kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ধারাবাহিক উপন্যাস মত্স্যগন্ধা

মত্স্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মত্স্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

৫৬ 

বিয়েটা সম্পন্ন হলো। শান্তনুতে-সত্যবতীতে। রাজায়-প্রজায়। আর্যে-অনার্যে। ক্ষত্রিয়ে-শূদ্রে। কালোতে-ধলোতে। কেন্দ্রে আর প্রান্তে সম্মিলন। ধনী-দরিদ্রে সংযুক্তি। গৌরবর্ণী আর্যনৃপতির আত্মসমর্পণ কৃষ্ণবরণ ধীবরকন্যা সত্যবতীতে।

আর্য আর অনার্যে চিরকালীন দ্বন্দ্ব। আর্যরা শাসক, অনার্যরা শাসিত। অনার্যকন্যারা রাজপ্রাসাদে দাসীর অধিক নয়। কোনো কোনো সময় শয্যাসঙ্গিনীও। ক্ষণকালের। দেহক্ষুধা মেটানোর সামগ্রী তারা।

আজ মহাবিপ্লব ঘটে গেল। ক্ষণকালের দেহসঙ্গিনীদের একজন হয়ে গেলেন চিরসঙ্গিনী। দাসী থেকে মহিষীতে রূপান্তরিত হলেন অনার্যকন্যা। একেবারে প্রধান রানি।

এই প্রথম একজন ধীবরকন্যার রাজমহিষী হওয়ার ঘটনা ঘটল। এর আগে ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রান্ত সমাজের কোনো মেয়ে আর্যনৃপতির স্ত্রী হওয়ার ভাগ্য অর্জন করেনি। সত্যবতীই প্রথম অনার্য কালো নারী, যিনি তাঁর সমাজের সব সংস্কৃতি নিয়ে কুরু নরপতির রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন এবং সত্যবতীর গৃহ প্রবেশের পর থেকেই কুরু রাজপ্রাসাদে অনার্য নারীর প্রতাপ প্রতিষ্ঠিত হলো।

প্রতাপ প্রতিষ্ঠা সহজে হয়নি। সত্যবতী নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। কোনো সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে, কোনোটিকে নির্মূল করে রাজপ্রাসাদে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেছেন তিনি।

রাজপ্রাসাদের অন্দরমহল অরক্ষিত ছিল। কাজে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। কেউ কাউকে মানত না। নারীমহলে ছিল না কোনো নীতিবিন্যাস। দীর্ঘদিন নারীমহল মহিষীশূন্য। মহারাজা শান্তনুর মাতা বানপ্রস্থ গ্রহণ করার পর রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে গেছেন বহু বছর হয়ে গেছে। মাঝখানে গঙ্গা রাজবধূ হয়ে প্রাসাদে এসেছিলেন। দেবী তিনি। মনুষ্য রীতি-নীতি আর প্রাসাদীয় কূটচালে নাক গলাননি গঙ্গা। মূলত গঙ্গার সময় থেকেই প্রাসাদ অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলার সূচনা। গঙ্গার অমনোযোগিতার সুযোগ নিয়ে ভৃত্যমহলে দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে। নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে দাসী আর ভৃত্যদের হাতে। প্রাসাদে শুরু হয়েছে মাত্স্যন্যায়। কেউ কারো কথা শোনে না। কেউ কাউকে মানে না। ফলে প্রাসাদ অভ্যন্তরের সৌন্দর্য বিনষ্ট হয়েছে। প্রাসাদীয় হেঁশেলটা লঙ্গরখানায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

সত্যবতী এসবকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করেছেন। বিনষ্টের নেতৃত্বে যারা, তাদের সরিয়ে দিয়েছেন। অন্যায়কারীদের মূলোত্পাটন করেছেন।

অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রাসাদে পরিপাট্য এসেছে। সেদিন বাসর রাতে থরথর দেহ শান্ত হয়েছিল একসময়। মহারাজ শান্তনু তৃপ্ত। রাজা তাকিয়ে ছিলেন সত্যবতীর দিকে। দেহ সান্নিধ্যলাভের আগে রাজার দৃষ্টিতে ঘোর ছিল। এখন দৃষ্টি থেকে আচ্ছন্নতা কেটে গেছে। রাজার দৃষ্টি এখন স্বচ্ছ। মহারাজা দেখলেন—বিশাল পালঙ্কের ওপর বহু মূল্যবান একটি কালো মুক্তা অবশ হয়ে পড়ে আছে।

মৃদু কণ্ঠে রাজা বললেন, ‘তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে সত্যবতী।’

সত্যবতী বেশভূষা ঠিক করলেন। আলুলায়িত দেহভঙ্গিতে সক্রিয়তা এলো। পালঙ্ক থেকে নেমে শান্তনুর পাশে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘বলুন।’

‘এভাবে বলছ কেন? তোমার কথায় নৈকট্য নেই।’

‘আপনি নৃপতি। এই কুরুরাজ্যের।’

‘তুমি মহিষী। প্রধান রানি তুমি শান্তনুর প্রাসাদের।’

‘আপনি মাননীয়। এই সাম্রাজ্যের সবাই আপনাকে সম্মান করে। আপনাকে সম্মান জানানো আমারও কর্তব্য।’

‘তার পরও তো তুমি আমার স্ত্রী। অর্ধাঙ্গিনী।’

রাজার গায়ে নিজের দেহ ছুঁইয়ে সত্যবতী বললেন, ‘আপনাকে অমর্যাদা করার সাহস আমাকে দেবেন না মহারাজ। ব্যক্তি হিসেবে আপনি আমার হূদয়ের, রাজা হিসেবে আপনি আমার মস্তকের।’

স্মিত হেসে রাজা বললেন, ‘ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছায় আমি হস্তক্ষেপ করব না। আজ নয় শুধু, কখনো।’

সত্যবতী বললেন, ‘কী কথা বলবেন বলেছিলেন।’

শান্তনু বললেন, ‘প্রাসাদকর্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ওখানকার শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে গেছে। ওটা নারীজগত্ বলে সব কিছু জেনেও ওখানে হাত দিতে পারিনি।’

‘কী করতে হবে বলুন আমায় মহারাজ।’

‘রাজমহলের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। এবং তা করতে হবে তোমাকেই।’ স্বগতকণ্ঠে বললেন, ‘রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় ওই প্রাসাদ অভ্যন্তরেই।’

শেষের কথাটি আপন মনে বললেও রাজার কথাটি সত্যবতী শুনতে পেলেন। দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন মজারাজ। অন্দরমহলের সব অনীতি আমি নির্মূল করব। প্রাসাদ অভ্যন্তরকে আপনার জন্য শান্তি ও স্বস্তির জায়গায় রূপান্তরিত করব।’

রাজা শান্তনু দুই হাত বাড়িয়ে সত্যবতীকে বুকের একেবারে কাছে টেনে নিলেন আবার।

পরদিন থেকেই প্রাসাদের আনাচকানাচে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন সত্যবতী। অনেক অনিয়ম, অসাধুতা তাঁর চোখে পড়তে লাগল। কঠিন হয়ে উঠলেন সত্যবতী। অন্দরমহলের সবাই অল্প সময়ের মধ্যে বুঝে গেল—ইনি রাজবধূ গঙ্গা নন, ইনি রাজমহিষী সত্যবতী।

মহারাজ শান্তনু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বহু বহু বছর পর তিনি গৃহসুখ আস্বাদন করতে শুরু করলেন।

পিতা শান্তনু দীর্ঘদিন উল্লাসে মত্ত থাকলেন। তাঁর মনে হলো—ভোগেই সুখ। আর নারী সেই সুখপ্রাপ্তির প্রধান সামগ্রী। নিজের ভেতরে চোখ রাখলেন শান্তনু। সেখানে সত্যবতীকে ছাড়া আর কাউকে দেখলেন না তিনি। গঙ্গার যৌবনবতী দেহবিভঙ্গ, তাঁর পুরুষ্ট ওষ্ঠাধার, তাঁর লোভনীয় কুচযুগল, তাঁর নয়ন কটাক্ষ কোথায় তিরোহিত হয়ে গেছে। এখন গঙ্গার জায়গায় শুধুই সত্যবতী। ফরসা নারীর প্রতি রাজার বিতৃষ্ণা জন্মে গেছে। প্রাসাদজুড়ে গৌরবর্ণী নারীদের সমাগম। এদের মধ্যে সত্যবতী যেন কালোবরণ উজ্জ্বল এক তিল। তিল যেমন রূপসীর মুখমণ্ডলের লাবণ্য বাড়ায়, সত্যবতীও তেমনি কুরুরাজ প্রাসাদের স্নিগ্ধতা বড়িয়েছে। এখন মহারাজ শান্তনুর সকাল কাটে সত্যবতীর সামিপ্যে, দুপুর কাটে সত্যবতীর সংস্রবে, রাত ফুরায় সত্যবতীর কল্লোলিত দেহতটিনীতে ভেলা ভাসিয়ে।

রাজকার্য পরিচালিত হয় পুত্র ভীষ্মের তত্ত্বাবধানে। ভীষ্ম সত্যবতীকে পিতার ঘরে পৌঁছে দিয়ে ক্ষান্ত হননি। পিতার সুখের দিকেও খেয়াল রেখেছেন। পিতার আনন্দময় মুহূর্তগুলো নষ্ট করতে চাননি ভীষ্ম। তাই রাজ্যের বা রাজদরবারের কোনো সমস্যার কথা পিতাকে জানাননি তিনি। নিজের বাহুবলে আর বুদ্ধিবলে সব সমস্যা মিটিয়ে রাজ্যের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রেখেছেন ভীষ্ম।

বিয়ের পর পরপর দুটি সন্তানের জন্ম দিলেন সত্যবতী। পুত্রসন্তান। চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য। চিত্রাঙ্গদ বড়, বিচিত্রবীর্য কনিষ্ঠ। উভয়ের মধ্যে বয়সের ফারাক কয়েক বছরের।

ভীষ্ম দেখলেন—তাঁর দুটি ভাই হয়েছে। মায়ের রং পায়নি তারা। বাপের মতোই আর্য রং তাদের শরীরে। চিত্রাঙ্গদ-বিচিত্রবীর্যকে জন্মাতে দেখে, তাদের বড় হতে দেখে ভীষ্ম কি কাতর হয়ে পড়েছিলেন? তাঁর মধ্যে রাজ্য হারানোর বেদনা কি চাগিয়ে উঠেছিল? কোনোক্রমেই ভীষ্ম কাতর হননি। কারণ তিনি তো আগেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন—কোনোভাবেই তিনি কুরুরাজ্যের অধিপতি হবেন না। বরং উল্টো কাজ করেছিলেন ভীষ্ম। মা সত্যবতীর সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, ‘ভাই দুজনকে ভালো করে মানুষ করো মা।’

কৃত্রিম একটু হেসে সত্যবতী বলেছেন, ‘ঠিক বলেছ ভীষ্ম। ওদের প্রতি নজর রাখতে হবে।’

‘বাবা বৃদ্ধপ্রায়, মা। ভাইদের মানুষ করার ব্যাপারে তিনি বেখেয়াল হতে পারেন।’

‘আমি তো আছি। ওদের মানুষ করার দায়িত্ব আমার।’ জোরগলায় বললেন সত্যবতী।

‘শুধু মানুষ হিসেবে নয় মা, ভবিষ্যতের কুরু অধিপতি হিসেবে তৈরি করার দায়ভারও আমাদের ওপর।’

‘ও ব্যাপারে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না ভীষ্ম। ওদের ঠিকঠাকভাবে গড়ে তোলার দায়ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও।’

‘শুধু গায়েগতরে বড় করার দায়ভার নয় মা, যথার্থ রাজপুরুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও কিন্তু।’ একটু বিরক্ত হলেন বুঝি সত্যবতী। ভ্রু কুঁচকালেন। বললেন, ‘বিচিত্রবীর্য আর চিত্রাঙ্গদকে নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর দরকার নেই বাছা। ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও।’ একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন সত্যবতী। চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভীষ্ম বললেন, ‘ঠিক আছে মা।’ যা ভালো বোঝো তুমি।’

ভীষ্ম মনঃক্ষুণ্ন হলেন ভীষণ। ভীষ্ম ভেবেছিলেন—ভাইদের মানুষ করার দায়িত্ব মা সত্যবতী তাঁর ওপর ছেড়ে দেবেন। মানুষ করা, বড় করা—এসবের মানে তো খাইয়েদাইয়ে নাদুসনুদুস করা নয়। একজন রাজপুত্রকে মানুষ হতে হয় বহু কঠিন বন্ধুর পথ পেরিয়ে। তাকে বিদ্যা অর্জন করতে হয়, অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করতে হয়, মনুষ্য চরিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিতে হয়। রাজনীতি আর কূটচাল সম্পর্কে অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে হয়। মা সত্যবতী কী বুঝলেন কে জানে! হয়তো প্রথমটাই বুঝলেন। খেয়েদেয়ে স্বাস্থ্যবান হওয়াকেই মানুষ হওয়া বুঝলেন। তা যদি হয়, তাহলে চিত্রাঙ্গদের পক্ষে যে রাজ্য চালনা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কষ্ট সহিষ্ণুতার অনেকটা পথ অতিক্রম করার পরই যে একজন যুবক রাজকুমারে রূপান্তরিত হতে পারে।

মা সত্যবতীর পক্ষে চিত্রাঙ্গদকে যথার্থ রাজকুমার হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। মায়ের জীবনাভিজ্ঞতা তো ওরকম নয়। রাজনীতির হিংস্রতা, ষড়যন্ত্র, নিষ্ঠুরতা, কৃতঘ্নতা সম্পর্কে মায়ের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নেই। একজন যথার্থ রাজকুমারকে এসব বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে ধারণা নিতে হয়। তাইতো আগ বাড়িয়ে ভীষ্ম সত্যবতীর কাছে গিয়েছিলেন চিত্রাঙ্গদ আর বিচিত্রবীর্যের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। কিন্তু সত্যবতী তা বুঝলেন না। বুঝলেন উল্টোটা। তিনি বুঝলেন, ভীষ্মের সংস্পর্শে এলে তাঁর সন্তান দুটি নষ্ট হয়ে যাবে। হয়তো ভীষ্ম ক্রূর বুদ্ধি প্রয়োগ করে তাদের সিংহাসন-উপযুক্ত করে গড়ে তুলবেন না। তাই ভীষ্মের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন সত্যবতী। বলেছিলেন, আমার ছেলে দুটিকে আমিই মানুষ করব। কিন্তু সত্যবতীর এই ধারণা, এই সিদ্ধান্ত যে ভুল, অনেক পরে বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। যখন বিপুল ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল তাঁর।

ধীবরকন্যা সত্যবতী তো আর গঙ্গা নন। তিনি সন্তান জন্ম দিয়েছেন বটে, সন্তান মানুষ করার করণকৌশল মোটেই জানা ছিল না সত্যবতীর। প্রথম সন্তান কৃষ্ণদ্বৈপায়নকে জন্ম দেওয়ার পরপরই পরাশর নিয়ে গেছেন। বড় করার দায় আর শিক্ষিত করার দায়িত্ব সত্যবতীর ওপর বর্তায়নি। পরে রাজপ্রাসাদে সন্তান নয় শুধু, রাজকুমারকে প্রসব করেছেন তিনি। শত চেষ্টার পরেই যেকোনো মানবসন্তান রাজপুত্রে রূপান্তরিত হয়, জানা ছিল না সত্যবতীর। তাই গাঙ্গেয় দেবব্রতের শিক্ষাদীক্ষার জন্য মনস্বিনী গঙ্গা যে চেষ্টা করেছিলেন, তার কণামাত্র করলেন না রাজমহিষী সত্যবতী। একজন রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা, বিনয় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তা থেকে যোজন দূরত্বে থাকল চিত্রাঙ্গদ।

মহারাজ শান্তনু দ্বিতীয় পক্ষের ছেলে দুটিকে প্রশ্রয় দিলেন যথেষ্ট। স্ত্রী বিভোরতার কারণে, না প্রৌঢ়ত্বের কারণে—বোঝা গেল না। সত্যবতীকে লক্ষ্য করে শুধু বললেন, ‘ওদেরকে ওদের মতো করে বড় হতে দাও সত্যবতী। রাজপুত্ররা কখনো নষ্ট হয় না। ভীষ্মের দিকে তাকাও। চিত্রাঙ্গদ-বিচিত্রবীর্যও বিপথগামী হবে না।’

রানি খুশি খুশি মুখে রাজার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। কিন্তু চিত্রাঙ্গদ নীতিবান না হয়ে বলদর্পী হয়ে উঠল। নিজেকে ছাড়া আর কাউকে মানুষ বলে গণ্য করল না চিত্রাঙ্গদ। কাউকে নিজের সমবুদ্ধিও ভাবল না। ভীষ্মের ওপর নির্ভরতা অস্বীকার করল সে। অহংকারী, হতবুদ্ধি, নীতিজ্ঞানহীন, রাজনীতিবুদ্ধিবিবর্জিত একজন যুবক হিসেবে গড়ে উঠল চিত্রাঙ্গদ।

কনিষ্ঠপুত্র বিচিত্রবীর্য বড় না হওয়ার আগেই পরলোকগমন করলেন কুরুরাজা শান্তনু।

রাজা শান্তনুর মৃত্যুর পর অচিরেই স্বামীশোক অতিক্রম করলেন সত্যবতী। ভীষ্মকে ডেকে বললেন, ‘চিত্রাঙ্গদকে মহারাজা পদে অভিষিক্ত করার আয়োজন করো ভীষ্ম।’

ভীষ্ম বিনয়ী কণ্ঠে বললেন, ‘খুব বেশি সময় লাগবে না। রীতি-প্রথা সম্পন্ন করতে যেটুকু সময় লাগার তার চেয়ে মুহূর্তমাত্র বিলম্ব হবে না।’

‘তা-ই করো বাছা!’ ভীষ্ম বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন, এই ভাবনায় ত্রস্ত ছিলেন সত্যবতী।

কিন্তু সত্যবতীর ভাবনাকে একেবারে উল্টে দিলেন ভীষ্ম। তাঁরই উদ্যোগে এক শুভদিনে কুরুরাজ্যের রাজসিংহাসনে বসলেন চিত্রাঙ্গদ।

রাজসিংহাসনে আরোহণ করেই চিত্রাঙ্গদ আরো বেপরোয়া হয়ে উঠল।

 

মন্তব্য