kalerkantho

বুধবার । ১৩ নভেম্বর ২০১৯। ২৮ কার্তিক ১৪২৬। ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

আমার আফসোস বেড়েছে

২৮ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ার ১১১টি মাল্টিপ্লেক্সে মুক্তি পেয়েছে নিরব অভিনীত ‘বাংলাশিয়া’। মুক্তি উপলক্ষে এবং ছবির প্রচারণায় দেশটিতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশি এই অভিনেতা। ফিরে এসে এই ছবি, মালয়েশিয়া ও সেখানকার চলচ্চিত্রশিল্প নিয়ে তাঁর এই লেখা

৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমার আফসোস বেড়েছে

মালয়েশিয়ায় ছবির প্রচারণায় অন্য কলাকুশলীদের সঙ্গে নিরব

এবারের মালয়েশিয়া সফরের অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্য রকম। বিমানে বসেই কেমন যেন মিশ্র অনুভূতি হচ্ছিল। গত মাসে নেমউই [ছবির পরিচালক ও অভিনেতা] যখন জানালেন, ছবিটা মুক্তি পেতে যাচ্ছে, তখন থেকেই আমার বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। তবে ছবির প্রিমিয়ারে যাওয়ার আগে অপরিচিত একটা নার্ভাসনেস কাজ করছিল। কুয়ালালামপুরের সানওয়ে পিরামিড সিনেপ্লেক্সে হয় প্রিমিয়ার। হলজুড়ে আনন্দ-হর্ষধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি বসেছিলাম একেবারে সামনের সারিতে। মাথায় তখন নানা চিন্তা খেলা করছিল। না জানি কী হয়! নেতিবাচক ও ইতিবাচক—দুটো বিষয়ই উঁকি দিচ্ছিল মনে। প্রিমিয়ার শেষে পরিস্থিতি পাল্টে গেল! অনেক মালয়েশিয়ান, চায়নিজ চেয়ার ছেড়ে এসে জড়িয়ে ধরল, নিরাপত্তারক্ষীরা এসে আমাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, ওরা আমাকে ছেড়ে দিল। তবে আমার শরীরে লেগে গেল ওদের ভালোবাসা, সে দেশের মানুষের আবেগ। প্রিমিয়ার শুরুর আগের নেতিবাচক চিন্তাগুলো সব কর্পূরের মতো উবে গেল! ফুরফুরে মেজাজে গেলাম দ্বিতীয় প্রিমিয়ারে।

একই দিনে দু-দুটি প্রিমিয়ার শেষ করে যখন হোটেলে ফিরি, তখন আমি ক্লান্ত। কুয়ালালামপুরের বহুতল ভবনের দামি সুইটসে আমার থাকার বন্দোবস্ত হলো। জানালা খুললে আলো-ঝলমলে রাজধানী। মধ্যরাতে জানালা খুলে তাকিয়ে ছিলাম বর্ণিল শহরের বুকে। নিচে শহর জেগে আছে, মনে হলো কুয়ালালামপুর ঘুমায় না। মনে পড়ল শুরুর দিনগুলোর কথা। যেদিন ছবির শুটিং শুরু হলো, সেদিন ফেসবুক পেজে অশালীন মন্তব্যের বন্যায় ভেসে যাচ্ছিল! মালয়েশিয়া শব্দ থেকে ‘মালয়’ সরিয়ে ‘বাংলা’ বসিয়ে অপমান করা হয়েছে, এমন অভিযোগ করে মালয়রা। অনেক বাংলাদেশিও সেদিন না বুঝে অশালীন ভাষায় গালি দিয়েছিল। ‘বাংলাশিয়া’ মুক্তির পর এখন তারাই দাবি তুলছে, এটার সিক্যুয়াল নির্মাণ করা হোক। সিনেমা দেখার আগ পর্যন্ত মালয়েশিয়ান ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ধারণা হয়েছিল, এখানে উভয় দেশের মানুষদের অপমান করা হয়েছে। আদতে তা তো নয়! এক বাংলাদেশি তরুণ নিজের জীবন বিপন্ন করে মালয়েশীয়দের জন্য। গুলি খাওয়ার পর সেই তরুণটিই বলে, ‘বাংলাদেশিরা কখনো মরতে পারে না।’

নায়িকা আতিকা সুহাইমির সেলফিতে নিরব

প্রবাসী সাংবাদিকদের দুই দফা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলাম। প্রশ্ন করবে কি, তারা শুধু মুগ্ধতাই প্রকাশ করে গেল। প্রশ্নের চেয়ে তাদের কমপ্লিমেন্টস বেশি পেলাম। তারা জানায়, এই সিনেমা বাংলাদেশিদের সঙ্গে মালয়েশীয়দের বন্ধন সুদৃঢ় করেছে। প্রবাসীদের মধ্যে এই ছবি নিয়ে তুমুল আগ্রহের কথাও জানাল। দ্বিতীয় প্রিমিয়ারের পর দেখা হয় এক বাংলাদেশি পরিবারের সঙ্গে। বাসার ঠিকানা ও ফোন নম্বর নোটপ্যাডে লিখে দিয়ে বারবার অনুরোধ করল, তাদের বাসায় যেন যাই। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে অসংখ্য মেসেজ, সবই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

ছবিটি এখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র হিসেবে বাংলাদেশে মুক্তি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। আমার ক্যারিয়ারে এই ছবি বিশেষ কিছু। আইএমডিবিতে এই মুহূর্তে ছবির রেটিং ৭.২, পছন্দের অনুপাত ৮৫ শতাংশ। কুয়ালালামপুরের মিডভ্যালি সিনেপ্লেক্সে এক দিনে ১৩টি প্রদর্শনী হয়েছে। এমনকি মধ্যরাতের প্রদর্শনীতেও রয়েছে ‘বাংলাশিয়া’। মুক্তির প্রথম চার দিনে ১০ লাখ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিট আয় করেছে [দুই কোটি টাকা]।

নেমউই খুবই জনপ্রিয় সেখানে। শুটিংয়ে তাঁকে দেখতেই প্রচুর লোক জড়ো হয়ে যেত। সিনেমাটোগ্রাফার আনা হয় ফিলিপাইন থেকে। নায়িকা আতিকা সুহাইমি সিঙ্গাপুরের। মালয়েশিয়া, চীন ও থাইল্যান্ডের বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় শিল্পী অভিনয় করেছেন ছবিতে। নেমউইকে দেখে মালয়েশিয়ার চলচ্চিত্র সম্পর্কে একটা মোটামুটি ধারণা পেয়েছি। নির্মাণের পাঁচ বছর পর মুক্তি পাওয়ার পেছনে রয়েছে কাজের সঙ্গে পরিচালকের কম্প্রোমাইজ না করা। ২৩টি দৃশ্যে কাঁচি চালাতে চেয়েছিল তৎকালীন সরকার। নেমউই রাজি হননি। নতুন সরকার সাতটি দৃশ্যে আপত্তি জানায়। নেমউই রাজি হয়েছেন, কারণ দৃশ্যগুলো ততটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

মালয়েশিয়ার চলচ্চিত্রশিল্প আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে। সবার আগে বলতে হয় পেশাদারির কথা। প্রচুর পর্যটক আসে এখানে, সিনপ্লেক্সে দর্শকও অনেক। এই দেশের ১১১টি মাল্টিপ্লেক্সের একাধিক থিয়েটারের পর্দায় আমাকে দেখা যায়, এটা আমার অনেক বড় প্রাপ্তি। মালয়েশিয়ার ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা দেখে আমার আফসোস বেড়েছে, বাংলাদেশে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত থাকা সত্ত্বেও সেখানে কোনো মাল্টিপ্লেক্স নেই। আফসোস করার কারণ আরো আছে। ওয়েবসাইটে লগইন করেই দেখতে পারছি এই মুহূর্তে আমার ছবি কতজন লোক দেখছে, কত টাকার টিকিট বিক্রি হচ্ছে। একটা সেন্ট্রাল সার্ভার থাকলে হয়তো আমাদের দেশেও প্রচুর ভালো সিনেমা হতো। সিনেমায় লগ্নি করতে এগিয়ে আসতেন অনেকেই।

অনুলিখন : মাহতাব হোসেন

মন্তব্য