kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

খুলনার মাটি নায়িকার ঘাঁটি!

ঢাকাই ছবির বেশির ভাগ নায়িকাই বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের। সুচন্দা-ববিতা-চম্পা থেকে শুরু করে শাবনূর-মৌসুমী-পপি-কেয়া, এমনকি হালের পরীমণি-আঁচল-পূজা চেরী—সবাই খুলনা অঞ্চলের! চলচ্চিত্রে খুলনার মেয়েরাই কেন বেশি? উত্তর খুঁজেছেন সুদীপ কুমার দীপ

২৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



খুলনার মাটি নায়িকার ঘাঁটি!

সুচন্দা-ববিতা-চম্পা—ঢাকাই ছবিতে বাগেরহাটের ‘তিন কন্যা’

ষাট-সত্তর-আশি ও নব্বই—এই চারটি দশক চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাতিয়ে রেখেছিলেন তিন বোন সুচন্দা, ববিতা ও চম্পা। ববিতা তো শুধু দেশে নন, সত্যজিত্ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ করে পেয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি। তিন বোনের এই সফলতার নেপথ্য কারণ শোনালেন ববিতা, ‘আমরা খুব রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছি। তবে সংস্কৃতি আর শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে বাবা-চাচারা, বিশেষ করে আমার আম্মা ও চাচিরা ছিলেন উদার। আমার ভাবি সব সময় বোরকা ও হিজাব পরেন, পাশাপাশি ভার্সিটিতেও পড়াশোনা করেছেন। ছোটবেলায় আমাদের কখনো বলা হয়নি যে নাটক বা সিনেমায় অভিনয় করতে হবে। একটু একটু করে যখন বড় হলাম, দেখলাম বাসায় সকালবেলা গানের শিক্ষক, বিকেলবেলায় নাচের শিক্ষক আর সন্ধ্যায় আসেন ছবি আঁকার শিক্ষক। মনে আছে, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি করেছি। আম্মা কয়েকবার ডাকার পরও যখন উঠিনি তখন চিকন একটা বেত নিয়ে আমাকে মারতে শুরু করলেন। কারণ কী! পরে জানলাম, বাসায় গানের শিক্ষক এসেছেন। আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। পরিষ্কার করে বলতে গেলে আমাদের এলাকার মানুষ খুব সংস্কৃতিমনা। একটু খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এই অঞ্চলের মানুষ যত গরিবই হোক, বাসায় একটা হারমোনিয়াম বা ঢোল-তবলা আছে। স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় খেলাধুলার পাশাপাশি একটা নাটক বা নাটিকা মঞ্চায়ন করা হয়। ছোটবেলাতেই এই অঞ্চলের মেয়েরা গান-বাজনা-অভিনয় শিখে ফেলে।’

ববিতার এই কথার সঙ্গে একমত পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান। তাঁর হাত ধরে চলচ্চিত্রে এসেছিলেন নায়িকা মৌসুমী; যিনি নব্বইয়ের দশকে দিয়েছেন একের পর এক হিট ছবি। সোহান আরো যোগ করেন, ‘নায়িকাদের যেমন চেহারা বা শারীরিক গঠন পছন্দ করে দর্শক, সেটা খুলনার মেয়েদের সবচেয়ে বেশি আছে। খুলনা থেকে আজ পর্যন্ত যত মেয়ে চলচ্চিত্রে এসেছে, অভিনয় প্রতিভার পাশাপাশি প্রত্যেকেরই চেহারা সুন্দর। কেউ কেউ বিখ্যাত তার হাসির জন্য, কেউ আবার চঞ্চলতায়।’ সোহানের মতে ভৌগোলিক কারণেই এখানকার মেয়েরা শুধু নয়, ছেলেরাও চলচ্চিত্রের জন্য পারফেক্ট। আমিন খান, শাকিল খান থেকে শুরু করে রিয়াজরাও খুলনার। এই এলাকা সমুদ্র উপকূলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই ছেলে-মেয়েরা একটু ডানপিটে স্বভাবের হয়। যেকোনো পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ভারতের তামিল-তেলেগুর নায়ক-নায়িকারাও অনেক ন্যাচরাল। কারণ তারাও বেড়ে উঠেছে সমুদ্র উপকূলে। তাদের অভিনয় দেখলে বোঝা যায় সেটা।

ঢালিউডে একটি কথা প্রচলিত, ‘নায়িকা যদি খুলনার হয় তাহলে ছবি হিট!’ কেউ কেউ আবার মজা করে বলেন, ‘খুলনার মাটি নায়িকার ঘাঁটি’। পরিসংখ্যানও সে কথাই বলে। যার সর্বশেষ প্রমাণ পরীমণি। প্রথম ছবি মুক্তি পাওয়ার আগেই ২৭টি ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এটা রেকর্ড। কী আছে পরীর মধ্যে? ‘অন্তর জ্বালা’ পরিচালক মালেক আফসারী বলেন, ‘পরী বলতে আমরা কল্পনায় যেমন নারীকে ভাবি বাস্তবেও ঠিক তেমন দেখতে পরীমণি। সে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেই আলাদা একটা রোশনাই চলে আসে। পর্দায় ওর মতো সুন্দরী নায়িকা দ্বিতীয়টি আর নেই। ওর হাসি, অভিনয়, চেহারা—তিনটি দিকই নজরকাড়া। আমার তো মনে হয় পরীকে এখনো সেভাবে কেউ কাজে লাগাতে পারেনি। আমার ছবিতে স্বল্প উপস্থিতিতেই সে প্রমাণ করেছিল কত বড় মাপের অভিনেত্রী।’

শাবনূরের কথা উঠলেই নির্মাতারা এক কথায় বলেন, ‘অসাধারণ অভিনেত্রী’। সেই শাবনূরের বাড়িও খুলনা অঞ্চলে। সালমান শাহ, রিয়াজ, শাকিল খান, ফেরদৌস, মান্না থেকে শুরু করে শাকিব খান—সবার সঙ্গে জুটি গড়ে তিনি সফল! শাবনূরের অভিনয়গুণ নিয়ে প্রশংসা করেন নায়করাই। শাবনূরকে নিয়ে শেষ পাঁচটি ছবি নির্মাণ করেছেন জাতীয় পুরস্কার পাওয়া পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান মানিক। তাঁর ‘দুই নয়নের আলো’ ছবি করেই প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান এই অভিনেত্রী। মানিক বলেন, ‘বাংলাদেশে খুব কম নায়িকা আছেন যাঁদের ভেবে গল্প তৈরি করেন নির্মাতা। শাবানার পরে একমাত্র শাবনূরকে কেন্দ্র করেই ছবি তৈরি করেন প্রযোজক। শাবনূরকে একই সঙ্গে বলা হয় নায়ক ও নায়িকা। কারণ তাঁর ছবিতে তিনি একাই এক শ।’

খুলনা থেকে আরো এসেছেন পপি, কেয়া, শাহনূর, আঁচল, মৌসুমী, মিষ্টি জান্নাত ও পূজা চেরী। হয়তো সামনে আসবেন আরো অনেকে। সফলও হবেন তাঁরা, এমনটাই মনে করেন মৌসুমী। ‘অন্তরে অন্তরে’ অভিনেত্রী বলেন, ‘খুলনার মেয়েদের মধ্যে চেষ্টাটা বেশি থাকে। ভালো কাজ করার ইচ্ছাটাও তাদের মধ্যে প্রবল। এ জন্যই বেশির ভাগ খুলনার মেয়ে সফল। প্রথম ছবি থেকে আজ পর্যন্ত যে ছবিগুলোতে আমি অভিনয় করেছি তার প্রতিটিই মনে রাখার মতো। কারণ পেশার সঙ্গে কখনো আপস করিনি। সেই শুরু থেকে সুচন্দা ম্যাডাম, ববিতা ম্যাডাম, চম্পা ম্যাডাম বা শাবনূর—প্রত্যেকের প্রোফাইল দেখলেই বোঝা যাবে তাঁরাও ঠিক একই রকমভাবে ক্যারিয়ার ধরে রেখেছিলেন। ভালো গল্প, ভালো চরিত্র, ভালো পরিচালকদের ছবিতে অভিনয় করেছেন সবাই। একমাত্র কবরী ম্যাডাম ছাড়া এতটা ক্যারিয়ার সচেতন অন্য এলাকার নায়িকা আছেন বলে মনে  হয় না।’

মিডিয়ার প্রতি বরাবরই খুলনার মেয়েদের আলাদা একটা টান, সেটা বোঝা যায় বিভিন্ন রিয়ালিটি শো দেখলে। এসব প্রতিযোগিতায় খুলনা অঞ্চলের মেয়েরাই সাড়া দেয় বেশি। এনটিভির আলোচিত রিয়ালিটি শো ‘সুপারহিরো সুপারহিরোইন’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন খুলনার মেয়ে লামিয়া মিমো। তিনি ছবি করেছেন শাকিব খানের সঙ্গে। তবে পরে খুব একটা মেলে ধরতে পারেননি নিজেকে। মিমো না পারলেও পূজা চেরীর মধ্যে দারুণ সম্ভাবনা দেখছেন হালের নির্মাতারা। রায়হান রাফি তো আছেনই, এই সারিতে নতুন করে নাম লেখালেন সৈকত নাসির ও অনন্য মামুন। মামুন বলেন, ‘পূজাকে নিয়ে নতুন একটি ছবি শুরু করতে যাচ্ছি। আমার কাছে মনে হয়েছে পূজাই হতে পারে আগামী দিনের শাবনূর। তার মধ্যে সে চেষ্টাটা আছে।’

খুলনার ডুমুরিয়ার মেয়ে পূজা চেরী, ‘দহন’খ্যাত অভিনেত্রী বলেন, ‘আমার পরিবার খুব সংস্কৃতিমনা। পরিবারের সবার আগ্রহ গান-বাজনা-অভিনয়ে। তাদের দেখেই আমার ভালো লাগার শুরু। শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও আজ আমি দুই বাংলায় ছবি করছি। এটা অনেক ভাগ্যের। এখনো অনেক শেখার আছে। ভালো অভিনেত্রী হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার তার কোনো কমতি রাখতে চাই না। খুলনার নামকরা অন্য সব অভিনেত্রীর পাশে আমার নামটাও দেখতে চাই আগামী দিনে।’

মন্তব্য