kalerkantho

সোমবার। ২৭ মে ২০১৯। ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২১ রমজান ১৪৪০

ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ম ৎ স্য গ ন্ধা

মৎস্যগন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



মৎস্যগন্ধা

অঙ্কন : মানব

বেশ কিছুদিন ধরে গলদঘর্ম হয়ে কাজ করে যাচ্ছে সিন্ধুচরণ। এক দিনের কাজ সম্পন্ন করতে দুদিন লেগে যাচ্ছে তার। তার শরীরটা যে কথা শোনে না এখন আর।

প্রথম দিন নরসিংহ জেঠাকেও সঙ্গে এনেছিল সিন্ধুচরণ। অনেক দ্বীপ পেরিয়ে-ছাড়িয়ে এই দ্বীপে এসে পৌঁছেছিল সিন্ধুচরণের নৌকাটি। জেঠাই পথ দেখিয়ে এনেছিল। নৌকার পাছায় ছিল সিন্ধুচরণ, আগার দিকে নরসিংহ। ঝুপ ঝুপ করে জলে বৈঠা ফেলছিল সিন্ধুচরণ। জেঠা ডান হাত-বাঁ হাত নেড়ে নেড়ে বলছিল, ডাইনে যাও সিন্ধু, ওই ওই যে দ্বীপের ঠোঁটটা, তাকে বাঁয়ে রেখে সামনে আগাও। হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। এবার সোজা চলো। এ রকম ঘণ্টা দুয়েক চালানোর পর নরসিংহ জেঠা ছোট্ট একটা দ্বীপে নৌকাটি ভিড়াতে বলেছিল।

ডাঙায় পা রেখে বলেছিল, ‘এই দ্বীপটির কথাই বলেছিলাম তোমাকে। যৌবনকালে একবার রোখ চেপেছিল, যমুনাবুকের সব দ্বীপ বিচারি দেখব। কৈলাস ছিল আমার সঙ্গী। বড় দুর্দান্ত ছিল সে। তাকে নিয়েই দিনের পর দিন এই দুর্গম দ্বীপগুলো ঘুরে বেড়িয়েছি। তখন দুজনে ঠিক করেছিলাম, এই দ্বীপগুলোর একটায় ঘর বানাব আমরা। সংসার পাতব; কিন্তু কৈলাসটা মরে গেল হঠাৎ।’ এটুকু বলে নরসিংহ জেঠা চুপ মেনে গেল।

সিন্ধুচরণ বুঝল, অনেকক্ষণ কথা বলে জেঠা বুঝি হাঁপিয়ে উঠেছে; কিন্তু আসলে তা নয়। বাল্যবন্ধু কৈলাসের শোকে জেঠার ভেতরটা আলুথালু করে উঠেছে। নিজেকে সামাল দেওয়ার জন্যই জেঠা নিশ্চুপ হয়ে গেছে।

নিজেকে সংযত করে জেঠা আবার বলতে শুরু করেছে, ‘ওই সময়েই আমি এসব দ্বীপের অবস্থা জেনে ফেলেছিলাম। কোনটাতে সাপের, কোনটাতে কুমিরের, কোনটাতে নানা জন্তু-জানোয়ারের রাজত্ব—তখনই বুঝে গিয়েছিলাম। এই দ্বীপটিকেই তখন আমার ভালো লেগে গিয়েছিল। তুমি দেখবে—সন্ধ্যার আগে আগে এখানে ঝাঁকে ঝাঁঁকে পাখি আসে। নানা জাতের। কোনো গোলমেলে জীব এখানে তুমি পাবে না।’

তারপর দুজনে ঘুরে ঘুরে দ্বীপটি পরখ করেছিল। কোন দিকে ঘরটা বাঁধলে সুবিধা হবে—পূর্বে না পশ্চিমে, উত্তরে না দক্ষিণে? জেঠা বলেছিল, ‘যেদিকেই ঘর বানাও, জলের কাছেই বানাতে হবে। জল ছাড়া তো আর জীবন চলবে না।’

শেষ পর্যন্ত স্থির হয়েছিল—সিন্ধুচরণ চরণদ্বীপের দক্ষিণ পাশেই কুটিরটি তৈরি করবে। দক্ষিণ দিকে নৌকা ভিড়াতে সুবিধা। পাশটি খাড়া নয়, ঢালু।

ফিরে গিয়েছিল দুজনে। দিন দুই পর সরঞ্জামাদি নিয়ে সিন্ধুচরণ চরণদ্বীপে ফিরে এসেছিল। সেদিন থেকে সিন্ধুচরণের ঘর বানানোর শুরু।

কাটারি হাতেই নৌকা থেকে নেমেছিল সিন্ধুচরণ। প্রথমে পারে ওঠার পথ পরিষ্কার করতে হবে যে! ঝোপে প্রথম কোপটা দিতেই ফুড়ুত-ফাড়ুত। সড়সড় করে কী যেন সরে গেল ঝোপের আড়াল থেকে। সিন্ধুচরণ একটু থমকে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল—বড়সড় কোনো সাপ বুঝি সরে গেল; কিন্তু নরসিংহ জেঠা যে বলেছিল, এ দ্বীপে সাপ নেই। মন বলল, জেঠার কথা ঠিক না-ও হতে পারে। সেই যৌবনবেলায় কত দিনই বা ছিল জেঠা এই দ্বীপে? দ্বীপের আনাচকানাচটা কতটুকুই বা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিল? যেদিন যেদিন এসেছিল জেঠা এই দ্বীপে, সেদিন সেদিন হয়তো সাপের দেখা মেলেনি। সাপ তো আছেই। যেখানে নির্জনতা, সেখানেই সর্প। বিষধর সর্প। জীবনঘাতী সর্প।

শরীর ভয়ে কুঁকড়ে গেল সিন্ধুচরণের। ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু আশপাশে আর কোনো সাড়াশব্দ পেল না সিন্ধুচরণ। তার পরও তার ভেতরের কাঁপুনি থামে না। একটা সময়ে স্থির হলো সিন্ধু। যতই সাপ থাকুক, যত রকম বিষধর সাপই থাকুক, অথবা অন্য কোনো হিংস্র জানোয়ার, তাদের ভয় পেলে যে চলবে না। সব কিছু, এমনকি জীবনের বিনিময়ে হলেও তাকে যে এই দ্বীপে ছোট্ট একটি ঘর তৈরি করতেই হবে। ঘর না বানালে লোকচক্ষুর আড়ালে তার কন্যাটি...। এইটুকু ভেবেই সিন্ধুচরণ তার ভাবনার টুঁটি চিপে ধরল। তার মস্তিষ্কে দুঃসাহস এসে ভর করল। ঝপাঝপ কোপানো শুরু করল সিন্ধু। ঝোপঝাড় কোপায় আর সামনের দিকে এগোয়। ছোট ছোট গাছ, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় কেটে কেটে দুপাশে ছুড়ে ছুড়ে দেয় সিন্ধু। তার সামনে সরু একটা পায়ে চলার পথ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ঘণ্টা দুয়েক কাটাকুটির পর সিন্ধু ছোট একটা খোলা মতো জায়গায় এসে পৌঁছে। পৌঁছেই সে আঁতকে ওঠে। তার শ্বাস এই বুঝি বন্ধ হয়ে যাবে, এই বুঝি তার চোখ উল্টে যাবে!

শত-সহস্র নকুল সব স্থান জুড়ে। ছোট-বড়-মাঝারি। খোলা জায়গাটি ছাপিয়ে চারধারের ঢালু, ঢালু ছাড়িয়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত হাজার হাজার নেউল দাঁড়িয়ে। পেছনের দু-পায়ে দাঁড়িয়ে তারা। চোখ ঘূর্ণিত, দাঁত খিঁচানো। এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়বে, এই বুঝি ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে সিন্ধুকে।

সিন্ধু এক চুল নড়ল না। তার অক্ষিগোলক বেরিয়ে আসার উপক্রম। নিজের বুকের ধুকপুকানি সে শুনতে পেল। অজান্তে হাত থেকে কুটারিটা মাটিতে পড়ে গেল। ওই সময় চিঁ..., কুক কুক আওয়াজ শুনল সিন্ধু। খেয়াল করল—নকুলদলের মধ্যখানে দাঁড়ানো বিশাল বেজিটির মুখ থেকে আওয়াজটা বেরিয়ে আসছে। প্রথম দেখায় বিরাট দেহের বেজিটিকে খেয়াল করেনি সিন্ধু। তখন সে ছিল ভীত, ত্রস্ত, উত্তেজিত। এ সব কিছু বর্তমান বাস্তবতা থেকে তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। ওই অদ্ভুত, অশ্রুতপূর্ব শব্দটি সিন্ধুকে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিরিয়ে আনল। নিজের মধ্যে নিজেকে থির করল সিন্ধু।

দলনেতার ডাক শুনে সব বেজি তাদের সামনের পা দুটি মাটিতে নামিয়ে দিল। তাদের খিঁচানো দাঁত-মুখ স্বাভাবিক হলো। সিন্ধু বুঝল—বেজিরা তাদের মারমুখী ভাব ত্যাগ করেছে। দলনেতারই আদেশ নিশ্চয়ই। নইলে হাজার হাজার নকুলের দেহভঙ্গি মুহূর্তেই স্বাভাবিক হয়ে গেল কেন?

এই সময় হঠাৎ একটা কাজ করে বসল সিন্ধুচরণ। চট করে হাঁটু গেড়ে বসল সে। দুহাত জোড় করল। চোখ-মুখ কাকুতিতে ভরিয়ে তুলল। অত্যন্ত ধীরে গানের মতো অনেকটা টেনে টেনে সিন্ধু বলে গেল, ‘আমি এক দুর্ভাগা মানুষ। হে রাজা, বিপুল এক কষ্টে পড়ে আমাকে লোকালয় ছাড়তে হচ্ছে। আমাকে নয়, শুধু আমার কন্যাটিকেও। আমার অবুঝ কন্যাটি আজ অকূল পাথারে ভাসছে। তার জীবন সংশয় এখন। তার সন্তান হবে হে মহারাজ। নবাগত সন্তানের আগমন উপলক্ষে আনন্দে বিভোর হয় জননী। শুধু জননী কেন, তার আশপাশে যারা থাকে, তারাও খুশিতে বিহ্বল হয়। জনকেরও আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্তু আমার মেয়ে মৎস্যগন্ধার সেই ভাগ্য নেই। নিরপরাধ হয়েও সে আজ দণ্ডিত। গৃহবন্দি সে। মানুষের সামনে মুখ দেখানো দায় হয়ে উঠেছে তার। অসহায় কন্যাটিকে আমার বাঁচাতেই হবে। বড় দুঃসময়ে, করাল সংকটে পড়ে তোমার ভূখণ্ডে আমাকে সপরিবারে থাকতে হবে মহারাজ। তুমি যদি দয়া করে তোমার রাজ্যে আমাদের থাকতে দাও, তাহলে সমাজের কলঙ্ক থেকে আমি বাঁচি, আমার স্ত্রী ভবানী বাঁচে, আমার ভালোবাসার কন্যাটি বাঁচে। তুমি হয়তো জানতে চাইছ মহারাজ—কী সেই সংকট, কত গভীর মর্মান্তিক সেই দায় যে যার জন্য সমাজ ছেড়ে, গাঁ ছেড়ে এই নির্জন দ্বীপে আমরা আশ্রয় নিচ্ছি? আমার বিপর্যয়-বিপদের কথা ক্রমে ক্রমে তুমি জানতে পারবে মহারাজ। তোমার কাছে আমার শুধু এই মিনতি—তোমার রাজ্যে আমাকে মাথা গোঁজার জন্য সামান্য একটু ঠাঁই দাও। ছোট্ট একটা ঘর তুলব শুধু। ওই ঘরে অনন্তকাল ধরে থাকব না আমরা। একদিন না একদিন অবশ্যই চলে যাব। তোমাকে কথা দিচ্ছি—তোমার এই দ্বীপে আমরা কোনো উত্পাত করব না। তোমাদের সামান্যতম ক্ষতি হোক—এ রকম কোনো কাজই করব না আমরা।’ বলতে বলতে কণ্ঠ বুজে এলো সিন্ধুচরণের। মাটিতে মাথাটা নুইয়ে পড়ল তার। ওই অবস্থায়ই সে একটা শব্দ শুনতে পেল।

তাড়াতাড়ি মাথা তুলল সিন্ধুচরণ। দেখল—দলপ্রধান আগের মতো দুই পায়ে দাঁড়িয়ে ডাক পাড়ছে। তবে এই কণ্ঠস্বর আগেরবারের মতো কর্কশ নয়। এই কণ্ঠস্বরে একটা মনোহর টান। সুরেলা, মোলায়েম। নকুল রাজের এই শব্দে শতসহস্র বেজি একযোগে ডেকে উঠল। সামনের দুটি পা জড়ো করে কী রকম অদ্ভুত এক ভঙ্গি করল। তারপর পেছন ফিরল সবাই। কদম কদম সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। সামনে পা বাড়াতে গিয়ে মহারাজ হঠাৎ পেছন ফিরল। এক পায়ে দাঁড়িয়ে চরকির মতো ঘুরে গেল একবার। সিন্ধুচরণের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এ আনন্দ প্রকাশের ভঙ্গি। কেন এই ভঙ্গি? সিন্ধুর বাড়িতে নতুন অতিথি আসবে বলে নকুলরাজা কি আগাম শুভেচ্ছা জানাচ্ছে?

এরপর আর কোনো উপদ্রব সইতে হয়নি সিন্ধুচরণকে। দুপুর হলে খেতে বসেছিল সে। সঙ্গে বেশ কদিনে চিঁড়া-মুড়ি-খই-গুড় নিয়ে এসেছিল। খাওয়া শেষ করে দাটি আবার হাতে তুলে নিয়েছিল। সন্ধ্যার আগে আগে চারটি খুঁটির ওপর একটা আচ্ছাদন দাঁড় করাতেই হবে। খোলা আকাশের নিচে রাতটা কাটাবে কী করে নইলে?

সন্ধ্যার আগে আগে আরেক বিচিত্র ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সিন্ধুচরণকে।

গাছ কেটে আনা, খুঁটি বানানো, বড় আকারের বৃক্ষপত্র সংগ্রহ করা, ওগুলোকে আবার বনলতা দিয়ে বাঁধা—কাজ তো কম নয়! ওগুলো করতে করতে কখন সূর্য পশ্চিমে গড়িয়ে গেছে খেয়ালে রাখেনি সিন্ধু। যখন খেয়াল করল, সন্ধ্যা নামতে তেমন বেশি দেরি নেই আর। তাড়াতাড়ি হাত চালাতে লাগল সিন্ধুচরণ। হঠাৎ তার কানে শোঁ শোঁ আওয়াজ ভেসে এলো। এই আওয়াজ মৃদু থেকে তীব্র, তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল। ভড়কে গেল সিন্ধুচরণ। এ আবার কোন সংকট? কোন সংকটকাল অতিক্রম করতে হবে তাকে? ঝড় ধেয়ে আসছে না তো! দ্রুত আকাশের দিকে তাকাল সিন্ধু। কই, আকাশে তো মেঘের কণাটি পর্যন্ত নেই! তুফান আসবে কোত্থেকে? আচমকা যদি তুফান আসে, ঝড় ওঠে যমুনায়, তাহলে তো সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যাবে! গোটা দিন ধরে অশেষ পরিশ্রম করে সে যে ছোট ঘরটির কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, তা তো ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাবে!

হঠাৎ সিন্ধুর নজর গেল দূরের ওই আকাশতলে। দেখল—পশ্চিমের আকাশ আঁধার করে এক খণ্ড ঘন মেঘ এগিয়ে আসছে। সিন্ধুচরণ মুখ ফেরাল উত্তরে, পূর্বে, দক্ষিণে। দেখল—সব দিক থেকে খণ্ড খণ্ড মেঘ চরণদ্বীপের দিকে এগিয়ে আসছে। মেঘের গতি দ্রুত। যতই মেঘখণ্ডগুলো এগোচ্ছে, শোঁ শোঁ শব্দ তীব্রতর হচ্ছে।

চরণদ্বীপের মাথার ওপর এসে এই মেঘখণ্ডগুলো স্থির হলো। তারপর ঝুপঝাপ। নানা রকমের, নানা আকারের পাখিরা আকাশ থেকে দ্রুত নেমে আসছে। আর গাছেদের শাখায় মাথায় ঝুপ ঝুপ করে বসে পড়ছে। কী নেই সেই পক্ষীদলে? বক, সারস, কাক, চড়ুই, মাছরাঙা, তোতা, চিল, শকুন, বুনোহাঁস, পায়রা, খঞ্জন, ঘুঘু, শালিক, দোয়েল, কোকিল, ফিঙে, কাকাতুয়া, টুনটুনি, বুলবুলি, শ্যামা, সিন্ধু সারস—এ রকম আরো নানা জাতি-প্রজাতির পাখি।

সিন্ধুচরণ উঠে দাঁড়াবে কী, কাটারি হাতে বসেই থাকল। শত-সহস্র পাখির কলরবে গোটা দিনের শান্ত দ্বীপটি মুখরিত হয়ে উঠল। কূজনে গুঞ্জরণে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো।

আঁধার দ্রুত ঘন হয়ে এলো। কী অলৌকিক মন্ত্রবলে পাখিদের সব আওয়াজ হঠাৎ করে থেমে গেল। যেন এই দ্বীপটির সব পক্ষীকুল একসঙ্গে ঘুমিয়ে গেল। সিন্ধুচরণ শুনতে থাকল টুপ, টপ, ঠাস, চড়চড় আওয়াজ। পাখিদের বিষ্ঠা পতনের আওয়াজ।

সঙ্গে করে কুপি নিয়ে এসেছিল সিন্ধুচরণ। রাতের বেলা জ্বালাবে বলে। কিন্তু সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতা হলো তার, কুপিটি জ্বালাতে সাহস করল না আর। খেতেও ইচ্ছে করল না সিন্ধুচরণের। গোটা দিনের পরিশ্রমে তার দেহটি ঢুলুঢুলু। পাশে কর্তিত বৃক্ষপল্লব ছড়ানো-বিছানো ছিল। ওখানটায় শুয়ে পড়ল সিন্ধু। ঘুমসমুদ্রের অতলে তলিয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগল না।

কয়দিনের মধ্যে কুটিরটি দাঁড়িয়ে গেল। পাতার ছাউনি। বৃক্ষছালের বেড়া। দরজাও বানাল একটা সিন্ধুচরণ। মাটি খুঁড়ে এনে ভিটেটা উঁচু করল। শক্তপোক্ত দাওয়া বানাল। কুটিরের সামনের বেশ কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করল। ওটিই উঠান। উঠানের চারদিকে ডাল পুঁতে পুঁতে ঘিরে ফেলল। এই উঠানে যে তার নাতিটি হামাগুড়ি দেবে। উঠানটিতেই একদিন সে তার ছোট ছোট পা ফেলে হাঁটতে শিখবে। হাঁটতে হাঁটতে তার মুখ দিয়ে প্রথম শব্দটি বেরিয়ে আসবে—মা।

এক সকালে সিন্ধুচরণ তার গাঁয়ের উদ্দেশে নৌকা ভাসাল। যত শিগিগর সম্ভব তার কন্যা মৎস্যগন্ধাকে যে এই দ্বীপে নিয়ে আসতে হবে। মৎস্যগন্ধার প্রসব সময় যে আসন্ন।

 চলবে

মন্তব্য