kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

তাঁদের চোখে

অসাধারণ নারী

৭ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অসাধারণ নারী

চয়নিকা চৌধুরী, জাকিয়া বারী মম সোমনূর মনির কোনাল—নারী দিবস সামনে রেখে শোবিজের এই তিন নারী বলেছেন তাঁদের চোখে অসাধারণ দুই নারীর কথা—একজন শোবিজের, আরেকজন শোবিজের বাইরের। লিখেছেন ইসমাত মুমু

 

মা শিশির কণা কর্মকার ও সন্জীদা খাতুন

চয়নিকা চৌধুরী টিভি নাটক নির্মাতা

বেগম রোকেয়া পড়ে বড় হয়েছি। আমাদের নারীদের জন্য তিনি যে কাজটি করে গেছেন, সেটার কোনো তুলনা হয়। এ কারণে প্রথমে তাঁর চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তবে জীবনের এই সময়ে এসে বলব আমার মা শিশির কণা কর্মকারের কথা। শিক্ষিকা ছিলেন। আমাদের দুই বোনকে নিজ হাতে জামা-কাপড় বানিয়ে দিতেন। নিজে রান্না করতেন। নাচ, গান, অভিনয়সহ সংস্কৃতিপনার বিষয়টা আমাদের মধ্যে তিনিই ঢুকিয়েছেন, যেটা আজকে আমাদের অনেক কাজে লাগছে। আমার মা তখনকার সময়ে বরিশাল বিএম কলেজে পড়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেছেন। মাকে একজন মুক্তিযোদ্ধাও বলব। যুদ্ধের সময় তিনি গর্ভবতী ছিলেন। তবু প্রতিদিন ৩০-৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে রান্না করে খাওয়াতেন। আমার বয়স তখন মাত্র দেড় বছর। কাউকে  বিশ্বাস করাতে পারব না, আমরা দুই বোন কোনো দিন মাকে একটা টাকা দিতে পারিনি। তাঁর একটাই কথা—এখনো তোমার বাবা আছেন, যেদিন তিনি থাকবেন না, সেদিন দিয়ো।

আরেকজন ডক্টর সন্জীদা খাতুন, কাছ থেকে যাঁকে দেখে মুগ্ধ হয়েছি। তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন এবং আমার আইডল। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকেই ছায়ানটে গান শিখি। তখন থেকেই আমাদের শাড়ি পরতে হতো। তাঁর কথা বলায়, চলনে-বলনে মুগ্ধ হতাম। মানুষ যত বড় হয় তত বিনয়ী হয়, এই জিনিসটা আমি তাঁর কাছ থেকে শিখেছি। দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি থেকে তিনি কখনো বিচ্যুত হননি। কখনো মিথ্যা বলতে দেখিনি। সব সময় ন্যায়-নীতি ও সত্যের পক্ষে থাকেন। তাঁর সব কিছু আমাকে মুগ্ধ করে। কখনো শো অফ করতে দেখিনি। এখনো জন্মদিনে তাঁর বাড়ি গেলে বলেন—চয়নিকা, আসো, গান গাও। যদি বলি—দিদি এখন তো গলা ভালো নেই, গাইতে পারি না; বলেন—যা পারো তা-ই গাও। তিনি সেই একই রকম আছেন। তিনি যে কত বড় গুণী একজন মানুষ! দেশের জন্য লড়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথকে আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রেখেছেন। যাঁর কাছে এত ঋণ আমাদের দেশের, সেই মানুষটার তো অনেক অহংকার হওয়ার কথা। কিন্তু আমি কখনোই তাঁর মধ্যে অহংকার দেখিনি।

 

সুবর্ণা মুস্তাফা ও মা আয়শা আক্তার

জাকিয়া বারী মম অভিনেত্রী

সুবর্ণা মুস্তাফার নামটা উচ্চারণ করতে পারলে একজন জুনিয়র হিসেবে আমার গর্ববোধ হয়। তাঁকে ব্যাখ্যা করার মতো যোগ্যতা আমার নেই। শ্রদ্ধেয় গোলাম মোস্তাফার মেয়ে। মেয়ে হিসেবে বাবার নাম উজ্জ্বল করেছেন, নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন বহুগুণে। তাঁর শিক্ষা, রুচি, শিল্পীমন, সৌন্দর্যবোধ—সব কিছুই আমাকে মুগ্ধ করে। একজন সুবর্ণা মুস্তাফা দেশের সম্পদ। বাঙালি নারীর শাশ্বত সৌন্দর্যের মৌন রূপ এবং একই সঙ্গে রহস্যময় সৌন্দর্যের কারণে দর্শকদের কাছে ধ্রুপদি নারী। আমরা জুনিয়ররা প্রতিনিয়ত তাঁর কাছ থেকে শিখছি।

শোবিজের বাইরে বলব আমার মা আয়শা আক্তারের কথা। তিনি পলিটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ছিলেন। গত বছর অবসর নিয়েছেন। মায়ের সঙ্গে ছোটবেলায় আমার ভালো সম্পর্ক ছিল না। আম্মা যা-ই বলতেন, আমি তার উল্টো কথা বলতাম। কোনো কথা শুনতে চাইতাম না, রাগারাগি করতাম। ঝগড়া হতো, আম্মা বকাবকি করতেন। এটাই ছিল আম্মার সঙ্গে আমার শৈশবের সম্পর্ক। কিন্তু আমি যখন নিজের পথচলা শুরু করলাম, তখন দেখলাম, মা-ই আমার ফিলোসফার। ছোটবেলা থেকে মা আমাকে যে কথাগুলো বলতে চেষ্টা করেছেন, দেখলাম সব মনীষীই এই কথাগুলো বলেছেন এবং এগুলোই জীবনের সবচেয়ে সত্য কথা। আমার মা আমার শক্তি।

 

শারমিন সুলতানা সুমী ও রুবানা হক

সোমনূর মনির কোনাল গায়িকা

শুধু গান নয়, সব দিক দিয়ে তিনি সফল। চিরকুট ব্যান্ডের শারমিন সুলতানা সুমী আপাকে অনেক বেশি শ্রদ্ধা ও সম্মান করি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রাণিতও হই। তাঁর সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে আমার। দলের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, বন্ধন এবং জুনিয়র যারা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে। মানুষকে কাছে টেনে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তাঁর, এটা আমাকে সব সময়ই মুগ্ধ করে। শোবিজের সবাই জানেন তাঁর এই গুণের কথা। শুধু গায়িকা নন, তিনি অসাধারণ লিরিসিস্ট ও মিউজিশিয়ান। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি একজন লিডার।

শোবিজের বাইরে আমার চোখে অসাধারণ নারী রুবানা হক, আমাদের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী। রুবানা আপার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় আমার বিয়ের দিনে। আনিস ভাই ও রুবানা আপা এসেছিলেন। এত বড় একজন মানুষ, কিন্তু এত সাদামাটা! মানুষ যত বড় হন, ততই সাদাসিধা আর বিনয়ে নুয়ে পড়েন, এই কথাটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ রুবানা আপা। তাঁর মধ্যেও লিডারশিপের দারুণ দক্ষতা দেখেছি। তিনি ভালোবাসা দিয়ে সব কিছু ম্যানেজ করে ফেলতে পারেন। আনিস ভাইও বলেছিলেন, তাঁর সাফল্যের পেছনে ছিলেন রুবানা আপা। রুবানা আপা আমাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেন এবং তাঁকে যত দেখি, ততই মুগ্ধ হই।

মন্তব্য