kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

আল মাহমুদ

দীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনের পরিসমাপ্তি

তুহিন ওয়াদুদ

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দীর্ঘ সাহিত্যিক

জীবনের পরিসমাপ্তি

অঙ্কন : মানব

আল মাহমুদের ৮৩তম জন্মদিন ছিল গত ১৩ জুলাই। কবির শারীরিক অবস্থা তখনো খুব ভালো ছিল না। কৃতী কবির জন্মস্মরণে কালের কণ্ঠেই সেদিন লিখেছিলাম ‘কবিচিত্তে এখনো ঋজু আল মাহমুদ’। ওই লেখায় লিখেছিলাম কবি যেন শতায়ু হন। কে জানত বাংলা ভাষার এ অন্যতম প্রধান কবি আর তাঁর পরবর্তী জন্মদিন পালন করে যেতে পারবেন না। নিশ্চয়ই কবি জেনে গেছেন তাঁর অনুপস্থিতিতেও আমরা তাঁর জন্মকাল স্মরণ করব। তাঁর নিজের লেখার মধ্যে সেই বিশ্বাসের কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে। তিনি লিখেছেন ‘সবচেয়ে ক্ষণস্থায়ী যারা, আমি তাদের মধ্যেই থাকি। কিন্তু আমার স্থায়িত্ব দৈব নির্ধারিত। মানবজাতির আমাকে ভালো না বেসে গত্যন্তর নেই। কারণ আমি ছন্দ জানি। মিল রচনা করি। আমার হাতে তাল ভঙ্গ হয় না। আমি প্রতিটি ভাষার সম্ভবপর উদ্গাতা।’

আল মাহমুদ দীর্ঘ এক জীবন কাটিয়েছেন। অযুত অভিজ্ঞতায় পূর্ণ তাঁর জীবন। তিনি ‘কবির কররেখা’ শীর্ষক একটি গ্রন্থে কবি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যেখানেই তিনি জন্মান না কেন, কবির একটি দেশের প্রয়োজন হয়। কবির একটি দেশ ছাড়া চলে না।’ এ রকম একটি দেশ রক্ষায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। প্রগতিবাদী দর্শনের দীক্ষা নিয়েই শুরু করেছিলেন শিল্পযাত্রা। অন্তিম কাল পর্যন্ত অভিন্ন দর্শনযাত্রা তাঁর ছিল না। মাঝপথে প্রগতিবাদের পথ ছেড়ে হেঁটেছেন অন্য পথে। তাঁর সঙ্গে অনেকের দূরত্ব সূচিত হয়েছে। দর্শন বদলালেও নিজেরই অজান্তে তিনি স্বরূপে কবিতায় ফিরেছেন বহুবার। কবিতার বিষয়গত খানিকটা পরিবর্তন দেখা দিলেও আঙ্গিকচেতনায় তিনি থেকেছেন অপরিবর্তনীয়; বরং কবিতার প্রতি যত্ন তাঁর কমেনি।

কবি আল মাহমুদ শত বছর বাঁচলেন না। তাঁর সমকালে সাহিত্যের আরো দুই শক্তিশালী লেখক দুই বছরের মধ্যে চলে গেছেন ওপারে। সৈয়দ শামসুল হক ও শহীদ কাদরী। এঁরা প্রত্যেকে পরিণত বয়সে মারা গেছেন। এঁরা প্রত্যেকেই সাহিত্যকে তাঁদের জীবনের তুলনায় অনেক বেশি দিয়েছেন। অপর দুই লেখকের তুলনায় শিল্প সৃষ্টিতে পিছিয়ে নেই আল মাহমুদ।

আল মাহমুদ শরীরিকভাবে এখন মাটি ও মহাকালের অংশ। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি নিত্যকালের সম্পদ। এই সম্পদ বিনাশ হওয়ার নয়। বিস্তৃত পরিসরে তিনি পদ্য-গদ্য মিলে অসংখ্য শিল্পসফল রচনা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। পাঠক সমাদৃত হয়েছে সেসব রচনসম্ভার। লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না (১৯৮০), বখতিয়ারের ঘোড়া (১৯৮৫), পানকৌড়ির রক্তসহ অনেক গ্রন্থ তাঁর অমরত্বের একেকটি স্তম্ভ।

আল মাহমুদ কবিতার সংজ্ঞা দিয়েছেন। তাঁর কবিতার ভাষায় ‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে, চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’ সেই চুলখোলা আয়েশা আক্তারের সঙ্গে তাঁর আর দেখা হবে না। কিন্তু আয়েশা আক্তারকে নিয়ে আমাদের পঠন-পাঠন, আলোচনা-সমালোচনা চলতেই থাকবে। তিনি কবিতার সমালোচনা নিয়ে দার্শনিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মনে রাখতে হবে কবিকে কেউ ক্ষমা করে না। না পাঠক, না সমালোচক। আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়।’ আল মাহমুদের দার্শনিক এই ব্যাখ্যার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে আমরা তাঁরই কবিতার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছি, সমালোচনা করছি।

লোক লোকান্তরের আলো জ্বালিয়ে আল মাহমুদ বাংলা কবিতার আঙিনায় হাঁটতে শুরু করেছিলেন। এরপর আরো অনেক শিল্পের আলো নিজেরই চারদিকে জ্বালিয়ে রেখেছেন। আপন সৃষ্ট সেই আলোয় অনেক দূর থেকেও তাঁকে দেখা কবির অবয়ব। তিনি সিরিয়াস ধারার কবি। একই সঙ্গে তাঁর পাঠকপ্রিয়তাও কম নয়। তাঁর পাঠকপ্রিয়তা তুমুল। বড় কবি ইতিহাসের পাতায় বেঁচে থাকেন না; বড় কবি বেঁচে থাকেন নিত্যদিন, পাঠকই কবিকে বাঁচিয়ে রাখে। আল মাহমুদও বেঁচে থাকবেন পাঠকের হূদয়ে।

আল মাহমুদের কবিজীবনের শুরুতে কবিতায় আদি রসের বিস্তার ছিল। প্রথম কাব্যেই সেই প্রবণতা প্রধান সুরে পরিণত হয়েছিল। সেই সুরে মিশেছিল কবির ধর্মবোধও। তাঁর ‘নূহের প্রার্থনা’ কবিতার ধরন কিছুটা ভিন্ন। কবি কবিতার শুরুতেই একটি পটভূমি উল্লেখ করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, ‘ঈশ্বরের অলৌকিক আক্রোশে মহাপ্লাবনরূপে সমস্ত পৃথিবীকে চিহ্নহীন করে ফেলেছে।’ এ রকম মহাপ্লাবনের পর কবি কল্পনায় নূহসহ তিনজন নারী-পুরুষের চরিত্র তুলে এনেছেন। ইসলাম ধর্মে নূহ (আ.) নামে একজন নবী ছিলেন। তাঁর সময়ের মহাপ্লাবনের কথা বলা হয়েছে। আর কবি কল্পনায় আমরা নূহ নামের চরিত্র পাই। মহাপ্লাবনের পর মানুষ এলে জগত্জুড়ে নিযুত বিষয় রেখে কবির কাছে পুুরুষের চোখে নারী কেমন হবে সেটাই যেন তাঁর প্রথম ভাবনার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে—‘তখন কেমন হবে, আবার যখন/তরল তিমির ছিঁড়ে ভাসবে এ পৃথিবী প্রথম?/ জলপাই পাতার ফাঁকে সেই আলো,/ বালি আর ঘাসের নরম/ উদ্ভাসিত হবে ফের পুরুষের চোখে/ তখন কেমন হবে আমাদের রমণীরা সব?’

আল মাহমুদ একটি কল্পকাহিনির আড়ালে যেসব অনুভূতির প্রকাশ দেখিয়েছেন, তা মূলত কবিচিন্তার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। ‘পিপাসার মুখ’ কবিতায় আল মাহমুদকে আমরা সন্দেহাতীত বিশ্বাসী হিসেবে পাই না। এখানে তিনি অবিশ্বাসীও নন। বরং আমরা এখানে সংশয়বাদী কবিকে খুঁজে পাই। আল মাহমুদ নিজেরই প্রতিচ্ছবি যেন কবিতায় চিত্রিত করেছেন। কবিতায় তিনি লিখেছেন—‘আর হে নাস্তিক/তোমার উচ্চকণ্ঠ উল্লাসকে কোন্ শর্তে আনন্দ বলো/যা এতো দ্বিধান্বিত/তাই আমি নাস্তিক নই।/বিশ্বাসী নই।’ আল মাহমুদের অসংখ্য কবিতার বিষয়-আশয়জুড়ে কামের বিস্তৃতি। ধর্মবোধেরও আনুপাতিক হার কম নয়।

আল মাহমুদ মাটি-নারী-শাস্ত্র—এসবের মধ্যে ডুবে ছিলেন। মানুষ ক্রমাগত তাঁর অভিজ্ঞতা-পাণ্ডিত্য দ্বারা বদলে যান। অন্তর্গত পরিবর্তন ভাঙা-গড়া অনেক মানুষের জীবনে ঘটে থাকে। কবি আল মাহমুদের ক্ষেত্রেও তার পরিবর্তন ঘটেনি। মাটি-নারী থেকে যখন তিনি শাস্ত্রবাদী হয়ে ওঠেন, তার কিছু আভাস তিনি ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতায় দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন—‘পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে/আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিল সত্যিকার ঘুম/কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখুনি/সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো যার ফাঁক দিয়ে/যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বলো, স্বপ্ন।’ এখানে কবি এক অতিকল্পনার আশ্রয় নিয়েছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন কবি জেলে যান, সেই জেলবাসে তাঁর শাস্ত্রবাদী হয়ে ওঠার ঘটনাটি ঘটে। কবি তাঁর কল্পজগেক স্বপ্নের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সেখানে তিনি দেখতে পান, সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ বুকের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এর পর থেকে তাঁর শাস্ত্রপন্থী হয়ে ওঠা। প্রথম কাব্যগ্রন্থে আল মাহমুদকে আমরা সংশয়বাদী হিসেবে পেয়েছি। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে সৃষ্টি রহস্য নিয়ে ভাবিত দেখেছি আর তার কয়েক বছরের মধ্যে আমরা শাস্ত্রের কাছে সমর্পিত হতে দেখি। জন্মগতভাবেই প্রাপ্ত শাস্ত্রের কাছে তিনি ফিরেছিলেন। কারো মতকে তুচ্ছ করার অভিপ্রায়ে তিনি কাতর ছিলেন না। আপন বিশ্বাসে ছিলেন আপনার মতো।

এখন থেকে আল মাহমুদ আমাদের কাছে আসবেন তাঁর কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাসের মাধ্যমে। যেভাবে আসেন পৃথিবীর প্রয়াত শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকরা।

মন্তব্য