kalerkantho

রবিবার । ২১ জুলাই ২০১৯। ৬ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৭ জিলকদ ১৪৪০

সেই চৈতী

নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় মডেল লামিয়া তাবাসসুম চৈতী। বার্জারের একুশ বছরের পুরনো একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের সিক্যুয়ালে ফের দেখা দিয়েছেন তিনি। এত দিন কোথায় ছিলেন? কী করেছেন? লিখেছেন নাবীল অনুসূর্য

২০ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সেই চৈতী

বার্জারের নতুন বিজ্ঞাপনের শুটিংয়ে শিমূলের সঙ্গে চৈতী

নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে টিভি পর্দায় এক নবদম্পতি স্বপ্ন দেখাতেন বাড়ির ইন্টেরিয়র নিয়ে। স্বামী মনির খান শিমূল আর স্ত্রীরূপী লামিয়া তাবাসসুম চৈতী। শিমূল বলেন, ‘শোবার ঘরটা নীল হোক’, চৈতী বলে ওঠেন, ‘আকাশের মতো?’ একুশ বছর আগে বার্জার পেইন্টসের এই বিজ্ঞাপন দিয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন তাঁরা। সম্প্রতি আদনান আল রাজীব নির্মাণ করেছেন বিজ্ঞাপনচিত্রটির সিক্যুয়াল। ‘মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’ ঐশীসহ এ প্রজন্মের অনেকেই আছেন এখানে। কিন্তু শিমূল-চৈতীর উপস্থিতি নস্টালজিক করে তুলেছে নব্বইয়ের অনেক দর্শককে। শিমূল এখনো শোবিজে কাজ করে চলেছেন, চৈতীকে দেখা যায় না বললেই চলে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

বার্জারের আগে-পরে আরো বেশ কিছু আলোচিত বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছিলেন। অথচ মডেলিং-অভিনয় কোনোটাকেই পেশা হিসেবে নেবেন কখনোই ভাবেননি তিনি। বললেন, “পারিবারিকভাবেই শোবিজের সঙ্গে আমার সখ্য। আমার খালাতো বোন মডেল সাদিয়া ইসলাম মৌ। বাবা ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ নাগরিক নাট্যদলের সদস্য। আফজাল আঙ্কেল [আফজাল হোসেন] আমাদের পরিবারের সদস্যের মতোই। সব মিলিয়ে এই জগতের সবাই আমাকে চিনতেন। আমাকে মডেলিং করার কথা বলতেন। এমনকি আমি যখন আট-নয় মাসের বাচ্চা, তখনই মাইসিল পাউডারের একটা বিজ্ঞাপনচিত্র করেছিলাম।”

বড় হওয়ার পরও নিজে কখনো মডেলিংয়ের কথা ভাবেননি। ১৯৯৪ সালে হঠাৎ করেই সুযোগ এসে যায়। বললেন, ‘আমি তখন নবম শ্রেণিতে। একটা বিজ্ঞাপনী সংস্থা থেকে রেক্সোনার বিজ্ঞাপনচিত্রে মডেল হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ইউনিলিভার তখন একসঙ্গে তিন দেশের জন্য বিজ্ঞাপন বানাত। সেবার বানানো হয়েছিল বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের জন্য। দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল ভারতে। নির্মাণ করেছিলেন সে দেশের নামকরা বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা রাগিব মেনন।’

শুরুটা হলো রীতিমতো বড় পরিসরে। ফলে একের পর এক প্রস্তাব আসতে থাকে। যেহেতু মডেলিং কখনোই তাঁর পেশা ছিল না, তাই খুব বেছে বেছে কাজ করতেন। প্রতিটি কাজই প্রশংসিত হয়। ১৯৯৫ সালে বার্জার আর ১৯৯৬ সালে জুঁই নারিকেল তেলের বিজ্ঞাপনচিত্র করেন। মাঝে শপ অ্যান্ড স্টপ নামের একটি সুপারশপের বিজ্ঞাপনচিত্রও করেছিলেন। ১৯৯৮ সালে করেন বার্জারের সেই আলোচিত বিজ্ঞাপনটি। বললেন, “তখন তো এখনকার মতো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ছিল না। দর্শকের প্রতিক্রিয়া সেভাবে জানা যেত না। কিন্তু যখনই বাইরে যেতাম, মানুষ দেখে অটোগ্রাফ নিত, ছবি তুলত। বুঝতে পারতাম, তারা আমাকে পছন্দ করেছে। আর এর পরই তো একটা টেলিফিল্মে সুযোগ পেয়ে গেলাম।”

ইমদাদুল হক মিলনের কাহিনিতে টেলিফিল্ম ‘ছবির মতো মেয়ে’ পরিচালনা করেছিলেন আফজাল হোসেন। বিটিভিতে প্রচারিত প্রথম দিকের টেলিফিল্মগুলোর একটি সেটি। সেটিতে তাঁর অভিনয় সবার প্রশংসাও কুড়িয়েছিল। কিন্তু এর পরই শোবিজকে বিদায় জানান। চলে যান অন্তরালে। কারণ?

‘আমি মডেলিং করেছি শখের বশে। এটাকে পেশা ভাবিনি। কোনো কিছুকে পেশা করতে গেলে অধ্যবসায়ের দরকার। অভিনয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই আমার। সেটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার আগে আমাকে সময় দিয়ে অভিনয়টা শিখতে হতো। অথচ আগে থেকেই আমি শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। শিক্ষকতার পাশাপাশি অভিনয় শিখে সেটাকে পেশা করাটা আমার পক্ষে সম্ভব হতো বলে মনে হয়নি। তাই দর্শকদের যতটুকু ভালোবাসা পেয়েছিলাম, তা নিয়েই এ জগৎকে বিদায় জানিয়েছিলাম।’

শিক্ষক চৈতীর বয়সও প্রায় ২১ বছর। শুরুতে মাস্টারমাইন্ডে ছিলেন এক বছর। এরপর সানিডেলে ছিলেন ১৮ বছর। কিছুদিন আগে জয়েন করেছেন সানবিমসে।

মাঝে অবশ্য ফারজানা শাকিলসের কিছু প্রিন্ট মিডিয়ার বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছেন। সেটাও স্বেচ্ছায় নয়, বহুদিনের ব্যক্তিগত পরিচয়ের চাপে। সেটা বাদ দিলে, তখন থেকে এখন পর্যন্ত যুক্ত আছেন শুধুই শিক্ষকতার সঙ্গে। নতুন বিজ্ঞাপনটি উদ্বেলিত করেছে তাঁর পুরনো ছাত্রদেরও, ‘প্রথম বিজ্ঞাপনটা যখন প্রচারিত হয়েছিল, তখন আমি তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির বাচ্চাদের পড়াতাম। ওই বয়সের শিশুরা শিক্ষকদের খুব ভালোবাসে। তার ওপর আমাকে টিভিতে দেখা যেত। অন্য শিক্ষকদের চেয়ে আমাকে তাই বেশি ভালোবাসত। ওদের অনেকেই এখন ফেসবুকে আমার বন্ধু। নতুন বিজ্ঞাপনটা ওরা এত শেয়ার করছে! অনেকেই লিখেছে, যেন ওরা আবার শৈশব ফিরে পেয়েছে!’ শুধু ছাত্ররাই নয়, সাধারণ দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ভীষণ আপ্লুত করেছে চৈতীকে, ‘আমি সত্যিই বিস্মিত যে এত বছর পরও সাধারণ মানুষ আমাকে মনে রেখেছে। তাদের মনে সেই সময়ে যে আমি এতটা স্থান করে নিতে পেরেছিলাম, সেটা আমি আসলে এবার বুঝতে পেরেছি। মানুষ ভালোবেসে বিজ্ঞাপনচিত্রটা দেখছে, শেয়ার করছে। আমি বসে বসে দর্শকদের মন্তব্য পড়েছি। তাদের এই ভালোবাসা পেয়ে আমি সত্যিই ভীষণ সম্মানিত।’

প্রথম যখন সিক্যুয়াল বিজ্ঞাপনটির প্রস্তাব পেয়েছিলেন, তখন অবশ্য এত কিছু ভাবেননি চৈতী। বললেন, ‘প্রথমে বার্জার আর বিজ্ঞাপনচিত্রটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রেন্ড আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। চিত্রনাট্য পড়ে আমার নিজেরই খুব ভালো লাগে। রাজি হয়ে যাই। ওরাও আমাকে ভীষণ সম্মান দিয়েছে।’

দুই দশকেরও বেশি পরে মিডিয়ায় ফিরলেন। এবার থাকছেন তো? সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দিলেন না চৈতী, ‘ভালো প্রস্তাব পেলে অবশ্যই করব। সেটা নাটক. বিজ্ঞাপনচিত্র—যেকোনো কিছুই হতে পারে। এই জগৎ থেকে চলে গেলেও মায়াটা কিন্তু রয়ে গেছে। একটা ভালো কাজ অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে এই যাত্রায় সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা পেয়েছি, সেটাকে উপেক্ষা করা খুব কঠিন।’

ব্যক্তিজীবনে স্বামী ইমরান আসিফের সঙ্গে তাঁর সুখের সংসার। চৈতী এখন দুই কন্যার জননী। বড় মেয়ে পড়ছে ‘এ’ লেভেলে, ছোট মেয়েটা ক্লাস ওয়ানে।

মন্তব্য