kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

‘কবিতারা মাইন্ড করেছে’

জন্ম একাত্তরে, সেই হিসাবে তিনি বাংলাদেশের সমবয়সী। আর অভিনেতা হিসেবে বয়সটা দেখতে দেখতেই কুড়ি! প্রথম টিভি নাটকে অভিনয় করেছিলেন ১৯৯৯ সালে। মোশাররফ করিমের দুই দশকের অভিনয়জীবন এবং সংশ্লিষ্ট ভাবনার মুখোমুখি দাউদ হোসাইন রনি

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



‘কবিতারা মাইন্ড করেছে’

টিভিতে প্রথম নাটক ফেরদৌস হাসানের অতিথি। ১৯৯৯ সালের কোন মাস ছিল সেটা, মনে আছে?

না। মাস-তারিখের হিসাব আমার থাকে না।

অতিথির আগে কি কোনো নাটকে পাসিং শট দিয়েছিলেন?

না। ‘অতিথি’র পরে হয়তো দিয়েছি।

সময়ের হিসাব রাখেন না বললেন, ফোনও কিন্তু ধরেন না...

ফোন ধরা যায় না আসলে। ফোন ধরলে অভিনয় খারাপ হবে।

এই মুহূর্তে তো নিশ্চয়ই আমাদের সামনে অভিনয় করছেন না!

হা হা হা। না না। বেশির ভাগ সময়ই তো ক্যামেরার সামনে থাকি। তখন চিন্তা করি, শটটা দিয়ে পরে ফোন করব। মুশকিল হলো, কাজ শেষ করার পর আমার মনে থাকে না। এটা আমার একটা সীমাবদ্ধতা। এখন এই সমস্যা কিছুটা কেটেছে। তবে বেসিক সমস্যা খুব বেশি বদলানো যায় না, রয়েই যায়।

নাট্যকেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আপনি। বিচ্ছু, হয়বদন, আরজ চরিতামৃত, প্রতিসরণ...দলের সব নাটকেই অভিনয় করেছেন। আপনার উত্থান কি আরজ চরিতামৃত দিয়ে?

মঞ্চ থেকে পরিচিতি আর কতটা আসে? মঞ্চ রিলেটেড লোকজনই খোঁজখবর রাখে।

আরজ চরিতামৃততে সাতটি চরিত্র করেছিলেন। বেইলি রোডের আড্ডায় তখন আলোচনা হতো আপনাকে নিয়েই। তখনো কিন্তু টিভি নাটক নির্মাতারা মঞ্চনাটক দেখেই নতুনদের সুযোগ দিতেন...

তার আগেও। একসময় শুনতাম, বিটিভির প্রযোজকরা মঞ্চনাটক দেখতে যেতেনই কাস্টিংয়ের জন্য। থিয়েটারের প্রভাব কিন্তু অনেক বড়। যদি তৃপ্তির কথা বলি, সেটা থিয়েটারেই পেয়েছি।

মঞ্চের সবাই এ কথাটা বলেন। তৃপ্তিটা আসলে কোথায়? একটু ব্যাখ্যা করবেন?

একটা স্ক্রিপ্ট করব কি করব না, সবাই মিলে বারবার পড়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যখন কাস্টিংয়ে যেতেন নির্দেশক—তখনকার যে উত্তেজনা, আমি কি কাস্টিং পাব! এসব করতে করতেই দেখা গেল এক মাস চলে গেছে। এক মাস দেড় মাস ধরে সবাই রিহার্সাল করলাম, সবাই তো আর কাস্টিং পাবে না। দেখা গেল শেষমেশ কাস্টিং পেলাম না, তখনকার কষ্টটাও আসলে সম্পদ। এই যে না-পাওয়া, তার জন্য খারাপ লাগা—সেটাই একজন শিল্পী তৈরি করে। সেই খারাপ লাগাটা হজম করে আবার কাজে যোগ হওয়া, এভাবেই একজন শিল্পীর ধৈর্য, সৌন্দর্যবোধ, অপেক্ষার স্বভাব তৈরি হয়। তারপর দু-তিন মাস অনুশীলন করে ফাইনালি যখন নাটক মঞ্চে যায়, সেটার তৃপ্তি অন্য লেভেলের। আরেকটা বড় ব্যাপার, মঞ্চে ‘কাট’ বলার লোক নেই। ‘কাট’ বললেই এতক্ষণ যে ইমোশনাল জার্নির মধ্যে ছিলাম, সেটা বাধাগ্রস্ত হয়। স্টেজে ওই ঘটনাটা ঘটে না। ফলে আমি দীর্ঘক্ষণ একটা চরিত্রের মধ্যে থাকি, একটা পর্যায়ে হারিয়ে যাচ্ছি। অভিনয় করতে করতে দর্শকের সঙ্গে একটা অদ্ভুত যোগাযোগ তৈরি হয়, যেটা ক্লাসিক্যাল মিউজিকের আসরেও দেখি। একজন অভিনেতা বা শিল্পীর সামগ্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো ওখান থেকেই তৈরি হয়ে যায়—দায়বোধ, শ্রদ্ধাবোধ। থিয়েটারে একটা কথাই আছে, শো মাস্ট গো অন। এই কথাটা সবার রক্তে ঢুকে যায়। শিল্পী তৈরিতে এটা খুব জরুরি। থিয়েটারে যদিও টাকা-পয়সা নেই, কিন্তু যে পদ্ধতিতে আমরা কাজ করি, সেটা অত্যন্ত প্রফেশনাল। এখানে [শোবিজে] টাকা-পয়সা পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু পদ্ধতিটা প্রফেশনাল না।

মঞ্চের শিক্ষা ছাড়াও কিন্তু অনেকে শোবিজে কাজ করছেন। সবাই যে খারাপ করছেন তা-ও না...

থিয়েটারে কেউ অভিনয় করল আর বড় অভিনেতা হয়ে গেল, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। অভিনয়টা প্রথমত মজ্জাগত। অভিনয়কে লজিক্যাল করে তুলতে হয় কেমন করে, ক্যারেক্টারাইজেশন কী—সেটা শেখানো হয় থিয়েটারে। একটা দলে দেখা গেল ২৫ জন সদস্য, ধরে নিলাম ২০ জনই ক্যারেক্টারাইজেশনটা করতে জানে, কিন্তু চরিত্রের ভেতরে ডুব দেওয়ার কাজটা করতে পারে মাত্র ৫ জন। থিয়েটারের সঙ্গে না থাকা একজনকে দেখা গেল ক্যামেরার সামনে খুব সাবলীল। ক্যামেরার সামনে ইজি হওয়াটাই সৎ অভিনয় নয়। দর্শকের হাতে যেহেতু স্ক্রিপ্ট থাকে না, অনেক সময় তারা সেটা ধরতে পারে না। ব্যতিক্রমও আছে, সোফিয়া লরেনের মতো অভিনেত্রী মঞ্চ করেননি। এ রকম অনেকেই আছেন। তবে জগতের বড় বড় অভিনেতার বেশির ভাগই মঞ্চের অভিজ্ঞতা নিয়েই এসেছেন।

মঞ্চের যে প্রফেশনালিজমের কথা বলছেন, সেটা টিভি নাটক বা সিনেমায় হচ্ছে না কেন? এখানে তো আপনারাই লিড দিচ্ছেন...

এটা নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি। প্রবলেমটা আল্টিমেটলি সেই স্কুলিং। আমাদের নাট্যকেন্দ্রের সবার মেধা কিন্তু সমান না, কিন্তু আইডোলজির জায়গা এক। আর এখানে [শোবিজে] বুম ধরছে এমন একজন, হয়তো পরশুদিনই সে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। আইডোলজি তো দূরের কথা, এটা যে একটা শিল্পমাধ্যম, সে বোধটাই তার নেই। সে তার রুটিরুজির প্রয়োজনেই এসেছে। যে ছেলেটা ট্রলি ঠেলবে, তাকে সিকোয়েন্সের মুড বুঝতে হবে। অভিনয়ের মানসিক গতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে তাকেও ট্রলিটা ঠেলতে হবে, তবেই সেটা শিল্প হবে। সে শুধু জানে, এটা ঠেললেই চলে। এটা তার দোষ না, কারণ তার ওই ইন্টেলেকচুয়াল হাইট তৈরি হয়নি। যখন তার মধ্যে এই বোধ কাজ করবে, তখনই একটা সিকোয়েন্সের জন্য তার মায়া লাগবে, মনে মনে বলবে, ‘আমার কারণে যেন এই দৃশ্যটা নষ্ট না হয়। এখানে শুধু অভিনেতা-অভিনেত্রী অভিনয় করছে না, আমিও আছি এবং আমি আছি বলেই দৃশ্যটা ভালো হবে।’ এই বোধ সবার মধ্যে না এলে শোবিজে প্রফেশনালিজমও আসবে না।

শোবিজের হিসাবে অভিনয়ে আপনার দুই দশক হলো। নাট্যকেন্দ্রের আগেও আপনি অভিনয় করেছেন। সব মিলিয়ে অভিনেতা মোশাররফের বয়স কত?

একেবারে ছোটবেলায় স্কুলে কবিতা পড়া, টুকটাক অভিনয় করা, আবার যাত্রামঞ্চে শিশুশিল্পী হয়েও কিছু পালায় অভিনয় করেছি। তারপর ঢাকায় এসে প্রথম দিকে ভালো দলে ঢোকার চেষ্টা করা এবং ঢুকতে না পারা। বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন দলে কাজ করেছি। ঠিকঠাকভাবে গুছিয়ে কাজ করাটা ১৯৯০ থেকে, নাট্যকেন্দ্রে। সেই হিসাবে প্রায় ২৯ বছর।

অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে কেউ যখন সফল হয়, কেন যেন মনে হয় তারা তখন বেশ জটিল চরিত্রের হয়ে ওঠে...

এটার ব্যাখ্যাটা আমি আসলেই জানি না। জটিল কোন অর্থে? মানে তার মধ্যে এক ধরনের পোশাকি ভাব চলে আসে?

ঠিক তা না। ধরুন, ১৯৯৯ সালে আপনার সহশিল্পী মূল চরিত্র করছেন, আপনার মনে হলো, এই চরিত্রটা তিনি ঠিকঠাক পারছেন না। আপনি হলে ফাটিয়ে দিতেন। এই সময়ে এসে তেমনি নতুন কোনো সহশিল্পী ভাবতে পারে, আপনার চরিত্রটা সে আরো ভালো করতে পারত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো আপনি সেটা বোঝেনও, কিন্তু তাকে আপনি আর সেই সুযোগটা দিচ্ছেন না।

হা হা হা। মাইকেলের পর কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন। সুযোগের ব্যাপারটা আমার কাছে পিকিউলিয়ার মনে হয়। সুযোগটা হয় আসে...[একটু থেমে] আমার অভিনয় করতে ভালো লাগে, তাইলে মনোযোগ দিয়ে এটাই করি। কী ঘোড়ার আন্ডা হলো না হলো, সেটা বিচারের দায়িত্ব অন্য কারো। চরিত্রটা করতে ভাল্লাগতেছে, ঠিকঠাক করতে পারলাম, আমার ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল, এখন আমি ঘুমাব। অভিনয়ের আনন্দ যদি সংক্রামক হয়, তা ছড়াবেই। যারা দেখবে, তারা আনন্দ পাবে কি পাবে না, সেটায় আমার মাথাব্যথা নেই।

শিল্পীর কাজ দেখেই কিন্তু বাজারমূল্য তৈরি হয়। দেখা গেল একজন ভুল লোকেরও বাজারমূল্য তৈরি হয়ে গেল...

ভুল লোকের বাজারমূল্য বিভিন্নভাবে তৈরি হতে পারে। কারো কোনো টুইস্টিং, তাকানো বা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণেও হয়ে যেতে পারে। মূল বিষয়টা হচ্ছে, একটা দীর্ঘ প্রেম ভেতরে না থাকলে কিছু হয় না। বাজারে নতুন জামা এলে আমাদের নজর যাবেই। তাতে কিন্তু আসলে গুণের বিচার হয় না। ওটা টানা পরলেই বোঝা যাবে, জামাটার কী কী সুবিধা-অসুবিধা। শিল্পের ক্ষেত্রে আসল বিচারক আল্টিমেটলি ‘কাল’। বিজ্ঞানের সূত্র না মিললে সবাই ধরে ফেলে, না সূত্র মেলেনি। কমার্সের ক্ষেত্রে  রেওয়ামিল মিলল না মানে হয়নি। আর্টসের ক্ষেত্রে কোনো হিসাব নেই। সে কারণে আর্টিস্টের সৎ হওয়াটা জরুরি। কারণ বিচারকই তো নেই এখানে! যেহেতু বিচারক নেই, সেহেতু শিল্পের বিচারক শিল্পী নিজেই। এ কারণেই আমাকে চূড়ান্ত লেভেলের সৎ হতে হবে। আমি যদি জানি আমি ফালতু অভিনয় করেছি, তারপর বড়গলায় বললাম, আমি তো আসলে এ রকমই করতে চেয়েছিলাম, তখনই আমি অসৎ হব। সেটারও কিন্তু বিচার হয়, বিচারক এখানে কাল, সময়। সাহিত্যে আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেছি, তাঁর কাজের বিচার করেছে সময়।

স্বাধীনতার আগে-পরে অনেকেই মঞ্চে এসেছেন অভিনয় ভালোবেসে। আপনারা যখন এসেছেন, তখন কিন্তু টিভিতে সুযোগ পাওয়ার বিষয়টা চলে এলো। অনেকে টিভি নাটকে সুযোগ পাওয়ার টার্গেট নিয়েই মঞ্চে আসা শুরু করলেন। আপনিও কি...?

নব্বইয়ে যখন শুরু করি, তখন ফরীদি ভাই, আফজাল ভাই, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূরসহ থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাই টেলিভিশনে কাজ করেন। আমাদের দলের তৌকীর ভাইও তখন জনপ্রিয়। আমি কবে মুখ দেখাব টেলিভিশনে, এটা নিয়ে অস্থির হয়ে থাকলে কিন্তু শিখতে পারব না। উচাটন মন নিয়ে শেখা যায় না। বরং কাজ করে নিজেকে তৈরি করাতেই মনোযোগ দিয়েছিলাম। বিশ্বাস করতাম, নিজে তৈরি হলে তার রেজাল্টের জন্য দৌড়াদৌড়ি করার দরকার হয় না। এটা হয়ে যায়।

দলে আপনার সহকর্মী তৌকীর আহমেদ ও জাহিদ হাসান টেলিভিশনেও জনপ্রিয় হলেন। দুজনই তখন রোমান্টিক নাটক করেন, অনেকে তখন তাঁদের চকলেট হিরোও বলতেন। দেখতে আপনি ঠিক চকলেট হিরোর মতো নন, এসব বিবেচনায় পর্দায় অভিনয়ের স্বপ্নটা আপনার জন্য কঠিন ছিল না?

টেলিভিশন নিয়ে আমার স্বপ্ন ছিল না। স্বপ্ন থাকলে আরো অনেক আগেই বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী হওয়ার কথা ছিল আমার। মাত্র দুই কি এক বছর আগে বিটিভিতে তালিকাভুক্ত হলাম! আমি অভিনয় করতে চাই, অভিনয় করতে আমার ভালো লাগে। আবার টেলিভিশনে কাজ করব না—এমন পণ করেও বসেছিলাম না। ওটার পেছনে কখনো দৌড়াইনি।

মঞ্চে অভিনয় করে যে তৃপ্তিটা পেয়েছেন, টিভি নাটকে কি কখনো সেটা পেয়েছেন? পেলে কোন কোন কাজে?

অনেক নাটক করেই তৃপ্তি পেয়েছি। এর মধ্যে আছে সালাহউদ্দিন লাভলু ভাইয়ের ‘ঘরকুটুম’, ‘কবুলিয়তনামা’, সরয়ার ফারুকী ভাইয়ের ‘৪২০’ এবং অবশ্যই ‘ক্যারাম’। যে সিরিয়াসনেস নিয়ে কাজগুলো করেছি, করার সময়ই মনে হতো, আমরা কিছু একটা করছি। এই যে ভেতরে একটা উত্তেজনা, সেই উত্তেজনাটা লাগে, যেটা থিয়েটারে পেতাম। রেদোয়ান রনি, ফাহমির সঙ্গেও কিছু কাজে তৃপ্তি পেয়েছি। মাহফুজ আহমেদ ভাইয়ের ‘তোমার দোয়ায় ভালো আছি’ করতে গিয়েও খুব একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ টিমের সবার মধ্যেই একটা ভালো কিছু করার তাগিদ ছিল। এটা অত্যন্ত জরুরি। যখন দেখি আমি একাই সিরিয়াস, একাই ঠেলছি, আর কারোই কিছু যায়-আসে না, তখন অসহায় লাগে।

মোশাররফ করিম হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে কার সাপোর্ট পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি?

একটা সময় আমাকে নিয়ে কাজ করত অরণ্য আনোয়ার। আমার অভিনয় খুবই পছন্দ করত সে। তখনো আমার চরিত্রের মধ্যে ফোন না ধরার বিষয়টা ছিল। একটা সময় তো ফোনই ছিল না। একবার জাহাঙ্গীরনগরে আড্ডা দিতে গিয়ে সেলফোন রেখে আসি। তিন মাস পর সেটা আনতে যাই। কারণ ফোন আমার কাছে প্রয়োজনীয় কিছু মনে হতো না। তবে ফোনটা আমার কাছে না থাকার কারণে কয়েকটা বড় কাজ হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। আমার সব কিছু বুঝেশুনেও অরণ্য আনোয়ার আমাকে নিয়ে কাজ করত। আমার প্রথম যে কাজ ক্লিক করল সেটা ‘ক্যারাম’। কচি খন্দকারের লেখা। সরয়ার ভাই যখন ডাকলেন, তখন আমার থাইল্যান্ডে একটা কাজ করতে যাওয়ার কথা ছিল। বিদেশে গিয়ে শুটিং করার বিষয়টা তখন আমার কাছে বিশাল ব্যাপার। আমার বউ বলল—না, তুমি এটাই করো। আমারও মনে হলো, থাইল্যান্ডে যাওয়ার চেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে একটা ভালো কাজ। থাইল্যান্ডের বদলে কুমিল্লা গিয়ে ‘ক্যারাম’টাই করলাম। দারুণ অভিজ্ঞতা। তার ফলাফল তো আমরা দেখতে পেলাম। ‘ক্যারাম’-এর পরই আমি সাধারণের কাছে ভালো অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছিলাম।

মোশাররফ করিম বাংলাদেশের টিভি ইন্ডাস্ট্রির অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, এমনকি রজনীকান্তও। যাঁরা এই লেভেলের তারকা, তাঁদের আশপাশে একদল স্তাবক সব সময় গিজগিজ করে। একটা বাজে কাজ নিয়েও এরা আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। ভালো-খারাপের পার্থক্য নির্ণয় করা তখন কঠিন হয়ে পড়ে না?

এটা খুবই মুশকিল। তবে শুটিংয়ে অভিনয় করার সময় থেকেই জানি কাজটি ভালো হয়নি। কাউকে জিজ্ঞেস করি না আমি। কোনো অভিনেতা যখন আশপাশের লোকদের কাছে বেশি বেশি জিজ্ঞেস করে, অমুক কাজটি কেমন হয়েছে? তার অন্য মানে...

তার মানে তিনি নিজেই সন্দিহান?

না, তার মানে সে একটু প্রশংসা শুনতে চায়। তবে একটা বিষয় মানি, যারা গুণী তারা একটু দূরেই থাকে। আর যাদের গুণ নাই, তারা চিন্তা করে—আমার তো ওই চেয়ারটায় বসতে হবে, সুতরাং তারা নানা ধরনের ডান্স শুরু করে। সেই কসরত করে ওদের কেউ কেউ এগিয়েও যায়। তাতে হয় কি, এগিয়ে গিয়েও তারা কোথাও পৌঁছায় না আসলে। মাঝখান থেকে একটা সময়কে, জায়গাকে নষ্ট করে এরা।

[একটু থেমে]

নাহ্, কথা বলে বেশ আরাম পাচ্ছি আজকে।

...মাঝে মাঝে নিজের কাছে লজ্জাও লাগে। বাংলাদেশে যে নাটক হচ্ছে, এটাই অনেক বেশি। এখানে যারা কাজ করছে, এরা কোত্থেকে কাজটা শিখেছে? কেউ চার-পাঁচটা সিনেমা দেখে নির্মাণে চলে এসেছে। আমি যখন নাট্যকেন্দ্রে ঢুকলাম, আর্থার মিলারের নাম জানলাম, মলিয়েরের নাম জানলাম। এখন থিয়েটারের তো আর ক্যামেরাম্যান তৈরি করতে পারার কথা না। কিন্তু শিল্পবোধ, কল্পনাশক্তি তৈরি করে দিতে পারে। এটার অভাবটাই বেশি। মেশিন তো কিনতে পাওয়া যায়, বোধ পাওয়া যায় না। এর মধ্য থেকেও ব্যক্তিগত চেষ্টায় বাংলাদেশে অন্তত ১০ জন ক্যামেরাম্যান তৈরি হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক মানের। এ রকম পরিচালক আছেন ১০-১৫ জন। এত ‘নাই’-এর মধ্যে যা হচ্ছে, সেটা অনেক বেশি। ইনস্টিটিউট থাকলে আরো ভালো হতো।

যে স্তাবকদলের কথা বললাম, এদের খপ্পরে পড়ে মিসগাইডেড হয়ে কখনো তাদের নাটকে অভিনয় করেননি?

করেছি! আমি তো গ্রেট কিছু না। আমি শিল্পী, আমার মধ্যে ইল্যুশন কাজ করে। কেউ এসে সুন্দর করে বললে আমার ভেতরে একটা ‘আহা রে!’ জেগে ওঠে। কিন্তু এখন বুঝি, এই ‘আহা রে!’টা আখেরে ভালো না। গত দুই ঈদের নাটক দেখলে দর্শক বুঝবে, এখন আমি আর যেটা-সেটা করে বসি না।

দেখা গেল খুব সাধারণ একটা গল্প, অভিনয়ের কারিশমা দিয়ে আপনি সেই নাটকের চরিত্রটা অসাধারণ করে তুললেন। পরবর্তী সময়ে একই ধরনের ১৫-২০টা চরিত্রে পর পর আপনাকে দেখা গেছে। দর্শকও আপনার সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছিল। এখান থেকে বের হওয়ার জন্য আপনি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

একটা সময় আসতে হয়। মাঝখানে যে সময়টা এসেছিল, সেটা ভালো ছিল না। লক্ষ করলে দেখবেন, গত ১০ বছরে অনেক গুণী পরিচালক নাটক থেকে সরে গেছেন। আর পুনরাবৃত্তির বিষয়ে বলব—একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা যদি বছরে পাঁচটি ছবি করেন, তার মানে তিনি বছরে পাঁচটি চরিত্র ভালোভাবে ডিল করছেন। আর আমরা যারা নাটকে অভিনয় করছি, বছরে তাদের কতগুলো চরিত্র ডিল করতে হয়? মাসে কতগুলো? আমাদের ক্ষেত্রে প্রতিটা চরিত্রে ভেরিয়েশন তৈরি করা টাফ লাইক অ্যানিথিং। ধরুন, আমাকে ‘রফিক’ চরিত্রটা দেওয়া হলো এবং এটা হিট হয়ে গেল। এর মধ্যেই আরেকজন নিয়ে এলো ‘সলিম’ চরিত্র। দেখলাম, ‘সলিম’ আসলে ‘রফিক’ই! তখন আমার দায়িত্ব হয়ে পড়ে এক হলেও চরিত্র দুটির পার্থক্য খুঁজে বের করা, যেমন ডান হাতের সঙ্গে বাঁ হাতের পার্থক্য! এ রকম সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পার্থক্য খুঁজে বের করা সব সময় সম্ভব হয় না। সেটার জন্য সময় লাগে।

জমজ, সেইরকম খোর’—এগুলো একটা পর্যায় পর্যন্ত মানুষ নিয়েছে। হয়তো এখনো ভালো হচ্ছে, তবু অনেকের মনে হচ্ছে, একই জিনিস বারবার কেন করছেন মোশাররফ...

এবার ‘বাকিখোর’টা খুব পছন্দ করেছে দর্শক। ‘জমজ ১১’ পছন্দ করেনি, ‘জমজ ১২’ মোটামুটি পছন্দ করেছে। ‘জমজ ১১’ আমার নিজেরই ভালো লাগেনি, দর্শকের ভালো লাগবে কেমনে! আমার কথা হচ্ছে, ‘খোর’ ১০০টা হতে পারে, আই ডোন্ট মাইন্ড। কিন্তু প্রতিটাই ‘হয়ে উঠতে’ হবে। স্ক্রিপ্ট পড়েই যেন আমি বলতে পারি, এবার তো ফাটিয়ে দেব। ইউটিউবে নাটকের লিংকের নিচে দর্শকের মন্তব্য পড়ি প্রায়ই। সেখানে প্রায়ই দেখি, ‘নাটকটি বাস্তবসম্মত হয়নি’। আর্ট ফর্মে কি রিয়ালিস্টিক ফর্ম ছাড়া আর কোনো ফর্ম নেই! আমরা কি সব সময় বাস্তব কিছু দেখতে চাই? তাহলে তো সার্কাস দেখতে যেতাম না। লোকটা চোখের সামনে ম্যাজিক তৈরি করতে পেরেছে কি না, সেটাই দেখতে যাই। ওটা দেখে আমার বিশেষ কোনো উপকার হয় তা নয়, কিন্তু মনোরঞ্জন হয়। দর্শকের মনে রং লাগাতে হবে, সেটা ভীষণ প্রয়োজন। ফুটবল ম্যাচে কী হয় এটা সবাই জানে, তবু সবাই খেলাটা দেখে। মাঠে নামার আগে ম্যারাডোনা জানে তাকে কী করতে হবে, কোথায় দাঁড়াতে হবে। কিন্তু হঠাৎ তিনজন প্লেয়ার এসে যখন তাঁকে ট্যাকল দেয়, তখন কী খেলাটা সে খেলবে এটা সে আগে থেকে ঠিক করে নামতে পারে না। সেটা দেখতেই আমরা ম্যাচ দেখি। উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ম্যারাডোনা তখন যেটা করে, সেটাই ম্যাজিক।

যে ম্যাজিকটা আপনি ক্যামেরার সামনে দেখান! মাঝে মাঝেই মনে হয়, যে সংলাপটা আপনি বলছেন, সেটা নিশ্চয়ই চিত্রনাট্যে ছিল না, এটা মোশাররফ করিম নিজে থেকেই বলছেন...

আমার একটা অদ্ভুত বিশ্বাস আছে, স্ক্রিপ্টে লেখা সংলাপই একটি চরিত্রের সারা জীবনের সংলাপ না। এই সংলাপগুলো নাট্যকার ওই চরিত্রের জন্য লিখেছেন। যদি চরিত্রের মধ্যে ডুব দেওয়া যায়, তাহলে ওই মুখ দিয়ে যা বলা হবে সেটাই ওই চরিত্রের সংলাপ। চরিত্রটা না হয়ে উঠতে পারলে ভিন্ন কথা।

বলিউডে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীকে দেখে আপনার আফসোস হয়?

কেন?

তাঁকে প্রধান চরিত্র করে একের পর এক ছবি হচ্ছে। বাংলাদেশে তো আপনাকে নিয়েও এমন হতে পারত...

নানা পাটেকর, নাসিরুদ্দীন শাহ শাহদের নিয়েও সেখানে এমন হয়েছে। সালমান খানের জায়গা আছে, প্যারালালি তাঁদেরও একটা জায়গা ছিল। আমাদের গোড়াতেই তো গলদ। আক্ষেপ হয়, তবে হতাশ না। হতেই হবে এমন না, হলে ভালো।

প্রায়ই পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভক্তরা এসে আপনার সঙ্গে দেখা করে। কলকাতায় আপনার বড় একটা ফ্যানবেইস তৈরি হয়ে আছে; যদিও সেখানকার কোনো কাজ করেননি!

ওখানকার লোকেরা পছন্দ করে আমাকে। সেদিনও পূজা উপলক্ষে সস্ত্রীক এক ভদ্রলোক এলেন দমদম থেকে। ইউটিউবের কল্যাণে আমাদের নাটক দেখছে ওরা। ওখানে গেলে অনেকেই আসে দেখা করতে। ভালোই লাগে। ওখানে ‘সিতারা’ নামের একটা ছবি করার কথা ছিল, এক মাস সেখানে গিয়ে থাকতে হতো, তাই করিনি। এটা আমাকে দিয়ে হবে না।

দুই দশকে ৯টি সিনেমায় আপনাকে দেখেছি। টেলিভিশন, অজ্ঞাতনামা’—এই দুটিতে আপনাকে যেভাবে পেয়েছি, বাকিগুলোতে ঠিক সেভাবে পাইনি। দর্শক কিন্তু বড় পর্দায় আপনাকে আরো বৈচিত্র্যময় চরিত্রে দেখতে চায়। কেন হচ্ছে না?

আগেই বলেছি, কোনো কিছু নিয়ে আমি কখনোই ক্রেজি না। অনেক সিনেমার অফারই পেয়েছিলাম, ভালো লাগেনি। ভালো লাগলে করব, ভালো না লাগলে জীবনে আর একটা ছবিও করব না।

এর সঙ্গে কি অর্থনৈতিক ব্যাপার জড়িত? একটা সিনেমার জন্য এক মাস সময় দিয়ে যে টাকা পাবেন, ওই সময়ে টানা নাটক করলে আরো বেশি আয় করতে পারবেন...

না। টাকা কখনোই ইস্যু না।

দুই দশক আগে যখন শুরু করেছিলেন, তখন টিভি নাটকে যাঁরা অভিনয় করতেন তাঁরা সংলাপ বলতেন আবৃত্তির ঢঙে, আকাশের দিকে তাকিয়ে। আপনারা আসার পর একটা পরিবর্তন এসেছে। দুই দশকে এ রকম আর কী কী পরিবর্তন হয়েছে?

সবাই ও রকম অভিনয় করত তা না। আবুল হায়াত, আবুল খায়ের, সালেহ আহমেদ, ফরীদি ভাই—তাঁরা স্বাভাবিক অভিনয়টা করতেন। তবে হ্যাঁ, সময়ের সঙ্গে অভিনয়ের গতি পরিবর্তন হবেই। এখন অভিনয়টা অনেক বেশি জীবনঘেঁষা। বাংলাদেশে অনেক কিছু এমনি এমনি হয়ে যায়। সমসাময়িক বাস্তবতা নাটকে চলে আসে এখন, এটা খুবই ভালো। একুশে টেলিভিশন যখন এলো, সরয়ার ফারুকী ভাই, গিয়াসউদ্দিন সেলিম ভাইয়েরা অসাধারণ কিছু কাজ করেছেন। তাঁরা নাটক ছেড়ে চলেও গেলেন। এর পেছনে বাজেটটা বড় ফ্যাক্টর। ভালো ক্যামেরাম্যানরাও চলে গেলেন অন্যদিকে।

জীবনে অনেক চরিত্র করেছেন। একটা চরিত্র করতে গেলে রিয়াল লাইফ থেকে চরিত্রগুলোর উপকরণ নিতে হয়। আপনার পক্ষে তো এখন মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ সে রকম হয় না, তাহলে এই সময়ের চরিত্রগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন কিভাবে?

এটা একটা বিপদ তো অবশ্যই। অতীতের দেখা জীবন থেকেই উপকরণ নিতে হয়। আমি পড়ার চেষ্টা করি। বই নিয়ে বসতে পারি না, মোবাইলে ই-বুক নামিয়ে পড়ি।

আপনি কবিতা লিখতেন, গানও। অনেক দিন হলো নতুন কিছু পাচ্ছি না।

সর্বশেষ কবে লিখেছি মনে নেই, অনেক দিন আগে।

কবিতা চাপে কখন আপনার?

কবিতা এখন আর চাপে না। কবিতারা মাইন্ড করেছে। আমার মনে হয়, কবিতার জন্য অখণ্ড অবসর লাগে। বেশি কিছু লিখতে পারিনি, যতটুকুই লিখেছি, বুঝেছি একটা নিরবচ্ছিন্নতা লাগে।

গলা ছেড়ে গান ধরেন কখন? আপনার গানের গলা কিন্তু বেশ ভালো।

এখন আর গলা ছেড়ে গান ধরা হয় না।

৭ অক্টোবর আপনার আর রোবেনা রেজা জুঁইয়ের দাম্পত্যজীবনের ১৫ বছর হলো। কেমন ছিল এই ১৫ বছর?

স্ত্রীর কাছে আমি মোটামুটি খোলা বই। মানুষ তো রহস্যময়, অনেক আগেই তাকে একটা কথা বলেছিলাম—মানুষ এমনিতেই রহস্যময়, অতিরিক্ত রহস্য তৈরি করার দরকার নাই। এমনিতে একটা ছেলে আর মেয়ে বায়োলজিক্যালি আলাদা। সোসাইটি এখনো পুরুষ আর নারীকে দুইভাবে ডিল করে। সেই জায়গা থেকে নারী বেড়ে ওঠে একভাবে, পুরুষ আরেকভাবে। আবার সমাজ বলে দেয়, এখন তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকো। সমাজ কী কঠিন একটা বিপদে ফেলে মানুষকে! তার পরও আমাদের সম্পর্কের চর্চাটা হচ্ছে ভালোত্বের। আমি অনেক বেশি ভুলোমনা, খুব বেশি কাজ করতে পছন্দ করি না। একটু অলস। আর জুঁই পুরো উল্টো। এখনকার কাজ এখনই করে ফেলবে। এই গুণটা যেহেতু তার আছে, আমার ওপর বিরক্ত হবে এটাই স্বাভাবিক। সৌন্দর্যটা হচ্ছে, আমাদের দুজনের গতিটা ভালোর দিকে, বেসিক মানুষ হিসেবে আমরা ভালো। ব্যস।

থিয়েটারে অভিনয় করে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি পান বলেছিলেন। আবার ফিরে যেতে চান থিয়েটারে?

প্রায়ই ইচ্ছা করে। সেটা করতেও পারি, বলা যায় না। দেখা গেল হঠাৎ রিহার্সাল শুরু করে দিলাম। কবে নিয়মিত হতে পারব, সেটাও বলতে পারব না এখন।

 

 

মন্তব্য