kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

লাইফ ইজ বিউটিফুল

৩১ অক্টোবর আসাদুজ্জামান নূরের ৭৫তম জন্মদিন। প্লাটিনাম জুবিলি উপলক্ষে কিংবদন্তি এই অভিনেতা ও নেতার মুখোমুখি হয়েছেন দাউদ হোসাইন রনি

২৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ২২ মিনিটে



লাইফ ইজ বিউটিফুল

আসাদুজ্জামান নূর ছবি : নূর-এ আলম

আমরা জানি, জন্মদিন সেভাবে পালন করেন না আপনি। এবার তো ৭৫তম জন্মদিন। জীবনের বিশেষ এই মুহূর্ত নিশ্চয়ই উদযাপন করার মতো...

আমি তো এত দিন এসব অ্যাভয়েড করে গেছি। এবার আর এড়াতে পারলাম না। যদিও নিজে কিছু করছি না। আহকাম উল্লাহ সবাইকে নিয়ে একটা কমিটি করেছে। গোলাম কুদ্দুছ আছে, অনুপম সেন সভাপতি। ওরাই সব আয়োজন করছে। আমাকে শুধু হাজির হতে বলা হয়েছে। আমি আর কিছু জানি না। আরও অনেকেই চেষ্টা করেছে। আমি আর কোনোটায় রাজি হইনি। বলেছি সবাই মিলে এই একটা আয়োজনই করব। পঁচাত্তর বছর বেঁচে থাকাও তো একটা বিশাল ব্যাপার। কোনোবারই উদযাপন করি না, এবারই একটু রাজি হলাম আর কি।

ছোটবেলায় ঘরোয়া জন্মদিন পালনের কোনো স্মৃতি মনে আছে আপনার?

আমাদের ছোটবেলায় জন্মদিন হতো না। যতটুকু মনে পড়ে, বাড়িতে একটু ভালো রান্নাবান্না হতো। কাউকে দাওয়াত করা বা ঘটা করে কিছু করা হতো না।

 

ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মের দেড় বছর পর আপনার বাবা পরিবারসহ বাংলাদেশে [পূর্ব পাকিস্তান] চলে আসেন। শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় আবার জলপাইগুড়িতে গিয়েছিলেন?

১৯৪৮ সালে আমরা নীলফামারী চলে আসি। মুক্তিযুদ্ধের সময় সেভাবে ছিলাম না ওখানে। যাওয়া-আসা হয়েছে। শুরুর দিকে কয়েকদিন ছিলাম। ওখানে আমরা একটা ক্যাম্প করেছিলাম সাময়িকভাবে। ক্যাম্প করার পর মুভ করে আবার অন্য জায়গায় গিয়েছি।

 

যুবক বয়সে জন্মভিটায় গিয়ে কী দেখলেন, আলাদা কোনো মায়া কাজ করছিল কিনা?

একবার মনে হয়েছিল, যদি নিজেদের বাড়িটা দেখতে পেতাম! সেটা হয়ে ওঠেনি। আমার পরিচিত কেউ ছিলেন না। বাবার এক বন্ধু ছিলেন। আর আমাদের ব্যস্ততা এমন ছিল এসব নিয়ে ভাবার অবকাশ পাইনি। স্বাধীনতার অনেক পরে একবার গিয়েছিলাম। আমার স্কুল জীবনের শিক্ষক সুনীল রতন ব্যানার্জি ওখানে থাকতেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তারও পরে আরেকবার গিয়েছিলাম আমার ফুপুর কাছ থেকে একটা ডিরেকশন নিয়ে। সেই ডিরেকশন অনুযায়ী গিয়ে অবশ্য কিছু পাইনি। তখন পুরোটাই চেঞ্জ হয়ে গেছে, বুঝতে পারিনি কোনটা কী।

 

জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের নাগরিক হয়ে, বেড়ে উঠেছেন পাকিস্তানে, পেশাগত জীবন বিকশিত করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে। এই অঞ্চলের বাঙালিদের অনেক চড়াই উতরাই নিজের চোখে দেখেছেন আপনি। এই জনপদের জন্য সামনে আর কী অপেক্ষা করে আছে বলে মনে হয় আপনার?

এখন তো আমাদের সামনে অনেক স্বপ্নের বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও স্বপ্নের বাংলাদেশ। মিলিত প্রচেষ্টায় সেই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়িত করার প্রচেষ্টা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা এমন একটা জীবন চেয়েছি যে আগামীতে বাংলাদেশটা হবে বাঙালিদের দেশ। যেখানে বাংলা সাহিত্যচর্চা হবে। গান বাংলায় হবে। অফিস আদালতের কাজ হবে বাংলায়। সেগুলো হয়তো অনেকটাই হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, সেই লক্ষ্যে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। আমরা আগের তুলনায় স্বচ্ছল অবস্থায় এসেছি। দেশের সর্বক্ষেত্রেই একটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু সব মানুষ এখনো দারিদ্র্যমুক্ত হয়নি।

 

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম স্তম্ভ অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এখনকার বাংলাদেশের যে চিত্র এমন দেশের স্বপ্নই কি দেখেছিলেন আপনারা?

আমি এ প্রসঙ্গেই বলতে চেয়েছিলাম। এ জায়গাটায় আমরা কিন্তু অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছি। এটা হয়েছে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে। তখন তো বাংলাদেশকে উল্টোপথে নেওয়া হলো। জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ, বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলের পুরো সময়টা ধর্মীয় উন্মাদনা আর ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতির চেষ্টা চলেছে। সব মিলিয়ে আমরা অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছি। আমাদের শিশুরা স্কুল কলেজের বইগুলোতে বিকৃত ইতিহাস পড়েছে। ফলে ওরা অনেক বিভ্রান্ত হয়েছে। এখন এই বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠাটা আমাদের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই মানুষগুলো তো বড় হয়েছে। এই সমাজেই আছে। ওই বিভ্রান্তি বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। বিশ্বাসের জায়গাটা পরিবর্তন করা কিন্তু খুব কঠিন। এর মধ্যে সারাবিশ্বেই সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলোর এক ধরনের নবউত্থান হচ্ছে। এই উত্থানের প্রভাব তো বাংলাদেশেও পড়েছে।

 

সাম্প্রদায়িক চেতনা ঠেকানোর জন্য কি সাংস্কৃতিক আন্দোলন যথেষ্ট?

এটা সব দিক থেকেই করতে হবে। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিন্তু সবাইকে শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য না, মনন তৈরি করার জন্য। যে মনটা মানুষকে ভালোবাসতে শেখাবে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে এটাই কিন্তু সংস্কৃতির মূল চেতনা। পারিবারিক আবহটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আজকাল লেখাপড়ার চাপে খেলাধুলা করারই অবকাশ পায় না শিশুরা। অন্য কিছু তো বাদই দিলাম। বই পড়া, ছবি আঁকা বা গান শেখা—এর মানে এই নয় যে ওরা বড় লেখক হবে বড় গায়ক বা অভিনেতা হবে। ভেতর থেকে তার যে মনটা গড়ে উঠবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো নানাভাবে যে উচ্ছৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে তার কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। দৃশ্যমান শাস্তি। যাতে করে সমাজে একটা বার্তা যায়, এই ধরনের অন্যায় করলে তার শাস্তি পেতে হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলতে পারি। সেদিনই টেলিভিশনে দেখছিলাম, একজন মহিলা ওয়ার ক্রিমিনাল। ৯৩ বছর বয়স। সে জার্মান হিটলার সরকারের পক্ষে কাজ করতো। তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। কেউ কেউ বলতে পারেন, ৯৩ বছরের মহিলাকে শাস্তি দিয়ে কী লাভ? আসলে এগুলো এক একটা দৃষ্টান্ত। আইনের প্রয়োগ সঠিকভাবে করার ক্ষেত্রে বয়স-সময় কোনো বিষয় নয়। এগুলো অতিক্রম করেই সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি। যেমন বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হওয়াটা খুব জরুরি ছিল। এটা কিন্তু কিছু মানুষকে ধরে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপার নয়। সারাদেশের জন্য এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও একটা বার্তা দেওয়া যে ন্যায় বিচারই মূল জিনিস।

 

আপনি ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি করেছেন। পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন, মন্ত্রীত্বও পেয়েছিলেন। রাজনৈতিক বিশ্বাস কি চেঞ্জ হয় নাকি বিশ্বাস অপরিবর্তিত রেখেই দল বদল করা যায়? আপনার ক্ষেত্রে কী হয়েছে?

বিশ্বাস অপরিবর্তিত রেখেই দল বদল করা যায়। ছাত্র ইউনিয়ন করেছি বা কমিউনিস্ট পার্টি করেছি এর মধ্য দিয়ে একটা নিজস্ব জগত্ গড়ে উঠেছিল। সে জায়গাটা ছিল মূলত মানুষের সঙ্গে থাকা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষের জন্য কাজ করা, মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা। পরবর্তীতে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমার সামনে কিন্তু আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো প্লাটফর্ম ছিল না। কারণ যে রাজনীতিটা আমরা করতাম সেই রাজনীতির আন্তর্জাতিক বিভক্তি, পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বা চীনে আজকের যে কমিউনিজম এই কমিউনিজম তো কমিউনিজম না, এটা তো ক্যাপিটালিজমেরই আরেকটা রূপ—এসব কারণে প্রত্যেকটা দেশে বামপন্থী আন্দোলন সংকুচিত হয়েছে। সেই অবস্থায় থেকে বামপন্থীরা দেশ পরিচালনায় কোনো বড় ভূমিকা রাখতে পারছে না, এমনকি বিরোধী দলের ভূমিকাও রাখতে পারছে না। অতীতে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একসাথে পথ হেঁটেছে। বঙ্গবন্ধুকে সহযোগিতা করেছে। বঙ্গবন্ধু সবসময়ই গুরুত্ব দিয়ে তাদের কথা শুনেছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীতে রাষ্ট্র গঠনেও তাদের ভূমিকা ছিল। পরে তারা তো সেই ভূমিকা ধরে রাখতে পারেনি। আমাদের সামনে যেটা আরেকটা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো সেটা হলো বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে যখন বাংলাদেশের অস্তিত্বই সংকটের মধ্যে পড়ে গেল, বাঙালি অস্তিত্বের সংকটের মধ্যে পড়ে গেল তখন আমার সামনে আওয়ামী লীগ ছাড়া তো আর কোনো প্লাটফর্ম ছিলো না। আর বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে আমাদের কারো কখনো ভিন্নমত ছিলো না। তিনি বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা। এই ব্যাপারে আমাদের কোনো বিতর্ক বা বিভ্রান্তি নেই। কাজেই আওয়ামী লীগে যাওয়াটাই আমার পক্ষে যুক্তিপূর্ণ একটা পরিবর্তন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনি আইনের ছাত্র ছিলেন। অথচ আপনি হলেনবিচিত্রা বিনোদন সাংবাদিক...

ল পড়েছিলাম বাবার ইচ্ছায়। আমার কখনোই ইচ্ছে ছিলো না, পছন্দও ছিলো না। অনেক কঠিন বিষয়। তাও সান্ধ্যকালীন ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম যেন সারাদিন সংগঠন করতে পারি, রাজনীতি করতে পারি। আমার ছেলেবেলা থেকে বড় হওয়া একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক ছিলেন। দুজনেই এসব ব্যাপারে উত্সাহী ছিলেন। আমাদের ছোট্ট শহর নীলফামারীতে যখন কোনো অনুষ্ঠান হতো আমার বাবা সেগুলোতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। আমাদের বাড়িতে রিহার্সাল হতো। আমার মা যে স্কুলে হেড মিস্ট্রেস ছিলেন সেখানে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলের গান দিয়ে ক্লাস শুরু হতো। পরে আমি চাকরিতে ঢুকলাম বিজ্ঞাপনী সংস্থা বিটপিতে। ওরা একটা ছাপাখানা করেছিল বারিধি মুদ্রায়ণ নামে। ওখানে যাওয়া-আসা সূত্রে পরিচয় হলো আহমেদ জামান চৌধুরীর সঙ্গে যাকে সবাই আজাচৌ বলি। এক সময়কার ডাকসাইটে সাংবাদিক। উনি আমাকে নিয়ে গেলেন চিত্রালিতে। উনি তখন চিত্রালিতে চাকরি করেন, বিটপিতেও বিজ্ঞাপনের কপি লিখতেন। তখন এস এম পারভেজ ছিলেন চিত্রালির সম্পাদক। উনাকে আজাচৌ বললেন, ‘আমি ওকে নিয়ে আসছি। ও বাংলা ভালো লেখে। কাজে লাগান।’ তখন উনি আমাকে বললেন, ঠিক আছে তুমি লেগে পড়ো।

 

প্রথম কার ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন মনে পড়ে?

যতদূর মনে পড়ে, টিএসসিতে যে নাটকগুলো হচ্ছিল তার দুটি নাটকের সমালোচনা লিখেছিলাম প্রথমে। এরপর সম্ভবত ইন্টারভিউ করি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। উনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। এরপর আলী যাকের, আব্দুল্লাহ আল মামুন, লায়লা সামাদ, ফজলুল করিমদের ইন্টারভিউ করেছিলাম।

 

পরে তো নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দিলেন। শুনেছি, প্রথমদিকে আপনি প্রম্পটিং করতেন...

আলী যাকেরের ইন্টারভিউ নিতে গিয়েই নাগরিকে যাওয়া। আস্তে আস্তে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম। স্বাধীনতার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সমস্ত অনুষ্ঠানগুলো আমরা করেছি, আমি ছিলাম সংস্কৃতি সংসদের সভাপতি। জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন আবুল হাসনাত, কালি ও কলম পত্রিকার সম্পাদক। তখন ইউনিভার্সিটিতে যে নাটকগুলো হতো বাইরের লোকেরাই এসে অভিনয় করতেন। হাসান ইমাম নির্দেশনা দিতেন। গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, আবুল হায়াত, আতাউর রহমান, কাজী তামান্না, ড. ইনামুল হক—এরা সবাই এই নাটকগুলোতে অভিনয় করতে আসতেন। আমরাই ডেকে ডেকে আনতাম। তখন আমাকে প্রায়শই প্রম্পটিংয়ের কাজটা করতে হতো। যখন আমি নাগরিকে এলাম সেখানে পুরনো অনেককেই পেলাম। ওরা আমাকে দেখে বললো এইতো প্রম্পটিংয়ের লোক পাওয়া গেছে।

 

আবুল হায়াতের নাক না ফাটলে মঞ্চে অভিনয় করা হতো না আপনার, এমন একটা কথা প্রচলিত আছে...

না, ঢাকায় আসার পর ছোটখাটো রোল করেছি বিভিন্ন নাটকে। কিন্তু ওইভাবে অভিনয় করবো এমন কোনো প্ল্যান ছিলো না। ঘটনাচক্রে যেটা হলো, রিহার্সালের সময় বাদল রহমানের ঘুষি লেগে হায়াত ভাইয়ের নাক ফেটে গেল। নাটকটি ছিলো রশিদ হায়দারের ‘তৈল সংকট’। নির্দেশক ছিলেন আলী যাকের। হায়াত ভাই তো হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেলেন। দুদিন পরে শো। আলী যাকের আমাকে বললেন, আপনি যেহেতু প্রম্পটিং করেন, পুরো নাটক আপনার মুখস্ত। আপনাকেই নামতে হবে। এভাবেই নাগরিকের হয়ে অভিনয়ে নামলাম। এরপর দলের অধিকাংশ প্রযোজনাতেই অভিনয় করেছি।

 

স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক অঙ্গণে সবচেয়ে বড় অর্জন মঞ্চনাটক। আপনি সেই থিয়েটার আন্দোলনের অগ্রসৈনকিদের একজন। মঞ্চের এখনকার চিত্র দেখে আপনি সন্তুষ্ট?

এখন তো পরিসর অনেক বেড়েছে। দলের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। তবে দলের সংখ্যা অনুযায়ী ভালো নাটকের সংখ্যা কমে গেছে। আমাদের সময় যে কটা দলই নাটক করতো। সব কটারই কোনো না কোনো নাটক উল্লেখযোগ্য। এখন দল অনেক বেশি হয়েছে ঠিকই সে তুলনায় নাটক হয়তো কমেছে। ভালো অভিনয়শিল্পী, নির্দেশক দরকার। এতগুলো দলের জন্য এত মানুষ পাওয়াটাও তো কঠিন। তবে চর্চাটা যে হচ্ছে এটাই তো বড় কথা। এই চর্চাকে আরও শক্তিশালী বা মানসম্মত করতে শিল্পকলা একাডেমির একটা বড় ভূমিকা আছে। এখন আমাদের ছেলেমেয়েলরা তো বিভিন্ন ড্রামাটিক স্কুল থেকে পাস করে আসছে। তারা হয়তো নাটকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন আবার অনেকেই চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু যারা নাটকের প্রতি নিবেদিত তাদের বেশিরভাগই মঞ্চে কাজ করছেন। শিল্পকলা একাডেমি আরো বেশি প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে হয়তো মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আপনার কি মনে হয় না এখনকার কর্মীদের মঞ্চের প্রতি নিবেদন কমে গেছে?

সেটা হয়তো নয়। জীবনের চাহিদা তো বেড়ে গেছে। আমরা যেমন চাকরি করতাম সন্ধ্যা বেলা একখানে হয়ে নাটক করতাম। এখন যাওয়া আসা থেকে শুরু করে জীবনের অনেক কিছুই কঠিন হয়ে গেছে।

 

আপনি দারুণ আবৃত্তি করেন। অনেকেই বলেন, অভিনেতাদের আবৃত্তির ঢঙে অতিনাটকীয় সুর পাওয়া যায়। যারা কেবলই আবৃত্তিশিল্পী তাদের অনেকে এটাকে ভালো চোখে দেখেন না। আবৃত্তিতে নাটকীয় সুর চলে আসাটা কি দোষণীয় কিছু?

আমি মনে করি না। কারণ কবিতা তো একটা এক্সপ্রেশন। এক্সপ্রেশনের মধ্যে কিছু নাটকীয়তা থাকেই। একজন আবৃত্তিকার যেভাবে কবিতা পড়েন একজন কবি কি সেভাবে পড়েন? কবি যেভাবে পড়েন আমরা যদি ধরে নেই ওটাই হওয়া উচিত তাহলে আমরা যারা আবৃত্তি করছি তারা কি ভুল করছি? আমরা তো আমাদের আবেগ, স্বর প্রক্ষেপণ, নৈপুণ্য, উচ্চারণের বিষয়গুলো মাথায় রেখেই বিষয়গুলো সাজাই, তৈরি করি। যখনই তৈরি করি তার মধ্যে কিছু নাটকীয়তা থাকবেই। আমরা যারা নাটকের মানুষ তারা নাটকটাকে আরো বেশি করে খুঁজি। আবৃত্তিকাররা সেই জায়গায় নাটকীয়তা হয়তো খোঁজেন না। আমি মনে করি না কোনোটার মধ্যেই কোনো বিরোধ বা সংঘাত আছে। মূল কথা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত শুনতে ভালো লাগে হূদয় স্পর্শ করে ততক্ষণ পর্যন্ত এটা আবৃত্তি নাকি নাটক হলো তা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

 

‘রঙের ফানুস’ বিটিভিতে আপনার প্রথম নাটক। আব্দুল্লাহ আল মামুনের রচনা ও পরিচালনায় সেখানে ছোট্ট একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। মূল চরিত্রে প্রথম কোন নাটকটি করেছিলেন?

ঠিক মনে করতে পারছি না।

 

অভিনয়ের সময় পর্দায় আপনাকে বরাবরই মনে হয় ‘কেয়ারফুলি কেয়ারলেস’। এটা কিভাবে নিজের মধ্যে গড়ে তুলেছেন? ক্যারিয়ারে আপনি হুমায়ূন আহমেদের চিত্রনাট্যে বেশি অভিনয় করেছেন। এমন কি হতে পারে এটা হুমায়ূন আহমেদের চিত্রনাট্যের প্রভাব? নাকি বিষয়টা আপনার ভেতরেই আছে?

টেলিভিশনে সাধারণত ৫ থেকে ১০ হাত দূরত্বে বসে নাটকটা দেখি। মঞ্চে কিন্তু ১০ থেকে ৩০ গজ দূরত্বেও বসে দেখি। এখানে যদি আমি উচ্চকিত অভিনয় বিনা প্রয়োজনে করি তাহলে এটা দর্শকের কাছে ভালো লাগে না। আমার ব্যক্তিগত ধারণা। প্রয়োজনে আমি অবশ্যই উচ্চকিত হবো যখন আমার ক্রোধ, উত্তেজনা, আবেগ প্রকাশের বিষয় থাকে তখন তো আমার উচ্চকিত অভিনয় দাবি করে। আমি মনে করি সংযত অভিনয়ের ভেতরে যে শক্তিটা থাকে ওটা থেকে বেরিয়ে গেলে চরিত্রের শক্তিটা আর থাকে না। যেটাকে সবাই বলে ন্যাচরাল অ্যাক্টিং। আমাদের দেশে অনেকেই ন্যাচরাল অ্যাক্টিং করেন। সারা পৃথিবীতেই ন্যাচরাল অ্যাক্টিংকে স্বীকৃত মান ধরা হয়। আমি কেমন করে করি এটা বোঝাতে পারবো না। চরিত্রটা তো একটা নির্মাণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সে সময় আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগে। কারণ আমি যে চরিত্রই নির্মাণ করি না কেন সেটা সমাজের কোথাও না কোথাও আছে। এগুলো সম্পর্কে হয় কোথাও না কোথাও শুনেছি দেখেছি বা পড়েছি। এমন অভিজ্ঞতা দিয়েই চরিত্রটা নির্মাণ হয়। এমনও হতে পারে ‘কেয়ারফুলি কেয়ারলেস’ থাকার বিষয়টা আমার ভেতরেই আছে।

 

‘কোথাও কেউ নেই’-এর বাকের ভাই বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় চরিত্র। আপনার মুখে একবার শুনেছিলাম, বাকের ভাই নয় ‘অয়োময়’-এর ছোট মির্জা আপনার কাছে বেশি প্রিয়। নিশ্চয়ই আপনার কোনো ব্যাখ্যা আছে...

ছোট মির্জার চরিত্রটা আমার কাছে বেশ গভীর ও শক্তিশালী মনে হয়। বাকের ভাই চরিত্রটা উড়িয়ে দিচ্ছি না। এ চরিত্রটা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিলো। একটা মাস্তানের চরিত্র। আমাকে খুব সিনিয়র একজন প্রডিউসার বলেছিলেন, চরিত্রটা তোমার করা উচিত হবে না। ‘অয়োময়’ করে এত সুনাম করেছো তোমার চরিত্রের মধ্যে একটা কোমলতা আছে, তোমাকে দিয়ে মাস্তান হবে না। আমি তখন তাকে বলি আপনি আজকে এ কথাটা বলছেন, ‘অয়োময়’ করার আগেও খুব সিনিয়র আরেকজন প্রডিউসার বলেছিলেন তুমি এই চরিত্রটা করছো এটা তো একটা লম্বা চওড়া দরাজ গলা যেমন আলী যাকের বা গোলাম মুস্তাফার মতো মানুষ করলে মানাতো। তুমি অসুবিধায় পড়ে যাবে। আমি দুটো চরিত্রই আমার মতো করে করেছি। সব ধরনের ক্যারেক্টার করার সক্ষমতাও একটা চ্যালেঞ্জ।

 

রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করতে গিয়ে অনেকেই নেতাদের অভিনেতা বলে তিরস্কার করেন। অভিনেতা থেকে নেতা হলে তো কথাই নেই, বাড়তি সমালোচনা শুনতে হয়। আপনি কি এই দুটো পেশার মধ্যে কোনো মিল বা অমিল খুঁজে পান?

আমি নেতা ও অভিনেতার মধ্যে এরকম কোনো মিল খুঁজতে চাই না। আমি যে মিলটা খুঁজতে চাই সেটা হলো, একজন রাজনীতিবিদের সাথে একজন শিল্পীর মিল। আমি মনে করি দুটোই খুব সৃজনশীল কাজ। লক্ষ্য একটাই, মানুষের কাছে যাওয়া, মানুষের পাশে থাকা তাদের কথাগুলো তুলে ধরা, জনমানুষের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা। কেউ রাজনৈতিকভাবে করেন আর কেউ কালচারালি করেন। একজন লেখক যখন লিখেন এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে লেখেন, একজন কবি অভিনেতা বা রাজনীতিবিদও তাই করেন। নেতা ও অভিনেতার মধ্যে আমি কোনো সমস্যা দেখি না, বিরোধ দেখি না বরং একটা মিল খুঁজে পাই।

 

বাকের ভাই এবং সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর—এই দুয়ের মধ্যে কে বেশি জনপ্রিয় বলে আপনি মনে করেন?

দেশব্যাপী যদি বলি তাহলে নিশ্চয়ই বাকের ভাই বেশি জনপ্রিয়। আর আমার নিজ এলাকা মানে নীলফামারী নির্বাচনী এলাকায় বাকের ভাইয়ের বিষয়গুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। আমি কী কাজ করছি না করছি, আমি কতটুকু তাদের উন্নয়নের কাজে লাগছি, তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারছি কিনা সেসবেই তাঁদের নজর বেশি থাকে।

 

চলচ্চিত্রে আমরা আপনাকে হুমায়ূন আহমেদের চিত্রনাট্যের বাইরে খুব কমই পেয়েছি। এর পেছনে কারণটা কী? নাকি অন্য যারা বানাচ্ছেন তাদের বিশ্বাস করতে পারছেন না?

আসলে আমি ভালো অফারও পাইনি। আর যে ধরনের কমার্শিয়াল ছবি হয়েছে আমাদের যৌবনকালে সেগুলো করা সম্ভব ছিল না।

 

আপনি অভয় দিলে একটা একটা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করতে চাই...

অবশ্যই।

 

আসাদুজ্জামান নূরকে আপনি সর্বশেষ দাড়িছাড়া কবে দেখেছেন? কত বছর আগে?

দাড়িছাড়া একটা টিভি নাটক করেছি আমি, ‘বরফ গলা নদী’। ১৯৭৫ সালের কথা। এরপর আর দাড়ি কাটা হয়নি।

 

এই দাড়ি নিয়েই আপনি টিভিতে পুরো নায়কজীবন কাটিয়ে দিলেন?

অনেকেই তখন আমাকে বলেছেন, তুমি দাড়ি রেখে দিলে চরিত্রে ভ্যারিয়েশন কিভাবে আসবে? আমি বলেছি দেখেন, একজন রিকশাওয়ালারও দাড়ি আছে, স্কুল শিক্ষকের দাড়ি আছে, মাওলানা সাহেবের দাড়ি আছে, সরকারি কর্মকর্তার দাড়ি আছে, কৃষকেরও দাড়ি আছে। এতগুলো মানুষ যদি দাড়ি রেখে এতগুলো পেশায় চলতে পারেন তাহলে আমি কেন অভিনয় করার মতো চরিত্র পাব না? আমি সেভাবেই চেষ্টা করেছি। মানুষও মোটামুটি গ্রহণ করেছে। আর এখন তো দেখছি সবাই দাড়ি রাখছে। ঢাকায়, কলকাতা এমনকি মুম্বাইতেও নায়করা এখন দাড়ি রাখছে।

 

চলচ্চিত্রের অনেকেই মনে করেন, চলচ্চিত্রকে তথ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে না রেখে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখলে ভালো হবে। আপনি তো এক সময় সরকারের সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

আমার কাছেও মনে হয় চলচ্চিত্র সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা উচিত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে চলচ্চিত্রের জন্য আরো ভালো হয়। তথ্য মন্ত্রণালয় যতটা প্রচারের দিকে মনোযোগ রাখেন ততটা চলচ্চিত্রে রাখতে পারেন না। তাদের মন্ত্রণালয়টা যথেষ্ট বড়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে থাকলে চলচ্চিত্র আলাদা ফোকাস পেত। এখন যেমন বছরে একবার অনুদান দেওয়া ছাড়া চলচ্চিত্রের কার্যক্রম খুব একটা দেখতে পাই না। হয়তো এফডিসি ডেভেলপ করা হলো, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দেওয়া হলো—এসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু চলচ্চিত্রে আরো অনেক কাজ করার রয়েছে। যেমন সিনেমা হল নেই, কিভাবে আবার সিনেমা হল ফিরিয়ে আনা যায় এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত দরকার। ভারতে এখন ম্যান্ডেটরি করে দিয়েছে, কেউ যদি শপিং কমপ্লেক্স করে তাহলে সেখানে মাল্টিপ্লেক্স থাকতেই হবে। এখানেও সেটা হওয়া উচিত ছিল। আমাদের এখানে ‘গুলিস্তান’ বন্ধ করে দিয়ে একটা শপিং মল মানে বাজার হলো আরকি। সিনেমা হল ছিল দুটি, দুটোই বন্ধ হয়ে গেল। আমি বুঝলাম আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান দেওয়া হচ্ছে সেটা এক ধরনের বড় সহায়তা। অনুদানের টাকার অংকটাও আগের চেয়ে বেশি। কিন্তু সেই ছবি দেখাবে কোথায়? দর্শকের কাছে পৌঁছানোর তো আর কোনো উপায় নেই।

 

জন্মদিন নিয়ে আলাপ শুরু করেছিলাম। ৭৫ বছরে আপনি তো জীবনের নানা রং দেখেছেন। আপনার দৃষ্টিতে মানুষের জীবনটা আসলে কেমন?

জীবন সুন্দর এতে কোনো সন্দেহ নাই। অনেক বাধা-বিঘ্ন থাকে, আনন্দ থাকে, দুঃখ কষ্ট থাকে—তারপরও লাইফ ইজ বিউটিফুল। জীবন অবশ্যই সুন্দর, শেষ দিন পর্যন্ত সুন্দর এবং সেটি সুন্দর করে ধরে রাখার কাজই আমাদের মূল কাজ।

 

যদি পেছন ফিরে তাকান, ৭৫ বছরের সময়টাকে আপনি কয়টা ভাগে ভাগ করবেন?

শৈশব কৈশোর কেটেছে আমাদের নীলফামারী শহরে। সেটি আমার জন্য একটি অসাধারণ সময় ছিল। বাবা-মা আত্মীয়, শিক্ষক, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সবাই মিলে আমরা একটা সুন্দর সময় পার করে এসেছি। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাহিত্যচর্চা, দেয়াল পত্রিকা বের করেছি। কলেজে উঠে ইলেকশন করে জেনারেল সেক্রেটারি হয়েছি। সবকিছু মিলেই চমত্কার সময় কেটেছে। তারপর ঢাকায় এসেও তো একটা ঐতিহাসিক সময় পার করেছি। ছয় দফা থেকে মুক্তির সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস, এটি তো আমি মনে করি জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। তারপরে স্বাধীনতার পরে ৫০ বছর আমরা পার করলাম। এই ৫০ বছরে আমাদের অনেক দুঃখ বেদনাও আছে। জাতীয়ভাবে যদি চিন্তা করি আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়েছি, এটিই আমাদের বিরাট একটি বেদনার বিষয়। পাশাপাশি যেটা হয়েছে, আমাদের চিন্তার জগৎ অনেকটা পাল্টে গেছে। স্বাধীনতার আগে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বা যুদ্ধের পর পর আমরা যেভাবে দেশটাকে দেখতে চাইতাম সেই জায়গাতে একটা বড় রকম আঘাত এলো। ঘাত প্রতিঘাত সংগ্রাম এবং আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই চলে যাচ্ছে, এর মধ্য থেকে তো আমরা এখনো বের হতে পারলাম না। সাম্প্রদায়িক শক্তির কথা বলছি, যারা আমাদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না তাদের সঙ্গে কিন্তু আমাদের একটা দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। পৃথিবীর কোনো দেশে মনে হয় এমন কোনো দল নেই যারা নিজের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিশ্বাস করে না। যে পাকিস্তানকে পরাজিত করে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে পেলাম সে পাকিস্তানেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে, তাদের মধ্যে সংঘাত আছে কিন্তু দেশ নিয়ে জাতির পিতা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। দুঃখজনক হলেও আমাদের দেশে এখনো এই পরিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হচ্ছে।

আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো দীর্ঘ সময় ধরে এত বড় সব মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। সেটি আমার জীবনের খুব বড় সঞ্চয় বলে মনে করি। শিল্পী জয়নুল আবেদীন থেকে কবি শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক—মানে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য জগতের মানুষগুলোর সান্নিধ্য পেয়েছি। অভিনয় ও চলচ্চিত্র জগতের গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, রওশন জামিল, সৈয়দ হাসান ইমামের মতো মানুষের সঙ্গে আমার ওঠাবসা মেলামেশার সুযোগ হয়েছে। হয়তোবা বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আমি কখনো যেতে পারিনি তবে অন্য অনেক বড় নেতার সঙ্গে ওঠাবসার সুযোগ হয়েছে সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছে, সব কিছু মিলিয়ে এগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

 

ব্যক্তিগত জীবনের অর্জন...?

ব্যক্তিগত জীবনে আসলে আমি কখনো পরিকল্পনা করে অগ্রসর হইনি। নাটক করবো বা বিজ্ঞাপনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হবো এরকম কোনো পরিকল্পনা আমার ছিল না। একেক সময় একেক জনের ভূমিকা আমার জীবনে আছে সেগুলো বলতে গেলে আরো অনেক সময় লেগে যাবে। যেমন আলী যাকেরের সঙ্গে পরিচয় না হলে হয়তো নাটক বা বিজ্ঞাপনের ব্যবসায় আসা হতো না। ছাত্রজীবনেও আমার বাবার পাশাপাশি সুনীল রতন ব্যানার্জির একটা বড় ভূমিকা ছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমার আওয়ামী লীগে আসা। আমি আসলে আওয়ামী লীগের কাজ শুরু করেছিলাম ৯৬ সালে সাল থেকেই। ৯৬ সালে আমাকে যখন নমিনেশন দেওয়ার কথা বললেন নেত্রী, আমি রাজি হইনি। বলেছি, এলাকার মানুষের সঙ্গে খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না আমার, মানুষের কাছে এখন গিয়ে ভোট চাইলে তারা কী ভাববে! ২০০১ সালে নমিনেশন নিলাম। ওই সময়টাও যদি দেখেন, ওই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যদি শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার যোগাযোগ না হতো তাহলে আজকে হয়তো আমি এই রাজনীতির জায়গাটাতে যেভাবে এসেছি হয়তো আমি আসতাম না।

 

গত কয়েকদিনে আমরা আলী যাকের, ড. ইনামুল হকের মতো কয়েকজনকে হারিয়েছি। এরা প্রত্যেকেই আপনার কাছের মানুষ ছিলেন...

আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আফসারও চলে গেল। এস এম মহসিন, মান্নান হীরা, মোস্তফা কামাল সৈয়দ মারা গেল। কদিন আগেই মাহমুদ সাজ্জাদ মারা গেল, আমার সহপাঠী ছিল। একই হলে থাকতাম আমরা। একসঙ্গে বহু সময় কাটিয়েছি। 

 

এই যে একজন একজন করে এভাবে প্রিয়জনরা চলে যাচ্ছে আপনার ভেতরে কেমন অনুভূতি হচ্ছে?

কিছুদিন আগে আমরা স্কুলের বন্ধুরা একত্র হলাম, সেখানে সর্বসাকুল্যে হাজির হয়েছে ১৩ জন, বাকিরা মারা গেছে। আমাদের সময়টা তো এরকমই যাবে, এটাতে চিন্তিত হয়ে কোনো লাভ নেই।

 

এমনিতে মৃত্যুচিন্তা হয় কখনো?

চিন্তা তো হয়ই কিন্তু সেটা নিয়ে কোনো দুর্ভাবনা হয় না। আমি সব সময় যেটা বলি, অসুস্থ হয়ে যেন মারা না যাই। অসুস্থ হলে নিজেরও যেমন ভোগান্তি হয় অন্যকেও কষ্ট দেওয়া হয় —এটা যেন না হয়।