হবে। বিপ্লব ছাড়া আন্দোলন সফল হবে না। একটা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আমাদের আছে!

জি, তা তো বটেই।

আমাদের লক্ষ্য তো ক্ষমতায় যাওয়া! ক্ষমতায় গিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করা! তাই না?

জি জি!

ক্ষমতায় যেতে হলে বিপ্লব করতে হবে। সশস্ত্র বিপ্লব। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

জি, একদম ঠিক।

এখন দেশে এক ধরনের অস্থিরতা আছে। এটা দিনে দিনে আরো বাড়বে। এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে।

অবশ্যই।

আমাদের দলের নামধাম নিয়ে তো সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলোই।

জি জি।

তাহলে ওভাবেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি।

জি।

আসলে এখন আর আলোচনার কিছু নেই। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। আমরা আজই রাজনৈতিক দলের গঠনপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে ফেলব।

জি আচ্ছা। জলিল ভাই, সশস্ত্র গোপন সংগঠনের ব্যাপারটা নিয়ে আপনার কোনো ভাবনা আছে কি না?

অবশ্যই আছে। সিরাজ ভাই তো বলেই দিয়েছেন। শোনেন, প্রশিক্ষিত ও সশস্ত্র একটি দলকে গোপন বাহিনীর দায়িত্ব দেওয়া হবে।

গ্রেট! খুব ভালো হবে।

অবশ্যই ভালো হবে। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া আমার কয়েকজন বন্ধু আছে। তারা স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেবে।

রব সাহেব সন্দেহের দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলেন, কাজটা করতে হবে গোপনে।

ভয় নেই। এখানে কেউ আসবে না।

না এলেই ভালো।

আচ্ছা শোনেন, আমরা দু-এক দিনের মধ্যেই সভা ডাকব। সেই সভায় জাসদ গঠন চূড়ান্ত করব। স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কথা সবাই জানবে না। আমাদের একটা মূল কমিটি থাকবে। সেই কমিটির সদস্যরাই কেবল জানবে। তার মধ্যে একজন শুধু স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর দায়িত্বে থাকবে। আমি আর আপনি সামগ্রিক বিষয় দেখভাল করব।

জি, ঠিক আছে। জলিল ভাই, আমি একটা কথা বলতে চাই।

অবশ্যই। কী কথা বলেন।

আমাদের দুজনের মধ্যে শতভাগ আস্থা থাকতে হবে। যদি কখনো কোনো রকম আস্থার অভাব দেখা দেয় তাহলে আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে নেব।

অবশ্যই।

আর একটা কথা; আমাদের ছাত্রসংগঠনটিই আমাদের মূল দলের ছাত্রসংগঠনের অঙ্গসংগঠন হিসেবে কাজ করবে।

বাহ্! তাহলে তো আরো ভালো।

আমি আসছি। তাহলে কালই আমাদের রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক যাত্রা হবে।

মন্তব্য