kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মানুষ আনিসুজ্জামান

সেলিনা হোসেন

২২ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



 জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মানুষ আনিসুজ্জামান

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান (জন্ম : ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৭—মৃত্যু : ১৪ মে ২০২০)

আনিসুজ্জামান একজন পূর্ণ আধুনিক মানুষ। আধুনিকতার প্রতিটি বিষয় তাঁর চরিত্রের ভেতরে গভীরভাবে বিরাজিত। তিনি মুক্তচিন্তার মানুষ; সংস্কৃতির বহুত্ববাদে বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক, নিজের ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, প্রগতিশীল চিন্তায় স্নাত। এমন আধুনিক চিন্তার মানুষ সমাজ-পরিমণ্ডলে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। যে কেউ তাঁর কাছে আধুনিকতার পাঠ গ্রহণ করতে পারে। এর জন্য শ্রেণিকক্ষের দরকার হয় না। তাঁর লেখা, বলা এবং আচরণের দিকে চোখ খুলে রাখলেই শেখা হয়ে যায়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ইতিহাসের মানুষ। একুশ ও একাত্তরের মতো জাতীয় ঘটনাকে তিনি নিজের কর্মে ও সৃজনে ধারণ করেছেন।

১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংকলন ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রকাশে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমানের সঙ্গে। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, “কিন্তু তার আগেই সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটে গেছে—ভাষা আন্দোলন। পেনসিলে লেখা হয়ে গেছে ‘অমর একুশে’ কবিতা, ছাপাও হয়ে গেছে বোধ হয় ফজলুল হক হল বার্ষিকীতে। সেই থেকে মাথায় ঘুরছে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংকলনের পরিকল্পনা। আমিনুল ইসলাম প্রচ্ছদ করেছেন। মুর্তজা বশীরের লেখা ছাড়াও স্কেচ যাচ্ছে। কোনো মতে কাগজের দামটা জোগাড় হয়েছে, বাকিতে তৈরি হচ্ছে ব্লক, বাকিতে ছাপা হচ্ছে প্রেসে। আবদুল্লাহ আল মুতীর লেখা বেনামিতে সম্পাদকীয় মুখবন্ধ হিসেবে ছাপা হলো। উৎসর্গপত্রটি হাসান একবার লেখেন, আমি একবার। চূড়ান্ত রূপটা যখন পছন্দ হলো, হাসান স্থির করলেন, আমার হাতের লেখাটা ব্লক করেই ছাপা হবে বইতে। তা-ই হলো।” এভাবে তিনি তরুণ বয়স থেকেই দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতি বুঝেছেন। বুঝেছেন গভীর ও নির্ভুলভাবে।

১৯৭১। বাঙালি জাতির জীবনে এক শ্রেষ্ঠ সময়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আগরতলা হয়ে কলকাতায় যান। তাঁর ছাত্র ড. মাহবুবুল হক লিখেছেন, ‘একাত্তরের জুন মাসের ৪-৫ তারিখের দিকে আমিও আগরতলায় পৌঁছাই। সেখানে স্যারকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। তিনি সেখানে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করছেন; এমনকি যে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে আগরতলায় পৌঁছেছেন সেটিও মুক্তিযুদ্ধের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগরতলায় ক্র্যাফটস হোস্টেলে থাকার সময়ে এবং কর্তাবাড়ি ক্যাম্প পরিচালনার কাজে মাঝেমধ্যেই সে গাড়ি ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছি।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনার প্রধান দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাবলীল ভাষায় রচিত সংবিধান সবার কাছে যে বোধগম্য হয়ে উঠেছিল, সে ভাষার উদাহরণ এমন—‘(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।’

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশ গণপরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা প্রণীত সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর সংবিধান বলবৎ হয়।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে রিডার পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন।

মুক্তিযুদ্ধ, সংবিধান প্রসঙ্গ ধরেই আনা যায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা। দেশের সুশীল সমাজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ১৯৯২ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের বিচারের জন্য গণ-আদালতের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই আদালতে বিচার চলাকালে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগনামা পাঠ করেছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এই ভূমিকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। দেশদ্রোহের মামলা দায়ের হয়েছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৬ সালে তিনি বাংলা সম্মান পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। এই পরীক্ষায় কলা অনুষদে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক’ অর্জন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে বাংলা একাডেমি থেকে পিএইচডি গবেষক হিসেবে বৃত্তি পান।

একই বছরে পিএইচডি গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই। এরই মধ্যে ১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো ছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ বিভাগে ফেলো হিসেবে গবেষণা করেন। ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আমন্ত্রিত হন। ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

তাঁর পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল ‘ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্য বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯১৮)’। এই গবেষণার জন্য তিনি ব্যয় করেছেন তিন বছর। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০। ১৯৬৪ সালে গবেষণা গ্রন্থটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। প্রকাশক লেখকসংঘ প্রকাশনী, ঢাকা। বইয়ের নাম দেন ‘মুসলিম মানস ও বাংলাসাহিত্য’।

দেশ-বিদেশের বিদ্বজ্জন তাঁর মানবিক বোধ ও পাণ্ডিত্যকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেছেন। এই বিশিষ্টতায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নন্দিত এবং বরণীয়।

বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা অনেক। প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থের সংখ্যা ১৬। তিনি শহীদ মুনীর চৌধুরী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোতাহের হোসেন চৌধুরীর জীবনী লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত স্মৃতিকথার সংখ্যা ২। ‘আমার একাত্তর’ এবং ‘কাল নিরবধি’ গ্রন্থদ্বয়কে বলা যায় সময়ের দলিল। তিনি অনুবাদ করেছেন দুটি নাটক। অস্কার ওয়াইল্ডের ‘অ্যান আইডিয়াল হাজব্যান্ড’-এর অনুবাদ করেছেন ‘আদর্শ স্বামী’ নামে। আলেক্সেই আরবুঝভের ‘স্তারোমোদোনাইয়া কোমেদিয়া’ নাটকের অনুবাদ করেছেন ‘পুরনো পালা’ শিরোনামে।

তাঁর শিশুতোষ বইয়ের সংখ্যা ২। একটি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবনী, অন্যটির নাম ‘কতকাল ধরে’। এ ছাড়া ভাষা নিয়ে ছোটদের জন্য লেখা তাঁর একটি চমৎকার বই ‘কথার কথা’।

তিনি আমাদের মাঝ থেকে শারীরিকভাবে চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর জীবনদর্শনের বিষয়টি চর্চা করলে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে তাঁর চেতনা বৃদ্ধি পাবে। এভাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাঁকে আমরা বাঁচিয়ে রাখব জীবন পরিচর্যার বাতিঘর করে।

মন্তব্য