kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

ধারাবাহিক উপন্যাস মৎস্যগন্ধা

মৎস্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১২ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



মৎস্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

দেবব্রতকে সঙ্গে নিয়ে রাজা শান্তনু রাজধানীতে ফিরে এলেন। গঙ্গাতীরের সেই উপবন থেকে রওনা দেওয়ার আগে ঘটনাটি ঘটল। বহু দিন ধরে রাজা একা আসছেন মৃগয়ায়। নিজের রথ নিজেই চালিয়ে আসেন। ঘোড়ায় টানা রথ। এমনিতে রাজার রথের ঘোড়া চারটি। সুসজ্জিত রথ। বিরাট। এক পাশে অস্ত্র রাখার ব্যবস্থা। একটু পেছন দিকে বসার কোমল আসন। আসনের ওপর মখমলের নরম আবরণ। আসনের সামনে খোলা স্থান। ওখানে দাঁড়িয়ে রাজা ধনুকে টঙ্কার তোলেন। রথ ঘিরে ওপর দিকে ছোট কুটির মতন। স্বর্ণ নির্মিত। কুটিরের ওপর ধ্বজা। সারথি রথ হাঁকিয়ে কাঙ্ক্ষিত স্থানে নিয়ে যায়।

কিন্তু রাজা শান্তনুর রাজকীয় রথের সঙ্গে একাকী মৃগয়ার এই রথটির কোনো মিল নেই। এ বড় সাধারণ রথ। মাথার ওপর সামান্য ছাউনি। রাজৈশ্বর্যবিহীন। একটি মাত্র ঘোড়ায় টানা। রাজার যখন ইচ্ছা ঘোড়াশালা থেকে রথটি নিয়ে রাজপ্রাসাদের ফটক দিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

ব্যাপারটা নিয়মিত ঘটছে বলে অন্যদের চোখসওয়া হয়ে গেছে। স্বাভাবিক বলে ধরে নিয়েছেন সবাই—প্রাসাদরক্ষী, দেহরক্ষী, অমাত্যবৃন্দ। কিন্তু দুজনের কাছে এ তুচ্ছ ব্যাপার নয়। তাদের একজন মহামন্ত্রী, অন্যজন সমরাধ্যক্ষ।

মহামন্ত্রী রৈভ্য সমরাধ্যক্ষ বজ্রকারকে ডেকে বললেন, ‘ব্যাপারটিকে সহজভাবে নিয়ো না।’

‘কোন ব্যাপারটির কথা বলছেন মাননীয় মহামন্ত্রী?’ জিজ্ঞেস করলেন সমরপ্রধান। রৈভ্য বললেন, ‘রাজাধিরাজ শান্তনু আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্ব তোমার ওপর। তবে আমারও কর্তব্য কম নয়। দায়িত্বের জায়গা থেকে জিজ্ঞেস করছি, ইদানীং তুমি রাজার নিরাপত্তার ব্যাপারটিকে হালকাভাবে দেখছ। দেখছ নাকি?’ ‘মাননীয় মহামন্ত্রী, আপনার অভিযোগ আমি অস্বীকার করছি না। হ্যাঁ, মহামতী নৃপতির নিরাপত্তার ব্যাপারটি একটু ঢিলেঢালা করেছি আমি। বরং বলা ভালো, ঢিলেঢালা করতে বাধ্য হয়েছি।’

‘কেন! তুমি বিশ্বস্ত। দায়িত্বশীল মানুষ তুমি। পরীক্ষিত সমরপ্রধান হয়ে এ রকম কাজ করতে গেলে কেন তুমি?’

‘ধমক খেয়ে।’ মৃদু কণ্ঠে বললেন বজ্রবারক।

‘ধমক খেয়ে! কী বলছ তুমি। রহস্য কোরো না। খুলে বলো।’ কম কথার মানুষ মহামন্ত্রী।

বিনীত কণ্ঠে বজ্রবারক বললেন, ‘আমি সম্যক জানি, মহারাজ শান্তনুর নিরাপত্তা বিধান করা আমার প্রধান কর্তব্য।’

‘তো! তা করলে না কেন? গুপ্তচরপ্রধান আমার কাছে খবর পৌঁছিয়েছে, ইদানীং মহারাজ দেহরক্ষী ছাড়া একাকী মৃগয়ায় বের হচ্ছেন।’ বললেন রৈভ্য।

‘গুপ্তচরপ্রধান আপনার কাছে ঠিক সংবাদটিই দিয়েছেন।’ ‘তাহলে!’ মহামন্ত্রীর কণ্ঠে উষ্মা।

‘রাজাধিরাজকে এভাবে বের হতে দেখে প্রথম প্রথম ছোট একটি সৈন্যদল পাঠাতাম সঙ্গে। জানতাম, তিনি অদূরের যমুনাতীরের উপবনে মৃগয়ায় যান। স্থানটি আমাদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে।’

‘তারপর?’

‘মহারাজ একদিন আমাকে ডেকে বললেন, আমার সঙ্গে কোনো সৈন্য পাঠানোর দরকার নেই। একাকী যেতেই স্বস্তি বোধ করি আমি।’

‘শুনলে তুমি তা? মহারাজের সুরক্ষার কথা ভাবলে না?’ ‘ভেবেছি, মহামন্ত্রী। ভেবেছি বলেই এর পরও দেহরক্ষী পাঠাতে ভুল করিনি।’ বজ্রবারক বললেন।

মহামন্ত্রী বললেন, ‘পাঠিয়েছ তাহলে? রাজার নিষেধ সত্ত্বেও?’

‘তাতেই তো মহারাজ চটে লাল।’ একটা ঢোক গিললেন সমরাধ্যক্ষ। তারপর বললেন, ‘ভাবলাম, রাজার কথাও থাক, আমার কর্তব্যও পালন হোক। রাজাধি রাজের অজ্ঞাতে ছোট্ট একটা রক্ষীদল পাঠাতে লাগলাম। ওই দলের অস্তিত্ব সম্পর্কে রাজা জানেন না। সৈন্যদলটি চোখের আড়ালে থেকে রাজাকে পাহারা দিয়ে যায়। কিন্তু একদিন...।’ বলে থেমে গেলেন বজ্রবারক। মহামন্ত্রী, অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু একদিন কী হলো?’

‘মহারাজ শান্তনু টের পেয়ে গেলেন। ডেকে নিয়ে আমাকে যথেষ্ট তিরস্কার করলেন। বললেন, আর কখনো যাতে এ রকম না হয়। কেউ যাতে আমাকে অনুসরণ না করে।’

‘সেই থেকে দেহরক্ষী প্রেরণ বন্ধ করে দিয়েছ তুমি?’

কোমর ভেঙে বজ্রবারক বললেন, ‘হ্যাঁ।’

মহামন্ত্রী আপন মনে কী যেন একটু ভাবলেন। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘রাজার তিরস্কারে আমাদের কিছু আসে-যায় না। কিন্তু বড় ক্ষতি হয়ে যাবে মহারাজের কিছু একটা হয়ে গেলে। কাল থেকে তুমি আবার দেহরক্ষী পাঠানো শুরু কোরো। তবে খুব সাবধানে। রাজাধিরাজ শান্তনু যাতে টের না পান। আর হ্যাঁ, আগের মতো অদক্ষ সৈন্য পাঠাবে না। অতিশয় চৌকস যারা, যারা নিজেদের লুকিয়ে রাখতে জানে, তেমন রক্ষী পাঠাবে।’ বজ্রবারক বললেন, ‘আপনার নির্দেশ যথাযথভাবে পালিত হবে মান্যবর।’

সেই থেকে জনাদশেকের একটা সৈন্যদল মহারাজ শান্তনুকে অনুসরণ করে আসছে। অতিকৌশলে নিজেদের আড়াল রাখতে জানে তারা। আজও আড়ালে দাঁড়িয়ে রাজার কর্মকাণ্ড দেখে যাচ্ছিল তারা। তারা দেখছিল—রাজার সামনে একজন অতুলনীয় রূপসী এবং একজন সুঠামদেহী যুবক। তিনজনের মধ্যে গম্ভীর কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কারো মধ্যে ক্ষিপ্তভাব নেই। তাদের দেহভঙ্গি আবেগায়িত। একটা সময়ে তারা দেখল—নারীটি চলে গেলেন। কিন্তু যুবকটি রয়ে গেলেন। এগিয়ে এসে যুবকটি রাজার পা ছুঁয়ে প্রণামও করলেন। কিন্তু প্রণাম করা তো শেষ কথা নয়। পৃথিবীতে হাজারো হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে, এ রকম সুজন সেজে। আরে আরে! যুবকটি রাজার গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন কেন? কোনো কু-উদ্দেশ্য আছে নাকি! দলপ্রধান ত্বরিত আদেশ দিল—এগিয়ে যাও।

চোখের পলকে দলটি রাজা আর যুবকটিকে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলল।

রাজা তাদের দেখতে পেয়েই চিনতে পারলেন—এরা তাঁর দেহরক্ষী। বজ্রবারক তাঁর কথা শোনেনি তাহলে! মন তাঁর কঠিন হয়ে আসতে চাইল। কিন্তু আজ বিশালপ্রাপ্তির দিন। আজ কঠোর হতে ইচ্ছা করল না শান্তনুর। শুধু হাত-ইশারায় দেহরক্ষীদের থামিয়ে দিলেন। আনন্দভরা কণ্ঠে বললেন, ‘এ আমার পুত্র দেবব্রত।’

সসম্ভ্রমে সৈন্যরা দূরে সরে গেল।

পুত্রকে নিয়ে ওই ছোট্ট রথটিতেই চড়লেন শান্তনু। রথের তিন দিকে ঘেরা দেহরক্ষী। দলপ্রধান অন্য একজনসহ সামনে সামনে।

সন্ধ্যা ঘনায়মান। রাজধানীর মন্দিরে মন্দিরে সান্ধ্যঘণ্টা বাজছে। কোনো কোনো মন্দির থেকে বৈদিক মন্ত্রধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। ধূপধুনোর গন্ধে চারদিক ম ম। প্রধান রাজপথ ধরে রথ এগিয়ে চলেছে। রাজপথের দুই ধারে উজ্জ্বল আলো। কিনারা ধরে সাধারণ মানুষ হাঁটছে। ঘোড়ার খুরের শব্দে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাছে তারা। একি! ইনি যে মহারাজ শান্তনু! এ রকম সাধারণ বেশভূষা! আরে! এ তো রাজার রথ নয়। এ তো সাধারণ একটা রথ, একটা ঘোড়ায় টানা! এ রথে তো রাজা কখনো চড়েন না। আরে আরে দেখো, রাজার পাশে ওই কোন জন দেখো। এ যুবক কে গো? রাজাগজা তো নিশ্চয়ই না। ওই রকম হলে তো পোশাক-আশাকও থাকত তেমন—স্বর্ণখচিত দেহবেশ, মাথায় মুকুট! ওঁর যে কিছুই নেই। আমাদের মতোই তো পরিধেয় তাঁর। সাধারণ কেউ হবেন। কিন্তু একজন সাধারণ যুবককে এত কাছে ডাকলেন কেন মহারাজ? নিশ্চয়ই কোনো হেতু আছে। অন্যজন বলল, দেহটা দেখেছ তাঁর? সুঠাম। শালপ্রাংশু যাকে বলে। আর গায়ের রং, গায়ের রংটা খেয়াল করলে না? অন্যজন বলল। আমাদের রাজার গায়ের রং ওই যুবকের গায়ের রঙের কাছে কালো কালো ঠেকছে।

মহারাজ শান্তনুর রথ এগিয়ে গেল রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকের দিকে। রাজপ্রাসাদের বিশেষভাবে সজ্জিত একটা কক্ষে দেবব্রতকে রাত্রি যাপন করতে দিলেন রাজা। বহু বছর আগে মনের খেয়ালে এই কক্ষটি সাজিয়েছিলেন তিনি। এর পেছনে তেমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, তবে আবেগ ছিল। যদি কোনো দিন পুত্রটি ফিরে আসে! যদি গঙ্গা কোনো দিন তার বুকের মানিকতুল্য সন্তানটিকে ফেরত দিয়ে যায়।

পরদিন সকালে রাজসভার আহ্বান জানালেন মহারাজ শান্তনু। মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, মহামন্ত্রী, সমরাধ্যক্ষ, পরামর্শক, সভাসদ, পুরোহিত, অমাত্য—সবাই উপস্থিত। সভামণ্ডপ গমগম। সবার মনে প্রশ্ন—হঠাৎ করে রাজাধিরাজ এ রকম জরুরি সভার আহ্বান করলেন কেন? কুরুরাজ্য আক্রান্ত হওয়ার কোনো সংবাদ পেয়েছেন কি রাজা? দেশের কোথাও দুর্ভিক্ষ লেগেছে? না অন্য কোনো দুর্যোগের ঘনঘটা? সবাই প্রশ্নাকুল হলেও মহামন্ত্রী রৈভ্য আর সমরাধ্যক্ষ বজ্রবারক নির্বিকার। তাঁরা জানেন এই সভা আহ্বানের পশ্চাতের কার্যকারণ।

মহারাজ শান্তনু সভামণ্ডপে প্রবেশ করলেন। তিনি তো রাজকীয় পোশাক পরেছেনই, তাঁর পেছন পেছন যে যুবকটি এগিয়ে এলেন, তাঁর গায়েও রাজার মতো পোশাক-পরিচ্ছদ। মাথা উঁচু করে দৃঢ় পদক্ষেপে যুবকটি মহারাজ শান্তনুকে অনুসরণ করে এগোচ্ছেন। সোপানের পর সোপান অতিক্রম করে শান্তনু সিংহাসনের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন। কিন্তু যুবকটি সোপানের প্রথম ধাপেই থেমে গিয়েছিলেন। খেয়াল করেননি শান্তনু। হঠাৎ পেছন ফিরে দেখলেন, যুবকটি সিঁড়ির নিম্নধাপে দাঁড়িয়ে আছেন। মৃদু কণ্ঠে রাজা বললেন, ‘এসো বাবা। ওপরে উঠে এসো।’

অকম্পিত পদক্ষেপে যুবকটি সিংহাসনের দিকে উঠে গেলেন। সিংহাসনের পাশে আগে থেকেই আরেকটা আসন রাখা ছিল। সেই আসনটি রাজসিংহাসনের মতো ঐশ্বর্যমণ্ডিত নয় বটে, তবে রত্নখচিত। চামরিরা ব্যজনী দুলিয়ে যাচ্ছিল।

কাছে পৌঁছলে যুবকটিকে হাত ধরে রত্নখচিত আসনে বসালেন রাজা। নিজে বসলেন। চক্ষু পরিপূর্ণভাবে উন্মীলিত করে সভার চারদিকে বুলিয়ে নিলেন কয়েকবার। তারপর সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে মহারাজ শান্তনু বললেন, ‘এ আমার সন্তান, আমার পুত্র গাঙ্গেয়।’

যাঁরা বিচক্ষণ, যাঁরা পূর্বের শান্তনু-গঙ্গার বিয়ে সম্পর্কে জানেন, শেষ সন্তানটি নিয়ে ঘটনাপরম্পরার ব্যাপারটি যাঁরা সামান্য অবগত, তাঁরা কিছুটা আঁচ করলেন। যাঁরা জানেন না তেমন, তাঁদের নেত্র বস্ফািরিত হলো—সন্তান! গাঙ্গেয়! অনেকটা নিজেদের অজান্তে ফিসফিসানির মতো করে তাদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো।

রাজা ডান হাতটা সামনের দিকে প্রসারিত করলেন। ক্ষণকালের জন্য চোখ দুটি মুদলেন। তারপর পরিষ্কার কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্চারণে রাজার গলা থেকে বেরিয়ে এলো, ‘এই যুবকটি আমার আত্মজ। দেবব্রত এর নাম। মা তাকে গাঙ্গেয় বলেও ডাকে কখনো কখনো।’ আবার তাকালেন রাজা। এবার সবার চোখ-মুখের ওপর নিরীক্ষার দৃষ্টি। কারো চোখে-মুখে কোনো প্রশ্ন আছে কি না বুঝতে চাইলেন। যাঁরা প্রশ্নাকুল ছিলেন, তাঁরা নিজেদের সংযত করলেন।

রাজা এবার বললেন, ‘অভিজ্ঞরা জানেন, একসময় গঙ্গার সঙ্গে আমার পরিণয় হয়েছিল। দেবব্রত তারই ফসল, সোনালি ফসল।’ গোটা সভাকক্ষ করতালিতে ফেটে পড়ল। সেনাধ্যক্ষ দাঁড়িয়ে কুর্নিশ করলেন। তাঁর দেখাদেখি সবাই দাঁড়িয়ে মাথা নত করে স্বীকৃতি জানালেন। পুরোহিতরা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠলেন—সাধু, সাধু, সাধু।

রাজা শান্তনুর ধারণা ছিল, হঠাৎ করে একজন যুবককে এনে পুত্র বলে পরিচয় দিলে সভাসদদের মধ্য থেকে একটা গুঞ্জন উঠতে পারে। কেউ কেউ এর অতীত জানতে চাইতে পারেন, কেউ কেউ এর প্রকৃতত্ব নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারেন। কিন্তু জয়ধ্বনি শুনে রাজার মনের সব সন্দেহ সরে গেল। তাঁর হূদয় তৃপ্তিতে ভরে উঠল এই জন্য যে সবাই দেবব্রতকে তাঁর পুত্র হিসেবে মেনে নিলেন।

ওই দিন ওই সভায় আরেকটা কাজ করে বসলেন শান্তনু। বিশেষ একটা কারণে রাজা বেশ চিন্তাযুক্ত ছিলেন। তাঁর বাস্তব জ্ঞান ছিল প্রখর। রাজা পত্নীহীন, সন্তানহীন—এই কথা প্রচারিত ছিল কুরু সাম্রাজ্যে। রাজা নতুন করে বিয়ে করতেও আগ্রহী নন। তাহলে তাঁর উত্তরাধিকারী কে? তাঁর পরে কে রাজা হবেন? পুরুবংশের লতাপাতার কোনো আত্মীয় হস্তিনার সিংহাসন দাবি করে বসতেই পারে। সন্তানপ্রাপ্তির পর রাজার মন থেকে সেই দুশ্চিন্তা চলে গেল বটে; কিন্তু কাঁটাটা খুঁচিয়ে যাচ্ছিল তাঁকে। যদি দূরে-কাছের কেউ ভজকট তৈরি করে একটা! একটা চিনচিনে ভয় রাজাকে ভেতরে ভেতরে ব্যাকুল করে তুলেছে। সেই ব্যাকুলতা থেকে মুক্তির জন্য রাজা শান্তনু ঘোষণা করলেন, ‘আজকেই আমি দেবব্রতকে যুরবাজ পদে অভিষিক্ত করছি। আমার পরে এই কুরু সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হবে এই দেবব্রত।’

এতকাল অপরিচিত দেবব্রতকে রাজ্য শাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিষ্ঠিত করে রাজা শান্তনু পরম তৃপ্তি পেলেন। দেবব্রত কী যেন একটা বলতে চাইলেন। রাজা কোমল দৃষ্টির শাসনে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনারা ভাবছেন—দেবব্রত তো আনাড়ি! কোথায় না কোথায় বড় হয়েছে, তার কোনো ঠিক আছে? রাজকার্য পরিচালনা করার জন্য যে বিচক্ষণতার দরকার, তা কি দেবব্রতের আছে?’ স্নেহস্নিগ্ধ চোখে পুত্রের দিকে একবার তাকালেন রাজা শান্তনু। তারপর সভামধ্যে দৃষ্টি বিস্তারিত করে বললেন, ‘দেবব্রত তৈরি হয়েই এসেছে। দক্ষতায় সে তুলনাহীন, জ্ঞানে প্রশংসাযোগ্য।’

 ► চলবে

 

মন্তব্য