kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ মে ২০১৯। ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৭ রমজান ১৪৪০

নারীমূর্তি

ফরিদা ইয়াসমিন সুমি

১০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নারীমূর্তি

অঙ্কন : বিপ্লব

উন্মত্তের মতো দুই স্তনের ওপর মুখ ঘষতে লাগল আরেফিন। মুহূর্তের উত্তেজনা শেষে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। মূর্তিটি যেন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলো। ঘুমিয়ে পড়ল আরেফিন।

হঠাত্ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। যেখানটাতে দাঁড় করানো ছিল, মূর্তিটা সেখানে নেই। কিছুটা ভয়, কিছুটা বিস্ময়ে উঠে বসল। আশ্চর্য! গেল কোথায়? অস্বস্তিবোধ হতে লাগল।

ওয়াশরুমে যেতে হবে। কিন্তু ঘটনাটা কী হলো, দেখা দরকার। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝল, প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ঘুমিয়েছে।

সামনে এগোতেই দেখল, একটি মেয়ে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়ানো। কোমর পর্যন্ত ঘন কালো চুল। জানালার দিকে ফেরানো বলে মুখটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে না। গভীর মনোযোগ দিয়ে আরেফিনের আঁকা পেইন্টিংটা দেখছে। পরনের সাদা শাড়িটা আলো-আঁধারিতে একটু নীলচে দেখাচ্ছে। আঁচলটা উড়ছে বাতাসে। মূর্তিটির সঙ্গে একটু আগে যা করেছে তা ভেবে মনে মনে খুব লজ্জিত আর বিব্রত আরেফিন। কী করবে ঠিক বুঝতে পারে না! 

টেবিলের ওপর রংতুলি, ব্রাশ, প্লাস্টার অব প্যারিস, খোদাইয়ের যন্ত্রপাতি ছড়ানো-ছিটানো। এর আগে অনেক মূর্তি বানিয়েছে আরেফিন। নারীমূর্তি এই প্রথম। আজই পুরো কাজটা শেষ হলো। নারীদেহের সব সুষমা অকৃপণভাবে ঢেলে সাজিয়েছে। ঠিক যেন কল্পনায় আঁকা বহু সাধনার আরাধ্য নারী। নিজের সৃষ্টিতে নিজেই মুগ্ধ হয়েছে! কিন্তু এ কী হলো! স্বপ্নমূর্তি আজ জীবন্ত! এ-ও কি সম্ভব? মাথাটা সত্যি সত্যিই গেছে! ডিল্যুশন হচ্ছে না তো! নিজেকে চিমটি কেটে দেখল!

কে ওখানে?

মেয়েটি তেমনি নিরুত্তর।

এই যে, শুনতে পাচ্ছেন? কে আপনি?

উঁ করে একটু শব্দ করল বলে মনে হলো আরেফিনের।

আপনাকেই বলছি। এখানে এলেন কী করে?

খুব ধীরে মেয়েটি ঘুরে দাঁড়াল।

এই তো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে আরেফিন। সেই নেশা ধরানো চোখ, সেই পুরুষ্টু চৌকো ঠোঁট, জ্যোত্স্নামাখা চিবুক, বুকে তীর-বেঁধানো দেহভঙ্গি!

বা রে! আপনিই তো গড়লেন আমাকে! এখন জিজ্ঞেস করছেন, কে আমি, কোথা থেকে এসেছি! ভারী অদ্ভুত মানুষ তো!

আরেফিনের বোকা চাহনি দেখে, মেয়েটিই আবার বলল, কী হলো, এখনো অবাক হওয়ার পালা শেষ হয়নি বুঝি? চলুন, এবার একটু গল্প করা যাক। এতক্ষণ ঘুমুচ্ছিলেন। তাই বিরক্ত করিনি। ঘুম ভাঙার অপেক্ষায় ছিলাম। আপনার আঁকা পেইন্টিংগুলো দেখে নিয়েছি, এই ফাঁকে।

মেয়েটি বেশ স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়াতে লাগল ঘরের ভেতর। টেবিলে রাখা এলোমেলো জিনিসপত্রের ওপর গভীর মমতায় হাত বুলাল। তারপর শেলফে রাখা বইগুলোর নাম পড়তে লাগল—ডিজাইন অ্যাজ আর্ট, আর্ট ইন থিওরি ১৯০০-২০০০; অ্যান অ্যান্থলজি অব চেইঞ্জিং আইডিয়া, টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি অব আমেরিকান আর্ট, ওয়েজ অব সিইং অন দ্য বিবিসি টেলিভিশন সিরিজ, হিস্ট্রি অব বিউটি। শেষ বইটি তুলে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে পাতা উল্টাতে লাগল।

হতভম্ব হয়ে বসে থেকে আরেফিনের পানি আর চা দুয়েরই তৃষ্ণা পেল।

হঠাত্ই মেয়েটি আরেফিনের দিকে তাকাল। বইটি টেবিলের ওপর পৃষ্ঠাটি ভাঁজ করে রাখল। কিচেনটা কোন দিকে বলুন তো? দুজনের জন্য চা বানিয়ে আনি। বলতে বলতে চেহারায় বেশ গিন্নিভাব ফুটিয়ে শাড়ির আঁচলটা কোমরে গুঁজল। শুনুন, শাড়ির আঁচলটা কিন্তু একটু ছোট হয়েছে।

এবার সহজ হয়ে এলো আরেফিন। ঠিক আছে, আঁচলটা না হয় বাড়িয়ে দেব। খুশি তো!

হুমম, খুশি। কিচেনটা এই দিকে, তাই না? মেয়েটি নিজেই এগিয়ে গেল।

কী সুন্দর ছন্দময় হাঁটা মেয়েটির! হেঁটে যাওয়ার সময় পুষ্ট বুক আর ভারী নিতম্বে ঢেউ খেলে যায়!  ঠিক এভাবেই গড়েছিল মেয়েটিকে। অনেক দিন ধরে, অনেক যত্নে।

এক শৌখিন ব্যবসায়ীর বাগানবাড়ির জন্য মূর্তিটা বানানোর কন্ট্রাক্ট পেয়েছিল। শিল্পী হিসেবে আরেফিন খুব খুঁতখুঁতে। টাকাটা বড় অঙ্কের ছিল, এটা সত্যি। তবে টাকাটাই ওর কাছে সব নয়। বাগানবাড়িটা দেখে ভদ্রলোককে বেশ রুচিশীল মনে হওয়ায় আরেফিন কাজটা নিয়েছিল।

মিষ্টি একটা সুরে গুনগুন করছে মেয়েটি। খুব চেনা। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না কোন গানটা! চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দ শুনে চায়ের তৃষ্ণাটা আরো বাড়ল আরেফিনের।

ট্রেতে দুই মগ চা, দুই গ্লাস পানি আর পিরিচে চারটা বিস্কিট নিয়ে রুমে ঢুকল মেয়েটি। বিছানায় রেখে পা তুলে বসল।

কী হলো? কী এত ভাবছেন? পা তুলে আরাম করে বসুন। আমি কিন্তু খুব ভালো চা বানাই। খেয়েই দেখুন না।

আরেফিন এক নিঃশ্বাসে পানিটা খেয়ে নিল।

মেয়েটি চায়ের মগটা এগিয়ে দিল। তারপর নিজেরটা নিয়ে চুমুক দিল।   

আচ্ছা, আমার নাম কী? মেয়েটির এই প্রশ্নে হঠাত্ একটা ধাক্কা খেল আরেফিন।

সুন্দর একটা নাম দিন না প্লিজ। অনামিকা হয়েই থাকব নাকি? নাম ছাড়া ভালো লাগছে না। আর শুনুন, আপনি আপনি করে বলতে একটুও ভাল্লাগছে না। আমরা তুমি করে বলব। ডান?

ওকে, ডান। দাঁড়াও, তোমার একটা নাম ঠিক করি। চোখ বন্ধ করে ভাববার চেষ্টা করল আরেফিন। এই মুহূর্ত থেকে তোমার নাম ‘তৃষ্ণা’। তুমি আমার তৃষ্ণা, তৃষ্ণা, তৃষ্ণা।

বাহ, খুব সুন্দর নাম তো! চলুন, আমার নাম রাখার ক্ষণটিকে সেলিব্রেট করি।

সেলিব্রেশন? কিভাবে?

বা রে! সব কিছু বুঝি আমি বলে দেব? একটু অভিমান নিয়েই বলল তৃষ্ণা।

উমমম, কাছে এসো! বলেই হাত ধরে নিজের দিকে মেয়েটিকে টানল আরেফিন।

কিন্তু

কোনো কিন্তু নয়। বলেই মেয়েটিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল আরেফিন।

ঝাঁকুনি দিয়ে যেন বিদ্যুত্ খেলে গেল শরীরে! তৃষ্ণার মুখটা আঁজলায় নিয়ে গভীর চুম্বন করল ঠোঁটে। তৃষ্ণাও সাড়া দিল।

এক বুক তৃষ্ণা নিয়ে অতল সাগরে হারিয়ে গেল দুজন!

বোধ ফিরে এলে দুজনেই লাজুক হাসে।

চলো, ছাদে যাই। আজ পূর্ণিমা! চাঁদ হবে আমাদের ভালোবাসাবাসির সাক্ষী।

ছাদে উঠল দুজন। আকাশজুড়ে মস্ত বড় চাঁদ। রুপালি আলোয় তৃষ্ণার মুখটা আরো মায়াবী, আরো রহস্যময় মনে হলো।

ফুলের খোঁজে ছাদের এদিক-ওদিক তাকাল আরেফিন। এক পাশে কিছু সন্ধ্যামালতী ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। একটা লাল সন্ধ্যামালতী গুঁজে দিল তৃষ্ণার চুলে। দরাজ গলায় বলল, ও চাঁদ ও সন্ধ্যামালতী, সাক্ষী থেকো, আজ থেকে তৃষ্ণা শুধু আমার!

খিলখিল করে হেসে ওঠে তৃষ্ণা। অপরূপ দেখায় তৃষ্ণাকে! মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে আরেফিন।

আমার একটা ছবি এঁকে দেবে?

নিশ্চয়ই। এক্ষুনি চলো।

ছাদ থেকে নেমে, তৃষ্ণাকে বিছানায় বসাল আরেফিন। একেবারে নড়বে না। এভাবেই থাকো।

ঠোঁটে সিগারেট নিয়েই রঙের স্ট্রোক দিতে লাগল অভিজ্ঞ হাতে। সাদা কাগজে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল কানের পাশে লাল সন্ধ্যামালতী গোঁজা তৃষ্ণার হাসিমাখা মুখ।

খোলা জানালা দিয়ে কড়া রোদ এসে পড়েছে আরেফিনের মুখে। দুই হাতে চোখ আড়াল করে উঠে বসে আরেফিন। ধড়ফড় করে ওঠে, তৃষ্ণা, আমার তৃষ্ণা কই?

আশ্চর্য! সারা শরীরে উপচে পড়া যৌবন নিয়ে মূর্তিটা আগের জায়গায়ই দাঁড়ানো আছে। নির্বাক, নিশ্চুপ, নিষ্প্রাণ! শাড়ির আঁচলটা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা ছোট। কানের পাশে এখনো গোঁজা আছে মিইয়ে যাওয়া সন্ধ্যামালতী।

টেবিলের ওপর রাখা ‘হিস্ট্রি অব বিউটি’ বইটির একটি পৃষ্ঠা ভাঁজ করে রাখা। বিছানার এক পাশে দুটি মগে নিঃশেষিত চায়ের তলানি, পিরিচে নরম হয়ে যাওয়া দুটি বিস্কিট। এর ঠিক পাশেই ইজেলে আঁকা ছবিটা। ছবিতে বিছানায় বসা নারীমূর্তিটির চুলে টকটকে লাল সন্ধ্যামালতী।

মূর্তিটিকে জড়িয়ে ধরে বিড়বিড় করতে লাগল আরেফিন, প্লিজ তৃষ্ণা, জীবন্ত হও। এভাবে প্রাণহীন হয়ে গেলে কী করে বাঁচব আমি? আমার কাছ থেকে কেউ নিতে পারবে না তোমায়। তুমি শুধু আমার। তুমি আমার অনঙ্গ প্রেম!

উদ্ভ্রান্তের মতো বিছানায় কী যেন খুঁজে বেড়াল আরেফিন। কী করে দুপুর গড়িয়ে বিকেল, বিকেল গড়িয়ে রাত হলো টের পেল না। এর মধ্যে ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের পিএস ফোন করলে সাফ সাফ জানিয়ে দিল, মূর্তিটা দিতে পারছে না ও। অন্য কাউকে কাজটি দেওয়ার অনুরোধ করে দুঃখ প্রকাশও করল। আবারও তলিয়ে গেল ঘুমের ঘোরে। কতটা রাত হয়েছে বুঝতে পারল না। একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

আরে! ওই তো তৃষ্ণা! আরেফিন ওর পেছনটা দেখতে পেল। প্রাণ ফিরে পেয়েছে তৃষ্ণা। মহা আনন্দে উঠতে গিয়ে মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। 

কিন্তু যাচ্ছে কোথায় তৃষ্ণা! ধীর পায়ে ছাদের দিকে এগিয়ে যেতে দেখল ওকে।

দাঁড়াও তৃষ্ণা, দাঁড়াও... আমিও আসছি।

ডাকতে ডাকতেই তৃষ্ণার পিছু ছুটল আরেফিন।

পরদিন সকালে নারীমূর্তি জড়িয়ে ধরে শহরের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আরেফিন সাদিকের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা গেল। শিল্পীর মুখে রহস্যঘন হাসি আর গভীর পরিতৃপ্তির ছাপ!

মন্তব্য