kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

জীবনের রূঢ় বাস্তবকে চিত্রিত করেছেন দেবেশ রায়

হাসান আজিজুল হক

২২ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবনের রূঢ় বাস্তবকে চিত্রিত করেছেন দেবেশ রায়

দেবেশ রায় (জন্ম : ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৬—মৃত্যু : ১৪ মে ২০২০)

ঠিক কবে দেবেশ রায়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল সেটা এখন নিশ্চিতভাবে মনে পড়ে না। তবে সেটা যে অনেক বছরের পুরনো কথা সে নিশ্চিত। পরিচয়ের আগে তাঁর কিছু লেখা আমার পড়া ছিল। তিনি পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির শিলং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। আমি সেই সময়ে বেশ কয়েকবার কলকাতায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথে বোধ হয় তাঁর সঙ্গে আমার একবার দেখা হয়েছিল।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। একদিন কলকাতায় গিয়ে অন্য একজনের বাড়ি থেকে উনার নম্বরে টেলিফোন করেছিলাম। উনি ফোনটা তোলার পর বলেছিলাম, ‘আমি দেবেশ রায়ের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’ তখন উনি ওপাশ থেকে বলেছিলেন, ‘আমিই দেবেশ রায়। আপনি কী বলতে চাইছেন বলুন।’ তাঁর এ রকম সম্বোধন পেয়ে আমি একটু অসন্তুষ্টই হয়েছিলাম। তখন পরে কথা হবে বলে ফোনটা রেখে দিই।

তখনকার সময়ে বাংলা সাহিত্যে যাঁরা লিখছিলেন তাঁদের মধ্যে দেবেশ রায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি খুব চমৎকারভাবে বাহুল্য বিবর্জিত ও নিষ্ঠুর লেখা লিখতেন। নিষ্ঠুর বলছি এই অর্থে যে, তিনি জীবনের রূঢ় বাস্তবকে ঠিক রূঢ় বাস্তব হিসেবেই লেখায় উপস্থিত করতেন।

দেবেশ রায়কে প্রথম প্রথম খুবই রূঢ় ও রুক্ষ প্রকৃতির মানুষ হিসেবে মনে হয়েছিল আমার কাছে। কিন্তু তাঁর সঙ্গে পরিচয়টা ঘনিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার এই ধারণাটিও পরিবর্তন হতে থাকে।

বছর পনেরো-ষোলো আগে রাজশাহীতে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। কিসের যেন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ছিল সেটি সঠিকভাবে মনে পড়ছে না। অনুষ্ঠানে তিনি, আমিসহ মোট তিনজন বিচারক ছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য শুনে বুঝতে পারি তিনি আসলেই অসাধারণ পড়ুয়া একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে কথা হওয়ার পর পড়েননি এমন কোনো লেখা খুঁজেই পেলাম না। যা-ই কিছু বলি না কেন, সবই উনার পড়া। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে তিনি যখন বক্তৃতা করলেন তা শুনে আমার মনে হয়েছিল যে, সত্যিকারার্থেই অসম্ভব রকমের পাণ্ডিত্যপূর্ণ একজন ব্যক্তি তিনি।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। সম্ভবত ৯০ দশকের সময়। কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে দেশভাগ, দাঙ্গা—এসব বিষয়ে আমার বক্তৃতা ছিল। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর তিনি আমাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, এ রকম একজন বক্তা যে আমরা এখানে ডেকে আনতে পেরেছি এবং বাংলা সাহিত্যে যে এ রকম একজন বক্তা আছেন তা আমার ধারণাই ছিল না।

ওই সময়ে কলকাতা থেকে আমার লেখা ‘বিধবাদের কথা নানা পাঠে’ নামে একটি বই বেরিয়েছিল। এই বইটি পড়ে দেবেশ রায় বলেছিলেন, ‘এর সঙ্গে আর কোনো কিছু কোনো দিক থেকেই তুলনা হতে পারে না। আমি মনে করি যে এটা অতুলনীয়। এই অতুলনীয়কে আমি বন্দনা করতে চাই। আমার তাকে ডাকতে ভালো লাগে, হাসান ভাই।’

এর পর থেকেই দেবেশ রায়ের সঙ্গে আমার যে যোগাযোগের সূত্রপাত শুরু হয় তা ক্রমেই বাড়তে থাকে। তিনি আমাদের আহ্বানে রাজশাহী এসেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চিহ্ন’ নামের একটি ছোট কাগজ প্রতি তিন বছর অন্তর বই মেলার আয়োজন করে। সম্ভবত ২০০৪ সালের দিকে তিনি সেই মেলায় এসেছিলেন। সেই মেলায় আমি, ড. আনিসুজ্জামান ও দেবেশ রায় পাশাপাশি বসেছিলাম। সেখানে আমাদের একে অপরের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা হয়।

লেখক হিসেবে দেবেশ রায় একজন বড় মনের মানুষ। আর মানুষ হিসেবে তিনি আরো বড় মনের মানুষ। মানুষকে তিনি প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। তিনি একটি বই আমাকে উৎসর্গ করেছিলেন। সেখানে লিখেছিলেন ‘পরম সখা হাসান ভাইকে’।

দেবেশ রায় ধীর, স্থির ও মৃদু কণ্ঠে জীবনের যে কথাগুলো বলতে পারতেন সেগুলো আশ্চর্যজনকই বটে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে একদিন নেতৃত্ব দেবে, যারা একদিন আমাদের ছাড়িয়ে যাবে, তাদের অবশ্যই দেবেশ রায়ের লেখা পড়তেই হবে।

আরেকটি কথা, যারা উপন্যাস কিংবা গল্প পড়ে শুধু মনোরঞ্জনই পেতে চায় না; বরং হৃদয়ের আরো গভীর স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে চায়, যারা মনের বিস্তৃতির ক্ষমতাকে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে চায় তাদের দেবেশ রায়ের লেখা পড়তেই হবে বলে আমি মনে করি। এটা আমার এক ধরনের পরামর্শও বলতে পারেন।

অনুলিখন : রেদওয়ানুল হক

মন্তব্য