kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

লেখার ইশকুল

প্রকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বারাতিনস্কির

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



প্রকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বারাতিনস্কির

আলেকজান্ডার পুশকিনের মতে, রাশিয়ার শোকগাথার সবচেয়ে উত্কর্ষের অধিকারী কবি হলেন ইয়েভগেনি বারাতিনস্কি। দীর্ঘদিন পর তাঁর নাম যখন নতুন পাঠকদের মন থেকে মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, তখন রাশিয়ার সিম্বলিস্ট কবিদের কাছে তাঁর আসল পরিচয় ফুটে ওঠে উচ্চমার্গীয় চিন্তাশীল কবি হিসেবে। সেন্ট পিটার্সবার্গে পড়াশোনার সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হন বারাতিনস্কি। তিন বছর গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে কাটান। প্রচণ্ড মানসিক চাপে তখন তিনি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। কর্মসূত্রে বদলি হন ফিনল্যান্ডে। সেখানে থাকাকালেই প্রথম দীর্ঘ কবিতা ‘এডা’ প্রকাশ করেন। ১৮২০ সালে দেখা হয় আন্তন ডেলভিগের সঙ্গে। ডেলভিগ তাঁর হতোদ্যম স্পৃহা জাগিয়ে তোলায় সরাসরি ভূমিকা রাখেন। তিনি কবিকে প্রকাশনাজগতের মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এই ‘এডা’র মাধ্যমে।

বারাতিনস্কি নিজে উত্কর্ষ দেখতে পান পুশকিনের কবিতায়। নিজের গুরু হিসেবে মানতেন পুশকিনকে। প্রথম দিকের কবিতায় চেষ্টা করেন, গুরুর কবিতার সরাসরি অনুকরণ যেন না হয়ে যায়। যদিও ‘এডা’ পুশকিনের ‘ককেশাসের বন্দি’ কবিতার দ্বারা প্রভাবিত, তবু নিজস্ব শৈলীতে লেখার চেষ্টা করেন এবং কিছুটা আবেগী ছোঁয়া থাকলেও পুরোপুরি রোমান্টিক হয়ে ওঠা থেকে বিরত থাকেন বারাতিনস্কি। অর্থের দিক থেকে সহজবোধ্যতার শৈলীতে লেখেন তাঁর এই দীর্ঘ কবিতা। এ কবিতার বর্ণনামূলক অংশগুলো সবচেয়ে সুন্দর চিত্রকল্প তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। সে কারণে ফিনল্যান্ডের প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে তাঁর বর্ণনায়।

১৮২০ সালের পরের ছোট কবিতাগুলো প্রধানত চাপা, উজ্জ্বল ও সুললিত। আকমাতোভার আগের সময়ের যেকোনো কবিতার চেয়ে বারাতিনস্কির ওই সময়ে লেখা কবিতা খুব বেশি পরিচ্ছন্ন এবং নিরাবেগ। প্রেমের শোকগাথাগুলো হালকা হৃদয়ানুভূতির ছোঁয়ায় আবিষ্ট হলেও ওপরের স্তরে বুদ্ধিদীপ্ত কথার আবরণ জড়ানো।

অন্যদিকে ১৮২৯ সালের পরের পরিপক্ব কবিতাগুলোতে তাঁর চিন্তাশীল কবিত্ব লক্ষ করা যায়। চিন্তাকে কবিতার উপকরণ বানানোর মতো উল্লেখযোগ্য প্রবণতার অধিকারী হিসেবে তাঁকেই প্রধানত এবং প্রথমত উল্লেখ করা হয়। এখানে তাঁর সমসাময়িক অন্য কবিদের থেকে এবং উনিশ শতকের তাঁর পরের প্রজন্মের কবিদের থেকে তিনি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কারণ অন্যদের কাছে কবিতার প্রধান উপকরণ ছিল হৃদয়ানুভূতি। বুদ্ধির যথাযথ প্রয়োগের দিক থেকে অষ্টাদশ-বিশ শতকের কয়েকজন কবির কবিতার কাছাকাছি বারাতিনস্কির কবিতা। ইংরেজি কবিতার কথা বলতে গেলে পোপ থেকে শুরু করে এলিয়ট পর্যন্ত কিছুসংখ্যক কবির নাম উল্লেখ করা যেতে পারে, যাঁদের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য দেখা যায়। তাঁর শৈলীর আরেকটি বিশেষ দিক হলো, আগের শতকের কবিদের অনেকের মতো ধ্রুপদিশৈলী ব্যবহার করতে চেয়েছেন তিনি। সব সময় চেষ্টা করেছেন কম কথায় বেশি ভাব প্রকাশের। এদিক থেকে পুশকিনের স্বর্গীয় এবং মোজার্টীয় লঘুচিত্তের একেবারে বিপরীতে অবস্থান করেন বারাতিনস্কি।  

তাঁর মনের ভেতর প্রবল একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যাওয়ার। প্রকৃতি থেকে মানুষের দূরে সরে যাওয়ার বাস্তবতা তাঁকে ব্যথিত করে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নৈকট্যের অতীত চিত্র বারবার হাজির হয়েছে তাঁর কবিতায়। মানুষের ক্রমান্বয়ে সরে যাওয়ার অবস্থা দেখে যে দুঃখ তিনি পেতেন, সেটা প্রশমনের সুযোগ খুঁজতেন কবিতার অবয়ব ও সুরে।

►দুলাল আল মনসুর

 

মন্তব্য