kalerkantho

বুধবার । ২৯ বৈশাখ ১৪২৮। ১২ মে ২০২১। ২৯ রমজান ১৪৪২

বিভূতিভূষণের লেখক হয়ে ওঠা

সাইফুর রহমান

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



বিভূতিভূষণের লেখক

হয়ে

ওঠা

অঙ্কন : মানব

আমাদের মধ্যে কমবেশি অনেকেই লেখক হতে চান। অনেকে হয়তো নিভৃতে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করেন—লেখক হয়ে ওঠার কী সেই জাদুমন্ত্র? যা একবার আওড়ালেই লেখক হয়ে উঠবেন তিনি। মন্ত্র আওড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লেখক হয়ে ওঠা প্রত্যাশী ব্যক্তিটি হয়তো কিঞ্চিৎ কায়িক পরিশ্রম করতেও প্রস্তুত থাকেন কখনোসখনো। পশ্চিমবঙ্গের ‘দেশ’ পত্রিকাটির প্রয়াত সম্পাদক সাগরময় ঘোষ, লেখক হওয়ার জাদুমন্ত্র সম্পর্কে বলেছেন, লেখক হতে গেলে বিশেষ করে তিনটি ক্ষমতার অধিকারী হওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, প্রচুর পড়াশোনা, অর্থাৎ বিদ্যাবুদ্ধি থাকা চাই। দ্বিতীয়ত, জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। আর তৃতীয়ত, কতখানি সিমেন্টের সঙ্গে কতখানি বালি মেশালে ইমারত গাঁথা যায়, সে কলাকৌশলটুকুও জানতে হবে। অর্থাৎ কতখানি বাস্তব ঘটনার সঙ্গে কতটুকু কল্পনার মিশেল দিলে সেটি যে লেখা সাহিত্যে পদবাচ্য হবে, সে বিষয়ে অবশ্যই টনটনে জ্ঞান থাকা চাই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর চব্বিশ পরগনার বনগ্রামে। পিতা মহানন্দের পেশা ছিল কথকতা, পৌরোহিত্য ও কবিরাজি। জন্মস্থান এবং পিতার চরিত্র বিভূতিভূষণের সাহিত্যজীবনে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিভূতিভূষণের বাল্যকাল ও কৈশোর কেটেছিল অভাব, দারিদ্র্যের মধ্যে। তবে বিভূতিভূষণের মনে লেখক হওয়ার বীজ রোপিত হয়েছিল সেই সময়, যখন তিনি সবেমাত্র পাঠশালায় যাতায়াত শুরু করেছেন। বিভূতির পিতা সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়লেই ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন গাছগাছালি, পাখপাখালির জগতে, চলে যান ইছামতীর পারে। এতে সুবিধাই হলো বিভূতির। বনমরিচের জঙ্গলটার মধ্য দিয়ে পুত্রের হাত ধরে প্রকাণ্ড প্রবীণ এক বৃক্ষের কাছে এসে দাঁড়ালেন মহানন্দ। বিভূতিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘এই হলো সপ্তপর্ণ জুনিপার গাছ। বুঝেছিস বিভূতি, তোর দাদু ওষুধ তৈরি করতেন এর বাকল দিয়ে। আর আমি এটা ছেঁচে-বেটে দিতাম।’ মাঝেমধ্যে হঠাৎ দাঁড়িয়ে আশ্চর্য হয়ে বিভূতি মহানন্দকে প্রশ্ন করে, ‘দেখো বাবা, এই লতাটি দেখতে কেমন? এই গাছটি বেয়ে কিভাবে ওপরে তরতর করে উঠে গেছে। একই রকম লতা অথচ দুই রঙের ফুল।’ বিভূতি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাঁর বাবার কাছে জানতে চান লতাটির নাম। পিতা মহানন্দ দৌড়ে লতাটির কাছে এসে বসেন। একি! তোকে না দুদিন আগেই এই লতাটি চিনিয়ে দিলাম! এর নাম হলো অপরাজিতা। এইতো সেদিন তোর মায়ের গলা ভেঙে গেল, এই লতাপাতা থেঁতলে রস করে তোর মাকে খাইয়ে দিলাম আর অমনি তার গলাভাঙা সেরে গেল। বিভূতি আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, আসলে এটাই তো সেই অপরাজিতাগাছ!’ এভাবে কিছুদিন চলার পর বিভূতি নোটবুকের মতো একটি খাতা তৈরি করে নতুন চেনা গাছ, লতা, পাখির নাম পেলে পেনসিল দিয়ে লিখতেন তাতে। পাঠশালার পাঠ শেষ করে সবেমাত্র বিভূতি হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছেন। ঠিক তখনই পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারালেন। বিভূতির মা তাঁদের পরিবারের অন্য ছোট ছোট ভাই-বোন নিয়ে সুরাতিপুর বাপের বাড়ি চলে গেলেন। বড় ছেলে বিভূতি কী করবে? পড়ার পাঠ সাঙ্গ করে ফিরে যাবে গ্রামে? না, কিছুতেই না। বোর্ডিংয়ে খরচ চালাচ্ছেন সহূদয় প্রধান শিক্ষক চারুবাবু। চারুবাবু জানেন, অতি মেধাবী ছাত্র বিভূতি। কিন্তু চারুবাবু বিভূতিকে পছন্দ করেন অন্য কারণে। নানা রকম বই পড়তে পছন্দ করেন বিভূতি। চারুবাবু বিলক্ষণ বুঝতে পারেন, এই ছেলে জীবনে সফল হবেই। চারুবাবুর সুপারিশে ডাক্তার বিধুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বিভূতির আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা হলো, তবে শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো, বিভূতিকে ডাক্তার সাহেবের ছেলে জামিনীভূষণ এবং মেয়ে শিবরানী—এই দুজনকে পড়াতে হবে। বিভূতিভূষণ সানন্দে সেই সব শর্তে বাড়িতে থাকতে রাজি হয়ে গেলেন। বিধু ডাক্তারের বাড়ির পাশেই মন্মথ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। আর এই বাড়ির একটি নতুন আকর্ষণ হলো এখানকার একটি ক্লাব, নাম—‘লিচুতলা ক্লাব’। এই ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক মন্মথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি নিজেই শুধু সাহিত্য রচনা করেন না, উপরন্তু ‘বালক’ ও ‘যমুনা’ নামের দুটি সাহিত্য পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক। বিভূতিও অবিলম্বে সেগুলোর অনুগ্রাহক হয়ে গেলেন। একেকটি সংখ্যা লিচু ক্লাবে আসতেই গোগ্রাসে তার প্রতিটি লেখা পাঠ, আলোচনা, বিচার চলতে থাকে পুরোদমে। বিভূতির প্রথম লেখার সূত্রপাত অবশ্য হয়, যখন তিনি রিপন কলেজের ছাত্র। বিশিষ্ট সাহিত্যিক রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী তখন রিপন কলেজের অধ্যক্ষ। তাঁর প্রেরণায় কলেজে তখন পুরোদমে চলছে বিতর্কসভা, সাহিত্যচক্র, সাহিত্যপত্র প্রকাশ প্রভৃতি। আর এই সাহিত্যচক্রের একটি অনুষ্ঠানে বন্ধুদের উৎসাহে ‘নতুন আহ্বান’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে সেটি পাঠ করলেন বিভূতি। সবার কাছ থেকে অকুণ্ঠ বাহবা ও সুখ্যাতি পেয়ে একদিন কবিতাও লিখে ফেললেন সে কলেজের ম্যাগাজিনে। লেখাপড়া শেষ করে কলকাতার একটি স্কুলে মাস্টারি জুটিয়ে নিলেন। কিন্তু সেটাও পোষাল না বেশিদিন। অগত্যা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিটোলায় ঘোষদের জমিদারির সেরেস্তায় নায়েবের কাজ নিয়ে চলে এলেন এখানে। পাঠকদের এখানে একটি বিষয় জানিয়ে রাখছি, বিভূতিভূষণ তখন অবধি লেখালেখি শুরু করেননি। ‘পথের পাঁচালী’ লেখার মধ্য দিয়ে এই ভাগলপুরেই তাঁর লেখকজীবনের সূত্রপাত ঘটে। ‘পথের পাঁচালী’ লেখার আগে বিভূতিভূষণ ‘স্মৃতির রেখা’ নামে তাঁর নিত্যদিনের খুঁটিনাটি নিয়ে ব্যক্তিগত জার্নালের মতো কিছু একটা লিখতেন।

ভাগলপুরের বাঙালিটোলায় আসার পেছনে অলৌকিক একটি ঘটনা ঘটেছিল। বিভূতিভূষণের জীবনে সেই দেবতার ভূমিকা রেখেছিলেন শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষ নামে এক লেখক।  জন্মেছিলেন আফ্রিকার নাইরোবি শহরে। বাংলা ভাষা ভালো করে না জানলেও ইংরেজি ও সেখানকার সোয়াহিলি ভাষা জানতেন।  সৌভাগ্যক্রমে তাঁর আলাপ হয়ে যায় ‘পরিচয়’ পত্রিকাগোষ্ঠীর লেখকদের সঙ্গে। সে সময় পরিচয় পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি জোর করে শ্যামলকৃষ্ণকে দিয়ে একটি বইয়ের সমালোচনা লেখালেন এবং বারবার সংশোধন করে সেটা ছাপালেন তাঁর পরিচয় পত্রিকায়। এই শ্যামলকৃষ্ণ ঘোষই  বিভূতিভূষণকে পূর্ণিয়ার লবটুলিয়ার জঙ্গলমহালের সন্ধান দিয়েছিলেন। প্রথম স্ত্রী বিয়োগের পর বিভূতিভূষণ পরলোকতত্ত্ব নিয়ে গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করেছিলেন। তখন শ্যামলবাবুর পরামর্শেই বিভূতিভূষণের লবটুরিয়ার জঙ্গলে ম্যানেজারির কাজটি নেওয়া। তাতেই আমরা পেলাম দুর্লভ রত্নের তুল্য ‘পথের পাঁচালী’, ‘আরণ্যক’-এর মতো উপন্যাস।

এই ভাগলপুরের বাঙালিটোলায় লেখক বিভূতিকে আবিষ্কার করেন যে মানুষটি, তাঁর নাম উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। এখানে বলা বেশ প্রাসঙ্গিক হবে যে এই উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন দুজন বিখ্যাত সাহিত্যিককে আবিষ্কার করার কারণে। তাঁদের মধ্যে প্রথমজন হলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আর দ্বিতীয়জন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উপেন্দ্রনাথ একদিকে সাহিত্যপাগল, অন্যদিকে মজলিসি। তাঁর বাড়ির কাছারিঘরে নিত্যদিন জমজমাট সাহিত্য আড্ডা বসে। সেই আড্ডায় একটি অপরিচিত যুবকের ছিল নিত্য যাওয়া-আসা। বৈঠকখানার সেই আড্ডায় কতজন কত রকম সাহিত্যিক আলোচনা ও মন্তব্যে মেতে ওঠেন। কিন্তু এই যুবকটি কোনো আলোচনায়ই অংশগ্রহণ করেন না। বৈশাখ মাসের এক বিকেলের আড্ডায় উপস্থিত হলো না কেউ? উপেন্দ্রনাথ কাছারিঘর থেকে নেমে উঁকি দিয়ে দেখলেন বাইরে রাস্তার দিকে একটি লণ্ঠনের আলো, সঙ্গে একটা ছায়ামূর্তি। ছায়ামূর্তি এসে হাজির হলো তাঁর বৈঠকখানায়। একেবারে পেছনের বেঞ্চে গিয়ে বসলেন। উপেন্দ্রনাথ বললেন, একি! আপনি পেছনে বসলেন কেন? প্রত্যুত্তরে বিভূতি বললেন, আরো অনেকে আসবে যে, আমি কিভাবে সামনের বেঞ্চটিতে বসি। উপেন্দ্রনাথ বললেন, আজকে মনে হচ্ছে আর কেউ আসবে না। আসুন, আপনি সামনের চেয়ারটাতে এসে বসুন। নানাবিধ গালগল্পের মধ্যে উপেন্দ্রনাথ হঠাৎ বিভূতিকে জিজ্ঞেস করলেন, তা আপনার কবিতা কিংবা গল্প-উপন্যাস লেখার বাতিকটাতিক আছে না কি কিছু? বিভূতি বললেন, না, তেমন কিছু নয়, একটা উপন্যাস লিখেছি। কিন্তু লেখাটি আদৌ মানসম্পন্ন হয়েছে কি না বুঝতে পারছি না। উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বিভূতিকে উদ্দেশ করে বললেন, তাহলে উপন্যাসের খাতাটি একবার নিয়ে আসুন। দেখি কেমন উপন্যাস লিখেছেন আপনি? এ ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই বিভূতিবাবু তাঁর ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিখানা জমা দিয়ে গেলেন উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে।

একদিন মজলিস শেষ করে একে একে সবাই যখন উঠে চলে যাচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে উপেন্দ্রনাথ বিভূতিভূষণকে বললেন, আপনি এখনই যাবেন না। আপনার সঙ্গে একটু কথা আছে। সাহিত্য আসর থেকে সবাই বিদায় নেওয়ার পর উপেন্দ্রনাথ বিভূতিকে বললেন, ভাই, আপনার হবে। হবে বলছি কেন! আপনার হয়েছে। কী এক অসাধারণ উপন্যাস লিখেছেন আপনি। পড়েই মন-প্রাণ দুটিই জুড়িয়ে গেছে আমার। যা হোক, এবার আসল কথা বলি, আমি ভাগলপুরে আর থাকছি না। কলকাতায় চলে যাচ্ছি। তবে আমার কলকাতায় যাওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেখান থেকে একটি পত্রিকা বের করব ‘বিচিত্রা’ নামে। সেখানেই আমি ছাপাব আপনার এই উপন্যাসটি। আপনার এই উপন্যাস দিয়েই যাত্রা শুরু করবে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকাটি। এর কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করল বিচিত্রা এবং বিভূতিভূষণের উপন্যাসও কিস্তিতে কিস্তিতে বের হতে লাগল। উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যরসিক পাঠকমহলে গুঞ্জন শুরু হলো—কে এই লেখক? যে সমাজ ও দেশ-গ্রামের তুচ্ছ জিনিসগুলো এত মনোমুগ্ধ করে তাঁর লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন। হঠাৎ একদিন ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদক সজনীকান্ত দাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে এসে উপস্থিত। নব্বইটি টাকা দিয়ে বললেন—বিভূতিবাবু, আপনি যদি অনুমতি দেন, তবে পথের পাঁচালী উপন্যাসটি বই আকারে ছাপব। এভাবেই শুরু বিভূতিভূষণের পথচলা।