kalerkantho

সোমবার । ২১ অক্টোবর ২০১৯। ৫ কাতির্ক ১৪২৬। ২১ সফর ১৪৪১                       

মোনালিসা চোরের জবানবন্দি

আন্দালিব রাশদী

১০ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২ মিনিটে



মোনালিসা চোরের জবানবন্দি

মোনালিসা

১১ আগস্ট ১৯১১ প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরের গ্যালারি থেকে গায়েব হয়ে গেল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা। সেদিন কেউ জানলই না।

মোনালিসার একপাশে কোরাজ্জিওর আঁকা ‘মিস্টিক্যাল ম্যারেজ’ আর পাশে তিশ্যানের ‘অ্যালেগরি অব আলফঁসো দ্য ‘অ্যাভালস’। পরদিন ১২ আগস্ট ১৯১১ ফরাসি শিল্পী লুই বেরু নিজের আঁকার প্রয়োজনে স্যালন ক্যারেতে ঢুকে দেখলেন, মাঝখানে শুধু চারটি পেরেক। অথচ পাঁচ বছর ধরে মোনালিসা তো এখানেই ছিল।

শিল্পী গার্ডদের সঙ্গে কথা বললেন। ফটোগ্রাফির জন্য কখনো ছবি নামানো হয়। গার্ডদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মনে হলো, ছবিটি ফটোগ্রাফারদের কাছে। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি আবার এলেন, ছবিটি না দেখে তিনি শাখাপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখলেন, মোনালিসা ফটোগ্রাফারদের কাছে নেই। সঙ্গে সঙ্গে খোঁজ শুরু হয়ে গেল, কোথাও নেই দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা। ল্যুভ পরিচালক তখন ছুটিতে, দ্বিতীয় প্রধান মিসরীয় অ্যান্টিক বিভাগের কিউরেটর ঘটনা জানলেন। তিনি পুলিশ ডাকলেন। প্রায় ৬০ জন অনুসন্ধানকারীকে পুরো জাদুঘর তল্লাশির হুকুম দেওয়া হলো। সেদিনের দর্শকদের আস্তে আস্তে বের করে দিয়ে ল্যুভ বন্ধ করে ভেতরে চিরুনি অনুসন্ধান চালিয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত হলো, মোনালিসা চুরি হয়ে গেছে।

তদন্তের সুবিধার জন্য জাদুঘর এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলো। অনুসন্ধানের প্রথম দিনই একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার—মোনালিসার মূল্যবান ফ্রেমটি অক্ষত অবস্থায় সিঁড়ির কাছে পড়ে আছে, বহিরাবরণ কাচটিও। ওই কাচ নিয়ে বিতর্ক ছিল। একজন কাউন্টেস দুই বছর আগে ফ্রেমটি জাদুঘরকে দান করেছিলেন। তার মানে চোর প্রদর্শনী দেয়াল পর্যন্ত এসেছে, পেরেক থেকে এটা তুলে নিয়েছে, সিঁড়িতে এসে ফ্রেমের ভেতর থেকে ছবিটা বের করে প্রহরীদের দৃষ্টি এড়িয়ে বেরিয়ে গেছে।

(বলা বাহুল্য, সিসিটিভির যুগ তখনো অনেক দূরে। ১৯৪২ সালে প্রথম জার্মানির সিমেন্স অফিসে ভি-২ রকেট উেক্ষপণ দেখার জন্য প্রথম ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা টিভি ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ব্যবহূত হয় ১৯৬৮ সালে নিউ ইয়র্কের স্ট্রিট ক্রাইম নজরদারি করতে।)

কিন্তু ব্যাপারটি ঘটল কখন? মিউজিয়ামের একজন কর্মচারী বলেছেন, সকাল ৭টায় তিনি দেয়ালে মোনালিসাকে দেখেছেন। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পর তিনি যখন আবার এদিক দিয়ে যান, তখন ছবিটা ছিল না, তিনি মনে করেছেন, জাদুঘরের কোনো কর্মকর্তা নিয়ে গেছেন।

এই কক্ষের নিয়মিত প্রহরীর সন্তান হাম রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি ছুটিতে ছিলেন, তাঁর জায়গায় যে প্রহরী কাজ করছিলেন, তিনি সকাল ৮টার দিকে সিগারেট খেতে কয়েক মিনিটের জন্য একটু দূরে ছিলেন।

সেদিন ক্লিনিংয়ের জন্য সকালে জাদুঘর বন্ধ ছিল। তার পরও সকালে স্যালন ক্যারে কক্ষে প্রায় ৮০০ জন ঢুকেছেন—তাঁরা জাদুঘরের স্টাফ, গার্ড, শ্রমিক, ক্লিনার, ফটোগ্রাফার। একজন আগন্তুকের কথাও কেউ বলেছেন।

একজন বিখ্যাত ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞ এলেন, ফ্রেমের আঙুলের ছাপের সঙ্গে ম্যাচ করে এমন কাউকে পেলেন না।

মিউজিয়ামে এলিভেটর সংযোজনের কাজ চলছিল, বাইরে একপাশে মাচা বাঁধা ছিল। সন্দেহ করা হলো, চোর সেদিক দিয়ে ঢুকেছে। তবে তদন্তকারীরা একমত হলেন, চোর জাদুঘরের ভেতরটা সম্পর্কে বেশ জ্ঞানবান।

কিন্তু কে চুরি করল?

চুরির খবর আগুন লাগা বনের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।

সবার আগে ফরাসিরা দোষ দিল জার্মানদের। তাদের নৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য জার্মানরা চুরি করিয়েছে। জার্মানরা বলল, কাজটা ওদেরই; আন্তর্জাতিক বিষয় থেকে দৃষ্টি সরাতে নিজেরাই করেছে। প্যারিসের পুলিশের তিনটি অভিমত : এটি রাজনৈতিক নয়, তবে ল্যুভের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতে নাশকতামূলক হতে পারে; অসন্তুষ্ট কোনো ল্যুভ কর্মচারী কিংবা কোনো বাতিকগ্রস্ত কেউ কাজটা করেছেন। আর্থিক লাভের জন্য সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায়ের জন্য মোনালিসা চুরি হয়েছে।

 

গিওম আপোলিনেয়ার ও পাবলো পিকাসো গ্রেপ্তার

ল্যুভ থেকে চুরির রেকর্ড আছে এমন একজন চিত্রশিল্পী গ্যারি পিরে। প্যারিসের পুলিশ মোনালিসা চোর হিসেবে তাকে সন্দেহ করল। তাকে আটক করার চেষ্টা করল, কিন্তু তাকে প্যারিসে পেল না। তারা গিয়ে হাজির হলো তার চাকরিদাতা এবং সুররিয়ালিজম আন্দোলনের নেতা কবি গিওম আপোলিনেয়ারের কাছে। তাঁকে সন্দেহের তালিকায় রাখার কারণ, তিনি ল্যুভ জাদুঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিবৃতি দিয়েছিলেন। তিনি এই বিবৃতির পুনরুক্তিও করেন। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফরাসি কবি গিওমের স্পেনির শিল্পী বন্ধু পাবলো পিকাসো গ্যারি পিয়ের কাছ থেকে আইবেরিয়ান স্টোন কিনেছেন। তাঁর ধারণা ছিল না যে বিক্রেতা পুলিশের তালিকাভুক্ত ল্যুভ জাদুঘরের একজন চোর। পুলিশি তদন্তের পর দুইজনই ছাড়া পান।

তারপর দুই বছর কেটে যায়। মোনালিসার কোনো খবর মেলে না। ১৯১৩ সালের শরত্কালে আলফ্রেদো জেরি নামের একজন খ্যাতনামা এন্টিক ডিলার তাঁর ব্যবসার প্রয়োজনে ইতালির কয়েকটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন : ভালো মূল্যে সব ধরনের শিল্পসামগ্রীর ক্রেতা। ২৯ নভেম্বর ১৯১৩ তারিখে নির্মিত একটি চিঠি আলফ্রেদো জেরি পেলেন, তাতে বলা হয়েছে—লেখকের কাছে চুরি হয়ে যাওয়া লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনালিসা আছে। ফিরতি ঠিকানা হিসেবে পত্র লেখকের একটি প্যারিস পোস্টবক্স নম্বর উল্লেখ করা হয়েছে। বিক্রেতার নামও ‘লিওনার্দো’, জেরি মনে করেছেন—এটা প্রকৃত মোনালিসা হতে পারে না, সম্ভবত মোনালিসার কোনো কপি হবে। তার পরও তিনি ফ্লোরেন্সের উফিজি জাদুঘরের পরিচালক জিওভান্নি পোরজির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। দুজন আলোচনা করে ঠিক করলেন, বিক্রেতাকে চিঠি দিয়ে বলা হবে, কোনো মূল্য অফার করার আগে ছবিটি দেখতে চান।

সঙ্গে সঙ্গে ছবি দেখার জন্য জেরি চিঠি পেলেন। জেরি জবাব দিলেন, তাঁর পক্ষে প্যারিস যাওয়া সম্ভব নয়, তবে ২২ ডিসেম্বর মিলানে তাঁর সঙ্গে সঙ্গোপনে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে পারবেন।

গোঁফওয়ালা এক ইতালিয়ান ১০ ডিসেম্বর ১৯১৩ সালে ফ্লোরেন্সে জেরির সেলস অফিসে এসে হাজির হলেন। জেরি তখন একজন খদ্দেরের সঙ্গে ব্যাবসায়িক কাজ করছেন। খদ্দের চলে যাওয়ার পর গোঁফওয়ালা নিজের পরিচয় দিলেন—তিনি লিওনার্দো ভিনসেনজো, তাঁর হোটেল রুমে ‘মোনালিসা’ রেখে এসেছেন। তিনি কয়েকটি শর্তে বিক্রিতে সম্মত :

১. ছবিটির জন্য তাঁকে অর্ধমিলিয়ন (পাঁচ লাখ) লিরা দিতে হবে।

২. ছবিটি ওফিজিতে থাকবে, কখনো ফ্রান্সকে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না।

তিনি আরো বললেন, ইতালি থেকে নেপোলিয়ন মোনালিসা চুরি করে নিয়েছেন, সে জন্য তিনিও ল্যুভ থেকে এটা চুরি করে নিয়ে এসেছেন—ইতালির জিনিস ইতালিতে ফিরিয়ে আনার তাগিদে।

জেরি কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে তাঁর প্রস্তাবিত মূল্যে রাজি হয়ে গেলেন, তবে উফিজি জাদুঘরে টাঙাতে হলে জাদুঘরের পরিচালককে অবশ্যই তা দেখাতে হবে। লিওনার্দো ভিনসেনজো পরদিন তাঁর হোটেলকক্ষে দুজনকে আসতে বললেন। ফিরেই জেরি পুলিশ এবং উফিজির পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

 

পরদিন জেরি ও পজ্জি হোটেলে গেলেন। লিওনার্দো একটি কাঠের ট্রাংক টেনে বের করলেন। ট্রাংক খোলার পর লিওনার্দো এক জোড়া আন্ডারওয়্যার, পুরনো জুতা ও শার্ট বের করলেন। তারপর একটি ফলস পাটাতন সরালেন-সেখানেই মোনালিসা।

মিউজিয়ামের পরিচালক বললেন, এই ছবিটিকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অন্যান্য ছবির সঙ্গে তুলনা করে নিশ্চিত হতে হবে। তারপর তাঁরা ছবিটি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। লিওনার্দো ভিনসেনজোর প্রকৃত নাম ভিনসেনজো পেরুগিয়া। তিনি গ্রেপ্তার হলেন। তাঁর এক বছর পনেরো দিনের কারাদণ্ড হয়। চোর হিসেবে কারাদণ্ড ভোগ করলেও ইতালিয়ানদের কাছে তিনি দেশপ্রেমিক নায়ক হয়ে ওঠেন। ৪৪ বছর বয়সে জন্মদিনেই তাঁর মৃত্যু হয়।

 

ভিনসেনজোর জবানবন্দিটি অনূদিত হলো—

আমার নাম ভিনসেনজো পেরোগিয়া... জন্ম ৮ অক্টোবর ১৮৮১, দুমেনজা (কোমো)-তে ...আমি লিখতে ও পড়তে জানি, আমি এলিমেন্টারি স্কুলে থার্ড গ্রেড পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। আমি বিয়ে করিনি, কিছুদিনের জন্য সৈনিক ছিলাম; কিন্তু বুকের দুর্বলতা—আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে দুর্বলতার কারণে আমাকে সেনাবাহিনী থেকে বাদ দেওয়া হয়।

আমি দুবার ল্যুভ জাদুঘরে কাজ করেছি। প্রথমবার ১৯০৯ এবং দ্বিতীয়বার ১৯১০ সালে। প্রতিবারই তিন-চার মাস করে কাজ করেছি। ক্যানভাস পরিষ্কার করে কাচের নিচে ছবি রাখতে সাহায্য করতাম।

সেখানে কাজ করার সময় জানতে পারি, ল্যুভ জাদুঘরের অনেক পেইন্টিং ইতালি থেকে চুরি করা। একদিন বিরতির সময় আমি একটি ছোট লাইব্রেরিতে যাই। সেখানে ল্যাবরেটরিতে একটি আলমারির ভেতর থেকে একটি বই টেনে নিয়ে পড়ি (লেখকের নাম মনে নেই), তাতে অনেক ছবির ফটোগ্রাফও ছিল—আমি জানতে পারি, প্রথম নেপোলিয়ন ইতালি থেকে চুরি করে নিয়ে এসেছে।

সেই মুহূর্ত থেকেই আমার মধ্যে একটি বাসনার জন্ম হয়, আমি ক্ষুব্ধ ও বঞ্চিত বোধ করতে থাকি—ইতালিতে প্রোথিত আমার অহংকার, আমার মনে হয় এমন একটি পেইন্টিংও আমি যদি ইতালিকে ফিরিয়ে দিতে পারতাম।

...(ল্যুভ জাদুঘরে) আমার কাজ শেষ হওয়ার পর আমার প্রকল্প সচল রাখি।

আগস্ট মাসের এক সকালে শ্রমিকরা সাদা ঢিলা আলখাল্লা পরে, আমি ল্যুভে আসি; পেছনে সিন নদীর দিক থেকে খোলা দরজা দিয়ে আমি শ্রমিকদের সঙ্গে ভেতরে ঢুকে যাই। আমি ভেতরে যেতে থাকি। তারপর দেখি, আমি বর্গাকার একটি হলরুমে (স্যালন ক্যারে), কোনো রকম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই আমার নজর পড়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা গিয়োকোন্দার ওপর (ইতালিয়ানদের কাছে ছবিটি এই নামেই পরিচিত। লিওনার্দো তাঁর আঁকা পোর্ট্রেটটির কোনো নাম দেননি। ভাসারির লেখায়ই প্রথম মোনালিসা উল্লেখ করা হয়েছে)।

যে কক্ষে আমি গিয়েকোন্দাকে পেয়েছি, সেখানে র্যাফায়েলের ‘লা বোল জার্দিনেয়ার’, ‘দ্য হলি ফ্যামিলি অব ফ্রান্সিস ওয়ান’, ‘আর্চ অ্যাঞ্জেল মাইকেল’; কাস্তিলিয়ন নামের একজন শিল্পীর লেখাও আছে, আরো আছে কার্নান্দিনো লুইনির ‘ম্যাডোনা’।

গিয়োকোন্দার ছবিটি দুটি হুকের ওপর বসানো ছিল। ছবিটি ওপরের দিকে তুলতেই দেয়াল থেকে সরে আসে। তারপর আমি সাত মিটার কক্ষ সংলগ্ন সিঁড়িঘরে লুকিয়ে স্ক্রুগুলো খুলে ছবিটা বের করে নিই। ফ্রেমটা সেখানে ফেলে রেখে ছবিটা আমার ঢিলা পোশাকের ভেতর ঢুকিয়ে বাইরের আঙিনায় চলে আসি। প্রহরী কক্ষ থেকে বেরোনোর দরজায় অন্যদের নিয়ে ব্যস্ত ছিল, আমাকে লক্ষ করেনি। আমি তখন বাড়ি চলে আসি (ভায়া দেল’ হসপিটাল সেন্ট লুই, নম্বর-৫), কোথাও না লুকিয়ে ছবিটি বাড়িতে রেখে রাস্তায় অন্য একটি বাড়িতে কাজে চলে আসি।

আমি কুরিয়ার ডেল্লা মেরাতে ফ্লোরেন্সের এন্টিক ব্যবসায়ী জেরি সাহেবের ঠিকানা পেয়ে আমি তাঁকে লিখলাম, উফিজি জাদুঘর গিয়োকোন্দো কিনতে পারে, তিনি যোগাযোগ করে দেখতে পারেন। তিনি বললেন, আমি যদি ছবিটাকে ফ্লোরেন্সে নিয়ে আসতে পারি, তাহলে আমার প্রস্তাব গৃহীত হতে পারে। লিখে আমি জানালাম, ফ্লোরেন্সে আসতে পারি। যদি কাজটা তাড়াতাড়ি সারতে চাই, সে ক্ষেত্রে ফ্লোরেন্স ছাড়া অন্য কোনো শহর পছন্দ করলেও তার আপত্তি নেই বলে জেরি জানালেন। আমি জানালাম, প্রথমে আমি মিলান যাচ্ছি, সেখানে গিয়েছি; কিন্তু সেখানে থাকাটা আমার পছন্দ হয়নি, আমি জেরিকে টেলিগ্রাম করে জানালাম, ফ্লোরেন্সেই আসছি। ঘণ্টা দুয়েক মিলানে থেকে আমি বুধবার সকাল ১১টায় পৌঁছি।

ফ্লোরেন্সে ঢুকে ত্রিপোলি হোটেল দেখতে পাই, সেখানে রুম নিই; স্টেশনে ফিরে এসে আমার লাগেজ তুলে আনি। জেরি সাহেবকে পেতে একটু তাড়াহুড়ো করি। আমি তাঁকে পাই এবং বলি যে ছবিটি আমার কাছে আছে। যিনি ছবিটি কিনবেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় চেয়ে পরদিনের জন্য আমাদের অ্যাপয়েন্ট ঠিক করা হয়। ইতালিকে গিয়োকোন্দো ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে আমি পুরস্কৃত হওয়ার কথা বলি, কিন্তু টাকার অঙ্কে আমি তা স্থির করিনি। জেরি আমাকে পাঁচ লাখ লিরা (প্রায় পাঁচ হাজার পাউন্ড) চাওয়ার পরামর্শ দিলেন। কারণ যিনি ছবিটি কিনবেন, বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে পাবেন। কাজেই আমার পুরস্কারটি পেতে পারি। তিনি একটি পার্সেন্টেজ পাবেন। জেরির সঙ্গে আমার সাক্ষাতের পরদিন আবার তাঁর কাছে যাই এবং তাঁকে ও প্রফেসর পোগগিকে একত্রে পাই।

তাঁরা ছবিটি দেখতে চান, আমি তাঁদের হোটেল ত্রিপোলিতে নিয়ে আসি, তখনো যেহেতু বাইরে পর্যাপ্ত আলো, ছবিটি নিয়ে উফিজি গ্যালারিতে আসতে বললেন। আমি তা-ই করি, আমরা তিনজন সরাসরি উফিজিতে চলে আসি।

সেখানে অধ্যাপক পোগগি ও বিশেষজ্ঞ ফটোগ্রাফার সম্মত হন যে এটা সত্যিকার মোনালিসা। আমি ছবি সেখানে রেখে আসি এবং সম্মত হই, পোগগি রোমে তাঁর বস রিক্কিকে লিখবেন। তিনি এসে আমার পুরস্কার ঠিক করবেন। এসব ঘটেছে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (১২ ডিসেম্বর), ততক্ষণে রাত হয়ে যায়।

পরদিন আমি দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করি, আমি আবার জেরির সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করি। আমি তাঁকে বাড়িতে পাইনি। জেরির পক্ষে তাঁর ছেলে আমাকে জানায়, তার বাবা ফিরেছে; কিন্তু এখন দেখা করা যাবে না। আমাকে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হোটেলে থাকতে বলেছেন, আমাকে ফোন করা হবে।

৫টা বেজে গেল; কিন্তু কেউ না আসায় আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এ সময় আমি গ্রেপ্তার হই।

আমাকে সত্য বলার জন্য চাপ দেওয়া অর্থহীন, কারণ আমি পুরো সত্যটাই বলেছি, সত্য ছাড়া অন্য কিছু বলিনি। যে চিন্তা আমাকে বহু বছর ধরে তাড়া করে আসছিল, ছবিটি ইতালিকে ফিরিয়ে দেওয়া, আমি সে জন্যই ছবিটি নিয়ে এসেছি। এর বেশি আমার বলার কিছু নেই।

ভিনসেনজো পেরোগিয়া এক বছর ১৫ দিন কারাদণ্ড হলে মোনালিসা চোরের বিরুদ্ধে আপিল করলে সাজা কমে সাত মাস হয়।

জেরির বর্ণনা অনুযায়ী কাঠের ট্রাংকের নিচের ডেকে লাল সিল্কের আস্তরণে অত্যন্ত যত্ন করে মোনালিসাকে রাখা হয়েছে।

এই নারীর জন্য হয়তো তাঁরও তীব্র ভালোবাসা জন্মেছিল।

মোনালিসা উদ্ধারের কাহিনি শিল্পজগেক অনুপ্রাণিত করে। ইতালিয়ানদের দাবি অনুযায়ী—সে দেশের শহরে শহরে মোনালিসা প্রদর্শিত হয়। ৩০ ডিসেম্বর ১৯১৩ মোনালিসা ল্যুভ জাদুঘরে ফিরে আসে।

গত ২ মে ২০১৯ ছিল লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ৫০০তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই শিল্পীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

মন্তব্য