kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ নভেম্বর ২০১৯। ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

মেলার দ্বিতীয় সপ্তাহের নির্বাচিত ৫ বই
এই পথে আলো জ্বেলে

শুধু উপন্যাস নয়, এটা বাংলাদেশের জাগরণের ইতিহাস

কমল নাথ

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



শুধু উপন্যাস নয়, এটা বাংলাদেশের জাগরণের ইতিহাস

এই পথে আলো জ্বেলে : আনিসুল হক। প্রকাশক : প্রথমা প্রকাশন। প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা। মূল্য : ৪৬০ টাকা

ভাষার প্রতিনিয়ত বাঁকবদল ঘটছে; কিন্তু ইতিহাস অমর কথামালা। যা ঘটেছে তা-ই একইভাবে জীবন্ত থাকে। আনিসুল হকের লেখা ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ সেই জীবন্ত ইতিহাসের প্রতিচ্ছবিই শুধু নয়, তা যেন ঐতিহাসিকতা বিনির্মাণের এক উদার ও নির্মোহ যাত্রা। আমরা আনিসুল হককে জনপ্রিয় লেখকও বলে থাকি। এবারের একুশের গ্রন্থমেলায় প্রথমা প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে এই মূল্যবান গ্রন্থটি। এক অর্থে জনপ্রিয় মানে সস্তা। তার মানে কি উনি সস্তা লেখক? না, উনি সস্তা লেখক নন! সস্তা লেখক হলে ‘মা’, ‘সে’, ‘ফাঁদ’ কিংবা ‘আয়শামঙ্গলে’র মতো উপন্যাসকে কথাসাহিত্যের বিবেচনায় আমরা উত্তুঙ্গ মানে ধরতাম না। এই  উপন্যাসটি পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতে হয় অতীতে-ইতিহাসে এবং গৌরবের কাছে। ওই যে অতীত বললাম, অতীতটা হলো সমগ্র একটি জাতির। জাতিসত্তার। বাংলাদেশের। ইতিহাসও তাই। এবং ভাবতে হয়, তাঁর ভাষার নির্মিতি এক অর্থে সহজ, সরল ও হূদয়গ্রাহী, যা পাঠকের কাছাকাছি তাঁকে নিয়ে গেছে অনায়াসে। এবার বইয়ের পাতায় তাকিয়ে পড়তে হয়—বেগম মুজিব দাওয়াত করেছেন কয়েকজনকে। কিশোর কামাল সেতার বাজিয়ে শোনালো। শেখ মুজিব গান ধরলেন, ভাটিয়ালি গান। ধানমণ্ডির বাসায় বসে কামরুদ্দীন আহমদ সে স্মৃতিচারণা করছেন যখন, তখন শেখ মুজিব কারাগারে। মওলানা ভাসানী অসুস্থ। তাঁর জন্য খাবার রেঁধে নিয়ে যাচ্ছেন রেনু। ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে আকদ হলো শেখ হাসিনার। ছোট্ট রাসেল কারাগারে আব্বার গলা ধরে বলতে লাগল, ‘আব্বা, বালি চলো।’ এক মধ্যরাতে সৈন্যরা মুজিবকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে অজানার দিকে। মুজিব কারাগারের সামনের রাস্তা থেকে এক মুঠো ধুলো নিয়ে বললেন, ‘আমার এই দেশে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।’ দেওয়া হলো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। প্রতিবাদে জেগে উঠল সারা দেশ। মাওলানা ভাসানী বললেন, ‘খামোশ!’ ছাত্ররা দিল এগারো দফা। সমগ্র দেশ ফুঁসে উঠল অগ্নিগিরির মতো। মুজিব প্যারোলে মুক্ত হচ্ছেন—এ খবর শুনে সন্তানদের নিয়ে মুজিবের কাছে ছুটে গেলেন রেনু, ‘খবরদার, তুমি প্যারোলে মুক্তি নিবা না, জামিন নিবা না!’ ইতিহাসের কী নির্মম ও ইস্পাতকঠিন বয়ান। এভাবেই আনিসুল তাঁর আগের উপন্যাসেও ‘যারা ভোর এনেছিল, উষার দুয়ারে, আলো-আঁধারের যাত্রী’ লিখে গেছেন অনবরত। ১৯২০ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে এই গ্রন্থের মধ্যে দিয়ে তিনি ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোত্কৃষ্ট আলোময় অধ্যায়টি রচনা করে যাচ্ছেন। এই গ্রন্থ শুধু উপন্যাস নয়, এটা বাংলাদেশের জাগরণের ইতিহাস। এই গ্রন্থটি একদিকে পাঠকের  হূদয়ে শিহরণ ঘটাবে, অন্যদিকে ইতিহাসের সত্য পাঠকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে। এটা আমার ধারণা নয়, বিশ্বাসও বটে।

মন্তব্য