kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

বিশ্বকাপে এখনো আছেন পিয়া

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ দল। তবে প্রতিটি ম্যাচে এখনো মাঠে হাজির থাকছেন বাংলাদেশের পরিচিত এই মুখ—জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া। উদ্বোধনী দিন থেকেই আছেন সেখানে। রবিবারের ফাইনালের আগে বিশ্বকাপ অভিজ্ঞতা জানিয়ে কলম ধরেছেন এই মডেল-অভিনেত্রী-উপস্থাপিকা

১১ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিশ্বকাপে এখনো আছেন পিয়া

বাংলাদেশ দলের প্রতীক ‘বাঘ’ কোলে মাঠে জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া

ভ্রমণে সঙ্গী জয়া ও রাজ্জাক

বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে উপস্থাপক পাঠানো হলো। আমি লাকি, জিটিভি আমাকে এই কাজের যোগ্য মনে করল। আগে বিদেশে অনেকবার গেছি, তবে এতটা লম্বা সময়ের জন্য নয়। একটু ভয়ে ভয়েই ছিলাম। ভাগ্য ভালো, বিমানবন্দরেই পেয়ে গেলাম জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার আবদুর রাজ্জাক ভাই আর জয়া আপুকে [অভিনেত্রী জয়া আহসান]। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে যাচ্ছেন এ দুই তারকা। জয়া আপুর সঙ্গে ‘চোরাবালি’ ছবিতে কাজ করেছি, কিন্তু তখন এত কথা হয়নি, যতটা হয়েছে বিমানে। রাজ্জাক ভাইও অসাধারণ মানুষ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর কেউ কেউ জয়া আপুর অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আমার মনে হয়েছে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশকে তুলে ধরার জন্য তাঁর চেয়ে ভালো কেউই হতে পারেন না।

 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

ওভাল থেকে কেনিংটন বিশ্বকাপের সাজে সজ্জিত। একটা উৎসবমুখর পরিবেশ চারদিকে। বাকিংহাম প্যালেসে গেলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। জয়া আহসান আর আবদুর রাজ্জাক সকাল থেকেই সেখানে আছেন। ঠাণ্ডায় সবাই একেবারে জমে গেছেন, সবার হাতে কফির মগ। ঢুকতেই কাকে যেন দেখলাম খুব পরিচিত। ও মাই গড! ব্রেট লি। ছোটবেলায় যখন খেলা বুঝতাম না, তখন থেকেই তাঁকে খুব ভালো লাগে। তাই তাঁর সঙ্গে ছবি তুলতে ভুল করিনি। পাশেই বলিউড তারকা ফারহান আখতার, নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই—এ রকম আরো অনেকে। কমপক্ষে একজনের সাক্ষাৎকার আমাকে নিতেই হবে; যদিও তাঁরা সবাই ব্যস্ত। কার নেওয়া যায়? তখনই চোখ পড়ল স্যার ভিভ রিচার্ডসের ওপর। তিনি এত বিনয়ী, অবাক না হয়ে পারলাম না। তাঁকে বললাম, ‘আমি পিয়া, বাংলাদেশ থেকে এসেছি। সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় হবে কি?’ তিনি তখনই বললেন, ‘অবশ্যই।’ জানালেন, ক্রিকেটে বাংলাদেশ খুব ভালো করছে। এই কথোপকথনের প্রায় এক সপ্তাহ পর ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে আবার দেখা হলো। তখন তিনিই ডেকে বলে উঠলেন, ‘মিস বাংলাদেশ, কেমন আছ?’

 

বিলেতের শহরগুলো

এখানে আসার আগে টেনশনে ছিলাম, দেড়-দুই মাস কিভাবে থাকব দেশের বাইরে! আমি বেশিদিন দেশের বাইরে থাকতে পারি না। ট্রাভেল অনেক করি, কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারি না। একেকটা শহর একেক রকম, যে কারণে সময়টা কিভাবে যে কেটে গেল টেরই পাইনি। এখানকার আবহাওয়া চমৎকার। ডারহাম খুব ভালো লেগেছে। ছোট শহর, কিন্তু দারুণ জায়গা। ছবির মতো সাজানো শহর। ছোট ছোট পুরনো সব বাড়ি, দেখতে অসাধারণ। চারদিকে আবার পাহাড়। সাউদাম্পটনের রোজ বোল স্টেডিয়াম দারুণ। ওখানকার আবহাওয়াও চমৎকার। ছেলে-মেয়ে সবাই দারুণ স্মার্ট। যুক্তরাজ্যে গেলে সাধারণত লন্ডনেই বেশি যাওয়া হয়। এই সব ছোট শহরে আগে খুব একটা যাওয়া হয়নি। এবার  নতুন অনেক জায়গায় গেলাম। স্কটল্যান্ডের এডিনবরাও খুব ভালো লেগেছে।

 

তারকা ধারাভাষ্যকাররা কে কেমন

অনেক দিনের জার্নি তো, সবার সঙ্গেই আমার ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।  তবে সাইমন ডুল, হর্ষ ভোগলে, মাইকেল হোল্ডিংকে একটু বেশিই ভালো লেগেছে। মাইকেল হোল্ডিংকে তো সব সময়ই ফলো করি। তাঁর ধারাভাষ্য আমার খুব ভালো লাগে। তিনি যখন কথা বলেন, শুনতে কখনোই একঘেয়ে লাগে না। আমি তাঁর ধারাভাষ্য মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি। তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত হই। গল্পের মতো করে হোল্ডিং ব্যাখ্যা করেন। আমিও নিজেকে সেভাবে প্রস্তুত করছি। মাইকেল ক্লার্ককে খুবই ভালো লেগেছে, হয়তো তিনি গুড লুকিং তাই, হা হা হা।  ভারতীয় উপস্থাপক মায়ান্তি ল্যাঙ্গার আর পাকিস্তানের জয়নব আব্বাস—দুজনই খুব ভালো মানুষ। তাঁদের সঙ্গে সময়টা খুব ভালো কাটছে। কাজের দিক বিবেচনা করতে হলে বলব, মায়ান্তি অসাধারণ।

তাঁর উপস্থাপনায় দারুণ কিছু ব্যাপার আছে। আমার মনে হয়, ক্রিকেটে তিনি এই মুহূর্তে সেরা নারী উপস্থাপক।

 

চ্যালেঞ্জ

কোনো রেস্ট পাইনি, এটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন আমাদের ম্যাচ কাভার করতে হয়েছে। বিরতিতে একটা সিটি থেকে অন্য সিটিতে দৌড়াতে হয়েছে। এত এত ট্রাভেলের মধ্যে নিজেকে সুন্দর করে প্রেজেন্ট করাটাও চ্যালেঞ্জের। এত বড় একটা দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে, সেটা ঠিকভাবে করতে পারার চ্যালেঞ্জও আছে।

 

বাংলাদেশ সম্পর্কে গ্রেটদের মন্তব্য

শচীন টেন্ডুলকার, ওয়াসিম আকরাম, সৌরভ গাঙ্গুলি, মাইকেল ক্লার্ক, ব্রায়ান লারা, ওয়াকার ইউনুসদের সঙ্গে বসে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তাঁদের সঙ্গে কথা বলছি, কাজও করছি। ক্রিকেটভক্তরা যাঁদের অন্ধ ভক্ত, তাঁদের সঙ্গে কাজ করতে পারছি, এই বয়সে এটা আমার জন্য সৌভাগ্যের। তাঁরা প্রত্যেকেই খুব ভালো মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ নিয়ে। বিশেষ করে সৌরভ গাঙ্গুলির কথা বলতে হয়। তিনি নানাভাবে প্রশংসা করতেন। এটা বলাটা ঠিক হবে কি না জানি না, বাংলাদেশ যেদিন ভারতের কাছে হেরে গেল, তাঁর খুব মন খারাপ হয়েছিল। তাঁর মুখ দেখে সেটা স্পষ্ট বোঝা গেছে। তিনি বাংলাদেশ থেকে আরেকটু ফাইট আশা করেছিলেন। সাইমন ডুলের কথা বলতে হয়, কোনো একটা ম্যাচের সময় আমরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলাম। শ্রীলঙ্কা খুব বাজেভাবে হেরে যাচ্ছিল। হেরে যাওয়ার পরও শ্রীলঙ্কার সমর্থকরা গান গাইছিল। আমি ডুলকে বললাম, শ্রীলঙ্কার ফ্যানরা দারুণ পজিটিভ। বাজেভাবে দল হেরে যাচ্ছে তা-ও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে, যা দেখার মতো। তখন ডুল বলছিলেন, ‘তোমাদের ফ্যানরাও বেশ ভালো। বাংলাদেশের খারাপ সময়ও তারা বেশ পজিটিভলি সাপোর্ট দিয়ে গেছে।’ আমি তখন বলছিলাম, তারা সমালোচনাও কম করে না। তখন তিনি হাসলেন। আর বাংলাদেশের নাম শুনলেই ভিভ রিচার্ডসের চোখে-মুখে মুগ্ধতা চলে আসে। বারবার সেটা প্রকাশও করেছেন। শচীন টেন্ডুলকার, ব্রায়ান লারা, ওয়াসিম আকরামদের মতো লিজেন্ডদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। তাঁরা কেন লিজেন্ড তাঁদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়। অন্যকে প্রশংসা করার মতো অদ্ভুত সুন্দর গুণ তাঁদের।

 

নতুন বন্ধু

এখানে এসে অনেকের সঙ্গেই খাতির হয়েছে। একজন ব্রিটিশ ব্যারিস্টারের সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। পাকিস্তানি এক কমেডিয়ান লন্ডনে থাকেন, তাঁর সঙ্গেও বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়েছে। ভারতের উপস্থাপিকা রিদ্ধিমা পাঠকের সঙ্গেও বেশ জমেছে।

 

ক্রীড়া উপস্থাপনায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কেউ মাঠ থেকে সরাসরি উপস্থাপনা করল এবারই। আমাকে দেখে নতুনরা যেন আসে এই পেশায়, সেটাই চাইব। ক্রিকেট এমন একটা জায়গায় চলে গেছে, এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য নিজের কিছু প্রস্তুতিও জরুরি।

ফাইনাল ম্যাচ ১৪ জুলাই, আমি দেশে ফিরব ২২ জুলাই। উপস্থাপনার ওপর একটা কোর্স করেই দেশে ফিরব। উন্নতি আর ভালোর তো কোনো শেষ নেই।

 

অনুলিখন : মীর রাকিব হাসান

 

বিলেতের বিশ্বযজ্ঞে পিয়া

মন্তব্য